সংগ্রাম থেকে সাফল্য: ‘জিদ্দি’ থেকে ‘আরাধনা’—যে কয়েকটি গান বদলে দিয়েছিল এক শিল্পীর ভাগ্য

Main দেশ বিনোদন ভ্রমণ রাজ্য
শেয়ার করুন

“ইতিহাস কখনও একদিনে তৈরি হয় না। একটি কিংবদন্তির জন্ম হয় অসংখ্য প্রত্যাখ্যান, অপেক্ষা আর বিশ্বাসের ভিতের ওপর। কিশোর কুমারের ক্ষেত্রেও তাই। ‘আরাধনা’ তাঁকে রাতারাতি তারকা বানায়নি; বরং সেই সাফল্যের পেছনে ছিল দুই দশকের নিরবচ্ছিন্ন সাধনা।”

কলমে: অনিরুদ্ধ পাল
সংবাদ প্রভাকর টাইমস

১৯৪৮ সাল।

ভারত তখনও স্বাধীনতার প্রথম স্বপ্নে বিভোর। হিন্দি চলচ্চিত্রেও নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের আবির্ভাব ঘটছে। ঠিক সেই সময় মুক্তি পেল ‘জিদ্দি’

এই ছবিতেই গায়ক হিসেবে প্রথম বড় সুযোগ পান আভাষ কুমার গাঙ্গুলী। গানটির নাম ছিল “মরনে কি দুয়ায়ে কিউঁ মাঙ্গুঁ”। সুরকার ছিলেন কিংবদন্তি খেমচাঁদ প্রকাশ

আজকের দৃষ্টিতে হয়তো গানটি তাঁর জীবনের সবচেয়ে বিখ্যাত সৃষ্টি নয়। কিন্তু এই গানটিই তাঁকে প্রথমবার বুঝিয়ে দিয়েছিল—তিনি শুধু অভিনয়ের জন্য জন্মাননি।

তাঁর ভেতরে আরও বড় একজন শিল্পী অপেক্ষা করে আছেন।

অভিনেতা হিসেবে সাফল্য, গায়ক হিসেবে অপেক্ষা

পঞ্চাশের দশকের শুরুতে কিশোর কুমারের অভিনয়জীবন ধীরে ধীরে গতি পেতে শুরু করে।

‘নৌকরি’, ‘বাপ রে বাপ’, ‘নিউ দিল্লি’, ‘চলতি কা নাম গাড়ি’, ‘হাফ টিকিট’—একটির পর একটি ছবিতে তাঁর সহজাত হাস্যরস দর্শকদের মন জয় করতে থাকে।

বলিউড বুঝতে শুরু করল, এই মানুষটির অভিনয় অন্যদের মতো নয়। তিনি অভিনয় করতেন না। তিনি যেন বেঁচে থাকতেন।

সংলাপ, মুখভঙ্গি, শরীরী ভাষা—সবকিছুতেই ছিল এক স্বতঃস্ফূর্ত পাগলামি, যা আগে ভারতীয় সিনেমায় খুব কমই দেখা গিয়েছিল।

কিন্তু এই সাফল্যের মাঝেও তাঁর মনে একটা অপূর্ণতা রয়ে গেল। দর্শক তাঁকে অভিনেতা হিসেবে চিনছে। তিনি চান মানুষ তাঁকে গায়ক হিসেবে চিনুক।

শচীন দেব বর্মণের অবিচল আস্থা

এই সময় একজন মানুষ কখনও তাঁর ওপর থেকে বিশ্বাস হারাননি।

তিনি শচীন দেব বর্মণ

বর্মণদা জানতেন, কিশোর কুমারের কণ্ঠে এমন এক সতেজতা আছে, যা প্রচলিত নিয়মের মধ্যে বাঁধা যায় না। তিনি একের পর এক ছবিতে সুযোগ দিতে থাকলেন।

‘মুনিমজি’ (১৯৫৫)-এর “জীবন কে সফর মে রাহি” গানটি প্রথমবার সাধারণ মানুষের কাছে কিশোর কুমারের কণ্ঠকে নতুনভাবে পরিচয় করিয়ে দেয়। গানটি শুধু জনপ্রিয় হয়নি। মানুষ বুঝতে শুরু করল—এই কণ্ঠে এক অদ্ভুত আন্তরিকতা আছে।

এ যেন পাশের বাড়ির একজন মানুষ নিজের জীবনের গল্প বলছেন।

দেব আনন্দের কণ্ঠ হয়ে ওঠার শুরু

শচীন দেব বর্মণ আর একজন মানুষের মধ্যে কিশোরকে খুঁজে পেলেন।

তিনি দেব আনন্দ

দেব আনন্দের পর্দার ব্যক্তিত্ব, তাঁর হাসি, তাঁর ছন্দ—সবকিছুর সঙ্গে কিশোর কুমারের কণ্ঠ যেন আশ্চর্যভাবে মিলে গেল। এরপর ‘পেয়িং গেস্ট’, ‘ফান্টুশ’, ‘নও দো গিয়ারাহ’, ‘গাইড’, ‘জুয়েল থিফ’—একটির পর একটি ছবিতে দেব আনন্দের ঠোঁটে শোনা গেল কিশোরের কণ্ঠ।

“গাতা রহে মেরা দিল”, “ইয়ে দিল না হোতা বেচারা”, “গাও তুম সো যাও”—এসব গান শুধু জনপ্রিয়ই হয়নি, নতুন প্রজন্মের কাছে কিশোরকে পৌঁছে দিয়েছিল।

আজও অনেক সঙ্গীতবিশারদ মনে করেন, দেব আনন্দ ও কিশোর কুমারের জুটি ছিল বলিউডের প্রথম সফল নায়ক–নেপথ্য কণ্ঠের যুগলবন্দিগুলোর অন্যতম।

ষাটের দশক—সাফল্যের মাঝেও অনিশ্চয়তা

যদিও কিছু গান জনপ্রিয় হচ্ছিল, তবুও কিশোর তখনও বলিউডের এক নম্বর গায়ক নন। সেই সময় প্লেব্যাকের আকাশে উজ্জ্বল নক্ষত্র ছিলেন মোহাম্মদ রফি, মুকেশ, তালাত মাহমুদ এবং মন্না দে। সুরকারদের প্রথম পছন্দও তাঁরাই।

কিশোর কুমার যেন সেই বিশাল নক্ষত্রমণ্ডলের মধ্যে নিজের জায়গা খুঁজে বেড়ানো এক গ্রহ। তিনি গান গাইছেন। হিটও দিচ্ছেন।তবু কেউ তখনও ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারেননি, খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি ভারতীয় চলচ্চিত্র সঙ্গীতের মানচিত্র পাল্টে দেবেন।

রাহুল দেব বর্মণ—দুই প্রজন্মের সেতুবন্ধন

১৯৬৬ সালে সুরকার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলেন রাহুল দেব বর্মণ। যাঁকে পৃথিবী পরে চিনবে পঞ্চমদা নামে।

শচীন দেব বর্মণের ছেলে হলেও তাঁর সুর ছিল সম্পূর্ণ নতুন। পশ্চিমা বাদ্যযন্ত্র, ভারতীয় সুর, জ্যাজ, লাতিন রিদম—সবকিছুর এক সাহসী মিশ্রণ। এই নতুন সুরের জন্য দরকার ছিল নতুন ধরনের কণ্ঠ। আর সেই কণ্ঠ ছিল কিশোর কুমারের। ১৯৬৮ সালে ‘পড়োশন’ ছবিতে দু’জনের সৃজনশীল রসায়নের প্রথম বড় ঝলক দেখা যায়।

“এক চতুর নার”, “মেরে সামনে ওয়ালি খিড়কি মে”—আজও ভারতীয় চলচ্চিত্র সঙ্গীতের ইতিহাসে অনবদ্য সৃষ্টি হিসেবে বিবেচিত।

সেই ছবির সেটেই অনেকেই বুঝতে পেরেছিলেন—

এই দুই শিল্পী একসঙ্গে থাকলে অসাধারণ কিছু ঘটতে চলেছে।

১৯৬৯—যে বছর বদলে দিল সবকিছু

তারপর এল সেই বছর।

১৯৬৯।

ভারতীয় চলচ্চিত্র সঙ্গীতের ইতিহাসে যার গুরুত্ব আলাদা করে লিখতে হয়।

মুক্তি পেল শক্তি সামন্ত পরিচালিত ‘আরাধনা’

নায়ক—রাজেশ খান্না

সুরকার—শচীন দেব বর্মণ (অসুস্থতার সময় তাঁর কাজ সম্পূর্ণ করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন রাহুল দেব বর্মণ)।

আর গায়ক—

কিশোর কুমার।

ছবির তিনটি গান ইতিহাস হয়ে গেল।

“মেরে সপনো কি রানি”

“রূপ তেরা মস্তানা”

“কোরা কাগজ থা ইয়ে মন মেরা” (লতা মঙ্গেশকরের সঙ্গে দ্বৈত)

এই তিনটি গান শুধু জনপ্রিয় হয়নি। এগুলো ভারতীয় চলচ্চিত্র সঙ্গীতের সংজ্ঞাই বদলে দিয়েছিল।

একটি গান, একটি পুরস্কার, একটি নতুন যুগ

“রূপ তেরা মস্তানা”-র জন্য কিশোর কুমার প্রথমবার ফিল্মফেয়ার শ্রেষ্ঠ পুরুষ নেপথ্য কণ্ঠশিল্পী পুরস্কার পান। কিন্তু পুরস্কারের চেয়েও বড় ছিল অন্য একটি ঘটনা।

বলিউডের প্রায় সব বড় সুরকার বুঝে গেলেন—

নতুন যুগ এসে গেছে।

এরপর থেকে রাজেশ খান্নার জন্য প্রথম পছন্দ কিশোর। কিছুদিনের মধ্যেই অমিতাভ বচ্চন, ধর্মেন্দ্র, শশী কাপুর, ঋষি কাপুর—সবাই যেন তাঁর কণ্ঠের অপেক্ষায় থাকতেন।

‘আরাধনা’ শুধু একটি ছবি ছিল না

অনেক ছবি সুপারহিট হয়। অনেক গানও কালজয়ী হয়।

কিন্তু খুব কম সৃষ্টি একটি শিল্পীর ভাগ্য বদলে দেয়। ‘আরাধনা’ সেই বিরল ব্যতিক্রম। যে মানুষটি এতদিন নিজের জায়গা খুঁজছিলেন, তিনি এক লাফে ভারতীয় চলচ্চিত্র সঙ্গীতের কেন্দ্রবিন্দুতে পৌঁছে গেলেন। আভাষ কুমার গাঙ্গুলী আর নেই।

এখন তিনি শুধু—

কিশোর কুমার।

আর তাঁর কণ্ঠ হয়ে উঠেছে কোটি কোটি ভারতীয়ের ভালোবাসার অন্য নাম।


শেয়ার করুন