বিশ্বকর্মা পুজোয় কলকাতার আকাশে ঘুড়ির মেলা, পর্যটন দফতরের উদ্যোগে নিউ টাউনে বিশেষ ঘুড়ি উৎসব

Main দেশ রাজ্য
শেয়ার করুন

কলকাতার আকাশে ফিরল হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্যের রঙ

এসপিটি নিউজ, কলকাতা, ১৮ সেপ্টেম্বর: বিশ্বকর্মা পুজোর আবহে কলকাতার আকাশে ঘুড়ির রঙিন সমারোহ। শহরের পুরনো ঐতিহ্যকে নতুন করে সামনে আনতে আজ নিউ টাউনের ইকো পার্কে বিশেষ ঘুড়ি উৎসবের আয়োজন করল পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পর্যটন দফতর। শহরের সাংস্কৃতিক বর্ষপঞ্জিতে নতুন অনুষ্ঠান যুক্ত করার উদ্যোগের অংশ হিসেবেই এই আয়োজন বলে পর্যটন দফতর সূত্রে জানা গিয়েছে।

বিশ্বকর্মা পুজোর সঙ্গে বাংলার বহু জায়গায় ঘুড়ি ওড়ানোর দীর্ঘদিনের সম্পর্ক রয়েছে। সেই ঐতিহ্যকে কেন্দ্র করেই এবারের উৎসবের পরিকল্পনা। পর্যটন দফতরের উদ্যোগে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে বাংলার পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন প্রান্তের অভিজ্ঞ ঘুড়ি-উড়িয়েদের আমন্ত্রণ জানানো হয়।

দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ঘুড়িউড়িয়েদের উপস্থিতি

উৎসবে গুজরাত, ওড়িশা ও কর্ণাটক-সহ বিভিন্ন রাজ্য থেকে প্রায় ২৫ জন অভিজ্ঞ ঘুড়ি-উড়িয়েকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। আন্তর্জাতিক স্তরের বিভিন্ন ঘুড়ি উৎসবে অংশ নেওয়া এই শিল্পীরা বিশেষ আকৃতির ও বিষয়ভিত্তিক ঘুড়ি নিয়ে অনুষ্ঠানে অংশ নেন। বাংলার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে তুলে ধরে বিশেষ ঘুড়ি আনার জন্যও তাঁদের অনুরোধ জানানো হয়েছিল।

শুধু বিশেষ আকৃতির ঘুড়িই নয়, বাংলার চেনা ঐতিহ্যবাহী ঘুড়িও ছিল এই আয়োজনের অন্যতম আকর্ষণ। পেটকাটি, মোমবাতি, মুখপোড়া ও চন্দিয়াল-এর মতো বাংলার প্রচলিত ঘুড়ি ওড়ানোর পরিকল্পনা ছিল। উৎসবের শেষ পর্বে সাধারণ মানুষকেও ঘুড়ি ওড়ানোর সুযোগ দেওয়ার কথা জানানো হয়েছিল।

কোথায় এবং কখন অনুষ্ঠিত হল

প্রাথমিকভাবে কলকাতার ময়দানে উৎসব করার পরিকল্পনা থাকলেও পরে অনুষ্ঠানস্থল পরিবর্তন করা হয়। নিউ টাউনের ইকো পার্কের ১ নম্বর গেটের কাছে মিষ্টিকা ব্যাঙ্কোয়েটের পাশের হেলিপ্যাড মাঠে অনুষ্ঠান আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। অনুষ্ঠানটি আজ দুপুর ২টা থেকে ৫টা পর্যন্ত হওয়ার কথা জানানো হয়েছিল।

এর আগে পর্যটন দফতরের পক্ষ থেকে অনুষ্ঠানস্থল এবং সময় সম্পর্কে কলকাতা বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছিল। সংবাদসূত্র অনুযায়ী, প্রাথমিক চিঠিতে ১৮ সেপ্টেম্বর সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত অনুষ্ঠানের কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। পরে প্রকাশিত সূচিতে মূল ঘুড়ি ওড়ানোর অনুষ্ঠান বিকেল ২টা থেকে ৫টা পর্যন্ত রাখার কথা জানানো হয়।

ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ

পর্যটনমন্ত্রী শঙ্কর ঘোষ অগস্ট মাসেই এই ঘুড়ি উৎসবের কথা ঘোষণা করেছিলেন। রাজ্যের পর্যটন ও সাংস্কৃতিক পরিসরে কলকাতার বিভিন্ন ঐতিহ্যকে নতুনভাবে তুলে ধরার বৃহত্তর উদ্যোগের অংশ হিসেবেই অনুষ্ঠানটি পরিকল্পনা করা হয়েছে।

নিউ টাউনে অবশ্য এর আগেও ঘুড়ি ওড়ানোর অনুষ্ঠান হয়েছে। ২০১৩ ও ২০১৪ সালে হিডকো একটি বেসরকারি সংস্থার সঙ্গে যৌথভাবে ঘুড়ি উৎসব আয়োজন করেছিল। ২০২০ সালে এনকেডিএ-ও স্থানীয় একটি আবাসিক সংগঠনের সঙ্গে যৌথভাবে ঘুড়ি ওড়ানোর অনুষ্ঠান করেছিল, যেখানে পাখি ও পথচারীদের নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে নিরাপদ সুতো ব্যবহারের বিষয়ে সচেতনতা তৈরির চেষ্টা হয়েছিল।

পর্যটন দফতরের পক্ষ থেকে ভবিষ্যতে শীতকালে মকর সংক্রান্তিকে কেন্দ্র করে আরও বড় ঘুড়ি উৎসব আয়োজনের পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়েছে।

উৎসবের আগে বিমান নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ

তবে উৎসবকে ঘিরে নিরাপত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও সামনে এসেছে। কলকাতা বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ নিউ টাউনের অনুষ্ঠানস্থলটি বিমানবন্দরের কাছাকাছি হওয়ায় ঘুড়ি ওড়ানো নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, নির্ধারিত এলাকা বিমানবন্দরের প্রায় পাঁচ কিলোমিটারের মধ্যে এবং বিমান ওঠানামার পথের কাছাকাছি। ফলে বড় আকারের ঘুড়ি যদি নির্ধারিত উচ্চতার চেয়ে বেশি উঠে যায়, তা অবতরণ বা উড্ডয়নের সময় বিমানের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।

কলকাতা বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে উত্তর ২৪ পরগনার জেলাশাসক এবং বিধাননগর পুলিশ কমিশনারকেও বিষয়টি জানানো হয়েছিল। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ছিল, বিমানবন্দরের কাছে ঘুড়ি, ঘুড়ির সুতো বা অন্যান্য উড়ন্ত বস্তু বিমান চলাচলের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি করতে পারে।

পর্যটন দফতরের বক্তব্য

অন্যদিকে, রাজ্যের পর্যটন দফতরের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে নিরাপত্তার বিষয়টি মাথায় রেখেই আয়োজন করা হয়েছে। পর্যটন বোর্ডের ব্যবস্থাপনা অধিকর্তা সুমন্ত সহায়ের বক্তব্য উদ্ধৃত করে সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, ঘুড়ি ওড়ানোর ক্ষেত্রে ১০০ ফুটের উচ্চতার সীমা রাখা হয়েছে।

তবে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের উদ্বেগের জায়গা ছিল, বড় আকারের ঘুড়ির প্রকৃত উচ্চতা সবসময় মানুষের নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব কি না। বিশেষ করে পেশাদার ঘুড়ি-উড়িয়েরা বড় ঘুড়ি ওড়ালে সেগুলি নির্ধারিত উচ্চতার সীমা অতিক্রম করার সম্ভাবনা রয়েছে কি না, সেই প্রশ্নও উঠেছে।

আবহাওয়াও ছিল নজরে

আজকের অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে আবহাওয়াও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, কলকাতা ও সংলগ্ন এলাকায় বৃষ্টির সম্ভাবনা থাকায় ঘুড়ি উৎসবের আয়োজন এবং দর্শক সমাগমে তার প্রভাব পড়তে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল।

কলকাতার সাংস্কৃতিক বর্ষপঞ্জিতে নতুন সংযোজন

বিশ্বকর্মা পুজোর সঙ্গে যুক্ত বাংলার ঘুড়ি ওড়ানোর ঐতিহ্যকে কেন্দ্র করে আয়োজিত এই উৎসব শুধু বিনোদনের আয়োজন নয়, বরং শহরের হারিয়ে যেতে বসা লোকঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরার একটি প্রচেষ্টা হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

বিশেষ আকৃতির ঘুড়ি, বিভিন্ন রাজ্যের ঘুড়ি-শিল্পীদের অংশগ্রহণ এবং বাংলার ঐতিহ্যবাহী ঘুড়ির প্রদর্শন—সব মিলিয়ে নিউ টাউনের এই আয়োজন কলকাতার উৎসব-সংস্কৃতিতে একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে। একই সঙ্গে বিমান চলাচলের নিরাপত্তা, ঘুড়ির উচ্চতা এবং সুতো ব্যবহারের মতো বিষয়গুলিও ভবিষ্যতে এই ধরনের আয়োজনের ক্ষেত্রে আরও গুরুত্ব পাবে বলে মনে করা হচ্ছে।

পর্যটন দফতরের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ভবিষ্যতে মকর সংক্রান্তিকে কেন্দ্র করে আরও বড় পরিসরে এমন উৎসব হলে কলকাতার পর্যটন ও সাংস্কৃতিক বর্ষপঞ্জিতে ঘুড়ি উৎসব একটি নিয়মিত আকর্ষণ হয়ে উঠতে পারে।


শেয়ার করুন