
নন্দীগ্রাম ও রেজিনগর উপনির্বাচনের আগে নির্বাচন কমিশনের অন্তর্বর্তী নির্দেশ
Published on: সেপ্টে ১৭, ২০২৬ at ২৩:৫১
এসপিটি নিউজ, নয়াদিল্লি, ১৭ সেপ্টেম্বর: পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের নাম, সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ এবং নির্বাচনী প্রতীক নিয়ে চলা বিরোধে গুরুত্বপূর্ণ অন্তর্বর্তী সিদ্ধান্ত নিল নির্বাচন কমিশন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠী এবং ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠী—দুই পক্ষকেই আসন্ন বিধানসভা উপনির্বাচনে ‘অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস’ নাম এবং দলের সংরক্ষিত ‘জোড়া ফুল’ প্রতীক ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে কমিশন।
কমিশনের অন্তর্বর্তী নির্দেশ অনুযায়ী, উপনির্বাচনের জন্য দুই গোষ্ঠীকেই পৃথক নাম এবং পৃথক নির্বাচনী প্রতীক বেছে নিতে হবে। দুই পক্ষকে ১৮ সেপ্টেম্বরের মধ্যে নিজেদের পছন্দের তিনটি করে নাম এবং কমিশনের নির্ধারিত অবাধ প্রতীক-তালিকা থেকে তিনটি করে প্রতীকের বিকল্প দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
কেন এমন সিদ্ধান্ত কমিশনের?
তৃণমূল কংগ্রেসের সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ এবং দলের নাম ও নির্বাচনী প্রতীক নিয়ে দুই পক্ষই নিজেদের বৈধ দাবি নির্বাচন কমিশনের কাছে জানিয়েছিল। উভয় পক্ষই নথিপত্র জমা দেয় এবং কমিশনের সামনে নিজেদের বক্তব্য পেশ করে।
১৭ সেপ্টেম্বর কমিশন দুই পক্ষের বক্তব্য শোনার পর উপনির্বাচনের স্বার্থে অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করে। কমিশনের নির্দেশে স্পষ্ট করা হয়েছে, বিরোধের নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত কোনও পক্ষই এককভাবে ‘অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস’ নাম বা সংরক্ষিত প্রতীক ব্যবহার করতে পারবে না।
এর ফলে আসন্ন উপনির্বাচনে একই দলের নাম ও একই প্রতীক দাবি করে দুই পক্ষের মুখোমুখি হওয়ার পরিস্থিতি আপাতত বন্ধ হল।
নন্দীগ্রাম ও রেজিনগর ঘিরেই তীব্র হয়েছে বিরোধ
নন্দীগ্রাম এবং রেজিনগর বিধানসভা আসনে উপনির্বাচনকে কেন্দ্র করেই নাম ও প্রতীক নিয়ে বিরোধ দ্রুত তীব্র হয়। দুই পক্ষই প্রার্থী ঘোষণা করে এবং নিজেদের তৃণমূল কংগ্রেস হিসেবে দাবি করে।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন শিবির নন্দীগ্রামে সঞ্চিতা প্রধান এবং রেজিনগরে রাবিউল আলম চৌধুরীকে প্রার্থী ঘোষণা করেছিল। অন্যদিকে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন শিবির নন্দীগ্রামে মহম্মদ এতেশামুল হক এবং রেজিনগরে সফিউজ্জামান শেখকে প্রার্থী করেছিল।
দুই পক্ষই প্রথম পর্যায়ে তৃণমূলের প্রচলিত প্রতীক ব্যবহার করার দাবি জানিয়েছিল। ফলে একই নির্বাচনী প্রতীক নিয়ে দুই প্রার্থী মাঠে নামার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল।
১৬ সেপ্টেম্বর শেষ হয়েছিল মনোনয়ন জমার সময়সীমা
নন্দীগ্রাম ও রেজিনগর উপনির্বাচনের জন্য মনোনয়ন জমা দেওয়ার শেষ দিন ছিল ১৬ সেপ্টেম্বর। কমিশনও ওই সময়সীমার মধ্যে দুই পক্ষের কাছ থেকে অতিরিক্ত নথি ও বক্তব্য গ্রহণ করে।
এর আগে কমিশন দুই পক্ষের প্রতিনিধিদের সঙ্গে একাধিক দফায় বৈঠক করেছিল। ১৭ সেপ্টেম্বর ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন পাঁচ সদস্যের প্রতিনিধিদলের সঙ্গেও কমিশনের শুনানি হয়।
দুই পক্ষের দাবিতে কী ছিল?
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবিরের বক্তব্য ছিল, দলের বর্তমান সাংগঠনিক কাঠামো এবং নেতৃত্ব দলের সংবিধান অনুযায়ী বৈধ। তাদের দাবি, সংগঠনগত নির্বাচন ও দলের সাংবিধানিক কাঠামো এখনও কার্যকর রয়েছে।
অন্যদিকে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবির দলের সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ভিন্ন দাবি করেছে এবং নিজেদের পক্ষেই সংখ্যাগরিষ্ঠ বিধায়কের সমর্থন রয়েছে বলে জানিয়েছে। তাদের বক্তব্যের কেন্দ্রে ছিল দলের সংগঠন, নেতৃত্বের মেয়াদ এবং নির্বাচনী প্রতীকের বৈধ অধিকার।
এই দাবিগুলির নিষ্পত্তি এখনও চূড়ান্ত হয়নি। বর্তমান কমিশনের নির্দেশটি অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা, অর্থাৎ এটি মূল বিরোধের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি নয়।
আগেও এমন পরিস্থিতিতে প্রতীক ‘ফ্রিজ’ হয়েছে
নির্বাচনী প্রতীক নিয়ে দলের অভ্যন্তরীণ বিরোধের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের এমন পদক্ষেপ নতুন নয়। ২০২২ সালে শিবসেনার অভ্যন্তরীণ বিরোধের সময় কমিশন দলটির নাম ও ‘ধনুক-বাণ’ প্রতীক সাময়িকভাবে ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল। ২০২১ সালে লোক জনশক্তি পার্টির ক্ষেত্রেও দলীয় নাম ও প্রতীক নিয়ে অনুরূপ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল।
তৃণমূলের ক্ষেত্রেও কমিশন এবার একই ধরনের অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা নিয়ে দুই পক্ষকে পৃথক পরিচয়ে উপনির্বাচনে অংশ নেওয়ার পথ তৈরি করেছে।
এবার কী হবে?
কমিশনের নির্দেশ অনুযায়ী, দুই গোষ্ঠীকে নিজেদের জন্য নতুন নাম এবং নতুন প্রতীক বেছে নিতে হবে। প্রয়োজনে তারা নিজেদের নামের সঙ্গে মূল দলের সঙ্গে সম্পর্কের উল্লেখ করতে পারবে। তবে দুই পক্ষের প্রতীক পৃথক হতে হবে।
ফলে নন্দীগ্রাম ও রেজিনগরের উপনির্বাচনে ভোটারদের সামনে এবার একই ‘তৃণমূল কংগ্রেস’ নাম ও একই ‘জোড়া ফুল’ প্রতীকে দুই পক্ষের প্রতিদ্বন্দ্বিতার পরিবর্তে পৃথক নাম ও প্রতীক থাকবে।
নির্বাচন কমিশনের প্রকাশিত সময়সূচি অনুযায়ী, ৬ অক্টোবর নন্দীগ্রাম ও রেজিনগর বিধানসভা কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ হওয়ার কথা এবং ৯ অক্টোবর ভোটগণনা হবে।
তবে মূল প্রশ্ন এখনও রয়ে গেল
১৭ সেপ্টেম্বরের সিদ্ধান্তে উপনির্বাচনের জন্য নাম ও প্রতীকের তাৎক্ষণিক সমস্যা সামলানো হলেও তৃণমূল কংগ্রেসের প্রকৃত সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ, দলের বৈধ নেতৃত্ব এবং ভবিষ্যতে ‘অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস’ নাম ও ‘জোড়া ফুল’ প্রতীক কে ব্যবহার করবে—সেই বৃহত্তর প্রশ্নের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি এখনও হয়নি।
অর্থাৎ, নির্বাচন কমিশনের আজকের নির্দেশ উপনির্বাচনের জন্য একটি অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা; এটি দুই গোষ্ঠীর মধ্যে চলা মূল সাংগঠনিক বিরোধের চূড়ান্ত রায় নয়।
সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া, দ্য নিউ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, দ্য স্টেটসম্যান, ইন্ডিয়া টুডে, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, এএনআই-ভিত্তিক প্রতিবেদন।
Published on: সেপ্টে ১৭, ২০২৬ at ২৩:৫১




