পর্ব ৪ | বেদে ‘ধর্ম’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে?

Main দেশ ভ্রমণ রাজ্য
শেয়ার করুন

ধর্ম কি আদিতে শুধু ‘ধর্মীয় পরিচয়’ বোঝাত, নাকি তার অর্থ ছিল আরও বিস্তৃত?

Published on: সেপ্টে ১৮, ২০২৬ at ১৫:১৪

✍️ লিখছেন অনিরুদ্ধ পাল। সংবাদ প্রভাকর টাইম

এসপিটি বিশেষ প্রতিবেদন : ‘হিন্দু’ শব্দের ইতিহাস অনুসন্ধান করতে গিয়ে আমরা ইতিমধ্যেই দেখেছি—শব্দের বর্তমান অর্থ আর তার প্রাচীন অর্থ সবসময় এক নয়। একটি শব্দ সময়ের সঙ্গে বদলাতে পারে, তার ব্যবহার বদলাতে পারে, এমনকি একটি বৃহত্তর সাংস্কৃতিক ও সামাজিক ধারণার প্রতিনিধিও হয়ে উঠতে পারে।

‘ধর্ম’ শব্দের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।

আজ ‘ধর্ম’ বলতে আমরা অনেক সময় একটি নির্দিষ্ট উপাসনা-পদ্ধতি, বিশ্বাসব্যবস্থা অথবা সম্প্রদায়কে বুঝি। কিন্তু প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্যে ‘ধর্ম’ শব্দটির অর্থ এতটা সংকীর্ণ ছিল না। বরং বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে শব্দটি ধারণ, ধারণকারী শক্তি, বিধান, নিয়ম, কর্তব্য, আচরণ, নৈতিকতা, যজ্ঞবিধি, প্রথা এবং প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থার মতো নানা অর্থ বহন করেছে।

তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে— বৈদিক যুগে ‘ধর্ম’ বলতে ঠিক কী বোঝানো হত?

শব্দের ভিতরেধারণ’-এর ধারণা

‘ধর্ম’ শব্দটির ব্যুৎপত্তি সংস্কৃতের ‘ধৃ’ ধাতুর সঙ্গে যুক্ত বলে ভাষাতাত্ত্বিক ও শাস্ত্রীয় আলোচনায় ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এই ধাতুর মূল ভাবের মধ্যে রয়েছে—ধারণ করা, ধরে রাখা, সমর্থন করা, স্থির রাখা বা বহন করা। এই ব্যুৎপত্তিগত অর্থটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কারণ এখান থেকেই বোঝা যায়, ‘ধর্ম’কে কেবল একটি বিশ্বাসের নাম হিসেবে দেখলে শব্দটির প্রাচীন অর্থের একটি বড় অংশ বাদ পড়ে যায়। যা কোনও ব্যক্তি, সমাজ, আচরণ বা ব্যবস্থাকে ধরে রাখে, যা কোনও নির্দিষ্ট নিয়ম বা শৃঙ্খলাকে অবিচল রাখে, যা একটি প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থাকে সমর্থন করে—প্রাচীন ব্যবহারে ‘ধর্ম’ সেই বিস্তৃত ধারণার সঙ্গেও যুক্ত ছিল।

ঋগ্বেদেধর্মশব্দের ব্যবহার

ঋগ্বেদের বিভিন্ন স্তোত্রে ‘ধর্ম’ এবং ‘ধর্মণ্’ শব্দের ব্যবহার পাওয়া যায়। গবেষণামূলক আলোচনায় দেখা যায়, সেখানে শব্দটি সব জায়গায় একই অর্থে ব্যবহৃত হয়নি। কোথাও এটি ধারণকারী বা সমর্থনকারী শক্তি, কোথাও প্রতিষ্ঠিত বিধান বা নিয়ম, আবার কোথাও যজ্ঞ ও ধর্মীয় আচারের বিধি বোঝাতে ব্যবহৃত হয়েছে। অর্থাৎ, ঋগ্বেদের ‘ধর্ম’কে সরাসরি আজকের অর্থে একটি নির্দিষ্ট ধর্মের নাম হিসেবে অনুবাদ করলে অর্থের বিস্তৃতি অনেকটাই সংকুচিত হয়ে যায়।

বরং প্রাচীন ব্যবহারে ‘ধর্ম’ একটি কাজ, নিয়ম, বিধান, কর্তব্য ও প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থার ধারণার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। ঋগ্বেদের বিভিন্ন মন্ত্রের ব্যাখ্যায় ‘ধর্ম’ শব্দকে দেবতাদের দ্বারা রক্ষিত বা প্রতিষ্ঠিত বিধান, নিয়ম এবং যজ্ঞসংক্রান্ত ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।

ধর্মকি তবে ধর্মীয় আচারের সঙ্গে যুক্ত ছিল না?

অবশ্যই ছিল। এখানেই বিষয়টি আরও আকর্ষণীয়।

প্রাচীন বৈদিক সমাজে যজ্ঞ, দেবতার উদ্দেশে আহুতি, প্রার্থনা এবং বিভিন্ন ধর্মীয় আচারের গুরুত্বপূর্ণ স্থান ছিল। সেই কারণে ‘ধর্ম’ শব্দটি বহু ক্ষেত্রে যজ্ঞবিধি ও ধর্মীয় আচারের বিধান বোঝাতেও ব্যবহৃত হয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে শব্দটির অর্থ ছিল নিয়ম, কর্তব্য, নৈতিক আচরণ এবং প্রতিষ্ঠিত শৃঙ্খলা।

অর্থাৎ— ধর্ম = শুধু উপাসনা নয়। বরং প্রাচীন ব্যবহারে ধর্মের ধারণার মধ্যে ছিল— যা ধারণ করে, যা রক্ষা করে, যা প্রতিষ্ঠিত নিয়ম বজায় রাখে, যা কর্তব্য নির্ধারণ করে এবং যা আচরণকে একটি নির্দিষ্ট শৃঙ্খলার মধ্যে রাখে। এই বিস্তৃত অর্থটিই ‘ধর্ম’ শব্দের ঐতিহাসিক বিবর্তন বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

ঋতএবংধর্ম’—একটি গুরুত্বপূর্ণ যোগসূত্র

বৈদিক চিন্তায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হল ‘ঋত’।

ঋগ্বেদে ‘ঋত’কে বিশ্বজগতের একটি সুশৃঙ্খল ও সত্যনিষ্ঠ ব্যবস্থার ধারণার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে ‘ধর্ম’-এর ধারণার বিকাশকে এই বৈদিক ‘ঋত’-এর সঙ্গে সম্পর্কিত করে দেখেছেন বহু গবেষক।

সহজ করে বললে, প্রকৃতি, দেবতা, যজ্ঞ, মানুষ এবং বিশ্বব্যবস্থার মধ্যে যে একটি নিয়ম ও শৃঙ্খলা রয়েছে—বৈদিক চিন্তায় সেই বৃহত্তর ব্যবস্থার ধারণা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এই জায়গায় ‘ধর্ম’ ধীরে ধীরে এমন একটি ধারণার দিকে এগোয়, যা শুধু কোনও নির্দিষ্ট আচার নয়; বরং কীভাবে জীবন, সমাজ ও আচরণ একটি নির্দিষ্ট বিধান ও নৈতিক শৃঙ্খলার মধ্যে থাকবে, সেই প্রশ্নের সঙ্গেও যুক্ত হয়ে ওঠে।

তাহলেধর্মকিউপাসনানয়?

এখানে একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য মনে রাখা দরকার। বৈদিক সমাজে দেবতা, যজ্ঞ, প্রার্থনা ও আচার অবশ্যই ছিল। তাই ধর্মীয় আচরণ থেকে ‘ধর্ম’ ধারণাকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করা যায় না। কিন্তু ‘ধর্ম’ শব্দটির অর্থকে কেবল দেবতার উপাসনা বা একটি নির্দিষ্ট বিশ্বাসের নাম হিসেবে সীমাবদ্ধ করাও ঠিক নয়। প্রাচীন ব্যবহারে এর অর্থের পরিসর অনেক বড়।

গবেষণামূলক ব্যাখ্যায় ঋগ্বেদে ‘ধর্ম’ কখনও ধর্মীয় বিধান বা আচার, কখনও প্রতিষ্ঠিত নিয়ম বা আচরণবিধি, আবার কখনও ধারণকারী বা রক্ষাকারী শক্তির অর্থ বহন করেছে।

তাই বলা যায়— ‘ধর্ম’ ছিল একটি বহুমাত্রিক ধারণা। তার মধ্যে ছিল আচারও, কর্তব্যও; বিধানও, নৈতিকতাও; নিয়মও, ধারণক্ষমতাও।

সময়ের সঙ্গেধর্ম’-এর অর্থ আরও বিস্তৃত হয়

বৈদিক সাহিত্য থেকে পরবর্তী ব্রাহ্মণ, উপনিষদ, মহাকাব্য ও স্মৃতিশাস্ত্রের যুগে প্রবেশ করলে ‘ধর্ম’ শব্দটির অর্থের পরিসর আরও বিস্তৃত হতে দেখা যায়।

পরবর্তী সাহিত্যে ধর্মের সঙ্গে ব্যক্তির কর্তব্য, সামাজিক দায়িত্ব, নৈতিক আচরণ, আশ্রমভিত্তিক কর্তব্য, রাজধর্ম, পারিবারিক দায়িত্ব এবং বিভিন্ন সামাজিক বিধান যুক্ত হয়। গবেষণায় দেখা যায়, বিভিন্ন গ্রন্থ ও যুগে ‘ধর্ম’ শব্দটি ভিন্ন ভিন্ন নির্দিষ্ট অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। অর্থাৎ, ‘ধর্ম’ কোনও একদিনে তৈরি হওয়া একটি স্থির ধারণা নয়।

এটি দীর্ঘ সময় ধরে অর্থের পরিবর্তন, বিস্তার এবং নতুন প্রেক্ষাপটের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে বিকশিত হয়েছে।

ধর্মআরধর্মীয় পরিচয়’—দুটিকে কি এক করে দেখা যায়?

এই প্রশ্নটিই আমাদের ধারাবাহিকের মূল আলোচনার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। আজ যখন আমরা বলি—‘অমুকের ধর্ম কী?’—তখন অনেক সময় উত্তরটি একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় পরিচয়কে বোঝায়। কিন্তু বৈদিক যুগের পাঠে ‘ধর্ম’ শব্দটি সেই আধুনিক অর্থে একটি সম্প্রদায়ের নাম হিসেবে সর্বত্র ব্যবহৃত হয়েছে—এমন সরল সিদ্ধান্তে পৌঁছনো ঠিক হবে না।

বরং প্রাচীন পাঠে শব্দটির বিভিন্ন ব্যবহার দেখায় যে ধর্ম ছিল একটি বিস্তৃত ধারণা, যার মধ্যে বিশ্বব্যবস্থা, কর্তব্য, বিধান, আচরণ, যজ্ঞ এবং নৈতিক শৃঙ্খলার মতো একাধিক স্তর ছিল। তাই ‘ধর্ম’ শব্দটির ইতিহাস বুঝতে গেলে আমাদের আজকের পরিচিত অর্থকে প্রাচীন যুগের উপর সরাসরি চাপিয়ে দেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।

ধর্মকি আদিতেধর্ম ছিল?

এই প্রশ্নের উত্তর এক কথায় দেওয়া যায় না। যদি ‘ধর্ম’ বলতে আজকের মতো একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় সম্প্রদায়, প্রতিষ্ঠান বা পৃথক বিশ্বাসব্যবস্থা বোঝানো হয়, তাহলে বৈদিক যুগের ‘ধর্ম’ ধারণাকে সেই একই অর্থে দেখা সমস্যাজনক।

কিন্তু যদি ‘ধর্ম’ বলতে মানুষ, সমাজ, যজ্ঞ, কর্তব্য, নৈতিকতা এবং বিশ্বব্যবস্থাকে ধারণ ও নিয়ন্ত্রণকারী বিধান বা শৃঙ্খলা বোঝানো হয়, তাহলে তার প্রাচীন শিকড় বৈদিক সাহিত্যের মধ্যেই খুঁজে পাওয়া যায়। এই কারণেই ‘ধর্ম’ শব্দের ইতিহাস আসলে শুধু ধর্মের ইতিহাস নয়। এটি ভারতীয় চিন্তার ইতিহাসেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

তাহলেহিন্দু ধর্মকথাটি কোথা থেকে এল?

এই প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আমাদের ধারাবাহিকের প্রথম কয়েকটি পর্বে আমরা দেখেছি—‘হিন্দু’ শব্দের প্রাচীন ব্যবহার এবং তার পরবর্তী ধর্মীয় পরিচয় এক বিষয় নয়। অন্যদিকে ‘ধর্ম’ শব্দটিরও বৈদিক যুগে অর্থ ছিল বর্তমানের একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় পরিচয়ের তুলনায় অনেক বিস্তৃত।

তাহলে ‘হিন্দু’ এবং ‘ধর্ম’—এই দুই ধারণা কীভাবে পরবর্তী ইতিহাসে একসঙ্গে যুক্ত হল?

কখন ‘হিন্দু’ একটি বৃহত্তর সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত হতে শুরু করল?

এবং তার আগে ‘সনাতন’ শব্দটি নিজেই কতটা প্রাচীন?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই আমাদের এবার আরও পিছিয়ে যেতে হবে। (Picture: AI Generate)

এই পর্বের সূত্র
১. ঋগ্বেদ — বিশেষত প্রথম, তৃতীয়, নবম ও দশম মণ্ডলের ‘ধর্ম’ ও ‘ধর্মণ্’ শব্দযুক্ত মন্ত্রসমূহ।
২. ঋগ্বেদ ১.২২.১৮ — ‘ধর্মাণি’ শব্দের উল্লেখ।
৩. ঋগ্বেদ ৩.৩. — ‘ধর্মাণি’ শব্দের বৈদিক ব্যবহার।
৪. ঋগ্বেদ ৯.৬৪. — ‘ধর্মাণি’ শব্দের ব্যবহার এবং তার ব্যাখ্যা।
৫. বৈদিক সাহিত্যে ‘ধর্ম’-এর অর্থ পরিসর নিয়ে গবেষণামূলক আলোচনা — যেখানে ধারণ, সমর্থন, বিধান, কর্তব্য, আচরণ, যজ্ঞবিধি ও নৈতিকতার মতো বিভিন্ন অর্থের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
৬. পরবর্তী বৈদিক সংস্কৃত সাহিত্যে ধর্মের অর্থের বিবর্তন — ব্রাহ্মণ, উপনিষদ ও পরবর্তী ধর্মশাস্ত্রীয় সাহিত্যে এর বিভিন্ন ব্যবহারের আলোচনা।

Published on: সেপ্টে ১৮, ২০২৬ at ১৫:১৪

পরবর্তী পর্ব

পর্ব | ‘সনাতনশব্দটি কত প্রাচীন?

চিরন্তনথেকেসনাতন’—একটি শব্দের প্রাচীন অর্থের সন্ধানে

বৈদিক পরবর্তী সংস্কৃত সাহিত্যে ‘সনাতন’ শব্দের ব্যবহার।

বিশ্বাসের প্রতি শ্রদ্ধা, ইতিহাসের প্রতি দায়বদ্ধতা।

লিখছেন অনিরুদ্ধ পাল


শেয়ার করুন