
Published on: আগ ৩০, ২০২৬ at ২০:১৭
✍️ অনিরুদ্ধ পাল
সংবাদ প্রভাকর টাইমস
এসপিটি অনুসন্ধানমূলক প্রতিবেদন: নেপালের রসুয়া জেলার পাহাড়ি উপত্যকায় ২৬ আগস্ট যে বিপর্যয় নেমে এসেছিল, তাকে শুধু ‘ভয়াবহ বন্যা’ বলে ব্যাখ্যা করলে ঘটনাটির প্রকৃত চরিত্র ধরা পড়বে না। কারণ এই বিপর্যয়ের শুরু হয়েছিল নদীর তীরে নয়, বহু উঁচুতে—হিমালয়ের বরফে ঢাকা পাহাড়ি ঢালে। সেখান থেকে শুরু হওয়া একটি শৃঙ্খলাবদ্ধ প্রাকৃতিক বিপর্যয় কয়েক ঘণ্টার মধ্যে নদী, জনপদ, সেতু, রাস্তা, জলবিদ্যুৎ প্রকল্প, সীমান্ত পরিকাঠামো এবং পর্যটনপথকে বিপদের মুখে ঠেলে দেয়।
এ কারণেই ২০২৬-এর এই নেপাল বিপর্যয়কে বুঝতে গেলে প্রথমেই একটি প্রশ্ন করতে হয়—
এটি কি আদৌ শুধু একটি বন্যা ছিল?
উপলব্ধ বৈজ্ঞানিক তথ্য বলছে, উত্তরটি সম্ভবত ‘না’।
মার্কিন ভূতাত্ত্বিক সমীক্ষার প্রাথমিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, লাংটাং লিরুং অঞ্চলের একটি হিমবাহ-আবৃত উচ্চ পাহাড়ি ঢালে দ্রুত ধস নেমে আসে। বরফ, পাথর এবং অন্যান্য পাহাড়ি উপাদানের সেই বিপুল স্রোত নিচে নেমে লহেন্দে খোলায় প্রবেশ করে। সেখান থেকেই শুরু হয় ভয়াবহ জল ও পাথরের স্রোত, যা পরে ভোটেকোশী নদী ব্যবস্থাকে আঘাত করে।
অর্থাৎ বিপর্যয়ের সূত্রপাত হয়েছিল—
হিমবাহ–আবৃত পাহাড় → বরফ ও পাথরের ধস → পাহাড়ি খোলা → ভোটেকোশী → ত্রিশূলী → বিস্তীর্ণ জনপদ।
এটাই এই বিপর্যয়ের প্রথম বিশেষত্ব।
ভূমিকম্প নয়, পাহাড়ের ধসেই কি তৈরি হয়েছিল সেই কম্পন?
বিপর্যয়ের প্রথম পর্যায়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছিল। ওই সময় যে শক্তিশালী ভূকম্পন-সংকেত ধরা পড়ে, সেটিকে প্রথমে ভূমিকম্প বলে মনে করা হয়েছিল। পরে বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণে ছবিটি বদলায়।
মার্কিন ভূতাত্ত্বিক সমীক্ষা জানায়, সেই কম্পন আসলে ভূমিকম্পের পরিবর্তে বৃহৎ পরিসরের হিমবাহ-সম্পর্কিত ধস ও পাথর-বরফের স্রোতের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ঘটনাটি পৃষ্ঠের কাছাকাছি ঘটেছিল এবং এর ভূকম্পন-শক্তি প্রায় ৫.২ মাত্রার ভূমিকম্পের সমতুল্য ছিল।
অর্থাৎ— পাহাড় কেঁপেছিল, কিন্তু তার কারণ ছিল না ভূমিকম্প; বরং পাহাড়েরই একটি বিশাল অংশ ভেঙে পড়েছিল।
এই পার্থক্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ভূমিকম্পের ক্ষেত্রে বিপদের পূর্বাভাস দেওয়া কঠিন। কিন্তু হিমবাহ, পাহাড়ি ঢাল, নদীর জলস্তর এবং সম্ভাব্য হ্রদ নিয়মিত পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে ভবিষ্যতে কিছু ঝুঁকি আগেভাগে শনাক্ত করা সম্ভব।
হিমবাহের ধস কীভাবে বন্যায় পরিণত হল?
এই প্রশ্নের উত্তরেই লুকিয়ে রয়েছে গোটা বিপর্যয়ের আসল রহস্য।
প্রথমে উচ্চ পাহাড়ি অঞ্চল থেকে বরফ ও পাথরের বিশাল স্তর নেমে আসে। সেই ধস যখন নিচের জলধারায় প্রবেশ করে, তখন তার সঙ্গে মিশে যায় জল, কাদা, বোল্ডার এবং পাহাড়ের অন্যান্য আলগা উপাদান। ফলে এটি আর সাধারণ পাহাড়ি ধস থাকে না।
এটি পরিণত হয় একটি অত্যন্ত শক্তিশালী জল-পাথর-কাদা স্রোতে। পথে এই স্রোত আরও মাটি, পাথর এবং জলকে নিজের সঙ্গে টেনে নেয়। ফলে তার আকার এবং ধ্বংসক্ষমতা ক্রমশ বাড়তে থাকে। এই কারণেই নদীর পাশে থাকা বাড়ি বা সেতু শুধু জলের চাপে ভেসে যায়নি; অনেক ক্ষেত্রে সেগুলি আঘাত পেয়েছে বিপুল পরিমাণ পাথর, কাদা ও ধ্বংসাবশেষের সম্মিলিত শক্তিতে।
কয়েক মিনিটে নদীর জল কেন এতটা বেড়ে গেল?
এখানেও রয়েছে এই বিপর্যয়ের দ্বিতীয় বড় বৈশিষ্ট্য।
আন্তর্জাতিক পর্বত-পরিবেশ ও উন্নয়ন সংস্থার প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ত্রিশূলী নদীর গালছিতে প্রায় ৩০ মিনিটের মধ্যে জলস্তর প্রায় ৯ মিটার পর্যন্ত বেড়ে যায়। মালেখুতেও প্রায় একই সময়ের মধ্যে জলস্তর প্রায় ৭ মিটার বৃদ্ধি পায়। একটি পাহাড়ি জনপদের মানুষের জন্য এর অর্থ খুব সহজ—
সতর্ক হওয়ার পর পালানোর সময় ছিল অত্যন্ত কম।
যে পরিবার নদীর পাশে বসে বুঝতে পারল জল বাড়ছে, তাদের হাতে হয়তো ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় ছিল না। ছিল মাত্র কয়েক মিনিট। এই কারণেই আকস্মিক পাহাড়ি বন্যা সাধারণ বন্যার চেয়ে অনেক বেশি প্রাণঘাতী।
এই বন্যার জল কি শুধু বৃষ্টি থেকে এসেছিল?
না—এটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলির একটি। বর্ষাকালে নেপালে প্রবল বৃষ্টি হয়। কিন্তু এই বিপর্যয়ের ভয়াবহতা ব্যাখ্যা করার জন্য শুধু বৃষ্টিকে দায়ী করা যথেষ্ট নয়। এখানে একসঙ্গে কাজ করেছে— বরফ, পাহাড়ি ধস, পাথর, জল, কাদা, নদীর প্রবাহ এবং সম্ভবত কোথাও কোথাও নদীর সাময়িক বাধা। অর্থাৎ এটি ছিল একটির পর একটি ঘটনা পরস্পরকে আরও শক্তিশালী করে তোলার একটি ধারাবাহিক বিপর্যয়। একটি ধস থেকে আরেকটি বিপদ। একটি বিপদ থেকে আরও বড় বিপদ।
নদীর সরু গিরিখাত কি বিপদ আরও বাড়িয়েছে?
সম্ভবত হ্যাঁ।
ভোটেকোশী এবং ত্রিশূলী নদীর বহু অংশ গভীর পাহাড়ি গিরিখাতের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত। দুই পাশে খাড়া পাহাড় এবং মাঝখানে অপেক্ষাকৃত সরু নদীপথ। এই ভূপ্রকৃতিতে বিপুল পরিমাণ জল ও ধ্বংসাবশেষ একবার ঢুকে পড়লে তার গতিশক্তি অত্যন্ত ভয়ঙ্কর হয়ে উঠতে পারে। আর এই নদীর ধারেই সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তৈরি হয়েছে—
- বসতি
- বাজার
- রাস্তা
- সেতু
- হোটেল
- পর্যটনকেন্দ্র
- জলবিদ্যুৎ প্রকল্প
- শ্রমিক বসতি
অর্থাৎ মানুষের জীবন ও অর্থনীতি নদীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হয়ে গেছে। সেখানেই তৈরি হয়েছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন— মানুষ কি নদীর ঝুঁকিকে অস্বীকার করে নদীর কাছাকাছি চলে গেছে?
বন্যা শুধু জনপদ ভাসায়নি, একটি অর্থনৈতিক করিডরকেও আঘাত করেছে
ভোটেকোশী–ত্রিশূলী অঞ্চল শুধুই নদী উপত্যকা নয়।
এই অঞ্চল যুক্ত—সড়ক যোগাযোগের সঙ্গে, সীমান্ত বাণিজ্যের সঙ্গে, জলবিদ্যুতের সঙ্গে, পর্যটনের সঙ্গে, কৈলাস–মানস সরোবর যাত্রাপথের সঙ্গে, স্থানীয় মানুষের জীবিকার সঙ্গে।
রসুয়াগঢ়ী–জিলং সীমান্তপথের গুরুত্ব এখানে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। নেপাল থেকে তিব্বতে প্রবেশের এই পথটি বাণিজ্যের পাশাপাশি পর্যটন ও তীর্থযাত্রার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। ফলে একটি পাহাড়ি বিপর্যয়ের অভিঘাত শুধু কয়েকটি গ্রাম বা নদীতীরবর্তী বাড়ির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি।
আঘাত এসেছে একটি সম্পূর্ণ মানবিক ও অর্থনৈতিক করিডরে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন: মানুষ কি ভুল জায়গায় বসতি গড়েছে?
এই প্রশ্নের উত্তর সরল নয়। পাহাড়ি দেশে সমতল জমি কম। নদী উপত্যকাই অনেক সময় মানুষের বসবাস, কৃষি, সড়ক ও ব্যবসার জন্য সবচেয়ে সুবিধাজনক জায়গা। তাই নদীর পাশে বসতি গড়ে ওঠা অনেক ক্ষেত্রেই মানুষের ইচ্ছাকৃত ঝুঁকি নেওয়া নয়; বরং ভূগোল ও অর্থনীতির বাধ্যবাধকতা। কিন্তু সমস্যা শুরু হয় যখন—
নদীর সক্রিয় প্লাবনভূমিতে স্থায়ী বাড়ি তৈরি হয়, নদীর গতিপথ সংকুচিত করা হয়, অস্থিতিশীল পাহাড়ের নিচে বাজার তৈরি হয়, অতিরিক্ত পর্যটন পরিকাঠামো তৈরি হয়, এবং গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামো একই ঝুঁকিপূর্ণ করিডরে কেন্দ্রীভূত হয়।
তখন একটি প্রাকৃতিক বিপদ মানুষের জন্য বহুগুণ বড় বিপর্যয়ে পরিণত হয়।
দ্বিতীয় বিপদের প্রশ্নও তাই গুরুত্বপূর্ণ
প্রথম বিপর্যয়ের পরে সীমান্তের কাছে ধসের কারণে অস্থায়ী জলাধার বা বাধা-হ্রদ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়।
২৮ আগস্ট একটি এমন হ্রদ উপচে পড়ায় নতুন করে সতর্কতা জারি হয়েছিল। পরে ২৯ আগস্টের উপগ্রহ-তথ্যে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের হ্রদটি ধীরে ধীরে জল হারাচ্ছে। ফলে তাৎক্ষণিকভাবে ভয়াবহ দ্বিতীয় জলঢেউয়ের আশঙ্কা কিছুটা কমে। তবে উজানে আরও একটি বড় হ্রদ এবং অস্থিতিশীল পাহাড়ি ভূখণ্ড নিয়ে সতর্কতা বজায় রয়েছে। অর্থাৎ প্রথম বিপর্যয়ের পরেও পাহাড় পুরোপুরি শান্ত হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর সময় এখনও আসেনি।
জলবায়ু পরিবর্তন কি দায়ী?
এই প্রশ্নটি এখন স্বাভাবিকভাবেই উঠছে।
হিমালয়ের হিমবাহ দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। তাপমাত্রার পরিবর্তন, বরফের অবস্থার পরিবর্তন, হিমবাহের পশ্চাদপসরণ এবং পাহাড়ি ভূখণ্ডের অস্থিতিশীলতা ভবিষ্যতে বিভিন্ন ধরনের বিপদের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
কিন্তু ২৬ আগস্টের নির্দিষ্ট বিপর্যয়টি সরাসরি জলবায়ু পরিবর্তনের ফল—এমন সিদ্ধান্ত এখনই দেওয়া বৈজ্ঞানিকভাবে নিরাপদ নয়। এই পার্থক্যটি খুব গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ— জলবায়ু পরিবর্তন ঝুঁকির পটভূমি বদলাতে পারে; কিন্তু নির্দিষ্ট একটি ধসের প্রত্যক্ষ কারণ প্রমাণ করতে আলাদা গবেষণা প্রয়োজন।
এই গবেষণা এখনও চলছে।
তাহলে এই বন্যা কেন অন্যরকম?
কারণ এটি কোনও একক ঘটনা ছিল না। এটি ছিল একের পর এক বিপদের শৃঙ্খল।
পাহাড় → হিমবাহ → ধস → বরফ → পাথর → জলধারা → নদী → জনপদ → পরিকাঠামো → পর্যটন → সীমান্ত
এই শৃঙ্খলের যে কোনও একটি জায়গায় যদি আগাম সতর্কতা কাজ করত, ক্ষয়ক্ষতি হয়তো কমানো সম্ভব হত। কিন্তু পাহাড়ি দুর্যোগের সবচেয়ে বড় সমস্যা হল—একটি ঘটনা শুরু হওয়ার পরে পরবর্তী ঘটনাগুলি অত্যন্ত দ্রুত ঘটতে পারে।
আর এখানেই শুরু হচ্ছে আমাদের অনুসন্ধান
এই প্রথম পর্ব কোনও চূড়ান্ত রায় নয়। বরং এটি একটি দরজা খুলে দিচ্ছে। পরবর্তী পর্বগুলিতে আমরা খুঁজে দেখব—
ভোটেকোশী ও ত্রিশূলীর প্রকৃত ভূগোল কী? কোন কোন জনপদ নদীর ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে তৈরি হয়েছে? কেন নদীর এত কাছে বাজার ও বসতি গড়ে উঠল? জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলির ঝুঁকি মূল্যায়ন কতটা যথাযথ ছিল? পর্যটন ও কৈলাস–মানস সরোবর যাত্রাপথ কতটা নিরাপদ? রসুয়াগঢ়ী–জিলং সীমান্তে কী ঘটেছিল? দ্বিতীয় বিপর্যয়ের ঝুঁকি কতটা বাস্তব? এবং শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নটি—
ধ্বংস হওয়া জনপদ কি আবার আগের জায়গাতেই তৈরি করা হবে?
নাকি নেপাল এবার সিদ্ধান্ত নেবে— নদীর পাশে উন্নয়ন হবে, কিন্তু নদীর বিপদকে অস্বীকার করে নয়। কারণ ২০২৬-এর এই বিপর্যয় হয়তো শুধু একটি ভয়াবহ বন্যার ইতিহাস নয়।
এটি হিমালয়ের একটি সতর্কবার্তা।
আর সেই সতর্কবার্তা শুধু নেপালের জন্য নয়। হিমালয়ের নদী-উপত্যকায় বসতি, পর্যটন, সড়ক ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্প গড়ে তোলা প্রতিটি দেশের জন্যই এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।
হিমালয় স্থির নয়। নদীও স্থির নয়। তাই মানুষের বসতির মানচিত্রও হয়তো এবার নতুন করে ভাবতে হবে।
Published on: আগ ৩০, ২০২৬ at ২০:১৭




