ভোটেকোশী বন্যা: ২৬১ উদ্ধার, ৩২০ জনের এখনও খোঁজ নেই

Main দেশ ভ্রমণ রাজ্য
শেয়ার করুন

Published on: আগ ২৯, ২০২৬ at ২১:৫৫

বিশেষ সংবাদদাতা | সংবাদ প্রভাকর টাইমস

এসপিটি নিউজ, কাঠমান্ডু, ২৯ আগস্ট ২০২৬ : নেপালের ভোটেকোশী ও ত্রিশূলী নদী অববাহিকায় ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার চার দিন পরও পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। তবে আটকে পড়া বিদেশি নাগরিক ও পর্যটকদের উদ্ধারে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির কথা জানিয়েছে Nepal Tourism Board নেপাল পর্যটন বোর্ড (NTB)। সর্বশেষ সরকারি পরিস্থিতি সংক্রান্ত আপডেট–৯ অনুযায়ী, ২৯ আগস্ট সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত মোট ২৬১ জন বিদেশি নাগরিক ও পর্যটককে উদ্ধার করা হয়েছে, যদিও এখনও ৩২০ জনের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করা সম্ভব হয়নি।

এই সংখ্যা নেপাল পর্যটন বোর্ডের আগের দিনের আপডেটের তুলনায় উদ্ধার অভিযানে বড় অগ্রগতির ইঙ্গিত দিচ্ছে। একই দিনে দুপুর ১টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত প্রকাশিত আপডেট–৮-এ ১৮৪ জন পর্যটককে উদ্ধারের এবং ৪২০ জনের যোগাযোগবিচ্ছিন্ন থাকার কথা জানানো হয়েছিল। অর্থাৎ, কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই উদ্ধার ও যোগাযোগ পুনঃস্থাপন অভিযানে উল্লেখযোগ্য সাফল্য এসেছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, পর্যটকদের সন্ধানে নেপালের সরকারি সংস্থা, ট্যুরিস্ট পুলিশ, NDRRMA, নিরাপত্তা বাহিনী এবং স্থানীয় প্রশাসন একযোগে কাজ করছে।

২৬ আগস্টের সেই আকস্মিক বিপর্যয়

২৬ আগস্ট সকালে নেপালের রসুয়া, নুওয়াকোট, ধাদিং ও গোর্খা জেলার বিস্তীর্ণ এলাকায় ভোটেকোশী ও ত্রিশূলী নদীর প্রবল জলস্রোত ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের রিপোর্ট অনুযায়ী, বিপর্যয়ের তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে বহু মানুষ কার্যত কোনও পূর্বসতর্কতা পাওয়ার আগেই জল, কাদা ও পাথরের প্রবল স্রোতের মুখে পড়েন।

প্রথম দিকের আন্তর্জাতিক রিপোর্টগুলিতে বলা হয়েছিল, নেপাল–চীন সীমান্তবর্তী অঞ্চলে এই বিপর্যয়ে গ্রাম, রাস্তা, সেতু এবং জলবিদ্যুৎ পরিকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। উদ্ধারকাজে দুর্গম পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি, কাদা, ধ্বংসপ্রাপ্ত সড়ক এবং প্রতিকূল আবহাওয়া বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তবে পর্যটকদের যোগাযোগবিচ্ছিন্ন থাকার সংখ্যা এবং সামগ্রিক দুর্যোগে নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা এক নয়—এই বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। নেপাল পর্যটন বোর্ডের সর্বশেষ ৩২০ জনের হিসাব মূলত ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার বিদেশি নাগরিক ও পর্যটকদের সঙ্গে যোগাযোগের অবস্থা সম্পর্কিত।

উদ্ধার হওয়া পর্যটকদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভারতীয়

নেপাল পর্যটন বোর্ডের প্রকাশিত দেশভিত্তিক তালিকা অনুযায়ী, উদ্ধার হওয়া ২৬১ জন বিদেশি নাগরিক ও পর্যটকের মধ্যে সবচেয়ে বেশি রয়েছেন ভারতের নাগরিক—১৬৭ জন।

দেশভিত্তিক উদ্ধার হওয়া পর্যটকদের সংখ্যা
দেশ উদ্ধার
🇮🇳 ভারত ১৬৭
🇨🇳 চীন ৪০
অশনাক্তকৃত ২১
🇺🇦 ইউক্রেন *
🇩🇪 জার্মানি
🇲🇹 মাল্টা
🇺🇸 যুক্তরাষ্ট্র *
🇷🇺 রাশিয়া
🇪🇸 স্পেন *
🇨🇭 সুইজারল্যান্ড
🇹🇷 তুরস্ক
🇮🇹 ইতালি
🇧🇪 বেলজিয়াম *
🇧🇬 বুলগেরিয়া
🇵🇹 পর্তুগাল
🇴🇲 ওমান

* নেপাল পর্যটন বোর্ড জানিয়েছে, এই তালিকায় এমন কিছু ব্যক্তিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন, যাদের সঙ্গে বর্তমানে যোগাযোগ পুনঃস্থাপিত হয়েছে।

ভারতীয় পর্যটকদের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি হওয়ায় এই বিপর্যয় ভারতের পর্যটন ও তীর্থযাত্রী মহলেও বিশেষ উদ্বেগ তৈরি করেছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রাথমিক রিপোর্টগুলিতেও ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, ব্রিটেনসহ বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের যোগাযোগবিচ্ছিন্ন থাকার কথা উঠে এসেছিল।

দূতাবাসগুলির সঙ্গে সরাসরি সমন্বয়

ক্ষতিগ্রস্ত বিদেশি নাগরিকদের সন্ধানে নেপাল পর্যটন বোর্ড বিভিন্ন দেশের কূটনৈতিক মিশনের সঙ্গেও সমন্বয় বাড়িয়েছে।

২৮ আগস্ট নয়াদিল্লিতে অবস্থিত সিঙ্গাপুর হাই কমিশন এবং নিউজিল্যান্ড হাই কমিশনের প্রতিনিধিরা নেপাল পর্যটন বোর্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। যেসব সিঙ্গাপুরি ও নিউজিল্যান্ডের নাগরিকের অবস্থান এখনও নিশ্চিত করা যায়নি, তাঁদের বিষয়ে তথ্য ও সহায়তার জন্য এই যোগাযোগ করা হয়।

NTB জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত ভ্রমণকারীদের সন্ধান, উদ্ধার ও নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে নেপাল সরকার, পর্যটন সংস্থা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তথ্য আদান-প্রদান অব্যাহত রয়েছে।

কাঠমান্ডুমুগলিং সড়ক নিয়ে নতুন আপডেট

বিপর্যয়ের পর নেপালের সড়ক যোগাযোগ পরিস্থিতি নিয়েও তৈরি হয়েছিল ব্যাপক উদ্বেগ। তবে সর্বশেষ আপডেটে নেপাল পর্যটন বোর্ড জানিয়েছে, কাঠমান্ডু–মুগলিং সড়কের পৃথিবী মহাসড়ক–বেনীঘাট–গালছি–বৈরেনী অংশ এখন আংশিকভাবে কার্যকর রয়েছে। বর্তমানে এই অংশে একমুখী চলাচলের মাধ্যমে যানবাহন চলাচল সম্ভব হচ্ছে। এর আগে দিনের প্রথম আপডেটে এই রুটকে সম্পূর্ণ কার্যকর বলা হলেও, সন্ধ্যার সর্বশেষ আপডেটে সেটিকে আংশিক কার্যকর বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে যাত্রী ও পর্যটকদের যাত্রার আগে সর্বশেষ সরকারি ট্রাফিক ও সড়ক পরিস্থিতি যাচাই করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

রসুয়া, নুওয়াকোট, ধাদিং ও গোর্খার কয়েকটি ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক অংশ বাদ দিলে দেশের অন্য অংশে সড়ক যোগাযোগ সাধারণত কার্যকর রয়েছে বলে জানিয়েছে NTB।

কেন এত কঠিন হয়ে উঠেছে উদ্ধার অভিযান?

আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা ও বিভিন্ন প্রথম সারির সংবাদমাধ্যমের রিপোর্ট অনুযায়ী, এই উদ্ধার অভিযানের সামনে রয়েছে একাধিক বড় চ্যালেঞ্জ—

  • পাহাড়ি অঞ্চলের বহু রাস্তা ও সেতু ক্ষতিগ্রস্ত;
  • প্রবল কাদা ও ধ্বংসাবশেষের কারণে ভারী যন্ত্রপাতি পৌঁছানো কঠিন;
  • দুর্গম এলাকায় হেলিকপ্টার অবতরণেও সমস্যা হচ্ছে;
  • আবহাওয়ার অবনতি উদ্ধার অভিযানকে বারবার ব্যাহত করছে;
  • নদীর জলস্তর এবং নতুন করে বন্যার আশঙ্কা উদ্ধারকারী দলগুলির জন্য অতিরিক্ত ঝুঁকি তৈরি করছে।

বিজ্ঞানী ও দুর্যোগ বিশেষজ্ঞদের প্রাথমিক বিশ্লেষণে হিমালয়ের উচ্চভূমিতে হিমবাহ-সংক্রান্ত ধস বা বরফ-পাথরের বৃহৎ ভাঙনের সঙ্গে এই আকস্মিক বন্যার যোগসূত্রের সম্ভাবনার কথাও উঠে এসেছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, বিপর্যয়ের প্রকৃত কারণ নিয়ে তদন্ত চললেও হিমালয় অঞ্চলের ক্রমবর্ধমান জলবায়ু ঝুঁকি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

পর্যটকদের জন্য জরুরি সতর্কতা

নেপাল পর্যটন বোর্ড পর্যটক এবং ভ্রমণকারীদের বিশেষভাবে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে।

বিশেষ করে—

  • যাত্রার আগে সর্বশেষ সড়ক পরিস্থিতি পরীক্ষা করুন
  • আবহাওয়ার পূর্বাভাস যাচাই করুন
  • রসুয়া, নুওয়াকোট, ধাদিং ও গোর্খা জেলার দিকে গেলে স্থানীয় প্রশাসনের নির্দেশ মেনে চলুন
  • নিরাপত্তা সংস্থা ও ট্যুরিস্ট পুলিশের সতর্কবার্তা অনুসরণ করুন
  • ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় অনাবশ্যক ভ্রমণ এড়িয়ে চলুন
  • ট্যুর অপারেটর বা স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে যাত্রাপথ নির্ধারণ করুন
পর্যটন শিল্পের সামনে বড় পরীক্ষা

এই বিপর্যয় শুধু একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়—নেপালের পর্যটন ব্যবস্থার জন্যও এটি একটি বড় পরীক্ষা। ভোটেকোশী ও ত্রিশূলী অববাহিকা নেপাল–চীন সীমান্ত, তীর্থযাত্রা, ট্রেকিং এবং আন্তর্জাতিক পর্যটন রুটের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত।

আন্তর্জাতিক রিপোর্টে উঠে এসেছে, দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলের সড়ক, সেতু ও জলবিদ্যুৎ পরিকাঠামোর ক্ষতি উদ্ধার অভিযানের পাশাপাশি পর্যটন যোগাযোগ ব্যবস্থাকেও গুরুতরভাবে প্রভাবিত করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, হিমালয়ের পরিবর্তিত জলবায়ু, হিমবাহের অস্থিতিশীলতা এবং আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি ভবিষ্যতে দক্ষিণ এশিয়ার পর্যটন পরিকল্পনায় নতুন করে গুরুত্ব পেতে পারে।

শেষ কথা

চার দিনের এই বিপর্যয়ের পর উদ্ধার হওয়া বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা ১৮৪ থেকে বেড়ে ২৬১ হওয়া অবশ্যই আশার খবর। কিন্তু এখনও ৩২০ জনের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন না হওয়ায় নেপালের প্রশাসন, পর্যটন বোর্ড এবং বিভিন্ন দেশের কূটনৈতিক মিশনের উদ্বেগ কাটেনি।

উদ্ধার অভিযান যত এগোচ্ছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে—হিমালয়ের এই দুর্যোগ শুধু নেপালের একটি আঞ্চলিক বিপর্যয় নয়। আন্তর্জাতিক পর্যটন, সীমান্ত যোগাযোগ, তীর্থযাত্রা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান ঝুঁকির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক গভীর মানবিক সংকট হিসেবেই সামনে আসছে ২০২৬ সালের ভোটেকোশী বন্যা বিপর্যয়।  Photos: Courtesy of X

Published on: আগ ২৯, ২০২৬ at ২১:৫৫

 


শেয়ার করুন