
Published on: আগ ৪, ২০২৬ at ২৩:০১
✍️কলমে:অনিরুদ্ধ পাল
সংবাদ প্রভাকর টাইমস
এসপিটি প্রতিবেদন : ভাবুন তো, পৃথিবীতে এমন একজন মানুষ ছিলেন, যিনি কখনও সঙ্গীতের প্রথাগত তালিম নেননি। যিনি প্রথম জীবনে নিজের প্রিয় শিল্পী কুন্দন লাল সায়গলের কণ্ঠ নকল করতেন। যাঁকে একদিন বলা হয়েছিল—“অন্যের মতো গাইলে চলবে না, নিজের কণ্ঠ খুঁজে বের করো।” সেই মানুষটিই একদিন হয়ে উঠলেন ভারতীয় চলচ্চিত্র সঙ্গীতের সবচেয়ে প্রভাবশালী কণ্ঠ।
তিনি কিশোর কুমার।
আজ, তাঁর ৯৭তম জন্মবার্ষিকীতে যখন কোটি কোটি মানুষ ‘মেরে সপনো কি রানি’, ‘ও মেরে দিল কে চেইন’, ‘পল পল দিল কে পাশ’ কিংবা ‘আমার পূজার ফুল’ গুনগুন করছেন, তখন হয়তো অনেকেই জানেন না—এই মানুষটির জীবনটাই ছিল তাঁর গানের মতোই অদ্ভুত, অপ্রত্যাশিত এবং অসম্ভব নাটকীয়।
একটি পরামর্শ, যা বদলে দিয়েছিল ভারতীয় সঙ্গীতের ইতিহাস
প্রথমদিকে কিশোর কুমারের গান শুনে অনেকেই বলতেন—”এ তো সায়গলের নকল!”
সেই সময় সুরসম্রাট শচীন দেব বর্মণ তাঁকে ডেকে বলেছিলেন, “তুমি সায়গল হতে পারবে না। কিন্তু তুমি এমন একজন হতে পারো, যার মতো আর কেউ হতে পারবে না।”
এই একটি বাক্য যেন তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
এরপর তিনি আর কাউকে অনুসরণ করেননি। বরং সৃষ্টি করেছিলেন নিজের এক গায়কী—যেখানে ছিল ইয়োডেলিং, গলার স্বাভাবিক ভাঙন, অভিনয়মিশ্রিত আবেগ এবং কথার সঙ্গে সুরের অভিনব মেলবন্ধন। ভারতীয় সিনেমার গান যেন প্রথমবার এত জীবন্ত হয়ে উঠেছিল।
এক টেকে রেকর্ড হওয়া গান, যা তাঁকে অমর করে দিল
১৯৬৯।
‘আরাধনা’ ছবির একটি গান রেকর্ড হবে। নাম—‘রূপ তেরা মস্তানা’।
আজও চলচ্চিত্র সঙ্গীতের ইতিহাসে এটি অন্যতম বিখ্যাত রেকর্ডিং। বলা হয়, প্রায় একটানা পরিবেশনাতেই গানটির রেকর্ডিং সম্পন্ন হয়েছিল। গানটি মুক্তির পর যেন গোটা ভারত এক নতুন কণ্ঠের প্রেমে পড়ে।
সেই গান কেবল একটি হিট গান ছিল না। সেটিই কিশোর কুমারের পুনর্জন্ম।
এরপর ‘মেরে সপনো কি রানি’, ‘কোরা কাগজ থা ইয়ে মন মেরা’—একটির পর একটি গান তাঁকে এমন উচ্চতায় পৌঁছে দেয়, যেখান থেকে আর তাঁকে কেউ নামাতে পারেনি।
রাজেশ খান্না ছিলেন মুখ, কিশোর কুমার ছিলেন প্রাণ
বলিউডে একটা সময় ছিল, যখন রাজেশ খান্না পর্দায় হাসলেই দর্শক জানতেন—কিছুক্ষণের মধ্যেই শোনা যাবে কিশোর কুমারের কণ্ঠ।
‘ইয়ে শাম মস্তানি’, ‘কুছ তো লোগ কহেঙ্গে’, ‘জিন্দেগি এক সফর হ্যায় সুহানা’, ‘চিঙ্গারি কোই ভড়কে’, ‘মেরে নয়না সাওয়ান ভাদো’, ‘হামে তুমসে পেয়ার কতনা’—রাজেশ খান্নার পর্দার আবেগ আর কিশোরের কণ্ঠ একে অপরের পরিপূরক হয়ে উঠেছিল।
অনেক চলচ্চিত্র সমালোচকের মতে, ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে নায়ক ও নেপথ্য কণ্ঠের এত নিখুঁত রসায়ন খুব কমই দেখা গেছে।
আর. ডি. বর্মণ ও কিশোর—যে জুটি সময়কে হার মানিয়েছে
যদি প্রশ্ন করা হয়, কিশোর কুমারের সবচেয়ে সফল সঙ্গীত পরিচালক কে?
উত্তর একটাই—রাহুল দেব বর্মণ (পঞ্চমদা)।
দু’জনের সম্পর্ক ছিল শুধু শিল্পীর নয়, বন্ধু ও সহযাত্রীর।
‘আপ কি কসম’, ‘শোলে’, ‘আঁধি’, ‘গোলমাল’, ‘হীরা পান্না’, ‘কালিয়া’, ‘রকি’, ‘জোশিলা’, ‘দ্য বার্নিং ট্রেন’—যে ছবির নামই বলা হোক না কেন, আর. ডি.-র সুর আর কিশোরের কণ্ঠ একসঙ্গে যেন জাদু তৈরি করেছে।
পঞ্চমদা একবার বলেছিলেন, “আমি অনেক গায়কের জন্য সুর করি। কিন্তু কিশোরের জন্য সুর বানালে মনে হতো, ও গানের মধ্যে নিজের প্রাণ ঢেলে দেবে।”
শচীন দেব বর্মণ থেকে বাপ্পী লাহিড়ী—চার দশকের নির্ভরতার নাম
শচীন দেব বর্মণের কাছে তিনি ছিলেন আবিষ্কৃত প্রতিভা।
আর. ডি. বর্মণের কাছে তিনি ছিলেন সৃজনের প্রথম পছন্দ।
লক্ষ্মীকান্ত–পেয়ারেলাল তাঁকে দিয়ে সৃষ্টি করেছেন ‘দাগ’, ‘রোটি’, ‘হাথি মেরে সাথি’-র অমর গান।
কল্যাণজি–আনন্দজীর সঙ্গে ‘ডন’, ‘জনি মেরা নাম’, ‘মুকাদ্দর কা সিকন্দর’, ‘লাওয়ারিস’ আজও শ্রোতাদের প্লেলিস্টে।
আবার আশির দশকে বাপ্পী লাহিড়ীর ডিস্কো ঘরানাতেও তিনি নিজেকে বদলে ফেলেছিলেন। ‘পাগ ঘুঙরু বাঁধ’, ‘ইন্তেহা হো গয়ি’ কিংবা ‘মঞ্জিলে আপনি জগাহ হ্যায়’ শুনলে বোঝাই যায়, সময়ের সঙ্গে নিজেকে পাল্টে নেওয়ার অসাধারণ ক্ষমতা ছিল তাঁর।
যে শিল্পী একসঙ্গে তিন প্রজন্মের নায়কের কণ্ঠ
দেব আনন্দ থেকে রাজেশ খান্না।
রাজেশ খান্না থেকে অমিতাভ বচ্চন।
অমিতাভ থেকে ঋষি কাপুর।
ঋষি কাপুর থেকে সঞ্জয় দত্ত।
চার দশক ধরে বলিউডের নায়ক বদলেছে, দর্শকের রুচি বদলেছে, সঙ্গীতের ধারা বদলেছে—কিন্তু একটি কণ্ঠ বদলায়নি।
এই ধারাবাহিকতা ভারতীয় চলচ্চিত্রে আজও এক বিরল নজির।
বাংলার কিশোর—যাকে আমরা অনেক সময় ভুলে যাই
বম্বেতে থেকেও তিনি ছিলেন অন্তরে একেবারে বাঙালি।
দুর্গাপুজোর গান তাঁর কাছে ছিল উৎসবের অংশ।
‘আমার পূজার ফুল’, ‘এই কথাটি মনে রেখো’, ‘দিনের শেষে ঘুমের দেশে’—এই অ্যালবামগুলি শুধু জনপ্রিয় হয়নি, বাংলা আধুনিক গানের ইতিহাসে বিশেষ স্থান করে নিয়েছে।
আরও বিস্ময়কর বিষয়, বাংলা ভাষায় তাঁর অভিনীত চারটি ছবির সঙ্গীত পরিচালনা করেছিলেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। দু’জনের পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও বিশ্বাস বাংলা সঙ্গীতের ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায়।
কেন আজও তিনি অপ্রতিদ্বন্দ্বী?
কিশোর কুমার কখনও শুধু সুরে গান গাইতেন না।
তিনি হাসতেন, দুষ্টুমি করতেন, কাঁদতেন, প্রেমে পড়তেন, অভিমান করতেন—সবটাই করতেন তাঁর কণ্ঠ দিয়ে।
তাঁর প্রতিটি গান যেন একটি ছোট চলচ্চিত্র।
তাই আজও ‘ওহ শাম কুছ আজীব থি’ শুনলে সন্ধ্যা নেমে আসে, ‘মুসাফির হুঁ ইয়ারোঁ’ শুনলে পথ ডাক দেয়, ‘চিঙ্গারি কোই ভড়কে’ শুনলে হৃদয়ের গভীরে জমে থাকা ব্যথা নাড়া দেয়, আর ‘জিন্দেগি এক সফর হ্যায় সুহানা’ শুনলে মনে হয়—জীবন সত্যিই উদ্যাপনের নাম।
শেষ কথা
কিশোর কুমারকে সংখ্যায় মাপা যায় না—আটটি ফিল্মফেয়ার, হাজারেরও বেশি গান, অসংখ্য সুপারহিট চলচ্চিত্র—এসব তাঁর সাফল্যের পরিসংখ্যান মাত্র।
তাঁকে আসলে মাপতে হয় অন্যভাবে।
যখন কোনও প্রেমিক আজও ‘পল পল দিল কে পাশ’ গুনগুন করেন…
যখন কোনও দীর্ঘ ভ্রমণে ‘মুসাফির হুঁ ইয়ারোঁ’ অজান্তেই ঠোঁটে চলে আসে…
যখন বর্ষার রাতে ‘চিঙ্গারি কোই ভড়কে’ শুনে মন বিষণ্ন হয়ে ওঠে…
অথবা দুর্গাপুজোর সকালে ‘আমার পূজার ফুল’ ভেসে আসে…
তখন বোঝা যায়, কিশোর কুমার কোনও যুগের শিল্পী নন। তিনি সময়েরও ঊর্ধ্বে।
৪ আগস্ট তাই শুধু একটি জন্মদিন নয়।
এটি সেই কণ্ঠের জন্মদিন, যে কণ্ঠ ভারতীয় উপমহাদেশের কোটি কোটি মানুষের জীবনের সাউন্ডট্র্যাক হয়ে আছে—গতকাল, আজ এবং নিঃসন্দেহে আগামীকালও।
Published on: আগ ৪, ২০২৬ at ২৩:০১




