
‘সনাতন ধর্ম’ কি তখন একটি ধর্মের নাম, নাকি চিরন্তন কর্তব্যের ধারণা?
লিখছেন অনিরুদ্ধ পাল
এসপিটি বিশেষ প্রতিবেদন: ‘সনাতন ধর্ম’—আজকের দিনে এই শব্দবন্ধটি একটি সুপরিচিত ধর্মীয় পরিচয়। কিন্তু ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকালে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে—মহাভারতের সময়ে ‘সনাতন ধর্ম’ কি একটি নির্দিষ্ট ধর্মের নাম হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল, নাকি ‘চিরন্তন ধর্ম’, ‘চিরস্থায়ী কর্তব্য’, ‘প্রাচীন বিধান’ কিংবা ‘অবিচল নৈতিক নিয়ম’ বোঝাতে ব্যবহৃত হয়েছিল?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে শুধু ‘এষ ধর্মঃ সনাতনঃ’—এই তিনটি শব্দ দেখলেই চলবে না। দেখতে হবে, কোন প্রসঙ্গে এই বাক্য বলা হয়েছে এবং তার আগে-পরে কী বলা হয়েছে।
মহাভারতের বিভিন্ন অংশে ‘ধর্মঃ সনাতনঃ’, ‘এষ ধর্মঃ সনাতনঃ’ এবং অনুরূপ বাক্য একাধিকবার পাওয়া যায়। কিন্তু লক্ষ করার মতো বিষয় হল—প্রতিবারই ‘সনাতন ধর্ম’ কোনও একটি সর্বজনীন ধর্মসম্প্রদায়ের নাম হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে, এমনটি দেখা যায় না। বরং নির্দিষ্ট কোনও আচরণ, কর্তব্য, নীতি বা বিধানকে ‘সনাতন’—অর্থাৎ চিরন্তন, প্রাচীন বা চিরপ্রচলিত—বলে চিহ্নিত করা হয়েছে।
‘এষ ধর্মঃ সনাতনঃ’—শব্দগুলির সরল অর্থ কী?
সংস্কৃত বাক্যাংশটি— এষ ধর্মঃ সনাতনঃ।
এখানে—
এষ — এই
ধর্মঃ — ধর্ম, কর্তব্য, বিধান, নীতি, আচরণ বা ন্যায়সংগত নিয়ম
সনাতনঃ — চিরন্তন, চিরস্থায়ী, প্রাচীনকাল থেকে চলে আসা
অর্থাৎ প্রসঙ্গভেদে এর সরল অর্থ হতে পারে— “এটাই চিরন্তন ধর্ম।”
কিন্তু এখানে ‘ধর্ম’ শব্দটিকে আজকের অর্থে একটি নির্দিষ্ট ধর্মসম্প্রদায়ের নাম ধরে নেওয়া ঠিক নয়। প্রাচীন সংস্কৃত সাহিত্যে ‘ধর্ম’ শব্দের অর্থ অনেক বিস্তৃত। কর্তব্য, নৈতিক বিধান, আচরণবিধি, ন্যায়, দায়িত্ব, সামাজিক নিয়ম এবং ধর্মীয় অনুশাসন—সবই এই শব্দের অর্থের পরিসরের মধ্যে পড়ে।
তাই ‘এষ ধর্মঃ সনাতনঃ’ দেখলেই তার অর্থ ‘এটাই হিন্দুধর্মের নাম’—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনো ভাষাগত ও ঐতিহাসিকভাবে যথার্থ নয়।
মহাভারতের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ
মহাভারতের বনপর্বে একটি শ্লোক রয়েছে—
ন হি যাচন্তি রাজান এষ ধর্মঃ সনাতনঃ।
ন চাহং হাতুমিচ্ছামি ক্ষাত্রধর্মং কথঞ্চন॥
এর অর্থ— “রাজারা কারও কাছে প্রার্থনা করে না—এটাই চিরন্তন ধর্ম। আমিও কোনওভাবেই ক্ষত্রিয়ের কর্তব্য ত্যাগ করতে চাই না।” এখানে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এখানে যখন বলা হচ্ছে— “এষ ধর্মঃ সনাতনঃ”
তখন কোনও সর্বজনীন ধর্মসম্প্রদায়ের নাম ঘোষণা করা হচ্ছে না। বরং রাজা ও ক্ষত্রিয়ের কর্তব্য এবং মর্যাদা রক্ষার একটি নির্দিষ্ট নীতি সম্পর্কে বলা হচ্ছে। অর্থাৎ এখানে ‘সনাতন’ বলতে বোঝানো হচ্ছে—যে কর্তব্য দীর্ঘকাল ধরে স্বীকৃত, প্রাচীন এবং চিরপ্রচলিত। এই উদাহরণটি দেখিয়ে দেয়, মহাভারতের ‘সনাতন ধর্ম’ শব্দবন্ধকে সরাসরি একটি ধর্মের নাম হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায় না।
সাবিত্রী ও যমের সংলাপে ‘এষ ধর্মঃ সনাতনঃ’
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ পাওয়া যায় মহাভারতের বনপর্বের সাবিত্রী উপাখ্যানে। যম সাবিত্রীকে তাঁর মৃত স্বামীর পিছনে আর না যেতে বলেন। কিন্তু সাবিত্রী উত্তর দেন—
যত্র মে নীয়তে ভর্তা স্বয়ং বা যত্র গচ্ছতি।
ময়াপি তত্র গন্তব্যমেষ ধর্মঃ সনাতনঃ॥
অর্থাৎ— “যেখানে আমার স্বামীকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, অথবা তিনি নিজে যেখানে যাচ্ছেন, আমাকেও সেখানে যেতে হবে—এটাই আমার চিরন্তন ধর্ম।”
এখানেও ‘এষ ধর্মঃ সনাতনঃ’ কোনও ধর্মের নাম নয়। সাবিত্রী তাঁর স্বামীর প্রতি কর্তব্য ও আনুগত্যের একটি নির্দিষ্ট নীতি বোঝাতে এই কথা বলছেন। অর্থাৎ এখানে ‘সনাতন ধর্ম’ বলতে একটি বিশেষ নৈতিক কর্তব্য বোঝানো হয়েছে।
সাবিত্রীর বক্তব্যেই আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত
একই উপাখ্যানে আরও একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বক্তব্য রয়েছে—
অদ্রোহঃ সর্বভূতেষু কর্মণা মনসা গিরা।
অনুগ্রহশ্চ দানং চ সতাং ধর্মঃ সনাতনঃ॥
অর্থাৎ— “কর্মে, মনে ও কথায় কোনও জীবের প্রতি বিদ্বেষ না রাখা, অনুগ্রহ ও দান—সৎ মানুষের চিরন্তন ধর্ম।” এখানে ‘সনাতন ধর্ম’ বলতে কী বোঝানো হচ্ছে, তা আরও স্পষ্ট। সকল জীবের প্রতি বিদ্বেষহীনতা, অনুগ্রহ ও দান—এই নৈতিক গুণগুলিকে চিরন্তন ধর্ম বলা হচ্ছে। এটি কোনও ধর্মসম্প্রদায়ের নাম নয়। বরং একটি নৈতিক আদর্শের কথা বলা হচ্ছে।
যুদ্ধের ক্ষেত্রেও ‘সনাতন ধর্ম’—কিন্তু অর্থ কী?
শান্তিপর্বে আরও একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ রয়েছে। যুদ্ধে কোনও যোদ্ধা যদি আহত হয়, অস্ত্রহীন হয়ে পড়ে অথবা যুদ্ধ করার অবস্থায় না থাকে, তাহলে তাকে হত্যা না করে ছেড়ে দেওয়ার নীতির কথা বলা হয়েছে।
শ্লোকটির শেষে বলা হয়েছে—
নির্ব্রণোহপি চ মোক্তব্য এষ ধর্মঃ সনাতনঃ॥ এর অর্থ— “অসহায় বা যুদ্ধের অযোগ্য হয়ে পড়া ব্যক্তিকেও মুক্ত করে দিতে হবে—এটাই চিরন্তন ধর্ম।” এখানেও ‘সনাতন ধর্ম’ কোনও ধর্মীয় পরিচয়ের নাম নয়।
এটি যুদ্ধের নৈতিক বিধান। অর্থাৎ যুদ্ধের মধ্যেও কিছু নীতি এমন রয়েছে, যা অতিক্রম করা উচিত নয়—সেই নীতিকেই ‘সনাতন’ বলা হচ্ছে।
অহিংসা, সত্য, অক্রোধ ও দান—এগুলিও ‘সনাতন ধর্ম’
মহাভারতের অনুশাসনপর্বে বলা হয়েছে—
অহিংসা সত্যমক্রোধো দানমেতচ্চতুষ্টয়ম্।
অজাতশত্রো সেবস্ব ধর্ম এষ সনাতনঃ॥
এর অর্থ— “অহিংসা, সত্য, ক্রোধহীনতা এবং দান—এই চারটি গুণ গ্রহণ করো; এটাই চিরন্তন ধর্ম।” এখানেও ‘ধর্ম’ বলতে কোনও ধর্মসম্প্রদায়ের নাম বোঝানো হয়নি। চারটি নৈতিক আদর্শকে চিরন্তন ধর্ম হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয়—যদি ‘সনাতন ধর্ম’ তখন একটি নির্দিষ্ট ধর্মের নাম হতো, তাহলে অহিংসা, সত্য, অক্রোধ ও দানের মতো নির্দিষ্ট নৈতিক গুণকে ‘সনাতন ধর্ম’ বলে আলাদা করে চিহ্নিত করার প্রয়োজন থাকত না। বরং এখানে ‘ধর্ম’ বলতে কীভাবে মানুষ আচরণ করবে—তার নৈতিক বিধান বোঝানো হয়েছে।
মহাভারতে ‘সনাতন ধর্ম’—একটি অর্থ নয়, বহু প্রসঙ্গ
উপরের উদাহরণগুলি পাশাপাশি রাখলে একটি গুরুত্বপূর্ণ চিত্র পাওয়া যায়।
কখনও— রাজাদের কর্তব্যকে সনাতন ধর্ম বলা হয়েছে। কখনও— স্বামীর প্রতি সাবিত্রীর কর্তব্যকে সনাতন ধর্ম বলা হয়েছে। কখনও— সকল জীবের প্রতি বিদ্বেষহীনতা, অনুগ্রহ ও দানকে সনাতন ধর্ম বলা হয়েছে। কখনও— যুদ্ধে অসহায় ব্যক্তিকে রক্ষা করার নীতিকে সনাতন ধর্ম বলা হয়েছে।
আবার কখনও— অহিংসা, সত্য, অক্রোধ ও দানকে সনাতন ধর্ম বলা হয়েছে। অর্থাৎ ‘সনাতন’ এখানে কোনও একক ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের পরিচয় নয়; বরং কোনও ধর্মীয়, নৈতিক বা সামাজিক বিধানের চিরস্থায়িত্ব বোঝাতে ব্যবহৃত হচ্ছে।
তাহলে মহাভারতে ‘সনাতন ধর্ম’ বলতে কী বোঝানো হচ্ছে?
এই প্রশ্নের উত্তর আরও পরিষ্কার হয় ‘সনাতন’ শব্দটির অর্থ বুঝলে।
‘সনাতন’ বলতে বোঝাতে পারে— চিরন্তন, চিরস্থায়ী, প্রাচীনকাল থেকে চলে আসা, অবিচ্ছিন্ন বা সর্বদা বিদ্যমান। অন্যদিকে ‘ধর্ম’ বলতে বোঝাতে পারে— কর্তব্য, নীতি, বিধান, আচরণ, ন্যায়, দায়িত্ব কিংবা পালনীয় নিয়ম।
সুতরাং— ‘সনাতন ধর্ম’ = চিরন্তন ধর্ম বা চিরস্থায়ী কর্তব্য
—এই অর্থ বহু প্রাচীন গ্রন্থীয় প্রসঙ্গে স্বাভাবিক।
কিন্তু— ‘সনাতন ধর্ম’ = একটি নির্দিষ্ট ধর্মের নাম
—এই অর্থটি প্রত্যেক প্রাচীন প্রসঙ্গে বসিয়ে দেওয়া যায় না।
মহাভারতে এই শব্দবন্ধের ব্যবহার কি খুব কম?
একেবারেই নয়। গবেষক পিটার হিহস তাঁর গবেষণায় উল্লেখ করেছেন, মহাভারতে ‘সনাতন ধর্ম’ এবং এর বিভিন্ন রূপ বহুবার ব্যবহৃত হয়েছে। তাঁর আলোচনায় মহাভারতে এই ধরনের ব্যবহার একশ পঞ্চাশেরও বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল—এই ব্যবহারগুলির প্রসঙ্গ এক নয়। কোথাও নির্দিষ্ট সামাজিক কর্তব্য, কোথাও নৈতিক আচরণ, কোথাও যোদ্ধার বিধান, কোথাও দান, অহিংসা বা সত্যের মতো গুণ—বিভিন্ন বিষয়কে ‘সনাতন ধর্ম’ বলা হয়েছে।
অর্থাৎ ‘সনাতন’ শব্দটি ধর্মের চিরন্তনতা বোঝাচ্ছে; কোনও একক ধর্মসম্প্রদায়ের নাম নির্দেশ করছে—এমন সিদ্ধান্ত সব ক্ষেত্রে খাটে না।
‘সনাতন ধর্ম’ এবং ‘হিন্দুধর্ম’—দুটি কি একই?
এখানেই এই ধারাবাহিকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক প্রশ্নটি সামনে আসে। আজকের দিনে ‘সনাতন ধর্ম’কে অনেকেই ‘হিন্দুধর্ম’-এর প্রাচীন সংস্কৃত নাম হিসেবে দেখেন। কিন্তু প্রাচীন সংস্কৃত সাহিত্যের পাঠ থেকে এমন সরল সিদ্ধান্তের পক্ষে যথেষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায় না।
পিটার হিহসের গবেষণায় দেখা যায়—‘সনাতন’ এবং ‘ধর্ম’ শব্দ দুটি প্রাচীন; ‘সনাতন ধর্ম’ শব্দবন্ধও প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় সংস্কৃত সাহিত্যে পাওয়া যায়। কিন্তু ভারতের সমস্ত ধর্মীয় বিশ্বাস, আচরণ ও পরম্পরার একটি সাধারণ নাম হিসেবে ‘সনাতন ধর্ম’ ব্যবহারের প্রমাণ প্রাচীন সাহিত্যে সরাসরি পাওয়া যায় না।
অর্থাৎ— ‘সনাতন’ প্রাচীন। ‘ধর্ম’ প্রাচীন। ‘সনাতন ধর্ম’ শব্দবন্ধও প্রাচীন।
কিন্তু— ‘সনাতন ধর্ম’ই ভারতের সমগ্র ধর্মীয় পরম্পরার একমাত্র প্রাচীন নাম—এই সমীকরণটি সরাসরি প্রমাণিত নয়।
তাহলে কি ‘সনাতন ধর্ম’ আধুনিক সৃষ্টি?
এখানেও উত্তরটি সরল ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ নয়। ‘সনাতন ধর্ম’ শব্দ দুটি আধুনিক যুগে তৈরি হয়নি। মহাভারতসহ প্রাচীন সংস্কৃত সাহিত্যে এর ব্যবহার রয়েছে। কিন্তু সমগ্র হিন্দু ধর্মের একটি সাধারণ ও স্বতন্ত্র নাম হিসেবে ‘সনাতন ধর্ম’-এর ব্যবহার অনেক পরের বিষয়।
গবেষণা থেকে দেখা যায়, ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে এই শব্দবন্ধটি নতুন সামাজিক ও ধর্মীয় পরিচয়ের ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব পেতে শুরু করে এবং ধীরে ধীরে হিন্দু ধর্মীয় পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম হয়ে ওঠে।
তাই দুটি বিষয়কে আলাদা করে দেখা জরুরি—
প্রাচীন ‘সনাতন ধর্ম’
= চিরন্তন ধর্ম, কর্তব্য, নীতি, বিধান বা আচরণ।
আধুনিক ‘সনাতন ধর্ম’
= একটি বৃহত্তর ধর্মীয় পরিচয়ের নাম হিসেবে ব্যবহৃত পরিচয়।
দুটি একই শব্দবন্ধ হলেও ঐতিহাসিক ব্যবহারের পরিসর এক নয়।
মহাভারতের পাঠ আমাদের কী শেখায়?
মহাভারতের ‘এষ ধর্মঃ সনাতনঃ’ বাক্যটি আসলে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভাষাগত শিক্ষা দেয়। কোনও প্রাচীন গ্রন্থে আজকের পরিচিত একটি শব্দ পাওয়া গেলেই তার আধুনিক অর্থ সেখানে বসিয়ে দেওয়া যায় না।
‘ধর্ম’ শব্দটি মহাভারতে কখনও ব্যক্তির কর্তব্য, কখনও রাজার কর্তব্য, কখনও যোদ্ধার কর্তব্য, কখনও নৈতিক আচরণ, কখনও সামাজিক বিধান, আবার কখনও বৃহত্তর ন্যায় ও শৃঙ্খলার অর্থ বহন করে। তেমনই ‘সনাতন’ শব্দটি কোনও কিছুর চিরন্তনতা, প্রাচীনতা বা দীর্ঘস্থায়িত্ব নির্দেশ করতে পারে।
সুতরাং— ‘এষ ধর্মঃ সনাতনঃ’ মানেই ‘এই ধর্মের নাম সনাতন ধর্ম’ নয়।
অনেক ক্ষেত্রে এর অর্থ বরং— “এই কর্তব্যটি চিরন্তন।”
অথবা— “এই নীতিটি চিরকাল পালনীয়।”
অথবা— “এই বিধান প্রাচীনকাল থেকে স্বীকৃত ও স্থায়ী।”
তাহলে মহাভারতে ‘সনাতন ধর্ম’ কি একটি ধর্মের নাম ছিল?
এই পর্বের অনুসন্ধানের ভিত্তিতে উত্তরটি হবে— মহাভারতে ‘সনাতন ধর্ম’ শব্দবন্ধের প্রাচীন ব্যবহার ছিল, কিন্তু তার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গেই এটি একটি নির্দিষ্ট ধর্মসম্প্রদায়ের নাম নয়।
বরং এটি ব্যবহৃত হয়েছে— চিরন্তন কর্তব্য, নৈতিক বিধান, সামাজিক আদর্শ, আচরণনীতি এবং প্রাচীনভাবে স্বীকৃত ধর্মের ধারণা বোঝাতে।এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য মনে রাখা দরকার।
শব্দটি প্রাচীন—কিন্তু আধুনিক ধর্মীয় পরিচয় হিসেবে তার ব্যবহার একই অর্থে প্রাচীন—এমন প্রমাণ নেই। এই পার্থক্যটিই ‘হিন্দু না সনাতন?’ অনুসন্ধানের অন্যতম মূল জায়গা।
একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত
মহাভারতের পাঠকে যদি তার নিজস্ব প্রসঙ্গে পড়ি, তাহলে দেখা যায়— ‘সনাতন ধর্ম’ কোনও একক, সুসংজ্ঞায়িত ধর্মপ্রতিষ্ঠানের নাম হিসেবে সেখানে আবির্ভূত হয়নি।
বরং ‘সনাতন’ যুক্ত ‘ধর্ম’ বলতে বোঝানো হয়েছে এমন কর্তব্য বা নীতিকে, যা চিরন্তন, প্রাচীন, স্থায়ী এবং পালনীয় বলে বিবেচিত। পরবর্তী সময়ে এই প্রাচীন শব্দবন্ধ একটি বৃহত্তর ধর্মীয় পরিচয়ের নাম হিসেবে নতুন তাৎপর্য লাভ করে।
অতএব ইতিহাসের বিচারে সবচেয়ে সতর্ক সিদ্ধান্ত হতে পারে— মহাভারতের ‘এষ ধর্মঃ সনাতনঃ’ মূলত ‘এই কর্তব্য বা বিধান চিরন্তন’—এই অর্থ বহন করে; এটিকে সরাসরি সমগ্র হিন্দু ধর্মের প্রাচীন নাম হিসেবে প্রমাণ করা যায় না। এবং এখানেই আমাদের অনুসন্ধান আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থের দিকে এগিয়ে যায়—মনুস্মৃতি।
কারণ মনুস্মৃতিতেও আমরা প্রায় একই বাক্য দেখতে পাই— “এষ ধর্মঃ সনাতনঃ”
কিন্তু সেখানে এই বাক্যটির ঠিক আগে কী বলা হয়েছে?
কোন নৈতিক বিধানের পর বলা হয়েছে?
এবং সেই বিধানকে কি সত্যিই একটি সমগ্র ধর্মের নাম হিসেবে বোঝানো যায়?
তার উত্তর খুঁজতেই পরবর্তী পর্ব।
এই পর্বের সূত্রসমূহ
১. মহাভারত — বনপর্ব
রাজা, ক্ষত্রিয়ের কর্তব্য এবং ‘এষ ধর্মঃ সনাতনঃ’ বাক্যাংশের প্রসঙ্গ।
২. মহাভারত — বনপর্ব, সাবিত্রী উপাখ্যান
স্বামীর প্রতি কর্তব্য এবং ‘এষ ধর্মঃ সনাতনঃ’-এর ব্যবহার।
৩. মহাভারত — সাবিত্রী উপাখ্যান
‘অদ্রোহঃ সর্বভূতেষু’—অর্থাৎ সকল জীবের প্রতি বিদ্বেষহীনতা, অনুগ্রহ ও দানকে চিরন্তন ধর্ম হিসেবে চিহ্নিত করার প্রসঙ্গ।
৪. মহাভারত — শান্তিপর্ব
যুদ্ধে অসহায় ব্যক্তিকে হত্যা না করার নৈতিক বিধান এবং ‘এষ ধর্মঃ সনাতনঃ’।
৫. মহাভারত — অনুশাসনপর্ব
অহিংসা, সত্য, অক্রোধ ও দানকে চিরন্তন ধর্ম হিসেবে উল্লেখ।
৬. পিটার হিহসের গবেষণা
‘সনাতন ধর্ম’-এর শব্দগত, ঐতিহাসিক ও আধুনিক পরিচয়গত বিবর্তন নিয়ে গবেষণা; বিশেষত মহাভারতে শব্দবন্ধটির বহুবিধ ব্যবহার এবং ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে এর নতুন ধর্মীয় পরিচয় হিসেবে গুরুত্ব বৃদ্ধি।
পরবর্তী পর্ব
পর্ব ৯ — মনুস্মৃতিতে ‘এষ ধর্মঃ সনাতনঃ’
মনুস্মৃতি ৪.১৩৮-এর বিখ্যাত শ্লোক:
“এষ ধর্মঃ সনাতনঃ”
এর প্রকৃত প্রসঙ্গ কী?
এটি কি সমগ্র হিন্দু ধর্মের নাম, নাকি একটি নির্দিষ্ট নৈতিক বিধানের ক্ষেত্রে “এটাই চিরন্তন ধর্ম”?
— লিখছেন অনিরুদ্ধ পাল
“বিশ্বাসের প্রতি শ্রদ্ধা, ইতিহাসের প্রতি দায়বদ্ধতা।”




