
“কখনও কখনও জীবনের সবচেয়ে বড় সাফল্য শুরু হয় এমন একটি কাজ দিয়ে, যেটি মানুষ কখনও করতে চায়নি। কিশোর কুমারের ক্ষেত্রেও ঠিক সেটাই ঘটেছিল। তিনি নায়ক হতে চাননি। অথচ ভাগ্য তাঁকে প্রথমে বানিয়েছিল অভিনেতা, তারপর কিংবদন্তি গায়ক।“
Published on: আগ ৭, ২০২৬ at ১০:১৯
✍️ অনিরুদ্ধ পাল
সংবাদ প্রভাকর টাইমস
এসপিটি প্রতিবেদন: খণ্ডওয়ার ছোট্ট শহর ছেড়ে যখন আভাষ কুমার গাঙ্গুলী বোম্বের পথে রওনা দিলেন, তাঁর চোখে ছিল হাজারো স্বপ্ন। কিন্তু সেই স্বপ্নের নাম ছিল না সিনেমার নায়ক হওয়া।
তাঁর স্বপ্ন ছিল—গান।
কিন্তু জীবন কখনও কখনও মানুষকে সেই পথে নিয়ে যায় না, যে পথ সে নিজে বেছে নেয়। বরং এমন এক পথের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়, যেখান থেকে নিজের আসল পরিচয় খুঁজে নিতে হয়।
বোম্বেতে পৌঁছে আভাষ খুব দ্রুত বুঝে গেলেন, এখানে তাঁর পরিচয় একজন সম্ভাবনাময় গায়ক হিসেবে নয়। সবাই তাঁকে চিনত একটি পরিচয়ে—
“অশোক কুমারের ছোট ভাই।“
এ যেন আশীর্বাদও, আবার অভিশাপও। অশোক কুমার তখন ভারতীয় চলচ্চিত্রের সবচেয়ে জনপ্রিয় নায়কদের একজন। স্টুডিওর দরজা তাঁর জন্য সবসময় খোলা। সেই দরজা দিয়েই ছোট ভাইয়েরও প্রবেশ ঘটল। কিন্তু সেই প্রবেশ ছিল না নিজের প্রতিভার জোরে। বরং বড় ভাইয়ের ছায়ায়। আর এই বিষয়টিই কিশোর কুমারকে ভিতরে ভিতরে অস্বস্তিতে ফেলত।
ক্যামেরার সামনে একজন অনিচ্ছুক অভিনেতা
১৯৪৬ সালে শিকারি ছবিতে ছোট্ট একটি চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পেলেন তিনি। স্টুডিওতে উপস্থিত সবাই খুশি। অশোক কুমারও খুশি। কিন্তু একজন মানুষ খুশি নন। তিনি নিজেই। ক্যামেরার সামনে দাঁড়ালেই তাঁর মনে হতো, এ যেন তাঁর নিজের জায়গা নয়। শট শেষ হলেই তিনি দৌড়ে চলে যেতেন মিউজিক রুমে। সেখানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতেন। রেকর্ডিং দেখতেন। বাদ্যযন্ত্রের শব্দ শুনতেন। গায়কদের অনুশীলন শুনতেন।
অন্যরা যেখানে আলো, ক্যামেরা আর করতালির মধ্যে নিজের ভবিষ্যৎ দেখতেন, সেখানে আভাষ খুঁজে বেড়াতেন একটি মাইক্রোফোন।
“আমি নায়ক নই, আমি গাইতে চাই”
একদিন সাহস করে তিনি কয়েকজন সঙ্গীত পরিচালকের কাছে নিজের ইচ্ছার কথা বললেন। উত্তরটা খুব আশাব্যঞ্জক ছিল না।
“তোমার দাদা বড় নায়ক। তুমি অভিনয় করো।”
আরও কেউ বললেন—
“গায়ক হতে গেলে অনেক সাধনা লাগে।”
আবার কেউ সরাসরি জানিয়ে দিলেন—
“তোমার গলায় এখনও আলাদা কিছু নেই।” এই কথাগুলো যে কাউকে ভেঙে দিতে পারত। কিন্তু কিশোর কুমার ভাঙলেন না। তিনি বুঝেছিলেন, প্রত্যাখ্যান কোনও শেষ নয়। এটি কেবল প্রস্তুতির সময়।
যে ভুলটি তিনি প্রতিদিন করতেন
সে সময় তিনি একটি বড় ভুল করতেন। তিনি গান গাইতেন কুন্দন লাল সায়গলের মতো।
চোখ বন্ধ করলে বোঝার উপায় থাকত না—গাইছেন সায়গল, নাকি আভাষ।
তিনি ভাবতেন, এটাই প্রশংসার বিষয়। কিন্তু ভাগ্য যেন অন্য কিছু লিখে রেখেছিল।
একজন সুরকার, যিনি চিনেছিলেন ভবিষ্যৎকে
একদিন তাঁর সঙ্গে পরিচয় হলো একজন অসাধারণ সুরকারের।
নাম—
শচীন দেব বর্মণ।
বর্মণদা মন দিয়ে তাঁর গান শুনলেন। গান শেষ হওয়ার পর কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর এমন একটি কথা বললেন, যা ভারতীয় সঙ্গীতের ইতিহাসে আজ কিংবদন্তি হয়ে আছে।
“সায়গল একজনই। দ্বিতীয় সায়গল হওয়ার চেষ্টা কোরো না। নিজের কণ্ঠ খুঁজে বের করো।“
কথাটা খুব ছোট ছিল। কিন্তু তার অভিঘাত ছিল বিরাট।
সেদিন প্রথমবারের মতো আভাষ বুঝলেন—
নকল করে কখনও ইতিহাস লেখা যায় না। ইতিহাস লেখে মৌলিকতা।
নিজেকে ভাঙার শুরু
সেই দিন থেকেই শুরু হলো এক নতুন সাধনা। তিনি আর কাউকে নকল করলেন না। ঘণ্টার পর ঘণ্টা একা বসে গলা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে লাগলেন। কখনও নিচু স্বর। কখনও হঠাৎ উচ্চারণে ভাঙন। কখনও হাসতে হাসতে গান। কখনও কথা বলতে বলতে সুরে ওঠা। অনেকেই তাঁকে পাগল ভাবতেন। কিন্তু শিল্পের ইতিহাসে প্রায় সব বড় আবিষ্কারই প্রথমে পাগলামি বলেই মনে হয়।
যে ইয়োডেলিং ভারতীয় সঙ্গীতকে বদলে দিল
এই সময়েই তিনি পাশ্চাত্য শিল্পীদের গান শুনতে শুরু করেন। বিশেষ করে আমেরিকান গায়ক জিমি রজার্স-এর ইয়োডেলিং তাঁকে আকৃষ্ট করে। তিনি সেটিকে হুবহু অনুকরণ করেননি। বরং ভারতীয় সুরের সঙ্গে মিলিয়ে নিজের মতো করে গড়ে তুললেন। এরপর জন্ম নিল এক নতুন কণ্ঠ। যেখানে পাহাড়ি ইয়োডেলিংও আছে। আবার ভারতীয় আবেগও আছে। পরে এই স্টাইলই হয়ে উঠবে কিশোর কুমারের স্বাক্ষর।
অভিনয়ে ব্যর্থতা, গানে অপেক্ষা
এদিকে একের পর এক ছবিতে অভিনয় করছেন। কিন্তু তিনি নিজে সন্তুষ্ট নন।
অনেক ছবিই ব্যবসায়িক সাফল্য পায়নি। সমালোচকরাও তখনও তাঁকে বড় অভিনেতা বলে মেনে নিতে প্রস্তুত নন। অদ্ভুতভাবে এই ব্যর্থতাই তাঁকে গানের দিকে আরও বেশি ঠেলে দেয়।
তিনি যেন বুঝতে পারছিলেন—
ঈশ্বর তাঁকে অন্য কিছুর জন্য তৈরি করছেন।
যে কণ্ঠ তখনও অপেক্ষা করছিল তার সময়ের জন্য
পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি সময়ে তিনি অভিনয় করছেন। গানও গাইছেন।
কিন্তু এখনও সেই বিস্ফোরণ ঘটেনি।
ভারত তখনও জানে না—
এই মানুষটির কণ্ঠ একদিন রাজেশ খান্নার সুপারস্টারডমের ভিত্তি হয়ে উঠবে। অমিতাভ বচ্চনের পর্দার ব্যক্তিত্বকে নতুন মাত্রা দেবে। আর. ডি. বর্মণের সুরে নতুন যুগের জন্ম দেবে। ভারতীয় চলচ্চিত্র সঙ্গীতের অভিধানই বদলে দেবে। তখনও সময় আসেনি। কিন্তু সময় খুব দূরেও ছিল না। ঝড় আসার আগে যেমন হাওয়া নিঃশব্দে দিক বদলায়, তেমনি ভারতীয় সঙ্গীতও অপেক্ষা করছিল এক নতুন কণ্ঠের জন্য।
সেই কণ্ঠের নাম—
কিশোর কুমার।
পরবর্তী খণ্ড – ৩
“সংগ্রাম থেকে সাফল্য: জিদ্দি থেকে আরাধনা—যে কয়েকটি গান বদলে দিয়েছিল এক শিল্পীর ভাগ্য”
এই পর্বে থাকবে—
- জিদ্দি ছবিতে প্রথম বড় সুযোগ
- শচীন দেব বর্মণের আস্থা
- মুনিমজি, গাইড, জুয়েল থিফ-এ উত্থান
- পড়োশন-এ আর. ডি. বর্মণের সঙ্গে নতুন অধ্যায়
- এবং ১৯৬৯ সালের আরাধনা—যে ছবির তিনটি গান কিশোর কুমারকে ভারতের এক নম্বর নেপথ্য কণ্ঠশিল্পীতে পরিণত করেছিল।
Published on: আগ ৭, ২০২৬ at ১০:১৯




