
“কিছু মানুষ জন্মের পর নিজের নামকে বিখ্যাত করেন। আবার কিছু মানুষের ক্ষেত্রে নামটিই একদিন ইতিহাস হয়ে যায়। আভাষ কুমার গাঙ্গুলীও তেমনই একজন। যাঁকে পৃথিবী আজ চেনে—কিশোর কুমার নামে।“
✍️ কলমে: অনিরুদ্ধ পাল
সংবাদ প্রভাকর টাইমস
এসপিটি প্রতিবেদন: মধ্যপ্রদেশের ছোট্ট শহর খণ্ডওয়া। আজও শহরটির অলিগলি যেন এক মানুষের স্মৃতি বয়ে বেড়ায়। রেলস্টেশনে তাঁর মূর্তি, শহরের পথে পথে তাঁর নাম, আর স্থানীয় মানুষের গলায় আজও ভেসে আসে তাঁর গান। অথচ ১৯২৯ সালের ৪ আগস্ট যখন সেই শহরে এক শিশুর জন্ম হয়েছিল, তখন কেউ কল্পনাও করতে পারেননি—একদিন এই শিশুর কণ্ঠ গোটা ভারতবর্ষের আবেগ হয়ে উঠবে।
সেদিন তাঁর নাম রাখা হয়েছিল আভাষ কুমার গাঙ্গুলী।
পরিবারটি ছিল শিক্ষিত, সংস্কৃতিমনা এবং বাঙালি ঐতিহ্যে গড়ে ওঠা। বাবা কুঞ্জলাল গাঙ্গুলী ছিলেন একজন প্রতিষ্ঠিত আইনজীবী। মা গৌরী দেবী ছিলেন অত্যন্ত স্নেহশীলা, সংগীতপ্রেমী এবং সাংস্কৃতিক চেতনার মানুষ। বাড়িতে গান, গল্প, নাটক, সাহিত্য—সবকিছুরই ছিল অবাধ বিচরণ। হয়তো সেখান থেকেই অজান্তেই শিল্পের বীজ রোপিত হয়েছিল ছোট্ট আভাষের মনে।
কিন্তু চার ভাইবোনের মধ্যে সবচেয়ে ছোট এই ছেলেটি ছিল একেবারেই অন্যরকম।
সে পড়াশোনার চেয়ে বেশি ভালোবাসত দুষ্টুমি করতে। কখনও বাড়ির উঠোনে একা একা অভিনয় করছে, কখনও নিজের গলায় অদ্ভুত সব শব্দ বের করে পরিবারের সবাইকে হাসাচ্ছে। কখনও আবার গাছের নিচে বসে পাখির ডাক নকল করছে।
বয়স তখন খুব বেশি নয়। কিন্তু সে বুঝে গিয়েছিল—মানুষকে হাসাতে পারা এক অসাধারণ আনন্দ।
সম্ভবত তখনই জন্ম নিচ্ছিল ভবিষ্যতের সেই শিল্পী, যিনি পরে প্রমাণ করবেন—হাসিও এক ধরনের শিল্প।
অশোক কুমার—দাদা নন, প্রথম অনুপ্রেরণা
আভাষের জীবনে সবচেয়ে বড় প্রভাব ফেলেছিলেন তাঁর বড় ভাই অশোক কুমার।
সেই সময় বোম্বের চলচ্চিত্র জগতে অশোক কুমার ইতিমধ্যেই প্রতিষ্ঠিত নায়ক। গোটা ভারত তাঁকে চিনত। সিনেমার জগৎ তখন সাধারণ মানুষের কাছে স্বপ্নের মতো।
ছোট্ট আভাষ বিস্ময়ের চোখে দেখতেন—কীভাবে তাঁর দাদা সাধারণ একজন মানুষ থেকে রুপোলি পর্দার নায়ক হয়ে উঠেছেন।
দাদা যখন বাড়ি ফিরতেন, আভাষ তাঁর চারপাশে ঘুরঘুর করতেন। স্টুডিওর গল্প শুনতেন, অভিনেতাদের কথা শুনতেন, শুটিংয়ের অভিজ্ঞতা শুনতেন।
কিন্তু মজার বিষয় হলো, এসব গল্প শুনেও তাঁর সবচেয়ে বেশি আগ্রহ ছিল না নায়ক হওয়ার দিকে।
তিনি মুগ্ধ হতেন সিনেমার গান শুনে।
আজকের ভাষায় যাকে বলা যায় “ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক”, “প্লেব্যাক”, “রেকর্ডিং”—এসব শব্দের অর্থ তিনি তখনও জানতেন না। কিন্তু বুঝতে পারতেন, মানুষের মনে সবচেয়ে বেশি থেকে যায় গান।
হয়তো সেখানেই তাঁর ভবিষ্যতের বীজ রোপিত হচ্ছিল।
একটি গ্রামোফোন, আর এক কিশোরের নেশা
পরিবারে একটি গ্রামোফোন ছিল।
সেই গ্রামোফোনেই বারবার বাজত সেই সময়ের কিংবদন্তি গায়ক কুন্দন লাল সায়গলের গান।
আভাষ মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনতেন।
একবার নয়।
দশবার।
বিশবার।
পঞ্চাশবার।
তারপর ঘরের দরজা বন্ধ করে নিজেই সায়গলের কণ্ঠ নকল করার চেষ্টা করতেন।
পরিবারের সবাই অবাক হয়ে দেখতেন—এই ছেলেটা শুধু গান শুনছে না, গানের ভেতরে ঢুকে পড়ছে।
পরে কিশোর কুমার নিজেই একাধিক সাক্ষাৎকারে স্বীকার করেছিলেন, জীবনের প্রথম দিককার সবচেয়ে বড় প্রেরণা ছিলেন কুন্দন লাল সায়গল।
তবে ভাগ্যের লিখন ছিল অন্যরকম।
যে মানুষকে নকল করে তিনি গান শেখা শুরু করেছিলেন, একদিন তিনিই এমন এক স্বতন্ত্র কণ্ঠ সৃষ্টি করবেন, যা পরবর্তী প্রজন্মের অসংখ্য শিল্পীর অনুকরণের বিষয় হয়ে উঠবে।
স্কুলের বইয়ের চেয়ে মানুষের মুখ বেশি আকর্ষণীয় ছিল
আভাষ খুব মনোযোগী ছাত্র ছিলেন না।
কিন্তু তিনি ছিলেন অসাধারণ পর্যবেক্ষক।
মানুষ কীভাবে কথা বলে…
কীভাবে হাঁটে…
কীভাবে হাসে…
কীভাবে রাগ করে…
সব তিনি লক্ষ্য করতেন।
পরে তাঁর অভিনয়ে যে স্বতঃস্ফূর্ততা দেখা যায়, কিংবা গানের মধ্যে যে নাটকীয় অভিব্যক্তি ফুটে ওঠে, তার ভিত্তি তৈরি হয়েছিল এই শৈশবেই।
তিনি মানুষকে অনুকরণ করতেন, কিন্তু কাউকে ব্যঙ্গ করার জন্য নয়।
তিনি মানুষের চরিত্র বুঝতে চাইতেন।
হাসির আড়ালে যে ছেলেটি স্বপ্ন লুকিয়ে রেখেছিল
বন্ধুবান্ধবের কাছে তিনি ছিলেন পাড়ার সবচেয়ে মজার ছেলে।
বাড়ির সবাই জানতেন, আভাষকে যেখানে রাখা হবে, সেখানে হাসির রোল পড়বেই।
কিন্তু খুব কম মানুষই বুঝতে পেরেছিলেন, সেই হাসির আড়ালে এক গভীর স্বপ্ন লুকিয়ে আছে।
তিনি গান গাইতে চান।
তবে শুধু গাইতে নয়—
তিনি এমনভাবে গাইতে চান, যাতে মানুষ গানটাকে শুধু শুনবে না, মনে রাখবে।
এটি কোনও কিশোরের সাধারণ স্বপ্ন ছিল না।
এটি ছিল এক শিল্পীর জন্মের প্রথম ঘোষণা।
খণ্ডওয়া কখনও তাঁর ভেতর থেকে হারিয়ে যায়নি
জীবনের পরবর্তী সময়ে তিনি বোম্বেতে চলে গেলেন।
সুপারস্টার হলেন।
হাজার হাজার গান গাইলেন।
অসংখ্য পুরস্কার পেলেন।
দেশ-বিদেশে জনপ্রিয়তা অর্জন করলেন।
কিন্তু এক আশ্চর্য বিষয় কখনও বদলায়নি।
তিনি সারাজীবন নিজেকে পরিচয় দিতেন—”আমি খণ্ডওয়ার ছেলে।”
বন্ধুমহলে তিনি প্রায়ই বলতেন, জীবনের শেষ দিনেও যদি সম্ভব হয়, তাঁকে যেন খণ্ডওয়াতেই ফিরিয়ে আনা হয়।
এ যেন খ্যাতির শিখরে পৌঁছেও শিকড়কে ভুলে না যাওয়ার এক বিরল উদাহরণ।
যে ছেলেটি তখনও জানত না, সামনে কী অপেক্ষা করছে
খণ্ডওয়ার সেই হাসিখুশি, দুষ্টু, স্বপ্নবাজ ছেলেটি তখনও জানত না—
একদিন তাঁর কণ্ঠে প্রেমে পড়বে রাজেশ খান্নার পর্দা।
অমিতাভ বচ্চনের ব্যক্তিত্ব পূর্ণতা পাবে তাঁর গানে।
আর. ডি. বর্মণ তাঁর জন্য সুর বানাতে ভালোবাসবেন।
লতা মঙ্গেশকর, আশা ভোঁসলে, মহম্মদ রফির মতো কিংবদন্তিদের পাশে দাঁড়িয়ে তিনি নিজের এক স্বতন্ত্র সাম্রাজ্য গড়ে তুলবেন।
আর সবচেয়ে বড় কথা—
ভারতীয় সঙ্গীতের অভিধানে “কিশোর কুমার” নামটি একদিন কোনও শিল্পীর পরিচয় হবে না।
সেটি হয়ে উঠবে একটি অনুভূতির নাম।
পরবর্তী খণ্ড – ২
“যে মানুষটি অভিনেতা হতে চাননি: বোম্বের পথে সংগ্রাম, প্রত্যাখ্যান আর নিজের কণ্ঠ খুঁজে পাওয়ার গল্প”
এই পর্বে থাকবে—
- বোম্বেতে তাঁর প্রথম জীবন
- অশোক কুমারের ছায়া থেকে বেরিয়ে আসার লড়াই
- প্রথম অভিনয়
- কেন তিনি অভিনয় অপছন্দ করতেন
- কেন প্রথমদিকে তাঁকে গায়ক হিসেবে গ্রহণ করা হয়নি
- এবং শচীন দেব বর্মণের সঙ্গে সেই ঐতিহাসিক সাক্ষাৎ, যা ভারতীয় সঙ্গীতের ইতিহাস বদলে দেয়।




