
“ভারত তাঁকে চিনেছে হিন্দি চলচ্চিত্রের সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নেপথ্য কণ্ঠশিল্পী হিসেবে। কিন্তু বাংলা তাঁকে দেখেছে একেবারে অন্যভাবে। এখানে তিনি শুধু গায়ক নন, তিনি ছিলেন ঘরের ছেলে। তাঁর গলায় ছিল মাটির গন্ধ, বাঙালিয়ানার আবেগ, আর এমন এক আন্তরিকতা, যা আজও বাংলা গানের ইতিহাসে আলাদা করে উচ্চারিত হয়।“
Published on: আগ ১৬, ২০২৬ at ১৯:৪৫
✍️ অনিরুদ্ধ পাল
সংবাদ প্রভাকর টাইমস
এসপিটি প্রতিবেদন: কিশোর কুমারের ঠিকানা ছিল বোম্বে।
কর্মক্ষেত্র ছিল হিন্দি চলচ্চিত্র।
খ্যাতি ছড়িয়েছিল গোটা ভারত জুড়ে। কিন্তু তাঁর হৃদয়ের এক কোণে সারাজীবন জায়গা করে নিয়েছিল বাংলা ভাষা।
তিনি প্রায়ই বলতেন, “আমি আগে বাঙালি, তারপর অন্য কিছু।“
বাড়িতে বাংলা ভাষাতেই কথা বলতেন। দুর্গাপুজো এলে তাঁর মধ্যে যেন নতুন এক উচ্ছ্বাস দেখা যেত। কলকাতায় এলেই বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, মাছের ঝোল, ভাত, মিষ্টি—সব মিলিয়ে যেন তিনি আবার ফিরে যেতেন শৈশবের পারিবারিক আবহে।
এ যেন সাফল্যের চূড়ায় পৌঁছেও শিকড়কে আঁকড়ে ধরে থাকার এক বিরল উদাহরণ।
হেমন্ত মুখোপাধ্যায়—যাঁর প্রতি শ্রদ্ধা ছিল আজীবন
কিশোর কুমারের জীবনে যদি এমন একজন শিল্পীর নাম বলতে হয়, যাঁকে তিনি শুধু সম্মানই করতেন না, প্রায় গুরুস্থানীয় মনে করতেন, তবে তিনি হলেন—
হেমন্ত মুখোপাধ্যায়।
হেমন্তবাবুর গভীর, মায়াময় কণ্ঠ কিশোরকে মুগ্ধ করত। কিন্তু তাঁদের সম্পর্ক ছিল প্রতিদ্বন্দ্বিতার নয়। ছিল পারস্পরিক শ্রদ্ধার। হেমন্ত মুখোপাধ্যায় খুব দ্রুত বুঝে গিয়েছিলেন—কিশোর কুমারের কণ্ঠে এমন এক স্বতন্ত্রতা আছে, যা কোনও ছাঁচে বাঁধা যায় না। অন্যদিকে কিশোরও অকপটে স্বীকার করতেন, বাংলা গানের আবেগ বুঝতে হেমন্তবাবুর মতো শিল্পী খুব কমই জন্মেছেন।
ভারতীয় সঙ্গীতের ইতিহাসে এমন পারস্পরিক সম্মান সত্যিই বিরল।
চারটি বাংলা ছবি—চারটি স্মৃতি
অনেকেই জানেন না, কিশোর কুমার বাংলা চলচ্চিত্রে মাত্র চারটি ছবিতে অভিনয় করেছিলেন।
‘লুকোচুরি‘
‘মধ্যরাতের তারা‘
‘একটুকু ছোঁয়া লাগে‘
‘দুষ্টু প্রজাপতি‘
সংখ্যায় কম হলেও এই চারটি ছবির মধ্যে লুকিয়ে আছে এক চমৎকার মিল। চারটি ছবিরই সঙ্গীত পরিচালক ছিলেন—
হেমন্ত মুখোপাধ্যায়।
এটি কেবল কাকতালীয় ঘটনা নয়। এটি ছিল দুই শিল্পীর পারস্পরিক বিশ্বাসের এক উজ্জ্বল উদাহরণ। বিশেষ করে ‘লুকোচুরি‘ আজও বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম জনপ্রিয় কমেডি হিসেবে স্মরণ করা হয়। এই ছবিতে অভিনেতা কিশোর কুমারের সহজাত রসবোধ দর্শকদের নতুনভাবে মুগ্ধ করেছিল।
উত্তম কুমারের ঠোঁটে এক নতুন কণ্ঠ
বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে উত্তম কুমার একটি প্রতিষ্ঠান। তাঁর জন্য বহু শিল্পী গান গেয়েছেন। কিন্তু সত্তরের দশকে এক সময় এমন এল, যখন উত্তম কুমারের পর্দার ব্যক্তিত্বের সঙ্গে কিশোর কুমারের কণ্ঠ এক নতুন মাত্রা যোগ করল।
‘অমানুষ‘, ‘আনন্দ আশ্রম‘, ‘রাজকুমারী‘, ‘নিশান‘, ‘ওগো বধূ সুন্দরী‘, ‘বন্দী‘—এইসব ছবিতে কিশোরের কণ্ঠে উত্তম যেন আরও আধুনিক, আরও প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছিলেন। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে উত্তম কুমারের যুগলবন্দি যেমন ইতিহাস, তেমনই কিশোর কুমারের কণ্ঠও উত্তমের পরবর্তী পর্বকে এক নতুন সুর দিয়েছিল।
যে বাংলা গানগুলো সময়কে অতিক্রম করেছে
কিশোর কুমারের বাংলা আধুনিক গান নিয়ে আলাদা আলোচনা হওয়া উচিত। কারণ তাঁর বহু বাংলা গান আজও পুজোর অ্যালবাম, রেডিও, মঞ্চ এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সমান জনপ্রিয়।
“আমার পূজার ফুল“
“এই কথাটি মনে রেখো“
“চলে যেও না“
“একদিন পাখি উড়ে যাবে“
“সে তো এলো না“
“নীল আকাশের নিচে“ (জনপ্রিয় বাংলা আধুনিক গানের ধারায় তাঁর বহুল আলোচিত পরিবেশনাগুলির মধ্যে একটি)
এসব গান শুনলে বোঝা যায়, তিনি হিন্দি গানের কিশোর নন। তিনি যেন একেবারে বাংলারই শিল্পী। তাঁর উচ্চারণে কোনও কৃত্রিমতা ছিল না। ছিল সহজ, স্বাভাবিক বাঙালিয়ানা।
রবীন্দ্রসঙ্গীত—এক সাহসী অধ্যায়
আশির দশকের শুরুতে কিশোর কুমার এমন একটি সিদ্ধান্ত নিলেন, যা অনেককে অবাক করেছিল। তিনি রবীন্দ্রসঙ্গীত রেকর্ড করবেন।
অনেকেই প্রশ্ন তুলেছিলেন— হিন্দি ছবির জনপ্রিয় গায়ক কি রবীন্দ্রনাথকে ধারণ করতে পারবেন?
উত্তর দিয়েছিল সময়।
হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের তত্ত্বাবধানে প্রকাশিত “এই কথাটি মনে রেখো“ এবং পরে “দিনের শেষে ঘুমের দেশে“—এই দুই অ্যালবাম বাংলা সঙ্গীতপ্রেমীদের কাছে বিশেষভাবে সমাদৃত হয়।
তিনি রবীন্দ্রসঙ্গীতকে নিজের মতো করে গেয়েছিলেন। কাউকে অনুকরণ করেননি। এটাই ছিল তাঁর শিল্পীসত্তার বৈশিষ্ট্য।
সত্যজিৎ রায়ের আস্থা
আরও একটি বিষয় অনেকের অজানা।
বিশ্ববরেণ্য চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায় তাঁর চলচ্চিত্র ‘চারুলতা‘ এবং ‘ঘরে বাইরে‘-তে কিশোর কুমারের কণ্ঠকে ব্যবহার করেছিলেন রবীন্দ্রসঙ্গীত পরিবেশনের জন্য।
এটি শুধু একটি গানের সুযোগ ছিল না। এটি ছিল একজন বিশ্বমানের নির্মাতার পক্ষ থেকে একজন শিল্পীর প্রতি গভীর আস্থার প্রকাশ। সত্যজিৎ রায় জানতেন— কিশোর কুমার শুধু সুর ধরতে পারেন না, তিনি গানের আত্মাও অনুভব করতে পারেন।
পুজো মানেই কিশোরের নতুন গান
এক সময় বাংলায় দুর্গাপুজোর আগে নতুন অ্যালবাম প্রকাশ ছিল এক সাংস্কৃতিক উৎসব। সেই উৎসবের অন্যতম বড় আকর্ষণ ছিলেন কিশোর কুমার। প্রতিবছর তাঁর নতুন বাংলা গান প্রকাশের অপেক্ষায় থাকতেন শ্রোতারা। গ্রামোফোনের দোকানে লাইন পড়ত। ক্যাসেটের চাহিদা বাড়ত। রেডিওতে বারবার বাজত তাঁর গান।
একটি প্রজন্মের কাছে পুজোর স্মৃতি মানেই ছিল—
কিশোর কুমারের নতুন গান।
হিন্দির আড়ালে চাপা পড়ে যাওয়া এক উত্তরাধিকার
আজ যখন কিশোর কুমারের নাম উচ্চারিত হয়, তখন প্রথমেই মনে পড়ে—
‘রূপ তেরা মস্তানা‘
‘ও মেরে দিল কে চেইন‘
‘পল পল দিল কে পাশ‘
‘কুছ তো লোগ কহেঙ্গে‘
কিন্তু বাংলা গানের জগতে তাঁর অবদানও কম নয়। বরং বলা যায়, বাংলা আধুনিক গানের এক স্বর্ণযুগের অন্যতম স্তম্ভ ছিলেন তিনি। তাঁর বাংলা গানগুলোতে ছিল না হিন্দি গানের প্রভাব। ছিল সম্পূর্ণ আলাদা আবেগ, আলাদা উচ্চারণ, আলাদা আত্মীয়তা। এই কারণেই বাংলা তাঁকে কখনও বাইরের মানুষ মনে করেনি।
শেষ পর্যন্ত তিনি ছিলেন ‘আমাদের কিশোর‘
সারা পৃথিবী তাঁকে ভারতীয় সঙ্গীতের কিংবদন্তি বলে সম্মান জানায়। বলিউড তাঁকে সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নেপথ্য কণ্ঠশিল্পী হিসেবে স্মরণ করে। কিন্তু বাংলা তাঁকে অন্য এক নামে ডাকে—“আমাদের কিশোর।“
কারণ তাঁর কণ্ঠে শুধু সুর ছিল না। ছিল বাংলার ঘ্রাণ। ছিল শৈশবের স্মৃতি। ছিল শরতের আকাশ। ছিল পুজোর ঢাক। ছিল এক অনন্ত আপনজনের অনুভূতি। হয়তো সেই কারণেই আজও বাংলার কোনও রেডিওতে কিশোর কুমারের বাংলা গান বাজতে শুরু করলে মনে হয়— তিনি কোথাও যাননি। তিনি এখনও আমাদেরই ঘরের মানুষ।
পরবর্তী খণ্ড–৮
“একজন অদ্ভুত মানুষ: চার বিয়ে, অগণিত কৌতুক, নিঃসঙ্গতা আর রহস্যে ঘেরা কিশোর কুমার“
এই পর্বে উঠে আসবে তাঁর ব্যক্তিজীবনের বিস্ময়কর অধ্যায়—চারটি বিয়ে, মধুবালার সঙ্গে সম্পর্ক, অদ্ভুত অভ্যাস, রসবোধ, অর্থ নিয়ে তাঁর বিচিত্র নীতি, নিঃসঙ্গতা, বাড়ির বাইরে লেখা সেই বিখ্যাত সতর্কবার্তা, এবং কেন অনেকেই তাঁকে ‘জিনিয়াস’, আবার অনেকেই ‘পাগল’ বলতেন।
Published on: আগ ১৬, ২০২৬ at ১৯:৪৫




