
বিভিন্ন পুরাণে ‘সনাতন’ ও ‘ধর্ম’ শব্দের ব্যবহার। বৈষ্ণব, শৈব, শাক্ত—বিভিন্ন ধারার সঙ্গে এর সম্পর্ক।
Published on: অক্টো ১৭, ২০২৬ at ১১:১৩
লিখছেন অনিরুদ্ধ পাল। সংবাদ প্রভাকর টাইমস
এসপিটি বিশেষ প্রতিবেদন: ‘সনাতন ধর্ম’—আজকের দিনে এই শব্দবন্ধটি একটি পরিচিত ধর্মীয় পরিচয়। বহু মানুষ এই নামের মধ্যে ভারতীয় ধর্মীয় ঐতিহ্যের প্রাচীনত্ব, ধারাবাহিকতা এবং চিরন্তন বিশ্বাসের ধারণা খুঁজে পান। কিন্তু ইতিহাসের অনুসন্ধানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন থেকেই যায়—প্রাচীন পুরাণে ‘সনাতন’, ‘ধর্ম’ এবং ‘সনাতন ধর্ম’ কী অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে? এই শব্দবন্ধ কি তখন থেকেই সমগ্র হিন্দু ধর্মের একটি নির্দিষ্ট নাম ছিল, নাকি বিভিন্ন প্রসঙ্গে তা চিরন্তন নীতি, কর্তব্য, ধর্মাচরণ কিংবা কোনও দেবতার সঙ্গে সম্পর্কিত বিশেষণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে পুরাণের বিশাল জগতে প্রবেশ করতে হয়। কারণ পুরাণ কোনও একক গ্রন্থ নয়। বিষ্ণুপুরাণ, ভাগবতপুরাণ, শিবপুরাণ, দেবীভাগবত, মার্কণ্ডেয়পুরাণ, মৎস্যপুরাণ-সহ বিভিন্ন পুরাণে সৃষ্টি, প্রলয়, দেবদেবীর মাহাত্ম্য, রাজবংশ, তীর্থ, ব্রত, আচার, নৈতিকতা এবং মুক্তির পথ নিয়ে নানা ধরনের আলোচনা রয়েছে। রচনার কাল, ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি, কাহিনি ও দার্শনিক ব্যাখ্যার ক্ষেত্রেও এই গ্রন্থগুলির মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।
তাই কোনও একটি পুরাণের একটি শ্লোককে সামনে রেখে সব পুরাণের বক্তব্য একই বলে ধরে নেওয়া যায় না। একইভাবে, কোনও একটি শব্দের ব্যবহার দেখেই তার বর্তমান ধর্মীয় অর্থ প্রাচীনকালেও হুবহু একই ছিল বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়।
পুরাণে ‘সনাতন’ শব্দের অর্থ কী?
‘সনাতন’ শব্দের সাধারণ অর্থ চিরন্তন, নিত্য, অনাদি থেকে প্রচলিত কিংবা দীর্ঘকাল ধরে চলে আসা। সংস্কৃত সাহিত্যে শব্দটি কোনও ব্যক্তি, দেবতা, নীতি, বিধান বা পরম সত্যের বৈশিষ্ট্য বোঝাতেও ব্যবহৃত হয়েছে। পুরাণের ভাষায় দেবতাদের কখনও অনাদি, কখনও অবিনশ্বর, কখনও বিশ্বজগতের চিরন্তন আশ্রয় হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। একইভাবে কোনও নীতি, কর্তব্য বা ধর্মাচরণকে প্রাচীন ও চিরস্থায়ী বলেও চিহ্নিত করা হয়েছে। ফলে ‘সনাতন’ শব্দটির অর্থ নির্ধারণ করতে হলে দেখতে হবে, কোন বিশেষ্যকে তা বর্ণনা করছে এবং কোন প্রসঙ্গে ব্যবহৃত হচ্ছে।
উদাহরণ হিসেবে ভাগবতপুরাণের তৃতীয় স্কন্ধের ষোড়শ অধ্যায়ের অষ্টাদশ শ্লোকে বলা হয়েছে—
“ত্বত্তঃ সনাতনো ধর্মো রক্ষ্যতে তনুভিস্তব।”
এই পঙ্ক্তির ভাবার্থ, তোমার বিভিন্ন রূপের মাধ্যমে সনাতন ধর্ম রক্ষিত হয়। এখানে ‘সনাতন ধর্ম’ কথাটি সরাসরি পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু শুধু এই পঙ্ক্তি উদ্ধৃত করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না যে এখানে সমগ্র হিন্দু ধর্মের একটি সর্বজনীন নাম বোঝানো হয়েছে।
শ্লোকটির বক্তব্য বুঝতে হলে তার সম্পূর্ণ পাঠ, বক্তা, শ্রোতা এবং কাহিনির প্রেক্ষাপট দেখতে হবে। ভাগবতপুরাণের এই অংশে বিষ্ণুর মহিমা এবং তাঁর ঐশ্বরিক স্বরূপ নিয়ে আলোচনা রয়েছে। তাই এখানে ‘সনাতন ধর্ম’ কথাটির ব্যবহারকে সেই ধর্মতাত্ত্বিক ও ভক্তিমূলক প্রসঙ্গের মধ্যে বিচার করা জরুরি।
এই উদাহরণ থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট—প্রাচীন পুরাণসাহিত্যে ‘সনাতন ধর্ম’ শব্দবন্ধের ব্যবহার রয়েছে। কিন্তু শব্দবন্ধটির প্রাচীন উপস্থিতি এবং সেটি সমগ্র ধর্মীয় ঐতিহ্যের সর্বজনীন নাম হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল কি না, তা দুটি পৃথক ঐতিহাসিক প্রশ্ন।
‘ধর্ম’ কি শুধু একটি ধর্মের নাম?
পুরাণে ‘ধর্ম’ শব্দের ব্যবহারও বহুমাত্রিক। কোথাও ধর্ম বলতে নৈতিক কর্তব্য বোঝানো হয়েছে, কোথাও সামাজিক আচরণবিধি, কোথাও ধর্মীয় আচার, আবার কোথাও বিশ্বব্যবস্থা ও ন্যায়নীতির সঙ্গে সম্পর্কিত ধারণা প্রকাশ পেয়েছে।
বিভিন্ন পুরাণে রাজধর্ম, প্রজাপালনের কর্তব্য, দান, সত্যবাদিতা, অহিংসা, তীর্থযাত্রা, ব্রত, পূজা এবং জীবনের নানা পর্যায়ের দায়িত্ব নিয়ে আলোচনা রয়েছে। এই প্রসঙ্গগুলিতে ‘ধর্ম’ সব সময় কোনও ধর্মসম্প্রদায়ের নাম নয়। অনেক ক্ষেত্রেই তা মানুষের কর্তব্য, আচরণ বা নৈতিক আদর্শকে বোঝায়। আবার পুরাণের ধর্মীয় কাহিনিতে ‘ধর্ম’ কোনও দেবতার মাহাত্ম্য, ভক্তির পথ কিংবা নির্দিষ্ট আচারপরম্পরার সঙ্গেও যুক্ত হতে পারে। অর্থাৎ শব্দটির একটি মাত্র অর্থ ধরে সব জায়গায় প্রয়োগ করলে মূল বক্তব্যের অনেকটাই হারিয়ে যেতে পারে।
এই কারণেই ‘সনাতন ধর্ম’ কথাটির ইতিহাস অনুসন্ধান করতে গেলে শুধু শব্দবন্ধটির উপস্থিতি খুঁজলেই হবে না। প্রতিটি ক্ষেত্রে তার অর্থ কী, তা আলাদা করে বিচার করতে হবে।
বৈষ্ণব পরম্পরায় ‘সনাতন’ ও ‘ধর্ম’
বৈষ্ণব পুরাণগুলিতে বিষ্ণু, নারায়ণ, কৃষ্ণ কিংবা তাঁদের বিভিন্ন অবতারের মাহাত্ম্য বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। ভাগবতপুরাণে ভক্তি, ঈশ্বরের প্রতি আত্মসমর্পণ, ধর্মাচরণ এবং জীবনের চরম লক্ষ্য নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা রয়েছে।এই পরম্পরায় ধর্মকে কেবল সামাজিক নিয়মের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়নি। ঈশ্বরের প্রতি ভক্তি, নৈতিক জীবন, আত্মসংযম এবং মুক্তির আকাঙ্ক্ষাও ধর্মীয় চিন্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
ভাগবতপুরাণের তৃতীয় স্কন্ধের ষোড়শ অধ্যায়ের অষ্টাদশ শ্লোকে ‘সনাতন ধর্ম’ কথাটির উপস্থিতি এই আলোচনায় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তবে এই শ্লোকের ব্যাখ্যা করতে গেলে তার নির্দিষ্ট কাহিনি ও বৈষ্ণব ধর্মতত্ত্বের প্রেক্ষাপট বিবেচনা করা প্রয়োজন। পরবর্তী কালের বৈষ্ণব আচার্য ও ভক্তি আন্দোলনের বিভিন্ন ধারায় ধর্মের অর্থ আরও নানা ভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। কোথাও ঈশ্বরভক্তিকে জীবনের প্রধান পথ বলা হয়েছে, কোথাও ভক্তি, জ্ঞান ও কর্মের মধ্যে সম্পর্ক ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
অতএব, বৈষ্ণব পরম্পরায় ‘সনাতন’ ও ‘ধর্ম’ শব্দের ব্যবহার বুঝতে হলে পুরাণের মূল বক্তব্যের পাশাপাশি পরবর্তী ভাষ্য ও সাধনপরম্পরার বিকাশও দেখতে হবে।
শৈব পরম্পরায় ধর্মের ধারণা
শৈব পরম্পরায় শিবকে পরম সত্তা, বিশ্বজগতের নিয়ন্তা কিংবা জীবের মুক্তির পথপ্রদর্শক হিসেবে দেখা হয়েছে। শিবপুরাণ-সহ বিভিন্ন শৈব গ্রন্থে শিবের সৃষ্টি, স্থিতি, সংহার, করুণা, ভক্তি এবং আধ্যাত্মিক মুক্তির সঙ্গে সম্পর্কিত নানা ধারণা পাওয়া যায়।
এই পরম্পরায় ধর্মের সঙ্গে পূজা, তপস্যা, আত্মসংযম, শিবভক্তি এবং আধ্যাত্মিক জ্ঞানের সম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু সব শৈব গ্রন্থে ধর্মের ব্যাখ্যা এক রকম নয়। বিভিন্ন শৈব দর্শন ও আচারপরম্পরায় মুক্তি, আত্মা, ঈশ্বর এবং জগতের সম্পর্ক নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন মত গড়ে উঠেছে।এখানেও ‘সনাতন’ শব্দটি কোথায় ব্যবহৃত হয়েছে, কোন ধারণাকে বোঝাচ্ছে এবং তার সঙ্গে ‘ধর্ম’ শব্দের সম্পর্ক কী—এসব প্রশ্নের উত্তর মূল পাঠের ভিত্তিতে খুঁজতে হবে।
শুধু শৈব পুরাণে কোনও নীতি বা দেবতাকে ‘সনাতন’ বলা হয়েছে বলেই সেই ব্যবহারকে সমগ্র হিন্দু ধর্মের একটি নির্দিষ্ট নামের প্রমাণ হিসেবে ধরে নেওয়া যায় না। আবার সেই কারণে শৈব পরম্পরার বৃহত্তর ধর্মীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে সম্পর্ক অস্বীকার করাও যুক্তিসংগত নয়।
শাক্ত পরম্পরায় ‘সনাতন’ ও ধর্ম
শাক্ত পরম্পরায় দেবীকে পরম শক্তি, জগতের সৃষ্টির উৎস এবং বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের অন্তর্নিহিত শক্তি হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে। দেবীভাগবত, মার্কণ্ডেয়পুরাণের অন্তর্গত দেবীমাহাত্ম্য এবং বিভিন্ন তান্ত্রিক গ্রন্থে দেবীর মহিমা, উপাসনা, শক্তিতত্ত্ব ও মুক্তির পথ নিয়ে আলোচনা রয়েছে।
এই ধারায় দেবী কখনও জগতের জননী, কখনও মহাশক্তি, কখনও জ্ঞান ও মুক্তির উৎস। ভক্তি, উপাসনা, মন্ত্র, আচার এবং আত্মিক উপলব্ধি শাক্ত ধর্মাচরণের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দিক। তবে বৈষ্ণব ও শৈব পরম্পরার মতো শাক্ত ধারার মধ্যেও নানা শাখা রয়েছে। সব শাক্ত সম্প্রদায়ের আচার, দর্শন বা ধর্মব্যাখ্যা এক নয়। ফলে কোনও একটি গ্রন্থের বক্তব্যকে সমস্ত শাক্ত পরম্পরার অভিন্ন মত বলে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।
এই বৈচিত্র্য আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়—ভারতীয় ধর্মীয় ঐতিহ্য একাধিক উপাসনাপদ্ধতি, দার্শনিক চিন্তা এবং আঞ্চলিক পরম্পরার মধ্য দিয়ে বিকশিত হয়েছে। ‘সনাতন’ ও ‘ধর্ম’ শব্দের ইতিহাসও এই বৈচিত্র্যের বাইরে নয়।
তাহলে কি পুরাণে ‘সনাতন ধর্ম’ একটি ধর্মের নাম ছিল?
এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গেলে কয়েকটি বিষয় আলাদা করে দেখা প্রয়োজন।
প্রথমত, প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় সংস্কৃত সাহিত্যে ‘সনাতন’, ‘ধর্ম’ এবং ‘সনাতন ধর্ম’ শব্দবন্ধের ব্যবহার পাওয়া যায়। কিছু ক্ষেত্রে তা চিরন্তন নীতি, ধর্মাচরণ বা কোনও বিশেষ ধর্মীয় ও দার্শনিক ধারণার সঙ্গে যুক্ত।
দ্বিতীয়ত, পুরাণের বিভিন্ন ধারায় ধর্মের ব্যাখ্যা এক নয়। বৈষ্ণব, শৈব ও শাক্ত গ্রন্থে নিজ নিজ উপাস্য, দর্শন ও আচারপরম্পরার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। তাই একটি নির্দিষ্ট শ্লোকের অর্থ থেকে সমগ্র পুরাণসাহিত্যের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না।
তৃতীয়ত, কোনও শব্দবন্ধ প্রাচীন গ্রন্থে পাওয়া গেলেই সেটি তখন থেকেই একটি বৃহত্তর ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর সর্বজনীন নাম ছিল—এমন সিদ্ধান্ত স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় না। শব্দটির ব্যবহার, তার সামাজিক প্রেক্ষাপট এবং বিভিন্ন যুগে তার অর্থের পরিবর্তন নিয়ে পৃথক গবেষণা প্রয়োজন।
ইতিহাসবিদ পিটার হীশ তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছেন, ‘সনাতন ধর্ম’ শব্দবন্ধটি ধ্রুপদি ও মধ্যযুগীয় সংস্কৃত সাহিত্যে পাওয়া গেলেও সমগ্র হিন্দু ধর্মীয় বিশ্বাস ও আচরণের সাধারণ নাম হিসেবে এর ব্যবহার প্রাচীনকাল থেকেই প্রতিষ্ঠিত ছিল—এমন দাবির পক্ষে পর্যাপ্ত প্রমাণ নেই। তাঁর মতে, হিন্দুধর্মের সমার্থক পরিচয় হিসেবে শব্দবন্ধটির ব্যবহার ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে বিশেষ গুরুত্ব পায়। এটি একটি গবেষণাভিত্তিক ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা; বিষয়টি নিয়ে আরও আলোচনা ও ভিন্ন ব্যাখ্যাও রয়েছে। তাই কোনও একটি গবেষণার সিদ্ধান্তকে প্রশ্নাতীত সত্য হিসেবে না ধরে মূল গ্রন্থ, ভাষ্য এবং অন্যান্য ঐতিহাসিক প্রমাণের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।
একটি শব্দ, বহু ঐতিহ্য
এই ধারাবাহিকের আগের পর্বগুলিতে আমরা দেখেছি, বৈদিক সাহিত্য, উপনিষদ, মহাভারত, মনুস্মৃতি ও গীতায় ‘ধর্ম’ এবং ‘সনাতন’ শব্দের ব্যবহার বুঝতে গেলে প্রসঙ্গের গুরুত্ব অপরিসীম। পুরাণের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। কোথাও ‘সনাতন’ কোনও দেবতার চিরন্তন স্বরূপ বোঝায়, কোথাও ধর্মকে চিরস্থায়ী নীতি হিসেবে বর্ণনা করা হয়, আবার কোথাও ‘সনাতন ধর্ম’ শব্দবন্ধটি নির্দিষ্ট ধর্মতাত্ত্বিক প্রসঙ্গে ব্যবহৃত হয়।
তাই ‘সনাতন ধর্ম’ শব্দবন্ধের ইতিহাস অনুসন্ধানে দুটি প্রশ্নকে পাশাপাশি রাখতে হবে—শব্দবন্ধটির প্রাচীন সাহিত্যিক ব্যবহার কী ছিল এবং পরবর্তী সময়ে সেটি কীভাবে একটি বৃহত্তর ধর্মীয় পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত হল?
এই দুটি প্রশ্নের উত্তর এক নয়। একটির উত্তর খুঁজতে হয় মূল গ্রন্থের ভাষা ও প্রসঙ্গে; অন্যটির জন্য প্রয়োজন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক পরিবর্তনের অনুসন্ধান। বিশ্বাসের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই এই পার্থক্য বোঝা সম্ভব। কোনও ধর্মীয় ঐতিহ্যের গভীরতা স্বীকার করার জন্য তার ইতিহাসকে একরৈখিক করে দেখানোর প্রয়োজন নেই। বরং বিভিন্ন যুগের গ্রন্থ, উপাসনা, দর্শন ও সম্প্রদায়ের বৈচিত্র্যকে স্বীকার করলেই সেই ঐতিহ্যের প্রকৃত বিস্তার আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
এই অনুসন্ধান আমাদের পরবর্তী প্রশ্নের দিকে নিয়ে যায়। প্রাচীন ভারতীয় সমাজে মানুষ নিজেদের কী নামে পরিচয় দিতেন? তাঁরা কি সবাই একই পরিচয়ে নিজেদের চিনতেন, নাকি বৈদিক, শৈব, বৈষ্ণব, শাক্ত, স্মার্ত এবং আরও নানা পরিচয়ের মধ্যে দিয়ে নিজেদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অবস্থান প্রকাশ করতেন?
পরবর্তী পর্বে সেই পরিচয়ের বহুত্ব নিয়েই আলোচনা হবে।
এই পর্বের সূত্র
১. ভাগবতপুরাণ, তৃতীয় স্কন্ধ, ষোড়শ অধ্যায়, অষ্টাদশ শ্লোক—‘সনাতন ধর্ম’ শব্দবন্ধের একটি প্রাসঙ্গিক উদাহরণ।
২. বিষ্ণুপুরাণ—বিষ্ণুর স্বরূপ, সৃষ্টি, ধর্ম ও বিশ্বব্যবস্থা সম্পর্কিত আলোচনা।
৩. শিবপুরাণ—শিবতত্ত্ব, উপাসনা ও ধর্মাচরণের বিভিন্ন দিক।
৪. দেবীভাগবত ও মার্কণ্ডেয়পুরাণ—দেবীতত্ত্ব, শাক্ত উপাসনা এবং ধর্মীয় পরম্পরার আলোচনা।
৫. পিটার হীশ, ‘চিরন্তন ধর্মের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস: সনাতন ধর্মের বংশপরম্পরার অনুসন্ধান’—আন্তর্জাতিক হিন্দুধর্ম-গবেষণা পত্রিকা, ২০২৫, ২৯তম খণ্ড। প্রাচীন সাহিত্যে শব্দবন্ধটির ব্যবহার এবং আধুনিক ধর্মীয় পরিচয় হিসেবে তার বিকাশ বিষয়ে একটি গবেষণামূলক আলোচনা।
পরবর্তী পর্ব
পর্ব ১২ — তাহলে প্রাচীন ভারতীয়রা নিজেদের কী বলতেন?
‘হিন্দু’ নয়—তাহলে কী?
আর্য, বৈদিক, শৈব, বৈষ্ণব, শাক্ত, স্মার্ত, ব্রাহ্মণ্য এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়—প্রাচীন ভারতীয় পরিচয়ের বহুত্বের অনুসন্ধান।
— লিখছেন অনিরুদ্ধ পাল
“বিশ্বাসের প্রতি শ্রদ্ধা, ইতিহাসের প্রতি দায়বদ্ধতা।”
Published on: অক্টো ১৭, ২০২৬ at ১১:১৩




