
“ভারতীয় চলচ্চিত্রে অসংখ্য গায়ক–সুরকার জুটি এসেছে। কেউ জনপ্রিয় হয়েছেন, কেউ ইতিহাস গড়েছেন। কিন্তু এমন একটি জুটি আছে, যাদের সম্পর্ককে শুধু ‘পেশাদার‘ বললে ভুল হবে। তারা ছিলেন বন্ধু, সহযোদ্ধা, পরীক্ষক, আবার একে অপরের সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা। তাঁরা—রাহুল দেব বর্মণ, অর্থাৎ পঞ্চমদা এবং কিশোর কুমার।“
Published on: আগ ১৩, ২০২৬ at ২০:২২
✍️কলমে: অনিরুদ্ধ পাল
সংবাদ প্রভাকর টাইমস
এসপিটি প্রতিবেদন: ঙ্গীতের ইতিহাসে কিছু সম্পর্ক তৈরি হয় সাফল্যের জন্য। আবার কিছু সম্পর্ক তৈরি হয় সৃষ্টির জন্য। পঞ্চমদা আর কিশোর কুমারের সম্পর্ক ছিল দ্বিতীয় ধরনের। দু’জনের মধ্যে বয়সের পার্থক্য ছিল। একজন ছিলেন কিংবদন্তি শচীন দেব বর্মণের ছেলে। অন্যজন ইতিমধ্যেই অভিনয় ও গানের জগতে নিজের পরিচয় গড়ে তুলছেন। কিন্তু যখন দু’জন মুখোমুখি হতেন, তখন তাঁদের মধ্যে কোনও আনুষ্ঠানিকতা থাকত না।
থাকত শুধু— সুর নিয়ে খেলবার এক শিশুসুলভ আনন্দ।
প্রথম দেখা, প্রথম বিশ্বাস
রাহুল দেব বর্মণ ছোটবেলা থেকেই কিশোর কুমারকে দেখেছেন। বাবা শচীন দেব বর্মণের রেকর্ডিংয়ে কিশোরের আসা–যাওয়া ছিল নিয়মিত। পঞ্চমদা তখনই বুঝেছিলেন—
এই মানুষটি অন্যরকম। কিশোর কোনও গানকে কাগজে লেখা নোটেশনের মতো দেখতেন না। তিনি গানকে দেখতেন জীবন্ত চরিত্র হিসেবে। একটি গান কীভাবে হাসবে…
কোথায় শ্বাস নেবে…
কোথায় চুপ করে যাবে…
এসব তিনি অনুভব করতেন। এই অনুভবই পরে পঞ্চমদাকে মুগ্ধ করেছিল।
দু‘জনের মিল কোথায় ছিল?
প্রথমত— দু’জনেই নিয়ম ভাঙতে ভালোবাসতেন।
দ্বিতীয়ত— দু’জনেই বিশ্বাস করতেন, গান শুধু নিখুঁত হলে চলবে না, জীবন্ত হতে হবে।
তৃতীয়ত— স্টুডিওতে তাঁরা কখনও ভয় নিয়ে কাজ করতেন না। ভুল হলে আবার গাইতেন। আবার নতুন কিছু করতেন। আবার বদলাতেন। সেই কারণেই তাঁদের সৃষ্টিগুলো আজও এত সতেজ।
‘পড়োশন‘—এক নতুন অধ্যায়ের শুরু
১৯৬৮ সালের ‘পড়োশন‘। এই ছবিতে কিশোর কুমারের গাওয়া “মেরে সামনে ওয়ালি খিড়কি মে“ শুধু জনপ্রিয় গান নয়। এটি ছিল পঞ্চমদা ও কিশোরের রসায়নের প্রথম বড় ঘোষণা।
তারপর আসে সেই অবিস্মরণীয় সংগীত-দ্বৈরথ—“এক চতুর নার…”
মন্না দে ও কিশোর কুমারের কণ্ঠে এই গান আজও ভারতীয় চলচ্চিত্রের অন্যতম সেরা কমেডি সংগীত।
পঞ্চমদা জানতেন— কিশোরকে যত স্বাধীনতা দেওয়া হবে, তিনি তত বেশি জাদু সৃষ্টি করবেন।
স্টুডিও ছিল তাঁদের খেলাঘর
রেকর্ডিংয়ের সময় দু’জনকে দেখলে বোঝা যেত না, তাঁরা কাজ করছেন নাকি খেলছেন। কখনও পঞ্চমদা হঠাৎ বলছেন— “কিশোরদা, এখানে একটু হেসে দাও।”
কখনও বলছেন— “এই লাইনটা গাইবে না, বলবে।”
আবার কখনও বলছেন— “এখানে ইয়োডেলিং করো।”
কিশোর কোনও প্রশ্ন করতেন না। তিনি পরীক্ষা করতেন। এই পরীক্ষার ফলেই জন্ম নিত এমন সব মুহূর্ত, যা আগে কেউ শোনেনি।
যেখানে কণ্ঠও একটি বাদ্যযন্ত্র
পঞ্চমদার একটি বড় বিশ্বাস ছিল , কিশোর কুমারের কণ্ঠ নিজেই একটি বাদ্যযন্ত্র। তিনি শুধু সুর গাইতেন না। হাসতেন। শিস দিতেন। গুনগুন করতেন। শ্বাসের শব্দও কখনও গানের অংশ হয়ে উঠত। আজকের ভাষায় যাকে “ভোকাল টেক্সচার” বলা হয়, পঞ্চমদা বহু আগেই তা বুঝে ফেলেছিলেন।
একের পর এক কালজয়ী সৃষ্টি
সত্তরের দশক যেন এই দুই শিল্পীর জন্যই অপেক্ষা করছিল।
‘হীরা পান্না‘
“পন্না কি তামান্না হ্যায়…”
প্রেমের গানে কতটা কোমলতা থাকতে পারে, এই গান তার অন্যতম উদাহরণ।
‘আপনা দেশ‘
“রোনা কভি নেহি রোনা…”
জীবনকে ইতিবাচকভাবে দেখার এক অসাধারণ সুর।
‘যাদোঁ কি বারাত‘
যদিও এই ছবিতে বহু শিল্পী ছিলেন, পঞ্চমদার নতুন সংগীতভাবনার অন্যতম প্রতীক হয়ে ওঠে এই অ্যালবাম।
‘শোলে‘
ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে সম্ভবত সবচেয়ে জনপ্রিয় ছবিগুলোর একটি।
“কোই হাসিনা জব রুঠ জাতি হ্যায়…”
কিশোরের কণ্ঠে এই গান বন্ধুত্ব, প্রেম আর দুষ্টুমির এক অনন্য মিশ্রণ।
‘আঁধি‘
“তুম আ গয়ে হো, নূর আ গয়া হ্যায়…”
লতা মঙ্গেশকরের সঙ্গে এই দ্বৈত গান ভারতীয় রোম্যান্টিক গানের ইতিহাসে আজও অমর।
‘গোলমাল‘
“আনে ওয়ালা পল, জানে ওয়ালা হ্যায়…”
এই গান যেন সময়ের দর্শন।
জীবনকে কয়েক মিনিটের মধ্যে এত গভীরভাবে প্রকাশ করা খুব কম গানই পেরেছে।
‘কালিয়া‘
অমিতাভ বচ্চনের পর্দার ব্যক্তিত্বকে আরও উজ্জ্বল করে তোলে—
“জাহাঁ তেরি ইয়ে নজর হ্যায়…”
‘রকি‘
“ক্যা ইয়াহি প্যায়ার হ্যায়…”
নতুন প্রজন্মের প্রেমের নতুন ভাষা।
‘দ্য বার্নিং ট্রেন‘
“পল দো পল কা সাথ হামারা…”
এই ছবিতেও পঞ্চমদার সুরে কিশোরের কণ্ঠ অন্য মাত্রা যোগ করে।
অমিতাভ বচ্চনের নতুন কণ্ঠ
রাজেশ খান্নার পর যখন বলিউডে অমিতাভ বচ্চনের উত্থান শুরু হলো, তখনও পঞ্চমদার প্রথম পছন্দ ছিলেন কিশোর। অমিতাভের গভীর ব্যক্তিত্ব, তীক্ষ্ণ সংলাপ আর বিদ্রোহী চরিত্রের সঙ্গে কিশোরের কণ্ঠ আশ্চর্যভাবে মানিয়ে গেল। ‘অভিমান’, ‘নমক হালাল’, ‘কালিয়া’, ‘শরাবি’—একটির পর একটি ছবিতে নতুন এক যুগের সূচনা হলো।
বন্ধুত্ব, যা শুধু স্টুডিওতে সীমাবদ্ধ ছিল না
রেকর্ডিং শেষ হলেই সম্পর্ক শেষ হয়ে যেত না। কিশোরদা আর পঞ্চমদা ঘণ্টার পর ঘণ্টা গল্প করতেন। খাওয়া-দাওয়া, আড্ডা, সুর নিয়ে তর্ক—সবকিছুতেই ছিল অকৃত্রিম আন্তরিকতা।
পঞ্চমদা প্রায়ই বলতেন, “কিশোরদা গাইছেন মানেই অর্ধেক কাজ হয়ে গেছে।”
অন্যদিকে কিশোরও অকপটে স্বীকার করতেন, “পঞ্চম আমাকে এমনভাবে গান গাওয়ায়, যেভাবে অন্য কেউ পারে না।”
কেন এই জুটি এত বড়?
অনেকেই মনে করেন, পঞ্চমদা সুর না দিলে কিশোর এত বড় হতেন না। আবার অনেকে বলেন, কিশোর না থাকলে পঞ্চমদার সুর এত জীবন্ত হয়ে উঠত না।
সত্যি বলতে— দু’জন দু’জনের অসম্পূর্ণতাকে পূর্ণ করেছিলেন। পঞ্চমদা কিশোরকে স্বাধীনতা দিয়েছিলেন। আর কিশোর সেই স্বাধীনতাকে শিল্পে রূপ দিয়েছিলেন।
সময়েরও ওপরে এক জুটি
আজ এত বছর পরেও যদি ভারতীয় চলচ্চিত্র সঙ্গীতের সেরা সুরকার–গায়ক যুগলের তালিকা তৈরি হয়, খুব কম নামই পঞ্চমদা–কিশোর জুটির সমকক্ষ হয়ে উঠতে পারে। কারণ তাঁদের সৃষ্টি কেবল জনপ্রিয় গান নয়। এগুলি ভারতীয় জনপ্রিয় সংস্কৃতির অংশ। রেডিও বদলেছে। ক্যাসেট হারিয়েছে। সিডি ইতিহাস হয়েছে। স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম এসেছে।
কিন্তু “ও মেরে দিল কে চেইন”, “চিঙ্গারি কোই ভড়কে”, “আনে ওয়ালা পল”, “ক্যা ইয়াহি প্যায়ার হ্যায়”, “পন্না কি তামান্না”—এসব গান এখনও একই আবেগে মানুষ শোনে।
এটাই প্রকৃত অমরত্ব। আর সেই অমরত্বের স্থপতি ছিলেন— দুই পাগল শিল্পী। একজন সুরের জাদুকর। আর একজন কণ্ঠের জাদুকর। ভারতীয় সঙ্গীতের ইতিহাস তাঁদের চিরকাল মনে রাখবে—পঞ্চমদা আর কিশোর।
পরবর্তী খণ্ড–৬
“দেব আনন্দ থেকে অমিতাভ: এক কণ্ঠে বদলে গেছে পাঁচ প্রজন্মের নায়কের পরিচয়“
এই পর্বে উঠে আসবে—
- কেন দেব আনন্দ, রাজেশ খান্না, অমিতাভ বচ্চন, ঋষি কাপুর, সঞ্জয় দত্ত-সহ একাধিক প্রজন্মের নায়কের জন্য প্রথম পছন্দ হয়ে উঠেছিলেন কিশোর কুমার,
- কোন নায়কের সঙ্গে তাঁর কণ্ঠের রসায়ন ছিল সবচেয়ে গভীর,
- এবং কীভাবে একই শিল্পী রোম্যান্স, অ্যাকশন, কমেডি ও দর্শন—সব ধরনের চরিত্রের আবেগকে নিজের কণ্ঠে ধারণ করেছিলেন।




