
Published on: ফেব্রু ৯, ২০২৬ at ১১:২১
Reporter: Aniruddha Pal

এসপিটি নিউজ : বিশ্বজুড়ে ভ্রমণের শক্তিশালী চাহিদার প্রতিফলন হিসেবে ২০২৫ সালে আন্তর্জাতিক পর্যটকদের আগমন ৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। রাষ্ট্রসঙ্ঘের পর্যটন বিভাগ—ইউএন ট্যুরিজম (ওয়ার্ল্ড ট্যুরিজম অর্গানাইজেশন)-এর প্রকাশিত সর্বশেষ ওয়ার্ল্ড ট্যুরিজম ব্যারোমিটার অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিশ্বব্যাপী আনুমানিক ১.৫২ বিলিয়ন আন্তর্জাতিক পর্যটক (রাত্রিযাপনকারী দর্শনার্থী) ভ্রমণ করেছেন। এটি ২০২৪ সালের তুলনায় প্রায় ৬ কোটি বেশি।
এই পরিসংখ্যান মহামারী-পরবর্তী পুনরুদ্ধার পর্ব পেরিয়ে আবারও মহামারী-পূর্ব প্রবৃদ্ধির ধারায় ফেরার স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে। উল্লেখযোগ্যভাবে, ২০০৯ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে আন্তর্জাতিক পর্যটনে যে বার্ষিক গড়ে ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি দেখা গিয়েছিল, ২০২৫ সালের ফলাফল তার কাছাকাছিই পৌঁছেছে।
শক্তিশালী চাহিদা ও সংযোগ ব্যবস্থার উন্নতিই মূল চালিকাশক্তি
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রধান উৎস বাজারগুলোর জোরালো পারফরম্যান্স, এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের গন্তব্যগুলোর ধারাবাহিক পুনরুদ্ধার, উন্নত বিমান সংযোগ এবং বহু দেশে ভিসা প্রক্রিয়ার সহজীকরণ—সব মিলিয়ে ২০২৫ সালে আন্তর্জাতিক ভ্রমণ উল্লেখযোগ্যভাবে গতি পেয়েছে।
ইউএন ট্যুরিজমের মহাসচিব শাইখা আলনুওয়াইস বলেন, “পর্যটন পরিষেবায় উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা থেকে সৃষ্ট অনিশ্চয়তা থাকা সত্ত্বেও ২০২৫ সালে ভ্রমণের চাহিদা অত্যন্ত শক্তিশালী ছিল। আমরা আশা করছি, বিশ্ব অর্থনীতি স্থিতিশীল থাকলে এবং পিছিয়ে থাকা গন্তব্যগুলো সম্পূর্ণ পুনরুদ্ধার লাভ করলে ২০২৬ সালেও এই ইতিবাচক ধারা বজায় থাকবে।”
অঞ্চলভিত্তিক চিত্র: আফ্রিকা এগিয়ে, এশিয়া–প্রশান্ত মহাসাগর ঘুরে দাঁড়াচ্ছে
২০২৫ সালে অঞ্চলভিত্তিক পর্যটন প্রবৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য বৈচিত্র্য দেখা গেছে।
- ইউরোপ—বিশ্বের বৃহত্তম গন্তব্য অঞ্চল হিসেবে ২০২৫ সালে ইউরোপে রেকর্ড হয়েছে ৭৯৩ মিলিয়ন আন্তর্জাতিক পর্যটক। এটি ২০২৪ সালের তুলনায় ৪ শতাংশ এবং ২০১৯ সালের তুলনায় ৬ শতাংশ বেশি। পশ্চিম ইউরোপ (+৫%) ও দক্ষিণ ভূমধ্যসাগরীয় ইউরোপ (+৩%) শক্তিশালী ফল দেখিয়েছে। মধ্য ও পূর্ব ইউরোপে (+৬%) ঘুরে দাঁড়ানোর প্রবণতা স্পষ্ট হলেও এখনও ২০১৯ সালের স্তরের তুলনায় ৯ শতাংশ কম।
- আমেরিকা—এই অঞ্চলে ২১৮ মিলিয়ন পর্যটক ভ্রমণ করেছেন, যা মোটের উপর ১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি। তবে উপ-অঞ্চলভেদে ফলাফল মিশ্র। দক্ষিণ আমেরিকা (+৭%) ও মধ্য আমেরিকা (+৫%) এগিয়ে থাকলেও, বছরের শেষ প্রান্তিকে হারিকেন মেলিসার প্রভাবে ক্যারিবীয় অঞ্চলের কিছু গন্তব্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
- আফ্রিকা—২০২৫ সালে সবচেয়ে শক্তিশালী ফলাফল এসেছে আফ্রিকা থেকে। মোট ৮১ মিলিয়ন পর্যটক ভ্রমণ করেছেন, যা ৮ শতাংশ বৃদ্ধি। বিশেষ করে উত্তর আফ্রিকায় প্রবৃদ্ধি ছিল চোখে পড়ার মতো (+১১%)।
- মধ্যপ্রাচ্য—২০২৫ সালে ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নিয়ে এই অঞ্চল মহামারী-পূর্ব স্তরের তুলনায় ৩৯ শতাংশ বেশি পর্যটক আকর্ষণ করেছে। প্রায় ১০০ মিলিয়ন আন্তর্জাতিক পর্যটকের মাইলফলক ছুঁয়েছে মধ্যপ্রাচ্য।
- এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল—এখানে ২০২৫ সালে পর্যটকদের আগমন ৬ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৩১ মিলিয়নে। যদিও অঞ্চলটি এখনও ২০১৯ সালের তুলনায় ৯ শতাংশ পিছিয়ে। উত্তর-পূর্ব এশিয়া (+১৩%) দ্রুত পুনরুদ্ধারে নেতৃত্ব দিয়েছে, আর দক্ষিণ এশিয়া ইতিমধ্যেই মহামারী-পূর্ব স্তরে ফিরে এসেছে।
বহু দেশে দ্বিঅঙ্কের প্রবৃদ্ধি
২০২৫ সালের বারো মাসের পূর্ণ তথ্য পাওয়া গন্তব্যগুলোর মধ্যে ব্রাজিল (+৩৭%), মিশর (+২০%), মরক্কো (+১৪%) ও সেশেলস (+১৩%) দ্বিঅঙ্কের প্রবৃদ্ধি দেখিয়েছে। নভেম্বর পর্যন্ত তথ্য অনুযায়ী ভুটান (+৩০%), আইসল্যান্ড (+২৯%), জাপান (+১৭%) ও দক্ষিণ আফ্রিকা (+১৯%)-এর মতো গন্তব্যেও উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে।
পর্যটন আয়ে রেকর্ড: ২.২ ট্রিলিয়ন ডলার
পর্যটকদের আগমনের সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে ব্যয়ও। প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালে আন্তর্জাতিক পর্যটন থেকে বিশ্বব্যাপী আয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ১.৯ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা ২০২৪ সালের তুলনায় ৫ শতাংশ বেশি। যাত্রী পরিবহনসহ মোট পর্যটন রপ্তানি আয় ২০২৫ সালে রেকর্ড ২.২ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
মরক্কো, দক্ষিণ কোরিয়া, মিশর, জাপান ও মঙ্গোলিয়ার মতো দেশে পর্যটন আয়ে প্রবৃদ্ধি আগমনের হারের চেয়েও বেশি ছিল। পাশাপাশি যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, স্পেন ও তুরস্কের মতো শীর্ষ আয়কারী দেশগুলিও শক্তিশালী বৃদ্ধি ধরে রেখেছে।
২০২৬ সালের দিকনির্দেশ: সম্ভাবনার সঙ্গে ঝুঁকিও
ইউএন ট্যুরিজমের পূর্বাভাস অনুযায়ী, অনুকূল বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ধারাবাহিক পুনরুদ্ধার অব্যাহত থাকলে ২০২৬ সালে আন্তর্জাতিক পর্যটন আরও ৩ থেকে ৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেতে পারে। তবে ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত, উচ্চ ভ্রমণ ব্যয়, বাণিজ্য উত্তেজনা এবং চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি এই প্রবৃদ্ধির পথে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মিলানো-কর্টিনা ২০২৬ শীতকালীন অলিম্পিক এবং ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর মতো বড় আন্তর্জাতিক ইভেন্টও আগামী বছরে আন্তর্জাতিক ভ্রমণকে বাড়তি গতি দেবে।
সব মিলিয়ে, ২০২৫ সাল প্রমাণ করেছে—মহামারীর ধাক্কা কাটিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যটন আবারও বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম শক্তিশালী চালিকাশক্তি হিসেবে ফিরে এসেছে, আর ২০২৬ সালেও সেই গতি বজায় থাকার আশাই করছে বিশ্ব।
Published on: ফেব্রু ৯, ২০২৬ at ১১:২১



