

Published on: ডিসে ১৮, ২০২৫ at ২১:১২
নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা ও নয়াদিল্লি , ১৮ ডিসেম্বর : বাংলাদেশ ও ভারতের দীর্ঘদিনের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে নজিরবিহীন টানাপোড়েন শুরু হয়েছে। ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশন অভিমুখে বিশাল বিক্ষোভ এবং এর প্রতিক্রিয়ায় দিল্লিতে বাংলাদেশের হাইকমিশনারকে তলব ও সতর্কবার্তা দেওয়ার মধ্য দিয়ে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক এখন খাদের কিনারে। নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে ইতিমধ্যে রাজশাহী ও খুলনার ভারতীয় ভিসা আবেদন কেন্দ্র (IVAC) অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করে দিয়েছে ভারত।
বিক্ষোভের মূল কেন্দ্রবিন্দু: শেখ হাসিনাকে ফেরানোর দাবি
গত ১৭ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে ‘জুলাই ঐক্য’ ও ‘আধিপত্যবিরোধী জুলাই ৩৬ মঞ্চ’-এর ব্যানারে রাজধানীর গুলশানে ভারতীয় হাইকমিশন অভিমুখে বিশাল প্রতিবাদ মিছিল বের করা হয়। বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, ভারত বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ক্রমাগত হস্তক্ষেপ করছে এবং ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে রাজনৈতিক আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা চালাচ্ছে। তাদের দাবি—অবিলম্বে শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশের আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি করতে হস্তান্তর করতে হবে।
বিক্ষোভটি বাড্ডার হোসেন মার্কেটের সামনে পৌঁছালে পুলিশ ও র্যাব ব্যারিকেড দিয়ে আটকে দেয়। তবে এই বিক্ষোভের আঁচ ছড়িয়ে পড়ে ঢাকার বাইরেও। আজ ১৮ ডিসেম্বর রাজশাহীতে ভারতীয় সহকারী হাইকমিশন ঘেরাও করতে গেলে আন্দোলনকারীদের সাথে পুলিশের ব্যাপক ধস্তাধস্তি ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে।
দিল্লিতে বাংলাদেশের হাইকমিশনারকে তলব
ঢাকায় বিক্ষোভের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই দিল্লিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার রিয়াজ হামিদুল্লাহকে তলব করে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় (MEA)। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (বিএম) বি শ্যাম বাংলাদেশের হাইকমিশনারের কাছে ভারতের গভীর উদ্বেগের কথা জানান।
ভারতের পক্ষ থেকে উত্থাপিত মূল অভিযোগগুলো হলো:
- বাংলাদেশে ভারতীয় কূটনৈতিক মিশনগুলোর নিরাপত্তা চরম হুমকির মুখে।
- বিক্ষোভকারীদের কর্মকাণ্ডকে ‘চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলোর’ তৎপরতা হিসেবে অভিহিত করেছে দিল্লি।
- ভারতীয় নাগরিকদের ওপর হামলা বা হুমকির ঘটনায় অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে কোনো কার্যকর তদন্ত না হওয়া।
বন্ধ হলো ভিসা কেন্দ্র: বিপাকে সাধারণ মানুষ
নিরাপত্তার অজুহাতে ঢাকার যমুনা ফিউচার পার্কের প্রধান কেন্দ্রসহ রাজশাহী ও খুলনার আইভ্যাক (IVAC) সেন্টারগুলো অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। আইভ্যাকের ওয়েবসাইটে জানানো হয়েছে, ১৮ ডিসেম্বর থেকে রাজশাহী ও খুলনায় কোনো আবেদন গ্রহণ করা হবে না। এতে বিশেষ করে ভারতে চিকিৎসা নিতে ইচ্ছুক রোগী ও সাধারণ পর্যটকরা চরম বিপাকে পড়েছেন।
“বর্তমান নিরাপত্তা পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে আইভ্যাক রাজশাহী এবং খুলনা আজ বন্ধ থাকবে। আবেদনকারীদের পরবর্তীতে নতুন সময় জানানো হবে।” — আইভ্যাক অফিসিয়াল বিজ্ঞপ্তি
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অবস্থান
পরিস্থিতি পর্যালোচনায় বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, সরকার সকল বিদেশি কূটনৈতিক মিশনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর। ১৭ ডিসেম্বরের বিক্ষোভকে শান্তিপূর্ণ রাখতে পুলিশ সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করেছে এবং কোনো স্থাপনার ক্ষতি হতে দেয়নি। একইসঙ্গে, মানবিক দিক বিবেচনা করে দ্রুত ভিসা কার্যক্রম সচল করতে ভারতকে অনুরোধ জানানো হয়েছে।
এক নজরে বর্তমান সংকট
| প্রধান দিক | বিস্তারিত তথ্য |
| আন্দোলনকারী গোষ্ঠী | জুলাই ঐক্য, আধিপত্যবিরোধী জুলাই ৩৬ মঞ্চ |
| মূল দাবি | শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ ও ভারতীয় হস্তক্ষেপ বন্ধ |
| ভারতীয় পদক্ষেপ | হাইকমিশনার তলব, রাজশাহী ও খুলনার ভিসা কেন্দ্র বন্ধ |
| বাংলাদেশ সরকারের অবস্থান | কূটনৈতিক নিরাপত্তা জোরদার ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার আহ্বান |
| জনভোগান্তি | ভিসা বন্ধ হওয়ায় চিকিৎসা ও জরুরি ভ্রমণ ব্যাহত |
আঞ্চলিক স্থিতিশীলতায় উদ্বেগের ছায়া
গত ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর ঢাকা ও দিল্লির মধ্যে যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছিল, সাম্প্রতিক এই ঘটনাপ্রবাহ তাকে আরও জটিল করে তুলেছে। একদিকে বাংলাদেশের জনমনে ক্রমবর্ধমান ভারতবিরোধী ক্ষোভ, অন্যদিকে ভারতের কঠোর ও রক্ষণাত্মক অবস্থান—দুই নিকট প্রতিবেশীর এই কূটনৈতিক টানাপোড়েন এখন দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
Published on: ডিসে ১৮, ২০২৫ at ২১:১২



