
— বর্তমান ভারত ও স্বামী বিবেকানন্দের চিন্তাধারা
Published on: জানু ১২, ২০২৬ at ১৬:৩১
লেখক : অনিরুদ্ধ পাল

এসপিটি প্রতিবেদন: ইতিহাসে কিছু মানুষ জন্মান আলোর মতো—যাঁরা নিজে জ্বলে অন্যকে পথ দেখান। স্বামী বিবেকানন্দ ছিলেন তেমনই এক অগ্নিস্ফুলিঙ্গ, যাঁর জীবন ও চিন্তাধারা আজও ভারতীয় জাতিসত্তার গভীরে দীপ্ত হয়ে রয়েছে। ১২ জানুয়ারি ১৮৬৩ সালে কলকাতায় জন্মগ্রহণকারী নরেন্দ্রনাথ দত্ত কালের প্রবাহে হয়ে উঠেছিলেন স্বামী বিবেকানন্দ—একজন সন্ন্যাসী, দার্শনিক, সমাজসংস্কারক এবং সর্বোপরি এক জাগ্রত জাতিচেতনার প্রতীক।
তাঁর ১৬৩তম জন্মদিবসে দাঁড়িয়ে আমরা যখন বর্তমান ভারতের দিকে তাকাই, তখন স্পষ্ট হয়—অর্থনৈতিক উন্নতি ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতির পাশাপাশি ভারত আজ মূল্যবোধের সংকট, সামাজিক বৈষম্য ও মানসিক অস্থিরতার মুখোমুখি। এই সন্ধিক্ষণে স্বামী বিবেকানন্দের চিন্তাধারা যেন এক অনন্ত আলোকবর্তিকা, যা আমাদের পথ হারাতে দেয় না।
স্বামী বিবেকানন্দের দর্শনের কেন্দ্রে রয়েছে মানুষ—তার শক্তি, সম্ভাবনা ও আত্মবিশ্বাস। তিনি মানুষকে কখনোই দুর্বল বলে স্বীকার করেননি। বরং তিনি দৃঢ় কণ্ঠে বলেছিলেন—
“All power is within you; you can do anything and everything.” (সমস্ত শক্তি তোমার মধ্যেই আছে; তুমি সব কিছু করতে সক্ষম।)
এই উক্তির মধ্যে লুকিয়ে আছে এক বিপ্লবী দর্শন। বিবেকানন্দ বিশ্বাস করতেন, মানুষের পতনের কারণ বাহ্যিক পরিস্থিতি নয়, বরং নিজের শক্তির প্রতি অবিশ্বাস। আজকের ভারত, বিশেষত তরুণ সমাজ, যখন হতাশা, ব্যর্থতার ভয় ও আত্মসন্দেহে জর্জরিত, তখন এই বাণী এক নবজাগরণের ডাক হয়ে ওঠে। তিনি আমাদের শেখান—নিজেকে চিনলেই জীবন বদলাতে শুরু করে।
স্বামী বিবেকানন্দের স্বপ্নের ভারত গড়ে উঠবে যুবকদের হাত ধরেই—এই বিশ্বাসে তিনি ছিলেন অবিচল। তাঁর মতে, যুবসমাজ হলো জাতির চালিকাশক্তি, ভবিষ্যতের স্থপতি। সেই কারণেই তিনি বজ্রনিনাদে উচ্চারণ করেছিলেন—
“Arise, awake and stop not till the goal is reached.” (ওঠো, জাগো এবং লক্ষ্যে না পৌঁছানো পর্যন্ত থেমো না।)
এই আহ্বান নিছক একটি প্রেরণামূলক বাক্য নয়; এটি এক জীবনদর্শন। আজকের ভারত বিশ্বের বৃহত্তম যুব জনসংখ্যার দেশ। এই বিপুল শক্তি যদি সঠিক দিশা পায়, তবে ভারত কেবল অর্থনৈতিক নয়, নৈতিক ও সাংস্কৃতিক দিক থেকেও বিশ্বনেতৃত্বের আসনে পৌঁছাতে পারে। তাই স্বামী বিবেকানন্দের জন্মদিন জাতীয় যুব দিবস হিসেবে পালিত হয়—যাতে জাতি প্রতি বছর নতুন করে যুবশক্তির গুরুত্ব উপলব্ধি করে।
১৮৯৩ সালের শিকাগো ধর্ম মহাসভায় স্বামী বিবেকানন্দের ভাষণ ছিল ভারতীয় দর্শনের এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। তিনি সেদিন বিশ্বের সামনে তুলে ধরেছিলেন ভারতের উদার ধর্মচেতনা। তাঁর কণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছিল—
“We accept all religions as true.”
এই বক্তব্য ছিল সাম্প্রদায়িক সংকীর্ণতার বিরুদ্ধে এক সাহসী ঘোষণা। বর্তমান ভারত বহুধর্মীয়, বহুভাষিক ও বহুসাংস্কৃতিক দেশ। এই বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য রক্ষা করতে হলে বিবেকানন্দের সহিষ্ণুতা ও মানবিকতার দর্শন আজও অপরিহার্য। তাঁর ধর্ম ছিল বিভাজনের নয়—সংযোগের।
স্বামী বিবেকানন্দ ধর্মকে কখনোই কেবল আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি। তাঁর কাছে ঈশ্বর মানে জীবন্ত মানুষ—বিশেষ করে দরিদ্র, নিপীড়িত ও অবহেলিত মানুষ। তাই তিনি বলেছিলেন—
“Daridra Narayana is my God.” (দরিদ্র মানুষই আমার ঈশ্বর।)
এই দর্শন বর্তমান ভারতের সামাজিক বাস্তবতায় গভীর তাৎপর্য বহন করে। দারিদ্র্য, বৈষম্য ও প্রান্তিকতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বিবেকানন্দের মানবসেবার আদর্শ আমাদের নৈতিক দিকনির্দেশ দেয়। উন্নয়ন তখনই অর্থবহ, যখন তা শেষ মানুষের জীবন স্পর্শ করে।
স্বামী বিবেকানন্দ শিক্ষাকে দেখেছিলেন আত্মউন্মোচনের প্রক্রিয়া হিসেবে। তাঁর মতে—
“Education is the manifestation of the perfection already in man.” (শিক্ষা হলো মানুষের ভেতরে নিহিত পূর্ণতার প্রকাশ।)
এই ভাবনা আজকের মুখস্থনির্ভর ও নম্বরকেন্দ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার এক শক্তিশালী বিকল্প। তিনি এমন শিক্ষার কথা বলেছেন, যা মানুষকে আত্মবিশ্বাসী, নৈতিক ও চরিত্রবান করে তোলে। বর্তমান ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থায় এই দৃষ্টিভঙ্গি নতুন করে ভাবনার দাবি রাখে।
স্বামী বিবেকানন্দ ভারতবাসীকে আত্মহীনতার গ্লানি থেকে মুক্ত করতে চেয়েছিলেন। তাঁর বিখ্যাত উক্তি—
“Say with pride, we are Hindus.”
এখানে ‘হিন্দু’ শব্দটি কোনো সংকীর্ণ ধর্মীয় পরিচয় নয়; এটি ভারতের প্রাচীন সভ্যতা, দর্শন ও জ্ঞানঐতিহ্যের প্রতীক। বিশ্বায়নের যুগে দাঁড়িয়ে এই আত্মমর্যাদাই জাতিকে আত্মবিশ্বাসী করে তোলে এবং অন্যের অনুকরণ নয়, নিজের শক্তিতে এগিয়ে যেতে শেখায়।
স্বামী বিবেকানন্দ কেবল অতীতের কোনো মহাপুরুষ নন—তিনি বর্তমান ভারতের নীরব পথপ্রদর্শক। আত্মবিশ্বাসী মানুষ গঠন, শক্তিশালী যুবসমাজ সৃষ্টি, মানবিক ও সহিষ্ণু সমাজ নির্মাণ—এই ছিল তাঁর স্বপ্নের ভারত।
তাঁর ১৬৮তম জন্মদিবসে তাঁকে স্মরণ করা মানে কেবল ফুল বা বক্তৃতার মাধ্যমে শ্রদ্ধা জানানো নয়; বরং তাঁর আদর্শকে নিজের জীবন, সমাজ ও রাষ্ট্রচিন্তায় বাস্তবায়িত করার অঙ্গীকার নেওয়া। আজও তিনি আমাদের ডাকছেন—
ওঠো, জাগো, আরমানুষেরজন্যমানুষহয়েওঠো।
Published on: জানু ১২, ২০২৬ at ১৬:৩১



