
“বলিউডে অনেক নায়ক এসেছেন, অনেক গায়কও এসেছেন। কিন্তু এমন কিছু জুটি আছে, যাদের একজনকে বাদ দিয়ে অন্যজনকে কল্পনা করাই কঠিন। যেমন রাজ কাপুর–মুকেশ, দেব আনন্দ–মহম্মদ রফি। আর সেই তালিকার শীর্ষে যে জুটির নাম আজও উচ্চারিত হয় শ্রদ্ধার সঙ্গে, তারা হলেন—রাজেশ খান্না ও কিশোর কুমার।“
Published on: আগ ১১, ২০২৬ at ১৬:৫৮
✍️কলমে: অনিরুদ্ধ পাল
সংবাদ প্রভাকর টাইমস
১৯৬৯ সালের ‘আরাধনা‘ শুধু একটি চলচ্চিত্র ছিল না।
এটি ছিল ভারতীয় সিনেমায় এক নতুন যুগের সূচনা।
একদিকে পর্দায় এক তরুণ অভিনেতা—রাজেশ খান্না। অন্যদিকে পর্দার আড়ালে এক কণ্ঠ—কিশোর কুমার।
দু’জনের কেউই তখনও জানতেন না, তাঁদের মিলন ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক কিংবদন্তির জন্ম দিতে চলেছে। যে সম্পর্ক রক্তের নয়, বন্ধুত্বেরও নয়—তবু আজও কোটি কোটি মানুষের স্মৃতিতে তারা একে অপরের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
একজনের মুখ, অন্যজনের প্রাণ
‘মেরে সপনো কি রানি’…
টয় ট্রেনের জানালায় হেলান দিয়ে রাজেশ খান্নার সেই বিখ্যাত হাসি।
পাহাড়ি পথ ধরে এগিয়ে চলেছে ট্রেন।
আর পেছনে বাজছে কিশোর কুমারের কণ্ঠ।
আজ এত বছর পরেও সেই দৃশ্য দেখলে মনে হয়, যেন কণ্ঠ আর মুখ—দুটো আলাদা নয়।
কিশোরের কণ্ঠ যেন রাজেশ খান্নার মুখেই জন্মেছিল।
বলিউড পেল নতুন ‘রোম্যান্টিক সাউন্ড’
ষাটের দশকের শেষভাগে ভারতীয় চলচ্চিত্রে প্রেমের গান ছিলই।
কিন্তু ‘আরাধনা’-র পর প্রেমের ভাষাই বদলে গেল।
কিশোর কুমারের কণ্ঠে প্রেম হয়ে উঠল আরও ব্যক্তিগত, আরও সহজ, আরও আন্তরিক।
তিনি গাইতেন না। তিনি যেন প্রেমে পড়তেন। আর দর্শকও সেই প্রেমে শামিল হয়ে যেত।
একের পর এক ইতিহাস
‘আরাধনা’-র পর আর থামেনি এই জুটি।
বরং শুরু হলো একের পর এক কালজয়ী গানের স্বর্ণযুগ।
‘সফর‘ (১৯৭০)
“জিন্দেগি কা সফর, হ্যায় ইয়ে ক্যায়সা সফর…”
জীবনের দর্শনকে এত সহজ ভাষায় এত গভীরভাবে খুব কম গানই প্রকাশ করতে পেরেছে। আজও এই গান শুনলে মনে হয়, জীবন যেন সত্যিই এক দীর্ঘ যাত্রা।
‘কাটি পতঙ্গ‘ (১৯৭১)
এই ছবিতে যেন কিশোর নিজের কণ্ঠের নতুন উচ্চতা স্পর্শ করলেন।
“ইয়ে শাম মস্তানি…”
“পেয়ার দিওয়ানা হোতা হ্যায়…”
“ইয়ে যা মোহব্বত হ্যায়…”
প্রতিটি গান আজও ভারতীয় চলচ্চিত্র সঙ্গীতের অমূল্য সম্পদ।
‘আনন্দ‘ (১৯৭১)
যদিও ছবির মূল নায়ক ছিলেন রাজেশ খান্না, কিশোরের গাওয়া
“ম্যায়নে তেরে লিয়ে হি সাত রং কে সপ্নে চুনে…”
গানটি আজও ভালোবাসার অন্যতম সেরা প্রকাশ হিসেবে বিবেচিত।
‘অমর প্রেম‘ (১৯৭২)
সম্ভবত এই ছবিতেই রাজেশ–কিশোর জুটি আবেগের সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছায়।
“কুছ তো লোগ কহেঙ্গে…”
“চিঙ্গারি কোই ভড়কে…”
এই দুটি গান কেবল জনপ্রিয় নয়। এগুলি ভারতীয় চলচ্চিত্র সঙ্গীতের দর্শন।
প্রেম, সমাজ, অপূর্ণতা, ব্যথা—সবকিছু যেন একসঙ্গে মিশে গেছে এই গানগুলিতে। আজও বহু সঙ্গীত সমালোচক ‘চিঙ্গারি কোই ভড়কে’-কে কিশোর কুমারের সেরা গায়কির অন্যতম উদাহরণ বলে মনে করেন।
‘মেরে জীবন সাথী‘ (১৯৭২)
“ও মেরে দিল কে চেইন…”
এই একটি গানই প্রমাণ করে, প্রেমের গান গাওয়ার ক্ষেত্রে কিশোর কুমারের মতো স্বাভাবিক শিল্পী খুব কমই জন্মেছেন। গানটি মুক্তির অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় পর আজও অসংখ্য শিল্পী মঞ্চে গেয়ে থাকেন।
‘দাগ‘ (১৯৭৩)
“মেরে দিল মে আজ কেয়া হ্যায়…”
এ যেন প্রেমের স্বীকারোক্তির এক অনন্ত সুর।
‘আপ কি কসম‘ (১৯৭৪)
এবার কিশোর যেন নিজের সীমাকেও ছাড়িয়ে গেলেন।
“জিন্দেগি কে সফর মে গুজর যাতে হ্যায় যা মকাম…”
“করবাটে বদলতে রহে…”
“জয় জয় শিব শঙ্কর…”
একই ছবিতে দর্শন, প্রেম আর উচ্ছ্বাস—তিনটি সম্পূর্ণ ভিন্ন আবেগকে তিনি যেভাবে কণ্ঠে ফুটিয়ে তুলেছেন, তা ভারতীয় সঙ্গীত ইতিহাসে বিরল।
একটি অদ্ভুত সত্য
অনেকেই বলেন—
রাজেশ খান্না না থাকলে কিশোর কুমার এত বড় হতেন না।
আবার অন্যরা বলেন—
কিশোর কুমার না থাকলে রাজেশ খান্নার জনপ্রিয়তা এত দূর পৌঁছত না।
সত্যি বলতে, দুটো কথার মধ্যেই কিছুটা সত্য লুকিয়ে আছে। দু’জন দু’জনকে পূর্ণ করেছিলেন।
পর্দায় রাজেশের চোখের ভাষা আর পর্দার আড়ালে কিশোরের কণ্ঠ—এই মিলনটাই ছিল জাদু।
শুধু গান নয়, চরিত্রেরও কণ্ঠ
কিশোর কুমারের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল—
তিনি কোনও অভিনেতার জন্য গান গাইতেন না। তিনি সেই চরিত্রটির জন্য গান গাইতেন। রাজেশ খান্না যদি প্রেমে পড়েন, কিশোরের কণ্ঠেও প্রেম ফুটে উঠত। চরিত্রটি যদি ভেঙে পড়ে, কিশোরের কণ্ঠেও সেই ভাঙনের শব্দ শোনা যেত।
এই কারণেই তাঁদের জুটি এত বাস্তব মনে হতো।
পঞ্চমদা—এই জুটির তৃতীয় স্তম্ভ
এই সময় আর একজন মানুষ নেপথ্যে ইতিহাস লিখছিলেন।
তিনি রাহুল দেব বর্মণ। কিশোরের কণ্ঠ আর রাজেশের ব্যক্তিত্ব—দু’টিকে এক সুতোয় বেঁধে দিয়েছিলেন তাঁর সুর।
পঞ্চমদা জানতেন—
কিশোরের কণ্ঠ কোথায় ফিসফিস করবে…
কোথায় হাসবে…
কোথায় ভেঙে যাবে…
আর কোথায় বিস্ফোরিত হবে।
এই কারণেই আর. ডি. বর্মণ–কিশোর–রাজেশ ত্রয়ী ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে প্রায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী।
যখন একটি কণ্ঠ হয়ে ওঠে এক নায়কের পরিচয়
সত্তরের দশকের মাঝামাঝি সময়ে এমন এক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, যখন দর্শক সিনেমা হলে বসে রাজেশ খান্নাকে দেখলেই প্রায় নিশ্চিত থাকতেন—
এখনই শোনা যাবে কিশোর কুমারের কণ্ঠ।
এটি কোনও পরিকল্পনা ছিল না। এটি ছিল দর্শকের দাবি। কারণ তাঁরা বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলেন—
রাজেশের প্রেম, রাজেশের হাসি, রাজেশের ব্যথা—সবকিছুর ভাষা একটাই।
সেই ভাষার নাম—
কিশোর কুমার।
যে জুটিকে সময়ও আলাদা করতে পারেনি
সময়ের নিয়মে নতুন নায়ক এসেছে। নতুন গায়ক এসেছে। সঙ্গীতের ধারা বদলেছে।
কিন্তু আজও যখন ‘মেরে সপনো কি রানি’, ‘ও মেরে দিল কে চেইন’, ‘কুছ তো লোগ কহেঙ্গে’, ‘চিঙ্গারি কোই ভড়কে’ কিংবা ‘জিন্দেগি কে সফর মে’ বাজে, তখন পর্দায় রাজেশ খান্নার মুখ আর কিশোর কুমারের কণ্ঠকে আলাদা করে ভাবা যায় না।
সেই কারণেই তাঁরা কেবল একজন অভিনেতা আর একজন গায়ক নন। তাঁরা ভারতীয় জনপ্রিয় সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অধ্যায়।
হয়তো এ কারণেই আজও চলচ্চিত্র ইতিহাসের পাতায় লেখা হয়—
রাজেশ খান্না ছিলেন ভারতের প্রথম সুপারস্টার।
আর সেই সুপারস্টারের হৃদস্পন্দনের নাম ছিল—কিশোর কুমার।
পরবর্তী খণ্ড–৫
“পঞ্চমদা আর কিশোর: দুই পাগলের সুরে জন্ম নেওয়া এক অনন্ত জাদু“
এই পর্বে উঠে আসবে—
- রাহুল দেব বর্মণ ও কিশোর কুমারের বন্ধুত্বের অজানা গল্প,
- কেন পঞ্চমদা অন্য সবার আগে কিশোরকে ভাবতেন,
- শোলে, গোলমাল, আঁধি, হীরা পান্না, কালিয়া, রকি, দ্য বার্নিং ট্রেনসহ একাধিক ছবির গানের নেপথ্যের ইতিহাস,
- এবং কেন সঙ্গীতবিশারদদের মতে আর. ডি. বর্মণ–কিশোর কুমার জুটি ভারতীয় চলচ্চিত্র সঙ্গীতের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সুরকার–গায়ক যুগল।
Published on: আগ ১১, ২০২৬ at ১৬:৫৮




