প্রস্তাবনা: একটি কণ্ঠের জন্ম, যা সময়কে হার মানিয়েছে

Main দেশ বিনোদন ভ্রমণ রাজ্য
শেয়ার করুন

Published on: আগ ৫, ২০২৬ at ২০:৩০

কলমে: অনিরুদ্ধ পাল
সংবাদ প্রভাকর টাইমস

এসপিটি প্রতিবেদন : কিছু মানুষের জন্মদিন ক্যালেন্ডারের একটি তারিখ মাত্র। আবার কিছু মানুষের জন্মদিন মানেই একটি যুগকে স্মরণ করা। ৪ আগস্ট ঠিক তেমনই একটি দিন। কারণ, এই দিনেই জন্মেছিলেন এমন এক শিল্পী, যাঁর কণ্ঠ শুধু গান গায়নি—ভালোবাসতে শিখিয়েছে, হাসতে শিখিয়েছে, কাঁদতে শিখিয়েছে, আবার জীবনের সবচেয়ে নিঃসঙ্গ মুহূর্তেও মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে।

তিনি কিশোর কুমার।

প্রায় চার দশক ধরে ভারতীয় উপমহাদেশের কোটি কোটি মানুষের সুখ-দুঃখ, প্রেম-বিরহ, আশা-হতাশা আর জীবনের অসংখ্য অনুভূতির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে একটি কণ্ঠ। সেই কণ্ঠ কখনও পাহাড়ি ঝরনার মতো ছুটে চলেছে, কখনও গভীর রাতের নির্জনতায় মনের অন্ধকারে আলো জ্বেলেছে, কখনও আবার নিছক দুষ্টুমি করে ঠোঁটে ফুটিয়েছে এক চিলতে হাসি।

অদ্ভুত বিষয় হলো, যাঁকে আজ ভারতীয় চলচ্চিত্রের সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নেপথ্য কণ্ঠশিল্পী বলা হয়, তিনি কখনও কোনও গুরুজনের কাছে বসে দীর্ঘদিন ধরে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের নিয়মতান্ত্রিক শিক্ষা নেননি। তাঁর সবচেয়ে বড় শিক্ষক ছিল জীবন, আর সবচেয়ে বড় বিদ্যালয় ছিল নিজের কান। তিনি শুনেছেন, অনুভব করেছেন, তারপর নিজের মতো করে গড়ে তুলেছেন এমন এক কণ্ঠ, যার কোনও দ্বিতীয় সংস্করণ আজও তৈরি হয়নি।

অনেকেই বলেন, কিশোর কুমার গান গাইতেন। কিন্তু এই কথাটি পুরো সত্য নয়।

তিনি আসলে গল্প বলতেন।

তিন মিনিটের একটি গানের মধ্যে তিনি একটি সম্পূর্ণ চলচ্চিত্র, একটি প্রেম, একটি বিচ্ছেদ, একটি স্বপ্ন কিংবা একটি মানুষের সমগ্র জীবনকে তুলে ধরতে পারতেন। তাই তাঁর গান শুধু শোনা যায় না, অনুভব করা যায়। তাঁর কণ্ঠে ‘মেরে সপনো কি রানি’ শুনলে ট্রেনের জানালার বাইরে ছুটে চলা পাহাড় যেন চোখের সামনে ভেসে ওঠে। ‘চিঙ্গারি কোই ভড়কে’ শুনলে মনে হয়, মানুষের বুকের গভীরে লুকিয়ে থাকা সমস্ত অপূর্ণতারই যেন সুর হয়ে উঠেছে সেই গান। আবার ‘জিন্দেগি এক সফর হ্যায় সুহানা’ যেন জীবনকে নতুন করে উদ্‌যাপন করার আহ্বান।

সময়ের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো—সে কাউকে ছাড় দেয় না। নায়ক বদলে যায়, সুরকার বদলে যায়, গানের ধারা বদলে যায়, প্রযুক্তি বদলে যায়, শ্রোতার রুচিও বদলে যায়। কিন্তু খুব কম শিল্পীই আছেন, যাঁরা সময়ের পরিবর্তনের মধ্যেও নিজেদের প্রাসঙ্গিকতা হারান না।

কিশোর কুমার সেই বিরল শিল্পীদের একজন।

পঞ্চাশের দশকে তিনি যেমন জনপ্রিয় ছিলেন, সত্তরের দশকে তিনি হয়ে ওঠেন এক প্রজন্মের আবেগ। আশির দশকে নতুন নায়কদের কণ্ঠস্বর। আর আজ, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের যুগেও তাঁর গান নতুন প্রজন্মের প্লেলিস্টে সমান স্বাচ্ছন্দ্যে জায়গা করে নিচ্ছে। একটি কণ্ঠ, যা গ্রামোফোন থেকে ক্যাসেট, ক্যাসেট থেকে সিডি, সিডি থেকে এমপিথ্রি, আর আজ স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম পর্যন্ত একইরকম আবেদন নিয়ে বেঁচে আছে—এমন উদাহরণ খুব বেশি নেই।

তাঁর জীবনও ছিল তাঁর গানের মতোই বিস্ময়ে ভরা।

তিনি ছিলেন অভিনেতা, অথচ অভিনয় করতে ভালোবাসতেন না। তিনি ছিলেন গায়ক, কিন্তু গানের কোনও প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি ছিল না। তিনি ছিলেন সুরকার, গীতিকার, পরিচালক, প্রযোজক—তবু নিজেকে কখনও কোনও এক পরিচয়ের মধ্যে আটকে রাখেননি। ব্যক্তিগত জীবনে ছিলেন রহস্যময়, কখনও শিশুসুলভ, কখনও নিঃসঙ্গ, কখনও অসম্ভব রসিক, আবার কখনও নিজের একান্ত জগতে ডুবে থাকা এক শিল্পী।

এই কারণেই কিশোর কুমারকে শুধু গান দিয়ে বিচার করা যায় না। তাঁকে বুঝতে হলে জানতে হয় তাঁর সংগ্রামের গল্প, তাঁর ব্যর্থতার ইতিহাস, তাঁর বন্ধুত্ব, তাঁর ভালোবাসা, তাঁর অদ্ভুত স্বভাব, তাঁর হাসির আড়ালে লুকিয়ে থাকা নিঃসঙ্গতা এবং সেই শিল্পীসত্তাকে, যা তাঁকে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে এক কিংবদন্তিতে পরিণত করেছে।

আজ তাঁর ৯৭তম জন্মবার্ষিকীতে এই বিশেষ ধারাবাহিক ফিচারে আমরা ফিরে দেখব সেই মানুষটিকে, যিনি শুধু ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাস বদলাননি, বদলে দিয়েছিলেন মানুষের গান শোনার অভ্যাসও। যে শিল্পী প্রমাণ করেছিলেন—একটি কণ্ঠ কখনও কখনও একটি যুগেরও বড় হয়ে উঠতে পারে।

এটি কোনও প্রচলিত জীবনী নয়। এটি এক মানুষের গল্প—যিনি আভাষ কুমার গাঙ্গুলী হিসেবে জন্মেছিলেন, কিন্তু সময় তাঁকে চিরদিনের জন্য মনে রেখেছে এক নামেই—

কিশোর কুমার।

পরবর্তী পর্ব: আভাষ থেকে কিশোর: এক অদ্ভুত মানুষের জন্ম, যার হাসির আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক অদম্য স্বপ্ন” — যেখানে তাঁর শৈশব, পরিবার, খণ্ডওয়ার দিনগুলি, অশোক কুমারের প্রভাব এবং সঙ্গীতের প্রতি প্রথম আকর্ষণের গল্প উঠে আসবে।

Published on: আগ ৫, ২০২৬ at ২০:৩০


শেয়ার করুন