
Published on: জানু ১৪, ২০২৬ at ২৩:৩১
Reporter: Aniruddha Pal

এসপিটি নিউজ, কলকাতা, ১৪ জানুয়ারি : কলকাতায় সম্প্রতি নিপা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন দু’জন। যদিও এখনও পর্যন্ত সংক্রমণের নির্দিষ্ট উৎস শনাক্ত করা যায়নি, তবে বিশেষজ্ঞদের মতে এই ভাইরাসের প্রধান রিজার্ভার হিসেবে বাদুড়ের ভূমিকা সর্বজনবিদিত। পরিস্থিতি নিয়ে আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন গবেষক ও চিকিৎসকরা।
পশ্চিমবঙ্গ প্রাণী ও মৎস্যবিজ্ঞান বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের প্রধান ড. ইন্দ্রনীল সামন্ত জানান, নিপা ভাইরাস একটি আরএনএ ভাইরাস, যা প্যারামিক্সোভিরিডি গোত্রের অন্তর্গত। ১৯৯৮ সালে মালয়েশিয়ার নিপা নামক অঞ্চলে প্রথম এই ভাইরাসের সংক্রমণ ধরা পড়ে। সে সময় শূকর পালকদের মধ্যে অজানা জ্বরে একাধিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। গবেষণায় দেখা যায়, শূকর থেকে মানুষের মধ্যে একটি নতুন ধরনের ভাইরাস ছড়িয়েছে। পরবর্তীতে সেটিকেই ‘নিপা ভাইরাস’ নামে চিহ্নিত করা হয়।
ড. সামন্তের কথায়, “বাদুড় এই ভাইরাসের অন্যতম প্রধান রিজার্ভার। আশ্চর্যের বিষয় হল, বাদুড়ের শরীরে নিপা ভাইরাস থাকলেও তাদের মধ্যে কোনও রোগ-লক্ষণ প্রকাশ পায় না। কারণ বাদুড়ের ইমিউন সিস্টেম অত্যন্ত উন্নত ও ভিন্ন প্রকৃতির।” তবে সেই ভাইরাসই বাদুড়ের লালা, মূত্র বা বিষ্ঠার মাধ্যমে পরিবেশে ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং সেখান থেকে মানুষ বা অন্যান্য প্রাণীর দেহে সংক্রমণ ঘটাতে পারে।
ভারতবর্ষে নিপা ভাইরাসের ইতিহাস নতুন নয়। ২০০১ সালে শিলিগুড়িতে বড় আকারের আউটব্রেক হয়েছিল, যাতে বহু মানুষের মৃত্যু ঘটে। এরপর পশ্চিমবঙ্গ, বাংলাদেশ ও কেরালায় একাধিকবার নিপা সংক্রমণের ঘটনা সামনে এসেছে। বিশেষ করে কেরালায় প্রায় প্রতি বছরই নিপা আউটব্রেক দেখা যাচ্ছে।
বাংলাদেশে নিপা সংক্রমণের একটি বড় কারণ ছিল কাঁচা খেজুর রস। খেজুর গাছে ঝোলানো হাঁড়িতে বাদুড় মুখ দেওয়ার ফলে তাদের লালা থেকে রসে ভাইরাস মিশে যায়। সেই কাঁচা রস পান করার মাধ্যমেই মানুষের মধ্যে সংক্রমণ ছড়ায়। এই কারণেই এখন খেজুর রস হালকা গরম করে খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।
শুধু বাদুড় নয়, শূকরও নিপা ভাইরাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাহক। এছাড়া গরুর শরীরেও এই ভাইরাস থাকতে পারে, যদিও গরুর মধ্যে সাধারণত কোনও লক্ষণ দেখা যায় না। গরুর সংস্পর্শে আসা মানুষ—বিশেষ করে গোয়ালারা—যদি সাবান দিয়ে হাত না ধোয়, তবে সংক্রমণের ঝুঁকি থেকে যায়।
নিপা ভাইরাসে সাধারণত জ্বর, মাথাব্যথা, শ্বাসকষ্টের পাশাপাশি এনসেফেলাইটিসের লক্ষণ দেখা যায়। অনেক ক্ষেত্রে খিঁচুনি ও স্নায়বিক জটিলতা তৈরি হয়। শুরুতে উপসর্গ সাধারণ ভাইরাল জ্বরের মতো হওয়ায় দ্রুত শনাক্ত করা কঠিন হয়। নির্দিষ্ট পরীক্ষার মাধ্যমেই নিশ্চিতভাবে নিপা শনাক্ত করা সম্ভব।
মানুষ থেকে মানুষের মধ্যেও নিপা ছড়াতে পারে—লালা, ঘাম, মূত্র বা শরীরের নিঃসৃত তরলের মাধ্যমে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অপরিচ্ছন্ন পাবলিক টয়লেট সংক্রমণের একটি বড় ঝুঁকিপূর্ণ জায়গা হতে পারে।
তবে ড. সামন্ত স্পষ্ট করে জানাচ্ছেন, “নিপা ভাইরাস কোভিডের মতো অতিমাত্রায় সংক্রামক নয়। সাধারণত এটি একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে এবং ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে না।”
বর্তমানে নিপার কোনও নির্দিষ্ট চিকিৎসা বা ভ্যাকসিন নেই। আক্রান্ত হলে হাসপাতালে ভর্তি করে সহায়ক চিকিৎসাই একমাত্র উপায়। তাই প্রতিরোধই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বাইরে খোলা খাবার এড়িয়ে চলা, মাস্ক ব্যবহার, ফল ও সবজি ভালোভাবে ধুয়ে খাওয়া এবং পোষ্য বা গৃহপালিত প্রাণী স্পর্শ করার আগে ও পরে সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার উপর জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
শহরের পার্ক বা পুরনো গাছে বাদুড়ের বসবাস লক্ষ্য করা যায়। সকালের হাঁটার সময় গাছের নিচে বাদুড়ের বিষ্ঠা পড়ার সম্ভাবনা থাকে, যা থেকে নানা ধরনের সংক্রমণ ছড়াতে পারে। তাই অতিরিক্ত সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
কলকাতায় সাম্প্রতিক দুই নিপা আক্রান্তের ঘটনায় স্বাস্থ্য দপ্তর ও গবেষকরা পরিস্থিতির উপর কড়া নজর রাখছেন। উৎস এখনও অজানা হলেও, বিজ্ঞানসম্মত সচেতনতা ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চললেই ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব বলে মত বিশেষজ্ঞদের।
নিপা ভাইরাস এক নজরে
- ভাইরাসের নাম: নিপা ভাইরাস (Nipah Virus)
- গোত্র: Paramyxoviridae
- ধরণ: RNA ভাইরাস
- প্রথম শনাক্ত: ১৯৯৮, নিপা (মালয়েশিয়া)
- প্রধান রিজার্ভার: বাদুড় (Fruit Bat)
- মধ্যবর্তী বাহক: শূকর (প্রধান), গরু (সম্ভাব্য)
- মানুষে সংক্রমণ:
- বাদুড়ের লালা/বিষ্ঠা
- কাঁচা খেজুর রস
- সংক্রমিত প্রাণীর সংস্পর্শ
- মানুষ থেকে মানুষে (লালা, ঘাম, ইউরিন)
- মৃত্যুহার: তুলনামূলকভাবে বেশি (40–70% পর্যন্ত রিপোর্ট আছে)
- টিকা/নির্দিষ্ট চিকিৎসা: নেই (২০২5 পর্যন্ত)
নিপা নিয়ে সাধারণ প্রশ্ন
নিপা কি কোভিডের মতো ছড়ায়?
না। নিপা সাধারণত সীমিত এলাকায় ছড়ায়। কোভিডের মতো দ্রুত বা বিশ্বব্যাপী সংক্রমণ হয় না।
বাদুড় দেখলেই কি ভয় পাওয়া উচিত?
না। সবাই বাদুড়ের সংস্পর্শে আসে না। তবে পার্ক বা পুরনো গাছের নিচে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়ানো এড়িয়ে চলা ভালো।
কাঁচা ফল বা সবজি খেলে কি নিপা হতে পারে?
সরাসরি নয়। তবে বাজার থেকে আনা ফল ও সবজি ভালোভাবে ধুয়ে না খেলে অন্য সংক্রমণ হতে পারে।
পোষ্য প্রাণী থেকে নিপা ছড়াতে পারে?
সাধারণভাবে কুকুর–বিড়াল থেকে নিপা ছড়ানোর প্রমাণ নেই। তবে গরু বা শূকরের ক্ষেত্রে সতর্কতা জরুরি।
নিপার চিকিৎসা কী?
নির্দিষ্ট কোনও অ্যান্টিভাইরাল নেই। হাসপাতালে ভর্তি করে সহায়ক চিকিৎসাই একমাত্র উপায়।
কীভাবে নিজেকে সুরক্ষিত রাখবেন?
- কাঁচা খেজুর রস না খাওয়া
- বাইরে খোলা খাবার এড়িয়ে চলা
- ফল–সবজি ভালোভাবে ধুয়ে খাওয়া
- প্রাণী স্পর্শের আগে ও পরে সাবান দিয়ে হাত ধোয়া
- অসুস্থ ব্যক্তির সংস্পর্শে এলে মাস্ক ব্যবহার
Published on: জানু ১৪, ২০২৬ at ২৩:৩১



