

Published on: ডিসে ২১, ২০২৫ at ১৮:১৫
এসপিটি নিউজ, ঢাকা ও কলকাতা, ২১ ডিসেম্বর : প্রতিবেশী দুই দেশের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বের দেয়ালে আজ ফাটল স্পষ্ট। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক টালমাটাল পরিস্থিতি, উগ্রপন্থী গোষ্ঠীর আস্ফালন এবং অন্তর্বর্তী সরকারের নিরাপত্তা দিতে চরম ব্যর্থতা—সব মিলিয়ে এক অভূতপূর্ব সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক। যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের ওপর। নিরাপত্তার অভাবে একের পর এক বন্ধ হচ্ছে ভারতীয় ভিসা কেন্দ্র (IVAC), আর অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে হাজার হাজার ভিসা প্রত্যাশীর।
ভিসা অফিসের বর্তমান চিত্র ও অবস্থান
বাংলাদেশে ভারতের মোট ১৫টি ভিসা আবেদন কেন্দ্র (IVAC) রয়েছে। এগুলি হলো: ঢাকা (যমুনা ফিউচার পার্ক—বিশ্বের বৃহত্তম ভিসা সেন্টার), চট্টগ্রাম, রাজশাহী, সিলেট, খুলনা, যশোর, সাতক্ষীরা, ময়মনসিংহ, বরিশাল, রংপুর, ঠাকুরগাঁও, বগুড়া, নোয়াখালী, কুমিল্লা এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া।
তবে বর্তমানে পরিস্থিতির ভয়াবহতায় এই নেটওয়ার্ক কার্যত স্থবির। আজ ২১ ডিসেম্বর ২০২৫-এর তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামের ভারতীয় সহকারী হাইকমিশনে হামলার আশঙ্কায় সেখানকার ভিসা কার্যক্রম অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এর আগে রাজশাহী ও খুলনার অফিসগুলোও নিরাপত্তার কারণে সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়েছিল। যদিও ঢাকা সেন্টারটি সীমিত পরিসরে চালু করার চেষ্টা চলছে, কিন্তু উগ্রপন্থীদের স্লোগান আর হুমকির মুখে কর্মীরা আতঙ্কিত।
ভিসা পরিসংখ্যান: ২০২৪ বনাম ২০২৫
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকেই চিত্রটা বদলে যেতে শুরু করে।
- ২০২৪ সালের পরিসংখ্যান: বছরের প্রথমার্ধে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৮,০০০ থেকে ৯,০০০ ভিসা ইস্যু করা হতো। ২০২৩ সালে মোট ১৬ লাখেরও বেশি ভিসা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু আগস্টের পর সেই সংখ্যা নাটকীয়ভাবে কমে যায়।
- ২০২৫ সালের বর্তমান অবস্থা: কূটনৈতিক সূত্র অনুযায়ী, বর্তমানে প্রতিদিন ভিসার সংখ্যা নেমে এসেছে মাত্র ১,০০০ থেকে ১,৫০০-এর ঘরে। যার অধিকাংশই শুধুমাত্র জরুরি মেডিকেল ও স্টুডেন্ট ভিসা। ট্যুরিস্ট ভিসা প্রায় বন্ধ বললেই চলে।
অরাজকতা ও উগ্রবাদের চড়া মাশুল
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অস্থিতিশীলতার জন্য ভারতের সংবাদমাধ্যম ও বিশ্লেষকরা সরাসরি দায়ী করছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রশাসনিক ব্যর্থতাকে। শেখ হাসিনা পরবর্তী বাংলাদেশে ইসলামপন্থী উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলোর প্রকাশ্য আস্ফালন এবং ভারতের বিরুদ্ধে লাগাতার উস্কানিমূলক স্লোগান দুই দেশের মধ্যকার আস্থার জায়গাটি ধ্বংস করে দিচ্ছে।
সাম্প্রতিক ‘ইনকিলাব মঞ্চ’সহ বিভিন্ন গোষ্ঠীর ভারতীয় হাইকমিশন ঘেরাও অভিযান এবং ভারত-বিরোধী অপপ্রচার কূটনৈতিক শিষ্টাচারের সমস্ত সীমা লঙ্ঘন করেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি সার্বভৌম দেশের কূটনৈতিক মিশনকে নিরাপত্তা দিতে না পারা অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য বড় ধরনের ব্যর্থতা।
অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধের সম্ভাবনা কতটা?
পরিস্থিতি যেদিকে এগোচ্ছে, তাতে অনির্দিষ্টকালের জন্য সব ভিসা অফিস বন্ধ হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। ভারত সরকারের পক্ষ থেকে পরিষ্কার জানানো হয়েছে, কর্মীদের জীবনের নিরাপত্তা যেখানে বিঘ্নিত, সেখানে কার্যক্রম চালানো অসম্ভব। ভিয়েনা কনভেনশন অনুযায়ী বিদেশি মিশনের নিরাপত্তা দেওয়া আয়োজক দেশের আইনি বাধ্যবাধকতা, যা পালনে বর্তমান সরকার হিমশিম খাচ্ছে।
তৈরি হয়েছে মানবিক বিপর্যয়
ভিসা না পাওয়ায় সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়েছেন রোগীরা। বাংলাদেশের বিশাল সংখ্যক মানুষ উন্নত চিকিৎসার জন্য কলকাতা, চেন্নাই বা দিল্লির ওপর নির্ভরশীল। ভিসা বন্ধ থাকায় ক্যানসার বা হৃদরোগে আক্রান্ত অনেক রোগী সময়মতো চিকিৎসা পাচ্ছেন না। এ ছাড়া কয়েক হাজার শিক্ষার্থী যারা ভারতের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছেন, তাদের শিক্ষাজীবনও আজ অনিশ্চয়তার মুখে।
ভারতের সঙ্গে শত্রুতা করে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের যে কোনো লাভ হবে না, তা সাধারণ মানুষ বুঝতে শুরু করলেও উগ্রপন্থীদের দাপটে তারা আজ বিপর্যস্ত। অন্তর্বর্তী সরকার যদি দ্রুত উগ্রবাদ দমন এবং ভারতীয় মিশনের নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারে, তবে অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হওয়ার পথে হাঁটতে পারে।
Published on: ডিসে ২১, ২০২৫ at ১৮:১৫



