
Published on: জানু ২৬, ২০২৬ at ১৮:১০
বাখারপুর থেকে অনিরুদ্ধ পালের রিপোর্ট

পূর্ব মেদিনীপুর, রামনগর, ২৬ জানুয়ারি: পূর্ব মেদিনীপুর জেলার রামনগরের বাখারপুর গ্রামে অবস্থিত অখণ্ড শ্রী ক্রিয়াযোগ সাধন মন্দির সেবাশ্রমে শুরু হয়েছে ২১তম বাৎসরিক মহোৎসব। সেবাশ্রমের ভক্ত, শিষ্য ও শুভানুধ্যায়ীদের সহযোগিতাকে পাথেয় করে দেবী জগজ্জননী জগদম্বা শ্রীশ্রী মা কনকেশ্বরী এবং বাবা কাল ভৈরব শ্রীশ্রী নাগেশ্বর মহাদেবের কৃপায়, সকল ভক্তের কল্যাণার্থে বহু জ্ঞানী-পণ্ডিত, সাধু-সন্ত ও সাধ্বী গণের উপস্থিতিতে ২৪শে জানুয়ারি ২০২৬, শনিবার, শুক্ল ষষ্ঠী পুণ্যলগ্নে এই মহোৎসবের শুভ সূচনা হয়। ২৯শে জানুয়ারি ২০২৬, বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ছয় দিন ধরে সেবাশ্রমের সুশোভিত প্রাঙ্গণে অখণ্ড মহাযজ্ঞ ও বিবিধ ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে এই মহাযজ্ঞ চলবে।
পূর্ব মেদিনীপুর জেলার রামনগরের প্রত্যন্ত বাখারপুর গ্রামে অবস্থিত অখণ্ড শ্রী ক্রিয়াযোগ সাধন মন্দির সেবাশ্রম আবারও হয়ে উঠেছে আধ্যাত্মিকতা, সংস্কৃতি ও মানবকল্যাণের এক অপূর্ব মিলনক্ষেত্র। এই আশ্রমের প্রতিষ্ঠাতা আচার্য দেবানন্দ শাস্ত্রী—২১ বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এক প্রথিতযশা ও বিদগ্ধ জ্যোতিষী, যিনি একাধারে জ্যোতিষাচার্য, তান্ত্রিকাচার্য, বাস্তু পরামর্শদাতা ও হস্তরেখাবিদ। তিনি ইন্টারন্যাশনাল অ্যাস্ট্রোলজি ফেডারেশন ইনক, ইউএসএ-র পেশাদার শিক্ষক সদস্য এবং দেশ-বিদেশের একাধিক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সম্মানে ভূষিত।
শোভাযাত্রা ও ঘটোত্তোলনে দিব্য অনুভূতি
২৪শে জানুয়ারি সকালে গুরুজির তত্ত্বাবধানে ভক্ত-শিষ্য ও সাধু-সন্তদের উপস্থিতিতে শোভাযাত্রা সহকারে অনুষ্ঠিত হয় ঘটোত্তোলন কর্মসূচি। অখণ্ড শ্রী ক্রিয়াযোগ সেবাশ্রম মন্দির প্রাঙ্গন থেকে শুরু হওয়া এই বিশাল শোভাযাত্রায় লালপাড় শাড়ি পরিহিতা কন্যাশিশুরা ও ধুতি পরা কিশোরীরা হাতে ঘট নিয়ে কয়েক কিলোমিটার পথ হেঁটে পৌঁছয় গ্রামের বড় পুকুরের কাছে। সেখানে গুরুজি মন্ত্রোচ্চারণের মাধ্যমে জল তুলে একে একে সকলের হাতে জলপূর্ণ ঘট প্রদান করেন। ঢোল, কাসর ও ঘণ্টাধ্বনির তালে তালে সেই শোভাযাত্রা ফিরে আসে আশ্রমে। শস্য-শ্যামলা প্রকৃতি ও মনোরম আবহে এই শোভাযাত্রা উপস্থিত সকলের মনে যেন এক দিব্য অনুভূতির ছোঁয়া এনে দেয়।
সংস্কৃতি ও সেবার সম্মেলন
এদিনের অনুষ্ঠান শেষে অনুষ্ঠিত হয় শিশুদের অঙ্কন প্রতিযোগিতা। দুপুরে ছিল প্রসাদ বিতরণ। সন্ধ্যায় আয়োজিত হয় মেয়েদের নৃত্য প্রতিযোগিতা, যেখানে ধর্মীয় সংগীত ও বাংলার চিরন্তন সংস্কৃতির সঙ্গে ভারতীয় পরম্পরার সুরে সুর মিলিয়ে পরিবেশিত নৃত্য দর্শকদের মুগ্ধ করে।
যজ্ঞ, পাঠ ও নাট্য পরিবেশনা
২৫শে জানুয়ারি ভোরে বাবা শ্রীশ্রী নাগেশ্বর মহাদেবের রুদ্রাভিষেকের মাধ্যমে মূল অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। এরপর শ্রীবিষ্ণুর সহস্রনাম পাঠ, শ্রীশ্রী সপ্তসতী চণ্ডীপাঠ ও অখণ্ড যজ্ঞের শুভারম্ভ হয়। বিকেলে হাওড়া জেলার ‘সৃজন’-এর পরিবেশনায় ‘উত্তরারা’, ‘শ্রীমতী হে’ ও ‘স্বীকারোক্তি’ নাটক বিশেষ সাড়া ফেলে।
২৬শে জানুয়ারি সকালেও রুদ্রাভিষেক, ষোড়শোপচারে রাধাগোবিন্দ পূজা, দ্বিতীয় দিনের চণ্ডীপাঠ ও যজ্ঞ অনুষ্ঠিত হয়। এদিন আশ্রমের পক্ষ থেকে গুণীজন সংবর্ধনাও প্রদান করা হয়।
মানবসেবায় ব্রতী আশ্রম
আগামী তিন দিন ধরে শ্রীশ্রী চণ্ডীপাঠ, গীতা পাঠ, জপ, যজ্ঞ, অষ্টপ্রহর হরিনাম সংকীর্তন, মহাকাল মহামৃত্যুঞ্জয় যজ্ঞ চলবে। পাশাপাশি সাধু ভান্ডারা, অন্নদান, কম্বল ও বস্ত্র দানের মতো মহতী সেবামূলক কর্মসূচিও আয়োজন করেছেন আচার্য দেবানন্দ শাস্ত্রী স্বয়ং।
সংসারের মাঝেই সাধনার পথ
যোগীরাজ শ্যামাচরণ লাহিড়ি মহাশয়ের দেখানো পথেই মানবসেবায় নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন আচার্য দেবানন্দ শাস্ত্রী। লাহিড়িবাবার বাণী— “ত্রিয়ায় সুখ, ক্রিয়া করে সুখ, ক্রিয়ার দর্শনে সুখ। এবং ক্রিয়ার পরাবস্থায় থাকে তার চেয়েও সুখ।”
আবার তিনি বলেছেন— “যিনি ক্রিয়া করেন তিনি সমস্ত দেবতার মধ্যে বিরাজ করতে সক্ষম হন।”
তবে অহঙ্কার থেকে দূরে থাকার শিক্ষাও তিনি দিয়েছেন— “ব্যাটা, জ্যাদা সোচো মত, জ্যাদা পড় মত— ম্যায় জো বাতা রহু ওহি করতে রহো। তব আগে বড় পাওগে।”
তীর্থের মিলনস্থল এক আশ্রম
এই আশ্রমের মন্দির স্থাপত্যে বাংলা ও ওড়িশার শিল্পকলা ও ভাস্কর্যের অপূর্ব সমন্বয় দেখা যায়। একই আশ্রমে শিব, কালী, রাধারানি, রাম-সীতা ও জগন্নাথদেবের অধিষ্ঠান ভারতের চিরন্তন সংস্কৃতি ও পারিবারিক সৌহার্দ্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। আশ্রমের নীচতলায় অধিষ্ঠিত বাবা শ্রীশ্রী নাগেশ্বর মহাদেব, যাঁকে গুরুজি মা নর্মদা থেকে লাভ করেছিলেন। তার উপরে মা কনকেশ্বরী কালী এবং সর্বোচ্চ স্তরে শ্রীহরি—জগন্নাথ, রাম-সীতা ও রাধামাধব রূপে বিরাজমান।
সব মিলিয়ে বাংলা-ওড়িশা সীমানা ঘেঁষা রামনগরের বাখারপুর গ্রামে অবস্থিত এই অখণ্ড শ্রী ক্রিয়াযোগ সাধন মন্দির সেবাশ্রম যেন আজ সত্যিই সমস্ত তীর্থের এক অপূর্ব মিলনস্থল, যেখানে আধ্যাত্মিক সাধনা ও মানবকল্যাণ একসূত্রে বাঁধা।


















Published on: জানু ২৬, ২০২৬ at ১৮:১০



