

Published on: ডিসে ১৯, ২০২৫ at ২১:২১
এসপিটি নিউজ ডেস্ক: বাংলাদেশের সংবাদপত্রের ইতিহাসে এক কলঙ্কিত ও ‘অন্ধকারতম’ রাত প্রত্যক্ষ করল বাংলাদেশবাসী। জুলাই অভ্যুত্থানের অন্যতম সংগঠক ও ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান বিন হাদীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট জনরোষের সুযোগ নিয়ে ঢাকার কারওয়ান বাজারে অবস্থিত দেশের শীর্ষস্থানীয় দুই সংবাদমাধ্যম—প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টার-এর কার্যালয়ে ভয়াবহ হামলা ও ভাঙচুর চালিয়েছে একদল দুষ্কৃতকারী। এই হামলার জেরে ১৯৯৮ সালে প্রতিষ্ঠার পর দীর্ঘ ২৭ বছরের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ছাপা সংস্করণ বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে ‘প্রথম আলো’।
২৭ বছরের ইতিহাসে প্রথম স্তব্ধ ‘প্রথম আলো’
গণমাধ্যমের ওপর এই নজিরবিহীন হামলাকে বাকস্বাধীনতার ওপর সরাসরি আঘাত হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন প্রথম আলোর নির্বাহী সম্পাদক সাজ্জাদ শরীফ। এএনআই-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি অত্যন্ত ভারাক্রান্ত কণ্ঠে বলেন, “গতকাল যখন সাংবাদিকরা পরবর্তী দিনের সংবাদপত্র ও অনলাইনের জন্য কাজ করছিলেন, তখনই দুষ্কৃতকারীরা আমাদের ওপর হামলা চালায়। প্রাণভয়ে আমাদের সংবাদকর্মীদের কার্যালয় ছেড়ে পালিয়ে যেতে হয়েছে। ১৯৯৮ সালে যাত্রা শুরুর পর গত ২৭ বছরে এই প্রথম আমরা আমাদের সংবাদপত্র প্রকাশ করতে পারিনি। এমনকি আমাদের অনলাইন সংস্করণও বন্ধ ছিল।” তিনি এই রাতটিকে বাংলাদেশের সাংবাদিকতার জন্য “অন্ধকারতম রাত” হিসেবে বর্ণনা করেন।
হাদির মৃত্যু ও সহিংসতার সূত্রপাত
উল্লেখ্য, গত ১২ ডিসেম্বর ঢাকার বিজয়নগরে রিকশাযোগে যাওয়ার সময় মোটরসাইকেলে আসা দুই দুর্বৃত্তের গুলিতে গুরুতর আহত হন জুলাই অভ্যুত্থানের সম্মুখসারির নেতা শরীফ ওসমান বিন হাদী। উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে সিঙ্গাপুরে নেওয়া হলেও বৃহস্পতিবার (১৮ ডিসেম্বর) তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে আবেগঘন ও উত্তপ্ত পরিস্থিতি তৈরি হয়। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠেয় জাতীয় নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসন থেকে হাদির লড়ার কথা ছিল। তার এই হত্যাকাণ্ডের ক্ষোভকে কাজে লাগিয়েই একদল দুষ্কৃতকারী সংবাদমাধ্যমগুলোর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সাংবাদিকদের পাশে অন্তর্বর্তী সরকার
সংবাদপত্রের ওপর এই বর্বরোচিত হামলার পর প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস গণমাধ্যমকর্মীদের প্রতি পূর্ণ সংহতি প্রকাশ করেছেন। এক জোরালো বিবৃতিতে তিনি বলেন, “দ্য ডেইলি স্টার, প্রথম আলো এবং নিউ এজ-এর সাংবাদিকদের প্রতি: আমরা আপনাদের পাশে আছি। আপনারা যে সন্ত্রাস ও সহিংসতার শিকার হয়েছেন তার জন্য আমরা গভীরভাবে দুঃখিত। সাংবাদিকদের ওপর হামলা মানে সত্যের ওপর হামলা। আমরা আপনাদের পূর্ণ ন্যায়বিচারের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি।”
রাজপথে বিক্ষোভ ও থমথমে পরিস্থিতি
হাদীর মৃত্যুর প্রতিবাদে এবং ঘাতকদের বিচারের দাবিতে আজ শুক্রবারও রাজধানীর শাহবাগ মোড়সহ বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে সাধারণ ছাত্র-জনতা। তবে ইনকিলাব মঞ্চের পক্ষ থেকে জনগণকে শান্ত থাকার এবং সহিংসতা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে। প্রশাসন জানিয়েছে, গণমাধ্যম ও জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
সাজ্জাদ শরীফসহ দেশের বিশিষ্ট নাগরিকরা এই হামলার সুষ্ঠু তদন্ত এবং অপরাধীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন। আন্তর্জাতিক মহলও বাংলাদেশের এই পরিস্থিতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করছে।
ঘটনার ক্রমপঞ্জি: হাদির মৃত্যু থেকে সংবাদপত্রের ‘অন্ধকারতম রাত’
| তারিখ ও সময় | ঘটনার বিবরণ |
| ১২ ডিসেম্বর, ২০২৫ | বিজয়নগর এলাকায় রিকশাযোগে যাওয়ার সময় মোটরসাইকেলে আসা দুই দুর্বৃত্তের গুলিতে গুরুতর আহত হন জুলাই অভ্যুত্থান নেতা ও ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান বিন হাদি। |
| ১২ – ১৫ ডিসেম্বর | ঢাকা মেডিকেল ও পরে এভারকেয়ার হাসপাতালের আইসিইউতে হাদির জীবনযুদ্ধ। দেশজুড়ে উৎকণ্ঠা। |
| ১৫ ডিসেম্বর, ২০২৫ | অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে হাদিকে সিঙ্গাপুরে স্থানান্তর। |
| ১৮ ডিসেম্বর (বৃহস্পতিবার) রাত | সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় হাদির মৃত্যু। খবর ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথেই ঢাকায় বিক্ষোভ শুরু। |
| ১৮ ডিসেম্বর, রাত ১১:০০ টা | কয়েকশ বিক্ষোভকারী ও দুষ্কৃতকারী কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার ভবনে হামলা চালায়। অগ্নিসংযোগ ও ব্যাপক ভাঙচুর। |
| ১৮ ডিসেম্বর, রাত ১:৪০ টা | ফায়ার সার্ভিসের প্রচেষ্টায় ডেইলি স্টার ভবনের আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। প্রাণভয়ে সাংবাদিকদের ভবন ত্যাগ। |
| ১৯ ডিসেম্বর (শুক্রবার) রাত ২:০০ টা | জাতির উদ্দেশে ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস হাদির মৃত্যুকে ‘শহীদ’ আখ্যা দেন এবং সংবাদপত্রে হামলার তীব্র নিন্দা জানান। |
| ১৯ ডিসেম্বর (শুক্রবার) ভোর | ২৭ বছরের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো প্রথম আলো-র ছাপা সংস্করণ বাজারে আসেনি। বন্ধ থাকে অনলাইন। |
| ১৯ ডিসেম্বর (শুক্রবার) দুপুর | ময়মনসিংহে সংখ্যালঘু হত্যার ঘটনায় প্রশাসনের শোক ও কঠোর হুঁশিয়ারি। শাহবাগে বিক্ষোভকারীদের অবস্থান। |
রিপোর্টের উপসংহার ও বিশ্লেষণ
এই টাইমলাইনটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, একটি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের ক্ষোভকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সংবাদমাধ্যমের ওপর ঘুরিয়ে দেওয়া হয়েছে। সাজ্জাদ শরীফের ভাষায় এটি শুধু একটি ভবনে হামলা নয়, বরং “বাকস্বাধীনতার ওপর সরাসরি আঘাত”। ২০২৬ সালের নির্বাচনের আগে এই ধরনের অস্থিতিশীলতা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তরের পথে এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সরকার এখন এই ‘অন্ধকারতম রাত’-এর হোতাদের খুঁজে বের করে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারে কি না, সেদিকেই তাকিয়ে আছে পুরো দেশ ও আন্তর্জাতিক মহল।
Published on: ডিসে ১৯, ২০২৫ at ২১:২১



