
খণ্ড–১০ (সমাপনী পর্ব)
“সময় মানুষকে বুড়ো করে। ইতিহাস অনেক নামকে ভুলে যায়। কিন্তু কিছু শিল্পী আছেন, যাঁদের বয়স বাড়ে না। তাঁদের গান ক্যালেন্ডারের পাতায় আটকে থাকে না। তাঁরা প্রতিটি নতুন প্রজন্মের সঙ্গে আবার নতুন করে জন্ম নেন। কিশোর কুমার সেই বিরল শিল্পীদের একজন। তাই তাঁর জন্মদিন কখনও শুধু একটি তারিখ নয়—এটি ভারতীয় সঙ্গীতের এক অনন্ত উৎসব।“
Published on: আগ ২৩, ২০২৬ at ১১:৩৬
এসপিটি প্রতিবেদন: প্রায় এক শতাব্দী পেরিয়ে গেছে তাঁর জন্মের পর। তবু আজও যদি কোনও গাড়ির জানালা খুলে রাস্তা দিয়ে যান, কোথাও না কোথাও ভেসে আসবে—
“মেরে সপনো কি রানি…” অথবা “ও মেরে দিল কে চেইন…”
হয়তো কোনও কলেজের অনুষ্ঠানে কেউ গাইছে “পল পল দিল কে পাশ…”
কোনও প্রবীণ মানুষ সন্ধ্যায় শুনছেন “জিন্দেগি কা সফর…”
আবার কোনও তরুণ প্রথম প্রেমে পড়ে গুনগুন করছে “কুছ তো লোগ কহেঙ্গে…”
এটাই তো অমরত্ব। যখন একজন শিল্পী একসঙ্গে দাদু, বাবা আর নাতির প্লেলিস্টে জায়গা করে নেন, তখন তিনি আর শুধু গায়ক থাকেন না। তিনি হয়ে ওঠেন সময়ের অংশ।
একজন নয়, বহু মানুষের সমষ্টি
কিশোর কুমারকে একটি পরিচয়ে বাঁধা অসম্ভব।
তিনি ছিলেন— একজন নেপথ্য কণ্ঠশিল্পী। একজন অভিনেতা। একজন সুরকার। একজন গীতিকার। একজন চলচ্চিত্র পরিচালক। একজন প্রযোজক। একজন চিত্রনাট্যকার। একজন অনবদ্য কমেডিয়ান। আবার একই সঙ্গে ছিলেন গভীর আবেগের শিল্পী।
যে মানুষ “এক চতুর নার”-এর মতো হাসির গান গাইতে পারেন, সেই মানুষই আবার “চিঙ্গারি কোই ভড়কে”-তে বুকভাঙা যন্ত্রণা ফুটিয়ে তুলতে পারেন। যিনি “পাগ ঘুঙরু বাঁধ”-এ উচ্ছ্বাস ছড়ান, তিনিই “আনে ওয়ালা পল”-এ জীবনের ক্ষণস্থায়ীত্বকে দর্শনে রূপ দেন। এমন বহুমাত্রিক শিল্পী ভারতীয় সঙ্গীতের ইতিহাসে সত্যিই বিরল।
যে কণ্ঠ কখনও পুরোনো হয় না
সঙ্গীতের ধারা বদলেছে। অ্যানালগ থেকে ডিজিটাল যুগে পৌঁছে গেছে পৃথিবী। আজ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গান তৈরি করছে। স্টুডিও বদলেছে। প্রযুক্তি বদলেছে। কিন্তু কিশোর কুমারের কণ্ঠে যে মানবিকতা ছিল, তা কোনও প্রযুক্তি তৈরি করতে পারে না। কারণ তিনি নিখুঁত গাইতে চাইতেন না। তিনি সত্যি গাইতে চাইতেন।
তাঁর গলায় শোনা যেত হাসি। কখনও দীর্ঘশ্বাস। কখনও দুষ্টুমি। কখনও নীরবতা। এই মানবিক অসম্পূর্ণতাই তাঁকে নিখুঁত করেছে।
আটটি ফিল্মফেয়ার—কিন্তু সংখ্যার বাইরেও তাঁর অর্জন
কিশোর কুমার আটবার ফিল্মফেয়ার শ্রেষ্ঠ পুরুষ নেপথ্য কণ্ঠশিল্পী পুরস্কার পেয়েছেন। দীর্ঘদিন ধরে এই বিভাগে সর্বাধিক পুরস্কার জয়ের রেকর্ড তাঁর দখলেই ছিল। কিন্তু তাঁর প্রকৃত সম্মান কোনও ট্রফিতে নেই।
তাঁর প্রকৃত পুরস্কার— প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মানুষের ভালোবাসা। যে শিল্পীকে মৃত্যুর চার দশক পরেও নতুন শ্রোতা আবিষ্কার করে, তাঁর সাফল্য পরিসংখ্যান দিয়ে মাপা যায় না।
তিনি শুধু গান গাইতেন না, চরিত্রে প্রাণ দিতেন
দেব আনন্দের হাসি…
রাজেশ খান্নার প্রেম…
অমিতাভ বচ্চনের ব্যক্তিত্ব…
ঋষি কাপুরের তারুণ্য…
উত্তম কুমারের আবেগ…
এসবের পেছনে কোথাও না কোথাও ছিল কিশোর কুমারের কণ্ঠ। তিনি নায়কদের জন্য গান গাইতেন না। তিনি তাঁদের চরিত্রকে প্রাণ দিতেন। তাই সিনেমা শেষ হয়ে গেলেও তাঁর গান থেকে যায়।
বাংলা ও হিন্দির সেতুবন্ধন
ভারতীয় সঙ্গীতে খুব কম শিল্পীই আছেন, যাঁরা একইসঙ্গে বাংলা ও হিন্দি—দুই ভাষাতেই সমান জনপ্রিয়। কিশোর কুমার সেই বিরল ব্যতিক্রম। একদিকে ‘রূপ তেরা মস্তানা’, ‘পল পল দিল কে পাশ’, ‘ইয়ে শাম মস্তানি’। অন্যদিকে ‘আমার পূজার ফুল’, ‘এই কথাটি মনে রেখো’, অসংখ্য বাংলা আধুনিক গান এবং রবীন্দ্রসঙ্গীত।
দুই ভাষার দুই ভুবনকে তিনি একই হৃদয়ে ধারণ করেছিলেন।
কেন নতুন প্রজন্মও তাঁকে ভালোবাসে?
একটি প্রশ্ন প্রায়ই ওঠে—
যে শিল্পী ১৯৮৭ সালে চলে গেছেন, তাঁকে ২০২০-এর দশকের তরুণরা কেন এখনও শুনছে?
উত্তরটি খুব সহজ। মানুষের অনুভূতি বদলায় না। প্রেম আজও একই রকম। অভিমান আজও একই রকম। বন্ধুত্ব, বিচ্ছেদ, স্বপ্ন, অপেক্ষা—সবই তো একই আছে। আর যতদিন মানুষের অনুভূতি থাকবে, ততদিন কিশোর কুমারের গানও থাকবে।
একটি অসমাপ্ত গল্প
কিশোর কুমার কখনও নিজেকে কিংবদন্তি ভাবেননি। তিনি শুধু গান গাইতে চেয়েছিলেন। মানুষকে আনন্দ দিতে চেয়েছিলেন। হাসাতে চেয়েছিলেন। হয়তো তিনি নিজেও জানতেন না, একদিন তাঁর কণ্ঠ কোটি মানুষের জীবনের অংশ হয়ে যাবে। এটাই প্রকৃত শিল্পীর বৈশিষ্ট্য। তিনি ইতিহাস লেখেন না। ইতিহাস তাঁকে লিখে রাখে।
কিশোর কুমার—একটি অনুভূতির নাম
আজ তাঁর জন্মদিনে আমরা শুধু একজন শিল্পীকে স্মরণ করছি না। আমরা স্মরণ করছি এমন একজন মানুষকে, যিনি আমাদের জীবনের প্রতিটি ঋতুর জন্য একটি করে গান রেখে গেছেন। প্রথম প্রেমে তাঁর গান। প্রথম বিচ্ছেদে তাঁর গান। বন্ধুর সঙ্গে দীর্ঘ সফরে তাঁর গান। বৃষ্টিভেজা বিকেলে তাঁর গান। একাকী রাতে তাঁর গান। আনন্দে তাঁর গান। বেদনায়ও তাঁর গান।
এমন শিল্পী খুব কমই জন্মান।
শেষ কথা: তিনি কোথাও যাননি
অনেকেই বলেন—
“কিংবদন্তির মৃত্যু হয় না।”
কিশোর কুমার সেই কথারই জীবন্ত প্রমাণ। ১৯২৯ সালের ৪ আগস্ট খণ্ডওয়ার যে ছেলেটি পৃথিবীতে এসেছিল, সে হয়তো ১৯৮৭ সালের ১৩ অক্টোবর শেষ নিঃশ্বাস নিয়েছিল।
কিন্তু শিল্পী কিশোর কুমার?
তিনি আজও বেঁচে আছেন। প্রতিটি রেডিওর তরঙ্গে। প্রতিটি মঞ্চের আলোয়। প্রতিটি উৎসবের সন্ধ্যায়। প্রতিটি প্রেমিকের গুনগুনে। প্রতিটি বাঙালির পুজোর স্মৃতিতে। প্রতিটি ভারতীয়ের হৃদয়ে।
তাঁর কণ্ঠ আমাদের শিখিয়েছে—জীবন ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু সুর অনন্ত। তাঁর গান আমাদের বুঝিয়েছে—ভালোবাসা কখনও পুরোনো হয় না। আর তাঁর জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—সত্যিকারের শিল্পী কখনও বিদায় নেন না।
তাঁরা থেকে যান। মানুষের স্মৃতিতে। মানুষের অনুভূতিতে। মানুষের হৃদস্পন্দনে। তাই, তাঁর ৯৭তম জন্মজয়ন্তীতে, শ্রদ্ধার সঙ্গে শুধু একটিই কথা বলা যায়—
কিশোর কুমার কোনও নাম নন।
তিনি ভারতীয় সঙ্গীতের এক চিরন্তন অনুভূতি।
আর যতদিন গান থাকবে, ততদিন কিশোর কুমারও থাকবেন।
শুভ জন্মজয়ন্তী, কিংবদন্তি। 🌹
Published on: আগ ২৩, ২০২৬ at ১১:৩৬




