
Published on: আগ ২৩, ২০২৬ at ১৮:২৫
এসপিটি নিউজ, রামনগর (কাঁথি), ২৩ আগস্ট: কাঁথি মহকুমার রামনগর বিধানসভার বাখারপুর-সহ বিস্তীর্ণ এলাকা টানা বৃষ্টির জেরে কার্যত বন্যার চেহারা নিয়েছে। দিনের পর দিন জলমগ্ন হয়ে রয়েছে রাস্তা, বসতভিটে ও বিভিন্ন জনপরিসর। সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে। কোথাও কয়েক কিলোমিটার পথ জল পেরিয়ে বাজারে যেতে হচ্ছে, কোথাও প্রয়োজনীয় কাজ সারতে মানুষের ভরসা শুধু হাঁটা পথ—তাও গলা বা কোমর সমান জল ঠেলে।
এলাকার পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে, কোথায় রাস্তা, কোথায় পুকুর বা জলাশয়, তা বোঝাই কঠিন হয়ে উঠেছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। প্রাথমিক বিদ্যালয় বন্ধ রয়েছে। জল ঢুকে পড়েছে অখণ্ড শ্রী ক্রিয়াযোগ সাধন মন্দির সেবাশ্রমেও। জলবন্দি মানুষের জন্য তৈরি ত্রাণ শিবিরগুলির অবস্থাও উদ্বেগজনক বলে অভিযোগ উঠেছে।
কিন্তু এই দুর্যোগের মধ্যে সবচেয়ে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি এলাকার আশা কর্মীরা। সরকারি নির্দেশ মেনে তাঁদের বাড়ি বাড়ি ওষুধ পৌঁছে দিতে হচ্ছে। অভিযোগ, কোনও নৌকা বা জলযানের ব্যবস্থা না থাকায় গলা সমান জল পেরিয়ে কয়েক কিলোমিটার পথ হেঁটে হাতে ওষুধ নিয়ে, কখনও মাথার উপরে ওষুধের প্যাকেট তুলে তাঁরা মানুষের কাছে পৌঁছচ্ছেন।
একদিকে যখন আশা কর্মীরা জীবন ও স্বাস্থ্য—দুইয়ের ঝুঁকি নিয়ে দায়িত্ব পালন করছেন, অন্যদিকে প্রশাসনিক আধিকারিক থেকে জনপ্রতিনিধিদের কখনও ট্রাক্টরে, আবার কখনও জলযানে চেপে বানভাসি এলাকা পরিদর্শন করতে দেখা গিয়েছে। কিন্তু স্থানীয়দের প্রশ্ন, পরিদর্শনের পরও কি মিলেছে কোনও কার্যকর সমাধানের পথ?
এলাকাবাসীর অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরেই বাখারপুরের যোগাযোগ ব্যবস্থা দুর্বল। রামনগর মূল শহর থেকে এই গ্রামের দূরত্বও যথেষ্ট। স্থায়ী ও কার্যকর যোগাযোগ ব্যবস্থা আজও গড়ে ওঠেনি বলে তাঁদের দাবি। পরিবহণ ব্যবস্থা সীমিত, রাস্তার অবস্থাও দীর্ঘদিন ধরে খারাপ। স্বাভাবিক সময়েই যেখানে যানবাহন চলাচল কঠিন, সেখানে টানা বৃষ্টির পর সেই রাস্তা এখন কার্যত জলের নিচে।
স্থানীয়দের বক্তব্য, আগের সরকারের আমলে যে পরিস্থিতি ছিল, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পরও তার উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এখনও চোখে পড়েনি। যদিও প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, এটি দীর্ঘদিনের সমস্যা এবং নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর পরিস্থিতির সব দিক খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি আগের সরকারের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের অব্যবস্থার অভিযোগও উঠছে।
কিন্তু রাজনৈতিক দোষারোপের এই পালার মাঝখানে প্রশ্ন উঠছে—দীর্ঘদিনের সমস্যার দায় কার, সেই বিতর্কের উত্তর খুঁজতে খুঁজতেই কি জলবন্দি মানুষের দুর্ভোগ আরও দীর্ঘ হবে?
এই পরিস্থিতি নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অখণ্ড শ্রী ক্রিয়াযোগ সাধন মন্দির সেবাশ্রমের প্রতিষ্ঠাতা শ্রীশ্রী ১০০৮ মহন্ত আচার্য দেবানন্দ শাস্ত্রী। তিনি বলেন, “এ কী ধরনের পরিস্থিতি বলুন তো? আশা কর্মীদের গলা সমান জলের মধ্যে কয়েক কিলোমিটার পথ পায়ে হেঁটে হাতে ওষুধ নিয়ে, মাথার উপরে করে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ওষুধ বিলি করতে হচ্ছে। তাঁরা বলছেন, উপরতলার নির্দেশ আছে, ওষুধ পৌঁছতেই হবে। কিন্তু এই মহিলারাই যদি অসুস্থ হয়ে পড়েন, তখন ওষুধ কারা বিলি করবেন? এর কোনও জবাব আছে?”
তাঁর অভিযোগ, বিধায়ক, মহকুমা প্রশাসনের আধিকারিক এবং ব্লক প্রশাসনের কর্তারা ট্রাক্টরে চেপে এলাকা পরিদর্শন করেছেন। জলযানেও ঘুরে দেখা হয়েছে পরিস্থিতি। কিন্তু যাঁরা দিনের পর দিন জলবন্দি অবস্থায় রয়েছেন, তাঁদের কাছে প্রয়োজনীয় পরিষেবা পৌঁছে দেওয়ার বিষয়টিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
আচার্য দেবানন্দ শাস্ত্রী বলেন, “যাঁরা এই জলবন্দি এলাকায় রয়েছেন, তাঁদের দিকে বিশেষভাবে নজর দেওয়া জরুরি। বিশেষ করে আশা কর্মীদের সুস্থ ও নিরাপদ রাখার জন্য ব্যবস্থা করতে হবে। স্পিডবোট না হলেও অন্তত ছোট নৌকার ব্যবস্থা করা উচিত। তাহলে তাঁরা সুষ্ঠুভাবে তাঁদের দায়িত্ব পালন করতে পারবেন।”
শুধু বর্তমান পরিস্থিতি সামাল দেওয়া নয়, বাখারপুরের দীর্ঘদিনের সমস্যার স্থায়ী সমাধানের দাবিও তুলেছেন তিনি। তাঁর মতে, জলমগ্ন এলাকার প্রধান রাস্তাটি উঁচু করতে হবে। সেই সঙ্গে দ্রুত ও কার্যকর জল নিষ্কাশনের ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। তাহলেই গ্রামের মানুষ প্রধান সড়কে এসে উদ্ধারকেন্দ্র, বাজার ও অন্যান্য জরুরি পরিষেবার কাছে পৌঁছতে পারবেন।
একই সঙ্গে বাখারপুর এলাকায় বাবা নাগেশ্বর মহাদেবের মন্দিরে ভক্তদের যাতায়াতও সহজ হবে বলে তাঁর দাবি। আচার্যের কথায়, রাস্তা উঁচু ও জল নিষ্কাশনের ব্যবস্থা হলে ভবিষ্যতে প্রশাসনিক কর্তাদেরও আর ট্রাক্টর বা জলযানে চেপে এলাকা পরিদর্শন করতে হবে না।
এদিকে স্থানীয় বাসিন্দা মাধব কয়রা জানিয়েছেন, প্রায় ১৫ দিন ধরে তাঁরা জলবন্দি অবস্থায় রয়েছেন। তাঁর অভিযোগ, “আমরা প্রায় পনেরো দিন ধরে জলবন্দি। ঠিকমতো খাবারও পাচ্ছি না। চারদিকে শুধু জল আর জল। কীভাবে চলব, কোথায় যাব, বুঝতে পারছি না।”
বাখারপুরের এই পরিস্থিতি এখন শুধু টানা বৃষ্টির কারণে তৈরি হওয়া সাময়িক দুর্যোগের ছবি নয়। সামনে এসেছে দীর্ঘদিনের দুর্বল যোগাযোগ ব্যবস্থা, খারাপ রাস্তা এবং পর্যাপ্ত জল নিষ্কাশন ব্যবস্থার অভাবের প্রশ্নও।
প্রশাসনিক পরিদর্শন হয়েছে, পরিস্থিতি খতিয়ে দেখা হয়েছে। কিন্তু জলবন্দি মানুষের প্রত্যাশা এখন আর শুধু পরিদর্শন নয়—বাস্তব পদক্ষেপ। বিশেষ করে গলা সমান জল পেরিয়ে দায়িত্ব পালন করা আশা কর্মীদের জন্য নিরাপদ যাতায়াতের ব্যবস্থা, জলবন্দি পরিবারগুলির কাছে পর্যাপ্ত ত্রাণ ও খাদ্য পৌঁছে দেওয়া এবং দীর্ঘমেয়াদে রাস্তা উঁচু করে কার্যকর জল নিষ্কাশন ব্যবস্থা গড়ে তোলাই এখন বাখারপুরবাসীর প্রধান দাবি।
— সংবাদ প্রভাকর টাইমস
Published on: আগ ২৩, ২০২৬ at ১৮:২৫







