কামি রিতা শেরপা: উচ্চতার ইতিহাসে এক নীরব বিপ্লব

Main দেশ বিদেশ ভ্রমণ রাজ্য
শেয়ার করুন

Published on: জানু ২০, ২০২৬ at ১৭:০২
Reporter: Aniruddha Pal

এসপিটি নিউজ : পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ—মাউন্ট এভারেস্ট। উচ্চতা ৮,৮৪৮.৮৬ মিটার। এই পর্বত শুধুই একটি ভৌগোলিক বাস্তবতা নয়, এটি মানুষের সাহস, সহনশীলতা ও আত্মসংযমের চরম পরীক্ষা। বহু পর্বতারোহীর স্বপ্ন থাকে জীবনে একবার হলেও এভারেস্টের চূড়ায় পা রাখার। কিন্তু সেই একই মরশুমে একাধিকবার এভারেস্ট শৃঙ্গ জয়—এ যেন কল্পনারও ঊর্ধ্বে। এই অসম্ভবকে সম্ভব করে দেখিয়েছেন নেপালের কিংবদন্তি শেরপা পর্বতারোহী কামি রিতা শেরপা।

১৯৭০ সালের ১৭ জানুয়ারি নেপালের সোলুখুম্বু জেলার থামে গ্রামে জন্ম কামি রিতা শেরপার। এভারেস্টের ছায়ায় বড় হয়ে ওঠা তাঁর কাছে পাহাড় ছিল জীবনযাত্রারই অংশ। বাবা ছিলেন শেরপা গাইড, ফলে ছোটবেলা থেকেই পাহাড়ের ভাষা, আবহাওয়া আর বিপদের ইঙ্গিত বুঝতে শিখেছিলেন তিনি। ১৯৯২ সালে পেশাদারভাবে পর্বতারোহণ শুরু এবং ১৯৯৪ সালে প্রথমবার এভারেস্ট জয়—সেখান থেকেই শুরু এক অবিশ্বাস্য অধ্যায়।

এভারেস্ট অভিযানের প্রধান সময় সাধারণত এপ্রিল-মে মাস। এই স্বল্প সময়ের মধ্যেই অধিকাংশ অভিযান সম্পন্ন হয়। এমন অবস্থায় একই মরশুমে একাধিকবার চূড়ায় ওঠা মানে শরীর ও মনের ওপর চরম চাপ। কিন্তু কামি রিতা সেই সীমা বারবার ভেঙেছেন।

বিশেষ করে ২০১৯ সালে একই মরশুমে তিনবার এভারেস্ট শৃঙ্গ জয় করে তিনি বিশ্বজুড়ে আলোড়ন ফেলেন। এছাড়াও ২০২৩ ও ২০২৪ সালে একই ক্লাইম্বিং সিজনে দু’বার করে শৃঙ্গ স্পর্শ করেছেন। সাধারণ পর্বতারোহীর কাছে যেখানে একবার নামতে নামতেই শরীর ভেঙে পড়ে, সেখানে তিনি আবার প্রস্তুত হন নতুন অভিযানের জন্য—এটাই তাঁকে অনন্য করে তোলে।

কামি রিতা শেরপা বর্তমানে সবচেয়ে বেশি বার এভারেস্ট জয় করা মানুষ। ২০২৫ সাল পর্যন্ত তাঁর সফল সমাপনী সংখ্যা পৌঁছেছে ৩১ বার—যা এককভাবে বিশ্বরেকর্ড। এই প্রতিটি অভিযান শুধুমাত্র ব্যক্তিগত কৃতিত্ব নয়; বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তিনি ছিলেন অভিযাত্রী দলের গাইড, অর্থাৎ অন্যদের নিরাপদে শীর্ষে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্বও ছিল তাঁর কাঁধে।

এভারেস্টে প্রতি অভিযানেই লুকিয়ে থাকে মৃত্যুর ছায়া—হিমবাহ ধস, আকস্মিক ঝড়, মাইনাস তাপমাত্রা, অক্সিজেনের অভাব। ‘ডেথ জোন’-এ শরীর ধীরে ধীরে কাজ করা বন্ধ করে দেয়। তবু কামি রিতা বারবার সেখানে ফিরে গিয়েছেন। তাঁর মতে, অভিজ্ঞতাই এখানে সবচেয়ে বড় অস্ত্র। পাহাড়ের মেজাজ বুঝতে পারাই আসল দক্ষতা।

কামি রিতা শেরপা এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন— “আমি রেকর্ড গড়ার জন্য পাহাড়ে যাই না। এটাই আমার কাজ, এটাই আমার জীবন। পাহাড় আমাকে সম্মান দেয়, আমিও পাহাড়কে সম্মান করি।” আরও বলেন, “এভারেস্ট আমাকে অহংকার শেখায়নি, বরং শিখিয়েছে কতটা ছোট আমরা।”

এই বিনয়ই তাঁর চরিত্রের সবচেয়ে বড় শক্তি। বিশ্বরেকর্ডধারী হয়েও তিনি নিজেকে কখনও নায়ক হিসেবে তুলে ধরেন না।

দীর্ঘদিন ধরে শেরপারা পর্বতারোহণে থেকেছেন পর্দার আড়ালে—সহকারী বা বাহক হিসেবে। কামি রিতা সেই ধারণা বদলে দিয়েছেন। তিনি প্রমাণ করেছেন, শেরপারা শুধু সহায়ক নন, তাঁরা নিজেরাও বিশ্বসেরা পর্বতারোহী হতে পারেন।

একই মরশুমে একাধিকবার এভারেস্ট জয় করা শুধু শারীরিক সক্ষমতার গল্প নয়—এ এক অসীম মানসিক দৃঢ়তার কাহিনি। কামি রিতা শেরপা সেই মানুষ, যিনি বারবার পৃথিবীর ছাদে উঠে আমাদের মনে করিয়ে দেন—সীমা আসলে মানুষের মনেই থাকে।

এভারেস্টের চূড়ায় যখন তীব্র বাতাসে তুষার উড়ে যায়, তখন সেখানে শুধু একটি নামই বারবার লেখা হয়ে থাকে ইতিহাসের বরফে—কামি রিতা শেরপা।

Published on: জানু ২০, ২০২৬ at ১৭:০২


শেয়ার করুন