ইন্ডিগো’র ‘ব্ল্যাক উইক’: পাইলট নেই, বিমান দাঁড়িয়ে ! হাজার হাজার যাত্রীর কাছে বিমান সংস্থার ‘ক্ষমাভিক্ষা’

Main দেশ বিমান ভ্রমণ রাজ্য
শেয়ার করুন

আকাশে আতঙ্ক, মাটিতে দুর্ভোগ: ইন্ডিগোর ১০০০+ ফ্লাইট বাতিল, হোটেল-খাবারেও কাটছে না ক্ষোভ

Published on: ডিসে ৫, ২০২৫ at ১৮:৪৯
Reporter: Aniruddha Pal

এসপিটি নিউজ, কলকাতা, ৫ ডিসেম্বর: সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বৃহত্তম বিমানসংস্থা ইন্ডিগো (IndiGo)-র পরিষেবা ব্যাপক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়েছে। একাধিক ফ্লাইট বাতিল ও দেরির কারণে লক্ষ লক্ষ যাত্রী দেশ ও বিদেশে চরম ভোগান্তির শিকার হয়েছেন। এই চরম অব্যবস্থার জন্য ইন্ডিগো কর্তৃপক্ষ যাত্রীদের কাছে আন্তরিকভাবে ক্ষমা চেয়েছে। যাত্রীদের এই চূড়ান্ত হয়রানির জন্য ক্ষোভ প্রকাশ করেছে সমস্ত ট্রাভেল অ্যাসোসিয়েশনগুলি। ট্রাভেল এজেন্টস ফেডারেশন অব ইন্ডিয়া বা টাফি’র ইস্টার্ন চ্যাপ্টারের চেয়ারম্যান অনিল পাঞ্জাবি তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে জানিয়েছেন যে সাম্প্রতিককালে এটি সবথেকে বড় ধরনের যাত্রী বিপর্যয়।

কী ঘটেছে? কেন এই বিপর্যয়?

ইন্ডিগো বিমানসংস্থা দেশজুড়ে গত কয়েক দিন ধরে (২ ডিসেম্বর থেকে শুরু করে ৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত) তাদের পরিষেবা স্বাভাবিক রাখতে পারেনি। তাদের শত শত উড়ান বাতিল হয়েছে। এর নেপথ্যে একাধিক কারণ রয়েছে, যার মধ্যে প্রধানতম হলো:

  • কর্মী ও পাইলটের ঘাটতি (Crew Shortage): ভারতের বিমান নিয়ন্ত্রক সংস্থা ডিজিসিএ (DGCA) কর্তৃক প্রণীত নতুন ‘ফ্লাইট ডিউটি টাইম লিমিটেশন’ (FDTL) নিয়মাবলী কার্যকর হওয়ার ফলে পাইলট ও বিমানকর্মীদের কাজের সময় এবং বিশ্রামের সময় কঠোরভাবে বেঁধে দেওয়া হয়েছে। এই নতুন নিয়মের কারণে ইন্ডিগোর মতো বড় বিমানসংস্থার পর্যাপ্ত সংখ্যক পাইলট ও কেবিন ক্রুর অভাব দেখা দিয়েছে, যা উড়ান বাতিলের মূল কারণ।
  • কারিগরি সমস্যা (Technical Glitches): ইন্ডিগো তাদের বিবৃতিতে প্রযুক্তিগত ত্রুটির কথাও স্বীকার করেছে। দিল্লি ও পুণের মতো বিমানবন্দরে চেক-ইন এবং ডিপারচার কন্ট্রোল সিস্টেমে সমস্যা দেখা দেওয়ায় কার্যক্রমে বিলম্ব হয়েছে।
  • অন্যান্য কারণ: শীতকালীন উড়ান সময়সূচি পরিবর্তন, প্রতিকূল আবহাওয়া এবং বিমান চলাচল ব্যবস্থায় অতিরিক্ত ভিড়ও এই সামগ্রিক বিপর্যয়ে প্রভাব ফেলেছে বলে সংস্থা জানিয়েছে।
বাতিল উড়ানের সংখ্যা ও যাত্রী দুর্ভোগ

ডিসেম্বর মাসের শুরু থেকেই এই সমস্যা ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। ডিজিসিএ-এর তথ্য অনুযায়ী, নভেম্বর মাস জুড়ে ইন্ডিগোর মোট ১,২৩২টি উড়ান বাতিল হয়েছিল ডিসেম্বরে এই সংখ্যা আরও বেড়েছে। বুধবার (৩ ডিসেম্বর) ২০০-রও বেশি উড়ান বাতিল হয়েছে। বৃহস্পতিবার (৪ ডিসেম্বর) নাতিল হয়েছে কমপক্ষে ৫৫০টি উড়ান । শুক্রবার (৫ ডিসেম্বর) ৬০০-রও বেশি উড়ান বাতিল হয়েছে (বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুসারে)। অর্থাৎ, মাত্র কয়েক দিনে হাজারের বেশি উড়ান বাতিল হয়েছে।

  • চার মেট্রো সিটিতে বাতিল উড়ান (বিভিন্ন দিনের হিসাব অনুযায়ী):
    • দিল্লি: ১৭২টি (শুক্রবার) / ৯৫টি (বৃহস্পতিবার) / ৩৮টি (মঙ্গলবার)।
    • মুম্বই: ১১৮টি (শুক্রবার) / ৮৫টি (বৃহস্পতিবার) / ৩৩টি (মঙ্গলবার)।
    • বেঙ্গালুরু: ১০০-র বেশি (শুক্রবার) / ৪২টি (বুধবার)।
    • কলকাতা: শতাধিক (বুধ ও বৃহস্পতিবার মিলিয়ে) / বৃহস্পতিবার ২২টি বাতিল হয়েছে।

উড়ান বাতিলের কারণে লক্ষ লক্ষ যাত্রী চরম অসুবিধার সম্মুখীন হয়েছেন। তাঁদের অনেকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিমানবন্দরে আটকা পড়েছেন, গুরুত্বপূর্ণ সংযোগকারী ফ্লাইট বা জরুরি মিটিং বাতিল করতে বাধ্য হয়েছেন।

কলকাতা বিমানবন্দরে ইন্ডিগো’র উড়ান বাতিলের চিত্র

কলকাতা বিমানবন্দর (নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর)-এ ইন্ডিগো’র পরিষেবাও দেশব্যাপী সঙ্কটের কারণে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গত তিন দিনের (৩ ডিসেম্বর, ৪ ডিসেম্বর এবং ৫ ডিসেম্বর) বাতিল হওয়া উড়ানের মোট সংখ্যা সম্পর্কে কোনো নির্দিষ্ট, চূড়ান্ত সংখ্যা ইন্ডিগো বা বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের তরফে তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি। তবে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী পরিস্থিতি ছিল নিম্নরূপ:

  • মোট বাতিল উড়ান: গত তিন দিনে কলকাতায় কমপক্ষে ৫০-৬০টিরও বেশি ইন্ডিগোর উড়ান বাতিল হয়েছে বলে অনুমান করা যায়।
    • ৩ ডিসেম্বর: প্রায় ১০টি উড়ান বাতিল এবং ৪৯টি দেরিতে উড়েছিল।
    • ৪ ডিসেম্বর (বৃহস্পতিবার সকালে): সকাল ৬টা থেকে ১০টার মধ্যে ১১টি ফ্লাইট বাতিল হয়। সারাদিনে মোট বাতিল হওয়া উড়ানের সংখ্যা আরও বেশি।
    • ৫ ডিসেম্বর (শুক্রবার): দেশজুড়ে ৬০০-রও বেশি উড়ান বাতিল হওয়ায়, কলকাতায় এই সংখ্যাটিও ছিল উল্লেখযোগ্য।

যাত্রী অপেক্ষা: উড়ান বাতিল বা দেরির কারণে কলকাতা বিমানবন্দরে কয়েকশো যাত্রী অপেক্ষায় থাকতে বাধ্য হয়েছেন। অনেক যাত্রীকেই চরম ভোগান্তির শিকার হতে হয়েছে, অনেকে লাগেজ টার্মিনালেই রেখে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেছেন।

টাফি’র চেয়ারম্যান অনিল পাঞ্জাবি (ইস্টার্ন চ্যাপ্টার) সংবাদ প্রভাকর টাইমস-কে একান্ত আলাপচারিতায় জানিয়েছেন অনেক উড়ান বাতিল হওয়ায় অন্য বিমান সংস্থাগুলির টিকিটের চাহিদা অপ্রত্যাশিতভাবে বেড়ে গেছে, যার ফলে বিমান ভাড়া বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকছে। ইতিমধ্যে বিমানের টিকিট বিক্রির অনেক বড় বড় পোর্টাল আপাতত বন্ধ করে দিয়েছে। এর ফলে যাত্রীরা চরম ভোগান্তির মুখে পড়েছেন। বিশেষ করে যারা দুই মাস কিংবা তারও আগে টিকিট কেটেছিলেন সেই দামে তো আজকে টিকিট পাবেন না। এমন অনেক যাত্রী প্রবল সঙ্কটে পড়েছেন। অনেকে জরুরি প্রয়োজনে উরানের টিকিট বুকিং করেছিলেন, কারও বিয়ের অনুষ্ঠান ছিল, কারও হাসপাতালে অপারেশনের ডেট ছিল, কারও বড় ধরনের বিজনেস চুক্তির দিন ধার্য ছিল। সব ভেস্তে গিয়েছে। এখন তারা কোথায় যাবে বলতে পারেন?”

এখানে না থেমে অনিল পাঞ্জাবি প্রশ্ন তুলেছেন- “এতো একদিনে এই সমস্যা তৈরি হয়নি। অনেক আগে থেকেই এমনটা হতে শুরু করেছিল। ভারতের সবচেয়ে বড় বিমান সংস্থা হিসেবে তাদের একটু বেশি প্রাধান্য দেওয়ে হয়েছে। সব থেকে বেশি উড়ান তাদের। কিন্তু সেই অনুযায়ী পর্যাপ্ত সংখ্যক নতুন পাইলট ও ক্রু নিয়োগের প্রস্তুতি কেন নেয়নি, যদি তারা সেই প্রস্তুতি নিত তাহলে তো আজ এই সমস্যা তৈরি হত না। আমার অনেক যাত্রী প্রবল সঙ্কতে। আমার মতো বহু এজেন্টের যাত্রীরা এখন চরম ভোগান্তির শিকার। এসব একদম ঠিক হল না। এখন তারা যতই ক্ষমা চাক, যাত্রীদের ভোগান্তির মূল্য কি ইন্ডিগো ফেরত দিতে পারবে?”

ইন্ডিগোর প্রতিক্রিয়া ও ক্ষমাপ্রার্থনা

এই চরম অব্যবস্থার জন্য ইন্ডিগো কর্তৃপক্ষ যাত্রীদের কাছে আন্তরিকভাবে ক্ষমা চেয়েছে।

“আমরা স্বীকার করছি যে গত দুই দিন ধরে নেটওয়ার্ক জুড়ে ইন্ডিগোর কার্যক্রম উল্লেখযোগ্যভাবে ব্যাহত হয়েছে এবং আমরা আমাদের গ্রাহকদের কাছে এই অসুবিধার জন্য আন্তরিকভাবে ক্ষমা চাইছি।”

বিমানসংস্থাটি যাত্রীদের অসুবিধা কমাতে বেশ কিছু ব্যবস্থা নিয়েছে:

ক্ষতিপূরণ ও বিকল্প ব্যবস্থা: বাতিল হওয়া উড়ানের যাত্রীদের বিনা খরচে সম্পূর্ণ টাকা ফেরত (Refund) অথবা বিকল্প ফ্লাইটে বুকিং (Reschedule)-এর সুবিধা দেওয়া হচ্ছে।

হোটেল ও খাবারের ব্যবস্থা: বিমানবন্দরে অপেক্ষমান যাত্রীদের জন্য ইন্ডিগো হাজার হাজার হোটেল এবং খাবারদাবারের (Accommodation and Meals) ব্যবস্থা করছে বলে জানা গেছে।

উড়ান সংখ্যা কমানো: পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার জন্য ৮ ডিসেম্বর থেকে ইন্ডিগো তাদের উড়ান সংখ্যা কমিয়ে দেবে বলে জানিয়েছে। সংস্থাটি আশ্বস্ত করেছে যে আগামী ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর মধ্যে পরিষেবা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক হয়ে যাবে।

এই পরিস্থিতিতে দেশের বিমান পরিবহন মন্ত্রক একটি উচ্চ-পর্যায়ের তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে সেই সাথে পরিস্থিতির উপর নজর রাখতে অসামরিক বিমান চলাচল নিয়ন্ত্রক সংস্থা ডিজিসিএ (DGCA) ইন্ডিগো কর্তৃপক্ষের কাছে নিয়মিত রিপোর্ট চেয়েছে এবং যাত্রীদের অসুবিধা কমানোর জন্য কঠোর নির্দেশ দিয়েছে।

Published on: ডিসে ৫, ২০২৫ at ১৮:৪৯


শেয়ার করুন