

Published on: ডিসে ৫, ২০২৫ at ১৭:১২
এসপিটি নিউজ, নয়াদিল্লি, ৫ ডিসেম্বর: রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ভারত সফরে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে নয়াদিল্লির ঐতিহাসিক হায়দ্রাবাদ হাউস। একসময় বিশ্বের অন্যতম ধনী শাসকের রাজকীয় বাসস্থান, এই প্রাসাদটি বর্তমানে ভারতের রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং উচ্চ-পর্যায়ের কূটনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
হায়দ্রাবাদ হাউস কী ও কোথায় অবস্থিত?
এটি নয়াদিল্লির ১, অশোক রোড, ইন্ডিয়া গেটের কাছে প্রায় ৮.২ একর জমিতে বিস্তৃত। এটি ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি সম্মেলন কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ভারতে সফরে আসা বিশ্বের নামী রাষ্ট্রপ্রধানদের সাথে ভারত সরকারের উচ্চ-পর্যায়ের বৈঠক, ভোজসভা এবং যৌথ সংবাদ সম্মেলন এই প্রাসাদেই অনুষ্ঠিত হয়।
প্রাসাদটির ইতিহাস: নিজামের রাজকীয় বাসনা
হায়দ্রাবাদ হাউস নির্মাণ হয়েছিল তৎকালীন বিশ্বের অন্যতম ধনী শাসক, হায়দ্রাবাদের সপ্তম তথা শেষ নিজাম মীর ওসমান আলী খান এর জন্য। ব্রিটিশ ভারতের নতুন রাজধানী দিল্লিতে নিজামের সার্বভৌমত্ব ও ক্ষমতা প্রদর্শনের প্রতীক হিসেবে এটি তৈরি করা হয়। এটির নির্মাণ শুরু হয় ১৯২৬ সালে এবং শেষ হয় ১৯২৮ সালে। ১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন হওয়ার পর, নিজাম এটি ভারত সরকারের কাছে হস্তান্তর করেন। ১৯৭৪ সাল থেকে এটি আনুষ্ঠানিকভাবে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
স্থাপত্যের অপূর্ব নিদর্শন: প্রজাপতির নকশা
হায়দ্রাবাদ হাউসটি বিখ্যাত ব্রিটিশ স্থপতি স্যার এডউইন লুটিয়েন্স -এর নকশা করা, যিনি রাইসিনা হিল এলাকার (যেমন রাষ্ট্রপতি ভবন, ইন্ডিয়া গেট) নকশাকার হিসেবেও পরিচিত। ইউরোপীয় নব্য-ধ্রুপদী (Neo-Classical) শৈলীর সাথে মুঘল/ইন্দো-সারাসেনিক (Indo-Saracenic) স্থাপত্যের মিশ্রণ। এটি একটি প্রজাপতির (Butterfly) আকৃতিতে তৈরি, যেখানে মাঝখানে একটি কেন্দ্রীয় গম্বুজ এবং দুই পাশে দুটি প্রতিসম (Symmetrical) ডানা রয়েছে।প্রাসাদের কেন্দ্রে থাকা বিশাল গম্বুজটি এবং এর নিচে অবস্থিত ষড়ভুজাকৃতির প্রবেশ কক্ষ (Hexagonal Vestibule)। প্রাসাদটিতে মোট ৩৬টি কক্ষ রয়েছে।
অভ্যন্তরীণ সজ্জা ও কূটনৈতিক ব্যবহার
রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন হিসেবে ব্যবহারের জন্য এর সজ্জা অত্যন্ত রাজকীয় এবং মার্জিত। ভেতরের ঝাড়বাতি, কার্পেট, রুপোর সামগ্রী এবং কিছু চিত্রশিল্প ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে আনা হয়েছিল, যা এর আভিজাত্য বাড়িয়েছে।
গুরুত্বপূর্ণ কক্ষগুলি:
- স্টেট ডাইনিং হল (State Dining Hall): মূল নকশার চারটি কক্ষকে সংযুক্ত করে রাষ্ট্রপ্রধানদের জন্য ভোজসভার স্থান তৈরি করা হয়েছে।
- কনফারেন্স হল (Conference Hall): দ্বিপাক্ষিক এবং বহু-পক্ষীয় বৈঠকের স্থান, যেখানে পুতিন এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক সাধারণত অনুষ্ঠিত হয়।
কূটনীতির সাক্ষী: যেসব রাষ্ট্রপ্রধান এখানে এসেছেন
হায়দ্রাবাদ হাউস ভারতের কূটনৈতিক ইতিহাসের এক নীরব সাক্ষী। এই প্রাসাদে বৈঠক করেছেন এমন কয়েকজন উল্লেখযোগ্য রাষ্ট্রপ্রধান হলেন:
- ভ্লাদিমির পুতিন (রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট)
- বিল ক্লিনটন, জর্জ বুশ, বারাক ওবামা (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক্তন প্রেসিডেন্টগণ)
- শি জিনপিং (গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের প্রেসিডেন্ট)
- শিনজো আবে (জাপানের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী)
- ইমানুয়েল ম্যাক্রঁ (ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট)
নির্মাণ ব্যয় সংক্রান্ত নোট: ১৯২০-এর দশকে এর নির্মাণে ঠিক কত টাকা খরচ হয়েছিল, সেই বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই। তবে, আধুনিক অনুমিত বাজার মূল্যের ভিত্তিতে এটিকে এক বিশাল অঙ্কের বিনিয়োগ হিসেবে দেখা হয়, যা নিজামের আভিজাত্য ও স্থপতি লুটিয়েন্সের উচ্চমানের নির্মাণশৈলীর ফল।
হায়দ্রাবাদ হাউস কেবল একটি প্রাসাদ নয়, বরং ভারতের পররাষ্ট্রনীতির গুরুত্ব, বিশ্বস্ততা এবং আতিথেয়তার এক শক্তিশালী প্রতীক। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ভারতের ভূমিকাকে তুলে ধরার জন্য এটিই প্রথম পছন্দের স্থান।
Published on: ডিসে ৫, ২০২৫ at ১৭:১২



