ইতিহাসের প্রত্যাবর্তন: ত্রিবেণীতে আবার কুম্ভ, ঘোষণায় ‘বঙ্গীয় শক্তি সঙ্গম ২০২৬

Main দেশ ধর্ম ভ্রমণ রাজ্য
শেয়ার করুন

Published on: জানু ১৬, ২০২৬ at ১৭:৫০
Reporter: Aniruddha Pal

এসপিটি নিউজ, কলকাতা, ১৫ জানুয়ারি : কলকাতার ঐতিহাসিক ইন্ডিয়ান মিউজিয়াম বৃহস্পতিবার সাক্ষী থাকল এক স্মরণীয় আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক মুহূর্তের। এখানেই অনুষ্ঠিত হল বিশেষ মহা-সম্মেলন ‘বঙ্গীয় শক্তি সঙ্গম ২০২৬’, যার মূল মঞ্চ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হল বহু শতাব্দী হারিয়ে যাওয়া বাংলার কুম্ভ ঐতিহ্যের পুনরুজ্জীবন—ত্রিবেণী কুম্ভ মেলা ২০২৬।

‘শক্তি: ভক্তি: প্রকৃতি’—এই মূলমন্ত্রকে সামনে রেখে আয়োজিত সম্মেলনে সাধু-সন্ত, গবেষক, প্রশাসনিক কর্তাব্যক্তি ও বিশিষ্ট অতিথিরা একযোগে বাংলার আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য ও ত্রিবেণীর ঐতিহাসিক গুরুত্বের কথা তুলে ধরেন। তাঁদের বক্তব্যে উঠে আসে, ত্রিবেণী শুধু একটি স্থান নয়—এ এক জীবন্ত সাংস্কৃতিক স্মৃতি, যেখানে গঙ্গা, যমুনা ও অন্তঃসলিলা সরস্বতীর শক্তি মিলিত হয়ে বাংলার সনাতন চেতনাকে ধারণ করে রেখেছে।

অনুষ্ঠানের সূচনা হয় ছায়ানট কলকাতার শিল্পীদের কণ্ঠে শ্যামাসঙ্গিতের মাধ্যমে। এরপর ডঃ সৌম্য ভৌমিকের পরিবেশনায় চন্ডী বন্দনা (গৌড়ীয় নৃত্য) করেন শিল্পীরা। এরপর বিশিষ্ট চিত্রশিল্পী রীতা পালের তত্ত্বাবধানে দেবী শক্তিক কালিকার উপর চিত্রায়ন প্রদর্শিত হয়।

কুম্ভ মেলার নির্ঘণ্ট ঘোষণা

মঞ্চ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়, আগামী ৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ থেকে পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার ত্রিবেণীতে শুরু হবে কুম্ভ মহোৎসব।

  • ৫ ফেব্রুয়ারি: ভূমি পুজন ও ধ্বজা উত্তোলনের মাধ্যমে সূচনা
  • ১২ ফেব্রুয়ারি: রুদ্রাভিষেক যজ্ঞ
  • ১৩ ফেব্রুয়ারি: শক্তিপীঠ পরিক্রমা ও অমৃত যোগস্নান
  • ১৪ ফেব্রুয়ারি: গীতা যজ্ঞ ও ধ্বজা অবতরণ
ঐতিহ্যের পুনর্জাগরণে সংকল্প

অনুষ্ঠানে বোস্টন নিবাসী গবেষক ও লেখক কাঞ্চন বন্দ্যোপাধ্যায়-এর প্রেরণাদায়ক বার্তা পাঠ করা হয়। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, ত্রিবেণী একসময় ‘দক্ষিণ প্রয়াগ’ নামে পরিচিত ছিল এবং এখানে মাঘ ও পৌষ সংক্রান্তিকে কেন্দ্র করে কুম্ভস্নান ও মেলা অনুষ্ঠিত হত। ইতিহাসের ঘাত-প্রতিঘাতে সেই ঐতিহ্য হারালেও, ২০২২ সালে প্রায় ৭০০ বছর পর ত্রিবেণীতে কুম্ভের পুনরাগমন ঘটে। ২০২৩ সালে যেখানে প্রায় ১০ লক্ষ মানুষের সমাগম হয় এবং যার উল্লেখ স্থান পায় প্রধানমন্ত্রীর ‘মন কি বাত’-এ।

“আপানারা অনেকেই জানেন না, জানলে অবশ্যই তৃপ্ত হবেন জেনে যে ত্রিবেণীর পবিত্র সপ্তর্ষী ঘাটে আজ প্রতি সন্ধ্যায় শঙ্খধ্বনি হয় , প্রদীপ জ্বালিয়ে আমাদের মা-বোনেরা গঙ্গা-আরতি করেন। ত্রিবেণিতে আমরা ছোট-বড়দের জন্য সংস্কৃত ভাষায় কথা বলার শিক্ষার উদ্যোগ গ্রহণ করেছি। আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশে ৫১টি শক্তিপীঠের মধ্যে ১৩টি পশ্চিমবঙ্গে অবস্থিত। আমরা কুম্ভের সঙ্গে সঙ্গে শক্তিপীঠ পরিক্রমা করেছি। আর আজ আমরা দাঁড়িয়ে আছি এই মহাযজ্ঞে পঞ্চ মহোৎসবে। আমি বাংলার মানুষ, সমগ্র ভারতের মানুষ , বিশ্বের সকল সনাতন প্রাণ মানুষের কাছে বিনীত আবেদন জানাই যে এই ঐতিহাসিক পবিত্র যাত্রায় আপনারা সকলে অংশ গ্রহণ করুন। আমি ধন্যবাদ জানাই কেন্দ্রীয় সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের প্রতিষ্ঠান সমূহকে, এশিয়াটিক সোসাইটি , ইন্ডিয়ান মিউজিয়াম এবং অবশ্যই পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে। আপনারা চাইলে ত্রিবেণীতে স্টল কিংবা প্যাভেলিয়ান স্থাপন করে আরও সমৃদ্ধ করতে পারবেন।“ যোগ করেন কাঞ্চনবাবু।

সাধু-সন্তদের কণ্ঠে জাগরণের ডাক

পূজ্যপাদ নির্গুণাণানন্দ মহারাজ তাঁর বক্তব্যে বলেন, ত্রিবেণীর স্নান কেবল ধর্মীয় আচার নয়, এটি বাংলার সংস্কৃতি ও ইতিহাসের জাগরণ। তিনি বাংলার প্রাচীন গৌরবময় ঐতিহ্য, শক্তিপীঠ ও মন্দির সংস্কৃতির পুনঃপ্রতিষ্ঠার আহ্বান জানান।

একই সঙ্গে তিনি কিছুটা উদ্বগের সুরে বলেন- “স্নানের মধ্যে দিয়ে আমাদের ওই যে ঘাটের পাশে চারদিকে ঘেরা একটা মাজার , যেখানে ঢোকা এখন বর্তমানে ২০১৪ সাল থেকে নিষেধ করে দেওয়া হয়েছে । একটি বিষ্ণু মন্দির – তার মন্দিরে থাকা ঠাকুর অন্যত্র পূজিত হচ্ছেন। কারুর বাড়িতে। সেখানে থাকা শৃঙ্খলা দেবী অন্যত্র গিয়ে কোনও গ্রামে কিংবা একটি ভগ্ন গৃহে পূজিত হচ্ছেন। ভাবলাম- এরকম ভাবেই পুরীর জগন্নাথ দেব তাদের উপর্, মন্দিরের উপরেও অত্যাচার হয়েছিল। কয়েকশো বছর ধরে মন্দির বিগ্রহহীন অবস্থায় পড়েছিল , পুরীর পান্ডারা সেই মূর্তিকে লুকিয়ে নিয়ে যান। সেই মূর্তি সমাধি করে দেন। ব্রহ্ম বস্তুকে চিল্কার হ্রদে ফেলে দেন। তার পর একজন শঙ্করাচার্য এলেন , তাঁর নিজের তপোবল, জ্ঞানবল, বুদ্ধিবল, বিবেকবলে জাগ্রত করলেন সমাজকে। এবং আবার শ্রীমন্দির স্থাপনা করে রাজা ইন্দ্রদুম্নের দ্বারা পুনরায় সমর্থ হয়ে প্রায় ২৭০০ বছর ধরে আজ সারা বিশ্বের কাছে পুরীর জগন্নাথ অধিষ্ঠিত। এহেন অত্যাচার আমাদের সহ্য করতে হয়েছে। যুগে যুগে। সত্যযুগেও সহ্য করেছি। হিরণ্যকশিপুর দ্বরা। ত্রেতা যুগেও সহ্য করেছি।কলিযুগেও তার অংশ কম দেখি না। যদিও বা এখন আমরা মন্দিরে ঘণ্টা বাজাই। আমোদ-প্রমোদের সংগে দুর্গা-পুজোয় যুক্ত থাকি কিন্তু শঙ্কা –আশঙ্কা বাস্তবায়ন হতে আর বেশি দূর নেই।“

যোগী কালিকানন্দ সরস্বতী বলেন, সাহস ও সংস্কার—এই দুই শক্তির উপর ভর করেই সনাতন সমাজ আজ পুনর্জাগরণের পথে এগোচ্ছে। আমরা চাই এই কুম্ভের মাধ্যমে আমরা সব কিছু প্রাপ্ত হই। আপনারা জানেন- ভারতের উত্তর দিশায় শৈব্যদের আধিক্য রয়েছে। আপনারা জানেন যে উত্তর ভারতে ভগবান শিবের নিবাস আছে। দেবভূমি উত্তরাখণ্ডের হিমালয়ের কোলে তার অনেক মন্দির আছে। ঠিক তেমনই ভারতের পূর্ব দিশায় শক্তিবাদের পুজো হয়ে আসছে। দেবী শক্তি, দশ মহাবিদ্যা, কালী মায়ের পুজো পূর্ব ভারতে বিশেষ মান্যতা প্রাপ্ত হয়েছে। আপনারা যদি দক্ষিণ ভারতের দিকে তাকান দেখবেন যে সেখানে কার্তিকের সম্মান করে থাকে। যেখানে মহাদেব শিবের পুত্র কার্তিকের আরাধনা করা হয়ে থাকে। ঠিক একইভাবে ভারতের পশ্চিম দিকে মহা গণেশজি গণপতি বাপ্পা মৌরিয়ার পুজো আরাধনা হয়ে থাকে। এই যে শিব পরিবারের ব্যপ্তি বলুন কিংবা প্রকাশ দেখা যায় যে এক পরিবার কিভাবে বিস্তৃত আকারে ভারতের সংস্কারকে প্রকাশ করে চলেছে। তাঁর মতে, কুম্ভের মাধ্যমে এমন এক নবজাগরণ সম্ভব, যেখানে পরানুবাদ, পরানুকরণ ও পরমুখাপেক্ষতা আমাদের স্পর্শ করতে পারবে ন।“

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ডঃ সায়ন ভট্টাচার্য (উপ-অধিকর্তা, ইন্ডিয়ান মিউজিয়াম), ডঃ শোভনা কুমার পট্টনায়েক (আইএএস, অবসরপ্রাপ্ত), ডঃ শতরূপা (বোর্ড অফ ট্রাস্টিজ সদস্য), ডঃ রাকেশ দাস, মৌমিতা চক্রবর্তী সহ বহু বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব।

সব মিলিয়ে, ‘বঙ্গীয় শক্তি সঙ্গম ২০২৬’ শুধু একটি সম্মেলন নয়—এ এক ঐতিহাসিক ঘোষণা, যা ত্রিবেণীর পবিত্র তীরে আবারও কুম্ভের শঙ্খধ্বনি শোনার প্রতিশ্রুতি দিল। বাংলার আধ্যাত্মিক মানচিত্রে ত্রিবেণী ফের একবার উঠে এল গৌরবের কেন্দ্রে।

 

Published on: জানু ১৬, ২০২৬ at ১৭:৫০


শেয়ার করুন