পর্ব ১২ — তাহলে প্রাচীন ভারতীয়রা নিজেদের কী বলতেন?

Main দেশ ধর্ম ভ্রমণ রাজ্য
শেয়ার করুন

“হিন্দু” নয়—তাহলে কী? আর্য, বৈদিক, শৈব, বৈষ্ণব, শাক্ত, স্মার্ত, ব্রাহ্মণ্য—পরিচয়ের বহুত্বের ইতিহাস
Published on: অক্টো ১৮, ২০২৬ at ১১:২৯
✍️ লিখছেন অনিরুদ্ধ পাল। সংবাদ প্রভাকর টাইমস

এসপিটি বিশেষ প্রতিবেদন: চীন ভারতের ইতিহাসে একটি প্রশ্ন বারবার ফিরে আসে—আজ যাঁদের আমরা সাধারণভাবে হিন্দু বলে চিনি, সেই মানুষদের প্রাচীন যুগে কী নামে পরিচয় দেওয়া হতো? তাঁরা কি নিজেদের সবাইকে একটিমাত্র ধর্মীয় নামে চিনতেন? নাকি তাঁদের পরিচয় গড়ে উঠেছিল নানা বিশ্বাস, উপাসনাপদ্ধতি, দর্শন, আচার এবং সম্প্রদায়ের মধ্য দিয়ে?

প্রশ্নটি আপাতদৃষ্টিতে সহজ মনে হলেও এর উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের ফিরে দেখতে হয় প্রাচীন ভারতের ভাষা, সাহিত্য, ধর্মীয় আচার এবং সামাজিক ইতিহাস। কারণ, বর্তমানের কোনও পরিচয়কে অতীতের মানুষের ওপর সরাসরি বসিয়ে দিলেই ইতিহাসের সত্য স্পষ্ট হয় না। বরং তাতে বহু শতাব্দী ধরে গড়ে ওঠা পরিচয়ের পরিবর্তন ও বৈচিত্র্য আড়ালে থেকে যেতে পারে।

প্রথমেই একটি বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন। প্রাচীন ভারতের মানুষের পরিচয় একরকম ছিল না। অঞ্চল, ভাষা, সামাজিক অবস্থান, ধর্মীয় অনুশীলন, উপাস্য দেবতা এবং দার্শনিক মতের ভিত্তিতে তাঁদের পরিচয় আলাদা হতে পারত। কোনও ব্যক্তি একই সঙ্গে একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের বাসিন্দা, কোনও সামাজিক গোষ্ঠীর সদস্য, বৈদিক আচার পালনকারী এবং বিশেষ কোনও দেবতার উপাসক হতে পারতেন। এই পরিচয়গুলির মধ্যে সব সময় বিরোধ ছিল না; অনেক ক্ষেত্রে তারা পাশাপাশি অবস্থান করত।

তাহলে ‘আর্য’ পরিচয় দিয়ে শুরু করা যাক।

‘আর্য’ শব্দটি প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্যে গুরুত্বপূর্ণ। বৈদিক সাহিত্যে শব্দটির ব্যবহার পাওয়া যায়। তবে প্রাচীন প্রসঙ্গে ‘আর্য’ শব্দের অর্থকে আজকের কোনও নির্দিষ্ট ধর্মীয় পরিচয়ের সমার্থক ধরে নেওয়া ঠিক নয়। বিভিন্ন প্রসঙ্গে শব্দটি সম্মান, সামাজিক বা সাংস্কৃতিক পরিচয় কিংবা নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর ধারণার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। আধুনিক যুগে শব্দটি নিয়ে নানা রাজনৈতিক ও জাতিগত ব্যাখ্যাও তৈরি হয়েছে। তাই প্রাচীন সাহিত্যে শব্দটির ব্যবহার এবং আধুনিক পরিচয়ের ধারণাকে আলাদা করে দেখা জরুরি।

‘বৈদিক’ পরিচয়ের ক্ষেত্রেও একই সতর্কতা প্রয়োজন। বেদকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা মন্ত্র, যজ্ঞ, আচার এবং জ্ঞানচর্চার সঙ্গে যাঁদের সম্পর্ক ছিল, তাঁদের বোঝাতে বৈদিক শব্দটি ব্যবহার করা যায়। কিন্তু প্রাচীন ভারতের সমস্ত মানুষ একইভাবে বৈদিক আচার পালন করতেন, এমন প্রমাণ নেই। বিভিন্ন অঞ্চলে নানা লোকাচার, দেবদেবীর উপাসনা, আঞ্চলিক বিশ্বাস ও ধর্মীয় রীতির প্রচলন ছিল। সময়ের সঙ্গে এই ধারাগুলির মধ্যে আদানপ্রদান ঘটেছে।

এরপর আসে শৈব, বৈষ্ণব ও শাক্ত পরিচয়। শিবের উপাসনাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ধারার সঙ্গে যুক্ত মানুষদের শৈব, বিষ্ণু এবং তাঁর বিভিন্ন অবতারকে প্রধান উপাস্য হিসেবে মানা ধারার অনুসারীদের বৈষ্ণব এবং দেবীকে পরম শক্তি হিসেবে উপাসনা করা ধারার অনুসারীদের শাক্ত বলা হয়। এই পরিচয়গুলি কেবল দেবতার নামের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল না; এগুলির সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল নিজস্ব ধর্মতত্ত্ব, উপাসনাপদ্ধতি, আচার, তীর্থ, সাহিত্য এবং গুরুপরম্পরা।

তবে এই ধারাগুলিকে একেবারে পৃথক ও পরস্পরবিরোধী গোষ্ঠী হিসেবে দেখলেও ভুল হবে। বহু ক্ষেত্রে একই পরিবারে একাধিক দেবতার উপাসনা করা হতো। কোনও ব্যক্তি শিবের প্রতি গভীর ভক্তি রেখেও বিষ্ণু বা দেবীর উপাসনা করতে পারতেন। বিভিন্ন ধর্মীয় ধারার মধ্যে প্রতিযোগিতা যেমন ছিল, তেমনই ছিল পারস্পরিক প্রভাব ও সমন্বয়ের উদাহরণ।

‘স্মার্ত’ পরিচয়ও এই ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। স্মৃতি–শাস্ত্র, গৃহস্থজীবনের আচার এবং বিভিন্ন দেবতার উপাসনাকে সমন্বিতভাবে গ্রহণ করার কিছু ঐতিহ্যের সঙ্গে এই পরিচয় যুক্ত। পরবর্তী কালের স্মার্ত ধারার বহু অনুশীলনে শিব, বিষ্ণু, শক্তি, সূর্য, গণেশ ও কার্তিকেয়ের মতো দেবতার উপাসনা স্থান পেয়েছে। তবে স্মার্ত পরিচয়ের অর্থ ও রূপ সব যুগে এক ছিল না; অঞ্চল ও ঐতিহাসিক পরিস্থিতি অনুসারে এর পরিবর্তন ঘটেছে।

‘ব্রাহ্মণ্য’ শব্দটির অর্থও বুঝতে হবে তার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে। কোনও কোনও প্রসঙ্গে এটি ব্রাহ্মণদের সঙ্গে সম্পর্কিত সামাজিক ও ধর্মীয় ব্যবস্থা, বৈদিক আচার এবং শাস্ত্রনির্ভর কর্তৃত্বের ধারণাকে বোঝায়। কিন্তু ব্রাহ্মণ্য ব্যবস্থা, বৈদিক ঐতিহ্য এবং আজকের হিন্দু পরিচয়—এই তিনটিকে সম্পূর্ণ সমার্থক বলে ধরে নেওয়া যায় না। ভারতীয় ধর্মীয় ইতিহাসে এমন বহু ধারা ছিল, যেগুলি বৈদিক কর্তৃত্বকে ভিন্নভাবে গ্রহণ করেছে, আবার কিছু ধারা তার বাইরে নিজেদের অবস্থান গড়ে তুলেছে।

বৌদ্ধ ও জৈন ঐতিহ্যের কথাও এখানে মনে রাখা প্রয়োজন। প্রাচীন ভারতে এই দুই ধর্মীয় ধারা স্বতন্ত্র দর্শন, সাধনা এবং নৈতিক আদর্শ নিয়ে বিকশিত হয়েছিল। একই বৃহত্তর উপমহাদেশে তাদের সঙ্গে বৈদিক ও অন্যান্য ধর্মীয় ধারার বিতর্ক, মতবিনিময় এবং সাংস্কৃতিক আদানপ্রদান চলেছে। এই ইতিহাস প্রমাণ করে, প্রাচীন ভারত কোনও একমাত্রিক ধর্মীয় সমাজ ছিল না।

তাহলে ‘সনাতন’ শব্দটি কোথায় দাঁড়ায়? ‘সনাতন’ শব্দের অর্থ চিরন্তন, অনাদি বা দীর্ঘকাল ধরে প্রচলিত—প্রসঙ্গ অনুসারে এর অর্থের সূক্ষ্ম পার্থক্য হতে পারে। ধর্মীয় সাহিত্যে শব্দটি চিরস্থায়ী নীতি, কর্তব্য, সত্য বা ধর্মীয় আদর্শ বোঝাতে ব্যবহৃত হয়েছে। কিন্তু কোনও গ্রন্থে ‘সনাতন’ শব্দের উপস্থিতি দেখেই ধরে নেওয়া যায় না যে সেই যুগে সমস্ত সংশ্লিষ্ট মানুষ নিজেদের একটি একক ধর্মীয় পরিচয়ে ‘সনাতন ধর্মাবলম্বী’ বলতেন।

এখানেই ইতিহাসের একটি মৌলিক পার্থক্য রয়েছে—কোনও শব্দের প্রাচীন ব্যবহার এবং সেই শব্দের ভিত্তিতে একটি বৃহত্তর ধর্মীয় পরিচয়ের প্রতিষ্ঠা একই ঘটনা নয়। একটি শব্দ বহু শতাব্দী ধরে নানা অর্থে ব্যবহৃত হতে পারে। পরে সেই শব্দ কোনও সম্প্রদায়, ধর্মীয় ঐতিহ্য বা বৃহত্তর পরিচয়ের নাম হিসেবে বিশেষ গুরুত্ব পেতে পারে। তাই শব্দের ইতিহাস অনুসন্ধানের পাশাপাশি তার সামাজিক ব্যবহারও পরীক্ষা করতে হয়।

একইভাবে ‘হিন্দু’ শব্দের ইতিহাস অনুসন্ধান করলেও দেখতে হবে, কখন শব্দটি প্রথম ব্যবহৃত হয়েছিল, কোন ভাষায় ব্যবহৃত হয়েছিল, কাদের বোঝাতে ব্যবহৃত হয়েছিল এবং কোন সময়ে তা ধর্মীয় পরিচয়ের অর্থে আরও ব্যাপক হয়ে উঠেছিল। এই প্রশ্নগুলির উত্তর একটিমাত্র শাস্ত্রের মধ্যে পাওয়া যাবে না। ভাষাতত্ত্ব, শিলালিপি, বিদেশি বিবরণ, ধর্মীয় সাহিত্য এবং সামাজিক ইতিহাস—সব কিছুর তুলনামূলক বিচার প্রয়োজন।

প্রাচীন ভারতীয়রা নিজেদের কী বলতেন—এই প্রশ্নের তাই কোনও একক উত্তর নেই। কেউ বৈদিক ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, কেউ শিব বা বিষ্ণু কিংবা দেবীর উপাসক, কেউ বিশেষ দার্শনিক বা সাধনাপথের অনুসারী, আবার কেউ নিজের অঞ্চল, গোষ্ঠী বা সামাজিক পরিচয় দিয়েই পরিচিত হতেন। এই পরিচয়গুলির অনেকগুলিই একে অপরের সঙ্গে মিশে ছিল; সব মানুষের জন্য একই পরিচয় প্রযোজ্য ছিল না।

এই বহুত্বকে স্বীকার করলেই ইতিহাসের কোনও ধর্মীয় ঐতিহ্যের গুরুত্ব কমে যায় না। বরং বোঝা যায়, ভারতীয় ধর্মীয় সংস্কৃতি দীর্ঘ সময় ধরে নানা ধারা, বিশ্বাস, দর্শন ও আচারকে ধারণ করে বিকশিত হয়েছে। আজকের পরিচয়কে সম্মান করার পাশাপাশি অতীতের পরিচয়গুলিকেও তাদের নিজস্ব ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে বোঝা জরুরি।

এই অনুসন্ধানের উদ্দেশ্য কোনও ধর্মীয় বিশ্বাসকে ছোট করা নয়। উদ্দেশ্য হলো, বিশ্বাসের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই ইতিহাসের প্রশ্নগুলির উত্তর খোঁজা। কারণ, কোনও পরিচয়ের ইতিহাস বুঝতে হলে শুধু সেই পরিচয়ের বর্তমান অর্থ জানলেই চলে না; জানতে হয় তার শব্দ, ব্যবহার, পরিবর্তন এবং বিকাশের দীর্ঘ পথও।

সূত্র
1. ঋগ্বেদ ও বৈদিক সাহিত্যে ‘আর্য’, ‘ধর্ম’ এবং বৈদিক আচারসংক্রান্ত আলোচনা।
2. গেরার কোলাস, বৈষ্ণব ঐতিহ্যের ইতিহাস, হিন্দুধর্মের সহচর গ্রন্থ।
3. পিটার বিসপ, শৈব ঐতিহ্যের ইতিহাস, অক্সফোর্ডের ধর্মবিষয়ক গবেষণা–সংকলন।
4. আর. এন. পানিক্করের গবেষণা, প্রাচীন ইতিহাস ও আধুনিক হিন্দু পরিচয়ের ধারণা, আধুনিক এশীয় অধ্যয়ন পত্রিকা।
5. প্রাচীন ভারতীয় ধর্মীয় ধারার বৈচিত্র্য বিষয়ে মহারাষ্ট্র রাজ্য পাঠ্যপুস্তক ব্যুরোর ইতিহাসবিষয়ক পাঠ্য।
পরবর্তী পর্ব

পর্ব ১৩ — ইসলামের আগেই কি ‘হিন্দু’ শব্দ ছিল?

এই পর্বে একটি প্রচলিত ধারণাকে পরীক্ষা করা হবে—

“মুসলমানরা ভারতীয়দের হিন্দু নাম দিয়েছিল”—এটি কি সম্পূর্ণ সত্য?

আকেমেনীয় যুগের ঐতিহাসিক প্রমাণের আলোকে অনুসন্ধান করা হবে ‘হিন্দু’ শব্দের প্রাচীনতম নির্দিষ্ট ব্যবহার। ইসলামের আবির্ভাবের বহু শতাব্দী আগেই প্রাচীন পারস্যের শিলালিপিতে ‘হিন্দুশ’ নামের উল্লেখ পাওয়া যায়। এই শব্দের অর্থ কী ছিল, কাদের বোঝাতে এটি ব্যবহৃত হয়েছিল এবং কীভাবে একটি ভৌগোলিক পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত শব্দ পরবর্তী সময়ে ধর্মীয় পরিচয়ের অর্থও অর্জন করল—পরবর্তী পর্বে থাকবে তার অনুসন্ধান।

— লিখছেন অনিরুদ্ধ পাল

“বিশ্বাসের প্রতি শ্রদ্ধা, ইতিহাসের প্রতি দায়বদ্ধতা।”

Published on: অক্টো ১৮, ২০২৬ at ১১:২৯


শেয়ার করুন