
Published on: অক্টো ১৮, ২০২৬ at ২৩:১৪
এসপিটি নিউজ, কলকাতা, ১৮ অক্টোবর: কেউ অনেক দিন আগে থেকেই পরিকল্পনা করেছিলেন কলকাতার বিখ্যাত দুর্গাপুজো দেখার। কেউ কাজ শেষ করে বন্ধুদের সঙ্গে বেরিয়েছিলেন ঠাকুর দেখতে। কেউ আবার বাবা-মায়ের হাত ধরে এসেছিল শহরের পুজো দেখবে বলে। ভিন্রাজ্য থেকেও অনেকে এসেছিলেন কলকাতার দুর্গাপুজোর জাঁকজমক উপভোগ করতে। কিন্তু সপ্তমীর সন্ধ্যায় উত্তর কলকাতার চোরবাগান সর্বজনীন দুর্গাপুজো মণ্ডপে ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক দুর্ঘটনা তাঁদের অনেকেরই জীবনের শেষ যাত্রা হয়ে উঠল। ঠাকুর দেখা আর হল না, ঘরেও ফেরা হল না। এই ঘটনায় ১৯ জনের মৃত্যু এবং অন্তত ২৫ জনের আহত হওয়ার খবর সামনে এসেছে। শোকের ছায়া নেমে এসেছে একাধিক পরিবারে। ছারখার ১৬টি পরিবার।
শনিবার সপ্তমীর সন্ধ্যায় উত্তর ও মধ্য কলকাতার বিভিন্ন এলাকায় প্রবল বৃষ্টি শুরু হয়। রাস্তায় যানজট তৈরি হওয়ার পাশাপাশি পুজোমণ্ডপগুলিতে দর্শনার্থীদের ভিড়ও বাড়তে থাকে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য অনুযায়ী, বৃষ্টি থেকে বাঁচতে চোরবাগানের মণ্ডপের ভিতরে ঢোকার চেষ্টা করেন লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা বহু মানুষ। সেই সময় ঠেলাঠেলি শুরু হয়। ভিড়ের চাপে কয়েক জন মাটিতে পড়ে গেলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। একসঙ্গে বহু মানুষের চলাচলের ফলে পদপিষ্ট হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়। শেষ পর্যন্ত প্রাণ হারান ১৯ জন। আহত হন আরও অন্তত ২৫ জন।
মৃতদের মধ্যে অধিকাংশই পশ্চিমবঙ্গের বাসিন্দা। বাকি দু’জন বিহার থেকে আসা বাবা ও ছেলে। পরিবারের সঙ্গে কলকাতার দুর্গাপুজো দেখতে এসেছিলেন অভিষেক শ্রীবাস্তব। তাঁর সঙ্গে ছিলেন স্ত্রী নিভা, ছেলে আয়াংশ-সহ পরিবারের পাঁচ জন সদস্য। কিন্তু সপ্তমীর রাতের দুর্ঘটনায় অভিষেক ও তাঁর ছেলের মৃত্যু হয়। স্বামী ও সন্তানকে হারিয়ে নিভার পরিবারে নেমে এসেছে গভীর শোক। পরিবারের অন্য সদস্যেরা বিহার থেকে কলকাতায় এসে পৌঁছেছেন। তাঁদের অভিযোগ, আগে থেকে যথাযথ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হলে এই মর্মান্তিক ঘটনা এড়ানো সম্ভব হতে পারত।
নিউ টাউনের গৌরাঙ্গনগর এলাকার দুই কিশোরী তানিয়া বিশ্বাস ও বর্ণালী হালদারেরও আর বাড়ি ফেরা হল না। দু’জনেরই বয়স ছিল ১৭ বছর। দুই বান্ধবী আগে থেকেই ঠিক করে রেখেছিল, সপ্তমীর দিন শাড়ি পরে কলকাতার পুজো দেখতে যাবে। সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী সেজেগুজে বেরিয়েছিল তারা। কিন্তু চোরবাগানের মণ্ডপে গিয়ে ভয়াবহ দুর্ঘটনার শিকার হয় দুই কিশোরী। একসঙ্গে পুজো দেখতে যাওয়ার আনন্দ যে এভাবে চিরদিনের বিচ্ছেদে পরিণত হবে, তা ভাবতেও পারেনি তাদের পরিবার।
হুগলির বৈদ্যবাটির বাসিন্দা শ্রীপর্ণা পোদ্দার টাটা ক্যানসার হাসপাতালের নার্স ছিলেন। শনিবার সকালে কাজে বেরিয়ে পরে বন্ধুদের সঙ্গে ঠাকুর দেখতে গিয়েছিলেন ২৭ বছরের তরুণী। দুর্ঘটনার খবর পেয়ে তাঁর পরিবারের সদস্য ও প্রতিবেশীরা কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ছুটে যান। কিন্তু একমাত্র সন্তানকে আর জীবিত অবস্থায় ফিরে পাননি তাঁরা। প্রতিবেশীদের কথায়, শ্রীপর্ণা ছিলেন অত্যন্ত প্রাণবন্ত এবং পরোপকারী। পাড়ায় কেউ অসুস্থ হলে সাহায্যের জন্য সবার আগে এগিয়ে আসতেন তিনি। তাঁর মৃত্যুতে শোকস্তব্ধ গোটা এলাকা।
কলকাতার বাগমারির বাসিন্দা শুভম সোনকরও পরিবারের সঙ্গে ঠাকুর দেখতে বেরিয়েছিলেন। বাবা-মা ও বোনের সঙ্গে পুজো দেখতে যাওয়া ৩৩ বছরের এই তরুণের আর বাড়ি ফেরা হয়নি। একটি বেসরকারি সংস্থায় কাজ করতেন তিনি। পরিবারের আর্থিক দায়িত্বের বড় অংশই ছিল তাঁর কাঁধে। মেয়েকে হারিয়ে তাঁর বাবা-মা ভেঙে পড়েছেন। পরিবারের কাছে এই ক্ষতি অপূরণীয়।
উত্তর ২৪ পরগনার নিউ ব্যারাকপুরের লেনিনগড়ের বাসিন্দা প্রিয়া সমাদ্দার ছিলেন এপিসি কলেজের কলা বিভাগের ছাত্রী। ১৯ বছরের প্রিয়া বন্ধুদের সঙ্গে কলকাতায় পুজো দেখতে গিয়েছিলেন। তাঁর বাবা শ্যামল সমাদ্দার পেশায় দর্জি। মেয়ের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর শোক সামলাতে পারছেন না তিনি। যে মেয়েকে ঘিরে ছিল পরিবারের নানা স্বপ্ন, তার এভাবে চলে যাওয়া কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না পরিবারের সদস্যেরা।
আগরপাড়া থেকে বাবা-মায়ের সঙ্গে পুজো দেখতে এসেছিল ১৩ বছরের প্রাঞ্জল সরকার। ভিড়ের চাপে বাবা-মায়ের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে সে। পরে তাকে উদ্ধার করা হলেও প্রাণ বাঁচানো সম্ভব হয়নি। সন্তানকে হারিয়ে শোকে ভেঙে পড়েছেন তার বাবা-মা। প্রাঞ্জলের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই এলাকায় শোকের পরিবেশ তৈরি হয়।
এই দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন কল্পনা জানাও। ভাইপো ও তার বন্ধুদের সঙ্গে ঠাকুর দেখতে গিয়েছিলেন তিনি। তাঁর মৃত্যুতে পরিবারের সদস্যেরা গভীর শোকের মধ্যে রয়েছেন। দুর্ঘটনার পর মণ্ডপের নিরাপত্তাব্যবস্থা, আলোর ব্যবস্থা এবং দর্শনার্থীদের বেরিয়ে যাওয়ার পথ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য অনুযায়ী, বৃষ্টি ও অতিরিক্ত ভিড়ের মধ্যে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে পড়েছিল।
হুগলির বালিয়া গ্রামের টগর বেজ তাঁর ১৪ বছরের ছেলে সন্দীপকে নিয়ে কলকাতায় দুর্গাপুজো দেখতে এসেছিলেন। সঙ্গে ছিলেন আত্মীয় পিয়ালি পরামানিকও। পরের দিন বাড়ি ফিরে পুজোর অভিজ্ঞতা সকলকে শোনানোর কথা ছিল তাঁদের। কিন্তু চোরবাগানের দুর্ঘটনায় টগর, সন্দীপ ও পিয়ালির মৃত্যু হয়। টগরের মেয়ে আগমনী বেজ আহত অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। মৃত্যুসংবাদ গ্রামে পৌঁছতেই শোকের ছায়া নেমে আসে।
বরানগরের বাসিন্দা দিলীপ ঘোষ ও তাঁর স্ত্রী দীপালি ঘোষও সপ্তমীর সন্ধ্যায় একসঙ্গে ঠাকুর দেখতে বেরিয়েছিলেন। দিলীপের বয়স ছিল ৬২ বছর এবং দীপালির ৫৬ বছর। কিন্তু চোরবাগানের দুর্ঘটনার পর দু’জনেরই মৃত্যুসংবাদ পরিবারের কাছে পৌঁছয়। একসঙ্গে বাড়ি থেকে বেরিয়ে আর একসঙ্গে বাড়ি ফেরা হল না তাঁদের। পরিবারের সদস্যদের কাছে এই ঘটনা এক গভীর শূন্যতা তৈরি করেছে।
নদিয়ার চাকদহের নতুনপাড়ার বাসিন্দা আরতি সরকার বিশ্বাসেরও মৃত্যু হয়েছে এই দুর্ঘটনায়। স্বামী রাম সরকারের সঙ্গে ঠাকুর দেখতে এসেছিলেন তিনি। স্বামীর বর্ণনা অনুযায়ী, মণ্ডপে তখন প্রচণ্ড ভিড় ছিল। আচমকা দর্শনার্থীদের বেরিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হলে বহু মানুষ একসঙ্গে বেরোনোর চেষ্টা করেন। সেই হুড়োহুড়ির মধ্যে ভিড়ের চাপে মাটিতে পড়ে যান আরতি। পরে আর তাঁকে বাঁচানো যায়নি। স্ত্রীর মৃত্যুতে ভেঙে পড়েছেন রাম।
এ ছাড়া শ্যামপুকুরের মিঠু মণ্ডল, বালির আকৃতি কুমারী, হাওড়ার বিকাশ ভট্টাচার্য এবং বাঁকরাহাটের স্নেহা ভাণ্ডারীরও মৃত্যু হয়েছে বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। প্রতিটি মৃত্যুর পিছনে রয়েছে একটি করে পরিবার, অসংখ্য স্মৃতি এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে দেখা নানা স্বপ্ন।
চোরবাগানের এই মর্মান্তিক ঘটনা দুর্গাপুজোর মতো বৃহৎ উৎসবে দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। কলকাতার দুর্গাপুজো শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়, বাংলার সংস্কৃতি ও পর্যটনের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। প্রতি বছর রাজ্যের বিভিন্ন জেলা এবং দেশের নানা প্রান্ত থেকে অসংখ্য মানুষ এই উৎসব দেখতে আসেন। তাই পুজোমণ্ডপে ভিড় নিয়ন্ত্রণ, প্রবেশ ও বেরোনোর জন্য আলাদা পথ, পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা, প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবক, জরুরি চিকিৎসা এবং বৃষ্টির সময় বিকল্প পরিকল্পনা থাকা অত্যন্ত জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনও মণ্ডপে অতিরিক্ত ভিড় জমলে দ্রুত প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করা এবং দর্শনার্থীদের নিরাপদ পথে সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। একই সঙ্গে আয়োজক, পুলিশ, দমকল ও বিপর্যয় মোকাবিলা দলের মধ্যে সমন্বয় থাকা দরকার। দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ এবং নিরাপত্তাব্যবস্থায় কোনও গাফিলতি ছিল কি না, তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সামনে আসা জরুরি।
উৎসব মানুষের মধ্যে আনন্দ, সম্প্রীতি ও মিলনের বার্তা নিয়ে আসে। কিন্তু সেই উৎসবের আনন্দ যেন কোনও পরিবারের কাছে চিরদিনের কান্না হয়ে না থাকে, তা নিশ্চিত করা প্রশাসন ও পুজোর আয়োজকদের বড় দায়িত্ব। চোরবাগানের এই মর্মান্তিক ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে আগামী দিনে আরও নিরাপদ পুজো আয়োজনের ব্যবস্থা করা এখন সময়ের দাবি।
Published on: অক্টো ১৮, ২০২৬ at ২৩:১৪




