
Published on: সেপ্টে ২৮, ২০২৫ at ২১:১১
Reporter: Aniruddha Pal

এসপিটি নিউজ, কলকাতা, ২৮ সেপ্টেম্বর : বিশ্ব পর্যটন দিবসে কলকাতায় সবচেয়ে বড় এবং জাঁকজমকপূর্ণ ভাবে উদযাপন করেছে অ্যাসোসিয়েশন অব ট্যুরিজম সার্ভিস প্রোভাইডার্স অব বেঙ্গল বা এটিএসপিবি। তারা একাধিক কর্মসূচি নিয়েছিল। তবে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল বনেদি বাড়ির দুর্গাপুজো ভ্রমম। উত্তর ও দক্ষিণ কলকাতার দুটি বিদ্যালয়ের প্রায় শতাধিক ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়ে বাসে চেপে কলকাতার সেরা তিন বনেদি বাড়ির দুর্গাপুজো ভ্রমণ করে। যানবাজারে রানী রাসমনির বাড়ির পুজো। বিডন স্ট্রিটে ছাতু বাবু এবং লাটু বাবুর বাড়ির পুজো এবং শোভাবাজার রাজবাড়ির দুর্গাপুজো।
শ্যামবাজারের পার্ক ইনস্টিটিউশন এবং দক্ষিণ কলকাতার খানপুর নির্মলা বালা সরকার প্রাইমারি গার্লস স্কুলের প্রায় ১৩০জন ছাত্র-ছাত্রী নিয়ে বাসে চেপে রওনা হয় এটিএসপিবি-র সদস্যরা। প্রথমে পৌঁছন যানবাজারে রানী রাসমনির বাড়ির পুজো প্রাঙ্গনে। সেখানে গিয়ে দেখা গেল এখন প্রস্তুতি চরমে। দেখা হয়ে গেল পুজো উদ্যোক্তা যিনি রানী রাসমনির বাড়ির ষষ্ঠ বংশধর বলে পরিচয় দেন। তার নাম প্রসূন হাজরা। দুর্গা ওন্নগনে দাঁড়িয়েই তাঁর সঙ্গে কথা হচ্ছিল। জানালেন এই পুজোর সম্পর্কে কিছু কথা।
রানী রাসমনির বাড়ির পুজো
রানী রাসমনির কোনও পুত্র সন্তান ছিল না। তাঁর তিন মেয়ে ছিল। তাই মনে করা হয় যে পুজো উদ্যোক্তারা সকলেই রানী রাসমনির মেয়ের দিকের বংশধর। তেমনই একজন হলেন প্রসূন হাজরা। তিনি বলেন- “এই পুজো প্রথম শুরু করেছিলেন রানীমার শ্বশুরমশাই প্রীতিরাম দাস মহাশয়। ১৭৯০ সালে প্রথম এই পুজো শুরু হয়। সেই থেকে ২০২৫ সাল অবধি টানা হয়ে আসছে এই পুজো। এই পুজোটা সঙ্কল্প করে আমি করি। এই পুজোর দায়িত্বে আমি , আমার বোন, ভাইপো আমরা সবাই মিলে করি। এবার ২৩৫ বছরে পড়ছে এই পুজো। এই পুজোর বিশেষত্ব হল, ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ এখানে সখি বেশে পুজো করেছিলেন। একবার এসে এখানে তিনি এক মাস ছিলেন। এক মাস থেকে তিনি দুর্গা পুজো করে , জগদ্ধাত্রী পুজো করে দক্ষিণেশ্বর মন্দিরে ফিরে গিয়েছিলেন। পুজোয় ছাগ বলি প্রথা বন্ধ হয়ে গিয়েছে। আমরা ২০০৩ সালে বড়দের বুঝিয়ে ছাগ বলি প্রথা বন্ধ করে এখন তার বদলে আখ, চালকুমড়ো এই সব বলিদান প্রথা চালু করেছি। তার আগে সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী, সন্ধিপুজো মিলিয়ে মোট সাতটি ছাগ বলি দেওয়া হত। আমাদের পুজো শুরু হয় প্রতিপদ থেকে। আমাদের বোধন ঘরে প্রতিপদ থেকে পুজো হয়। এই বোধন ঘরে আমাদের হোমকুন্ড আছে। সপ্তমী, অষ্টমী, নবমীতে যে হোম হয় তা হয় এই বোধন ঘরে। এখানে ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ হোমও করেছিলেন। সপ্তমীতে নবপত্রিকা স্নানের পর এই ঘট বোধনের ঘর থেকে মাতৃপ্রতিমার সামনে স্থাপন করা হয়।“
শোভাবাজার রাজবাড়ির পুজো
এরপর যাওয়া হয় শোভাবাজার রাজবাড়িতে। এখানে দেখা গেল জনপ্লাবন । দূর থেকেই মাতৃপ্রতিমার ছবি নিতে হল। শোভাবাজার রাজবাড়ির দুর্গাপূজা কলকাতার সবচেয়ে প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী দুর্গাপুজোগুলির মধ্যে অন্যতম। অবিভক্ত বাংলায় ১৭৫৭ খৃষ্টাব্দে দুটি পুজো হয়েছিল। একটা কৃষ্ণনগরে মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রের দুর্গাপুজো এবং অপরটি শোভাবাজার রাজবাড়ির দুর্গাপুজো। এখানে পুজোর সূচনা করেছিলেন রাজা নবকৃষ্ণ দেব।এই পূজাটিকেই কলকাতার প্রথম ‘দুর্গোৎসব’ হিসেবে গণ্য করা হয়, যেখানে পুজোকে কেন্দ্র করে একটি বৃহত্তর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল।রাজা নবকৃষ্ণ দেবের আমন্ত্রণে লর্ড ক্লাইভ নিজে এই পুজোয় অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। একসময় এখানে বিখ্যাত ব্যক্তিরা আসতেন এবং নাচ-গান ও পান-ভোজনের এলাহি আয়োজন থাকতো। শোভাবাজার রাজবাড়ির প্রতিমা একচালার এবং ডাকের সাজে সজ্জিত। একসময় জার্মানি থেকে রুপোর সাজ আনানো হতো। বর্তমানে সেই রীতি মেনে দেবী ও তাঁর দুই কন্যার সাজে রুপোলি রাংতার প্রাধান্য থাকে, যা থেকে ‘ডাকের সাজ’ শব্দবন্ধের উৎপত্তি। আরও জানা যায়, ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ যখন তিনি রামকৃষ্ণ হননি যখন তাঁকে গদাধর চট্টয়োপাধ্যায় নামেই সবাই জানত সেইসময় তিনি নাকি টানা ৯০ দিন এখানে মায়ের পুজো করেছিলেন। এরপর দক্ষিণেশ্বরে চলে যাওয়ার পর আর তিনি আসেননি। তখন একদিন মা ঠাকুরকে স্বপ্ন দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, কি রে আমার এখানে আসার কথা ভুলেই গেলি নাকি!এই স্বপ্ন পাওয়ার পরই ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ ছুটে এসেছিলেন শোভাবাজার রাজবাড়ি। দুর্গা দালানে গিয়ে মায়ের সামনে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করেছিলেন। আরও শোনা যায়, সাধক রামপ্রসাদের পায়ের ধুলোয় নাকি পড়েছে এই রাজবাড়িতে। তিনি নাকি নিয়মিত এসে উদাত্ত কণ্ঠে মা’কে গান শোনাতেন। এই সব নানা স্মৃতি জড়িয়ে আছে রাজবাড়ির কোনায় কোনায়।
এই রাজবাড়ির দুর্গা পূজা বাংলার বনেদি বাড়ির পূজার এক উজ্জ্বল উদাহরণ, যা ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক হিসেবে আজও টিকে আছে।
ছাতু বাবু ও লাটু বাবুর বাড়ির পুজো
সবশেষ যাওয়া হয়েছিল বিডন স্ট্রিটে লাটু বাবুর বাড়ি। লাটু বাবু এবং ছাতু বাবুদের বাড়ির দুর্গাপুজো কলকাতার বনেদি বাড়িগুলির পুজোর মধ্যে অন্যতম প্রাচীন ও বিখ্যাত। এটি মূলত রামদুলাল নিবাস নামে পরিচিত। শভাবাজার রাজবাড়ির পুজো যেমন ট্রাস্টি বোর্ড চালায় ঠিক তেমনই লাটু বাবুর বাড়ির দুর্গাপুজোও চালায় ট্রাস্টি বোর্ড। ঠাকুর দালানে ওঠার বাঁদিকে লিখিতভাবে কিছু গুরুত্বপূর্ণ লেখা চোখে পড়ল।
সেখানে লেখা আছে- “ঐতিহাসিক নিরীক্ষায় দেখা যায় যে রামদুলাল দে (সরকার)স্বাধীনোত্তর মার্কিন এবং ভারতের বাণিজ্যের পথিকৃত। তাঁহার জীবনকাল ১৭৫২ – ১৮২৫ খ্রিষ্টাব্দ। তিনি খুবই অল্প নয়সে ব্যবসায় সু-প্রতিষ্ঠিত হইয়া তাঁহার এই বসত বাটিতে সমস্ত পুজোর প্রবর্তন করেন। আনুমানিক ১৭৮০ খৃঃ হিতে ইহার সূচনা। তাঁহার মৃত্যুর পর তাঁহার পুত্রদ্বয় আশুতোষ দেব (ছাতু বাবু) ও প্রমথ নাথ দেব (লাটু বাবু) এবং তাঁহাদেরও মৃত্যুর পর রামদুলালের পৌত্র অনাথ নাথ দেব সেই ঐতিহ্য রক্ষা করেন। অনাথ নাথ দেবের মৃত্যুর পর তাঁহার পাঁচ পুত্র ত্রিপথ নাথ দেব, পশুপতি নাথ দেব , ভূপতি নাথ দেব, নৃপতি নাথ দেব ও শ্রীপতি নাথ দেব এই ঐতিহ্য রক্ষার চিরস্থায়ী ব্যবস্থার উদ্দেশ্যে অনাথ নাথ দেব ট্রাস্ট ১৯১৯ খৃঃ প্রতিষ্ঠা করেন।“
এই বাড়িতে শাক্ত, বৈষ্ণব ও শৈব – এই তিনটি মতের মিলনে দেবীর আরাধনা করা হয়ে থাকে। উত্তর কলকাতার বিডন স্ট্রিটে অবস্থিত এই প্রাচীন বাড়ির দুর্গাপুজো আজও তার জাঁকজমক, ঐতিহ্য এবং বনেদিয়ানার জন্য বিশেষভাবে পরিচিত।
লাটু বাবুর বাড়ির দুর্গা দালানে দাঁড়িয়ে শ্যামবাজার পার্ক ইনস্টিটিউশনের একাদশ শ্রেণির ছাত্রী বলেন- “এদিনের এই ভ্রমণ আমাদের কাছে অসাধারণ। এমন সুন্দর একতা অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারলাম। অনেক কিছু জানতে পারলাম। এটাই আমাদের কাছে বড় দিক।“




Published on: সেপ্টে ২৮, ২০২৫ at ২১:১১



