
Published on: জুলা ২২, ২০২৬ at ২১:৩৯
এসপিটি নিউজ, কলকাতা, ২২ জুলাই: পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় বুধবার নজিরবিহীন হট্টগোলের জেরে বেলেঘাটার তৃণমূল বিধায়ক কুণাল ঘোষকে একদিনের জন্য সাসপেন্ড করা হয়। অধিবেশন চলাকালীন স্পিকারের নির্দেশ অমান্য করে ওয়েলে নেমে প্রতিবাদ জানানো এবং উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি করার অভিযোগে মার্শাল ডেকে তাঁকে কক্ষের বাইরে বের করে দেওয়া হয়। ঘটনাকে কেন্দ্র করে তৃণমূল ও বিজেপি—উভয় পক্ষের বিধায়কদের মধ্যে তীব্র বাকবিতণ্ডা হয়।
কী ঘটেছিল বিধানসভায়?
বিধানসভা সূত্রে জানা গিয়েছে, এদিন বিরোধী দলের মুখ্য সচেতক আখারুজ্জামান বক্তব্য রাখছিলেন। অভিযোগ, সেই সময় কুণাল ঘোষ তাঁর বক্তব্যে আপত্তি জানান এবং তাঁকে বাধা দেন। পরিস্থিতি ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। স্পিকার রথীন্দ্রনাথ বসু বারবার কুণাল ঘোষকে আসনে ফিরে যেতে বলেন এবং সতর্ক করেন। কিন্তু তিনি প্রতিবাদ চালিয়ে গেলে মার্শাল ডেকে তাঁকে বলপ্রয়োগ করে অধিবেশন কক্ষের বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়।
এরপর শিল্পমন্ত্রী তাপস রায় বিধানসভার ৩৪৮(২) ধারায় নোটিস দিয়ে কুণাল ঘোষকে গোটা অধিবেশনের জন্য সাসপেন্ড করার প্রস্তাব দেন। তবে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেন, “ওনাকে বিখ্যাত করার দরকার নেই, একদিনের জন্য সাসপেন্ড করা হোক।” শেষ পর্যন্ত কুণাল ঘোষকে একদিনের জন্য সাসপেন্ড করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
মুখ্যমন্ত্রীর প্রতিক্রিয়া
ঘটনার তীব্র নিন্দা করে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেন, “এমন অসভ্যতা বিধানসভায় আগে দেখিনি। আখারুজ্জামান আগে মন্ত্রী ছিলেন। তাঁকে শারীরিকভাবে নিগ্রহ করতে যাওয়া হয়েছে। এই ঘটনার তীব্র নিন্দা করছি।”
কুণাল ঘোষের বক্তব্য
সাসপেন্ড হওয়ার পর ফেসবুক পোস্টে কুণাল ঘোষ দাবি করেন, তাঁকে পরিকল্পিতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিতর্কে কথা বলতে দেওয়া হচ্ছিল না। তিনি লেখেন, “গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় আমার নাম দল থেকে দেওয়া হলেও বিরোধী মুখ্যসচেতক আখারুজ্জামান তা কেটে দিচ্ছেন। স্বরাষ্ট্র বাজেট বিতর্কেও আমার নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। আমি প্রতিবাদ জানাতেই দমনপীড়ন শুরু হয়। মার্শাল দিয়ে আমাকে বের করে আজকের জন্য সাসপেন্ড করা হয়েছে।”
তিনি আরও অভিযোগ করেন, “বিজেপি চাইছে সরকার তাদের, বিরোধীও হবে তাদের পোষা। তাই আমার কণ্ঠরোধ করা হচ্ছে।” কুণাল ঘোষের দাবি, তাঁকে সাসপেন্ড করার পর তৃণমূলের অন্যান্য বিধায়ক ওয়াকআউট করেন এবং পরে সাংবাদিক বৈঠক করেন।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিন্দা
তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ফেসবুকে কুণাল ঘোষের প্রতি সমর্থন জানিয়ে লেখেন, “একজন বিধায়কের কথা বন্ধ করতে তাঁকে শারীরিক নিগ্রহ করা হয়েছে, মার্শাল দিয়ে বার করে সাসপেন্ড করা হয়েছে। এটি বর্বরোচিত আচরণ।” তিনি অভিযোগ করেন, “গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলিতে কুণালকে বলতে দেওয়া হচ্ছিল না। সরকার পক্ষ প্রকৃত বিরোধী কণ্ঠস্বরকে রুখতে চাইছে।”
মমতার দাবি, “বিধানসভার মধ্যে যদি একজন বিধায়ক আক্রান্ত হন, তবে গণতন্ত্রের অবস্থা কী, তা স্পষ্ট হয়ে যায়। এসব করে তৃণমূল কংগ্রেসকে থামিয়ে রাখা যাবে না।”
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতিক্রিয়া
সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ও ঘটনার নিন্দা করেন। তিনি লেখেন, “বিধানসভার ভেতরে কুণাল ঘোষের সঙ্গে যে আচরণ করা হয়েছে এবং যেভাবে তাঁকে বলপ্রয়োগ করে বের করে দেওয়ার অভিযোগ সামনে এসেছে, তার তীব্র নিন্দা জানাই।”
তিনি বলেন, “গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ভিন্নমত প্রকাশের অধিকার সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত। বিধানসভা হওয়া উচিত যুক্তি ও বিতর্কের পীঠস্থান, শারীরিক বলপ্রয়োগের নয়।” তাঁর মতে, “একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির সঙ্গে এমন আচরণ গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলির মর্যাদাকেও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়।”
রাজনৈতিক তাৎপর্য
ঘটনার পর তৃণমূল বিধায়কদের একাংশ ওয়াকআউট করেন। অন্যদিকে বিজেপি বিধায়করাও কুণাল ঘোষের আচরণের প্রতিবাদ জানিয়ে সরব হন। বিধানসভার ভেতরে বিরোধী কণ্ঠস্বর, বক্তৃতার সুযোগ এবং স্পিকারের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে।
এদিনের ঘটনায় শাসক ও বিরোধী—উভয় পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে গণতন্ত্র ক্ষুণ্ণ করার অভিযোগ তুলেছে। তবে বিধানসভা সচল রাখা এবং বিতর্কের সাংবিধানিক পরিসর বজায় রাখার প্রশ্নে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা আরও তীব্র হওয়ার ইঙ্গিত মিলছে।
Published on: জুলা ২২, ২০২৬ at ২১:৩৯




