

Published on: জুলা ১১, ২০২৬ at ০১:২৯
Reporter: Aniruddha Pal
এসপিটি নিউজ, কলকাতা, ১০ জুলাই: পূর্ব ভারতের বৃহত্তম ট্রাভেল ট্রেড প্রদর্শনী TTF (Travel & Tourism Fair) Kolkata 2026-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উঠে এল পর্যটন শিল্পকে ঘিরে নতুন আশার বার্তা। পশ্চিমবঙ্গের পর্যটনমন্ত্রী ড. শঙ্কর ঘোষ ঘোষণা করলেন, রাজ্যের পর্যটন সম্ভাবনাকে বাস্তব সাফল্যে রূপ দিতে নতুন সরকার একটি সুসংহত পর্যটন নীতি প্রণয়নের পথে এগোচ্ছে। একই সঙ্গে দার্জিলিংকে আন্তর্জাতিক মানের ‘গ্লোবাল ডেস্টিনেশন’ হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে কেন্দ্রের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ চলছে বলেও জানান তিনি।
বিশ্ব বাংলা মেলা প্রাঙ্গণে আয়োজিত এই আন্তর্জাতিক ট্রাভেল ট্রেড শোর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন গোয়ার পর্যটনমন্ত্রী রোহন খাউন্টে, উত্তরাখণ্ডের পর্যটনমন্ত্রী শতপাল মহারাজ, থাইল্যান্ডের কনসাল জেনারেল সিরিপর্ন তান্তিয়াথেপ, ছত্তিশগড় ট্যুরিজম বোর্ডের চেয়ারম্যান নীলু শর্মা, ফেয়ারফেস্ট মিডিয়া লিমিটেডের চেয়ারম্যান ও সিইও সঞ্জীব আগরওয়াল-সহ দেশ-বিদেশের পর্যটন শিল্পের প্রতিনিধিরা।
ড. শঙ্কর ঘোষ বলেন, পশ্চিমবঙ্গের পর্যটন দপ্তরের প্রথম লক্ষ্য হল রাজ্যের বিপুল পর্যটন সম্ভাবনাকে কার্যকর উন্নয়নে রূপান্তর করা। তিনি জানান, নতুন সরকার অন্যান্য রাজ্যের সফল পর্যটন মডেল, নীতি ও অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে সেগুলির উপযোগী দিক পশ্চিমবঙ্গে বাস্তবায়ন করতে চায়। তাঁর কথায়, “Partnership in Progress”-ই হবে আগামী দিনের পর্যটন উন্নয়নের মূলমন্ত্র।
তিনি আরও জানান, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ঘোষিত “One State, One Global Destination” কর্মসূচির আওতায় পশ্চিমবঙ্গ ইতিমধ্যেই দার্জিলিংকে বিশ্বমানের পর্যটন গন্তব্য হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে। সম্প্রতি কেন্দ্রীয় পর্যটনমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে তিনি পশ্চিমবঙ্গের জন্য একটি নয়, দুটি Global Destination-এর দাবি জানান। সেই প্রস্তাবে কেন্দ্র ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে বলেও তিনি জানান।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ফেয়ারফেস্ট মিডিয়া লিমিটেডের চেয়ারম্যান ও সিইও সঞ্জীব আগরওয়াল বলেন, TTF-এর মূল উদ্দেশ্য শুধুমাত্র একটি প্রদর্শনী আয়োজন নয়; বরং পর্যটন শিল্পের সঙ্গে যুক্ত অংশীদারদের মধ্যে সরাসরি সাক্ষাৎ, মতবিনিময়, জ্ঞান ভাগাভাগি এবং নতুন ব্যবসায়িক সম্পর্ক গড়ে তোলার সুযোগ সৃষ্টি করা। তিনি জানান, ১৯৮৯ সালে শুরু হওয়া TTF আজ দেশের সাতটি শহরে বছরে আটটি ট্রাভেল ট্রেড শোর আয়োজন করছে। কলকাতার পর পর্যায়ক্রমে আহমেদাবাদ, মুম্বই, দিল্লি ও হায়দরাবাদে TTF অনুষ্ঠিত হবে এবং বছরের শেষ প্রান্তে OTM Mumbai অনুষ্ঠিত হবে, যা বর্তমানে এশিয়ার অন্যতম শীর্ষ ট্রাভেল ট্রেড শো হিসেবে পরিচিত।
বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও নানা বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জের মধ্যেও ভারতের অভ্যন্তরীণ পর্যটন এবং প্রতিবেশী দেশগুলির সঙ্গে পর্যটন বিনিময়ের সম্ভাবনা উজ্জ্বল বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে, দেশের মোট জিডিপির প্রায় ১০ শতাংশ এবং কর্মসংস্থানের ১০ শতাংশেরও বেশি পর্যটন শিল্পের অবদান। তাই এই শিল্পকে আরও শক্তিশালী করতে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের গুরুত্ব অপরিসীম।
সঞ্জীব আগরওয়াল বলেন, পশ্চিমবঙ্গ সরকার যদি চায়, তাহলে রাজ্যের পর্যটন প্রচার, বিপণন এমনকি পর্যটন নীতি প্রণয়নের ক্ষেত্রেও ফেয়ারফেস্ট মিডিয়া তাদের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিতে প্রস্তুত। পশ্চিমবঙ্গ যেভাবে নতুন করে নিজের পর্যটন সম্ভাবনাকে বিশ্বের সামনে তুলে ধরার উদ্যোগ নিয়েছে, তাতে সহযোগী হতে পেরে তারা গর্বিত বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
উদ্বোধনী মঞ্চে গোয়ার পর্যটনমন্ত্রী রোহন খাউন্টে বলেন, পশ্চিমবঙ্গে নতুন সরকারের সূচনার সঙ্গে সঙ্গে পর্যটন ক্ষেত্রেও নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে। খাদ্যসংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও মানুষের আবেগের মিল দুই রাজ্যের পর্যটন সম্পর্ককে আরও মজবুত করবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। তিনি গোয়াকে শুধু সমুদ্রসৈকতের গন্তব্য নয়, বরং সংস্কৃতি, আধ্যাত্মিকতা, ওয়েলনেস, গ্রামীণ পর্যটন ও আন্তর্জাতিক ইভেন্টের কেন্দ্র হিসেবে তুলে ধরার আহ্বান জানান।
উত্তরাখণ্ডের পর্যটনমন্ত্রী শতপাল মহারাজ বলেন, পূর্ব ভারতের মানুষের সঙ্গে উত্তরাখণ্ডের সম্পর্ক শুধুমাত্র পর্যটনের নয়, বরং সংস্কৃতি ও আবেগেরও। তিনি অ্যাডভেঞ্চার, আধ্যাত্মিক এবং গ্রামীণ পর্যটনের প্রসারে পূর্ব ভারতের ট্রাভেল ট্রেড ও গণমাধ্যমের সহযোগিতা কামনা করেন।
থাইল্যান্ডের কনসাল জেনারেল সিরিপর্ন তান্তিয়াথেপ বলেন, আজকের পর্যটন শুধু একটি গন্তব্যে পৌঁছানোর বিষয় নয়, বরং এমন অভিজ্ঞতা তৈরি করা, যা মানুষের হৃদয়ে দীর্ঘদিন বেঁচে থাকে। তিনি ভারতকে থাইল্যান্ডের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদার হিসেবে উল্লেখ করে জানান, গত বছর প্রায় ২৫ লক্ষ ভারতীয় পর্যটক থাইল্যান্ড সফর করেছেন। কলকাতা ও পূর্ব ভারতের সঙ্গে পর্যটন ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক আরও জোরদার করতে তিনি Amazing Thailand Pavilion এবং আগামী Thai Film Festival 2026-এ অংশগ্রহণের আমন্ত্রণ জানান।
অন্যদিকে, ছত্তিশগড় ট্যুরিজম বোর্ডের চেয়ারম্যান নীলু শর্মা বলেন, ছত্তিশগড় এখন শুধু খনিজ সম্পদের রাজ্য নয়; এটি প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, জলপ্রপাত, গুহা, জাতীয় উদ্যান, লোকসংস্কৃতি এবং আদিবাসী ঐতিহ্যের এক অনন্য পর্যটনভূমি। একসময়ের নকশালপ্রভাবিত বাস্তার অঞ্চল এখন নিরাপদ ও পর্যটকবান্ধব হয়ে উঠেছে বলেও তিনি জানান।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের এক ব্যতিক্রমী আকর্ষণ ছিল সুন্দরবনের স্বনির্ভর মহিলা গোষ্ঠীর অংশগ্রহণ। অতিথিদের হাতে উপহার হিসেবে তুলে দেওয়া হয় সুন্দরবনের খাঁটি দেশি গরুর গাওয়া ঘি এবং বিখ্যাত সুন্দরবনের মধু। আয়োজকদের বক্তব্য, এই উদ্যোগের মাধ্যমে সুন্দরবনের হোমস্টে সংস্কৃতির পাশাপাশি স্থানীয় কৃষিপণ্য ও গ্রামীণ অর্থনীতিকেও আন্তর্জাতিক পর্যটন বাজারের সঙ্গে পরিচিত করে তোলার চেষ্টা করা হয়েছে।
অনুষ্ঠানের শেষে থাইল্যান্ডের শিল্পীদের মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক পরিবেশনার মাধ্যমে TTF Kolkata 2026-এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়। আগামী তিন দিন ধরে চলবে এই আন্তর্জাতিক ট্রাভেল ট্রেড শো, যেখানে দেশ-বিদেশের শতাধিক পর্যটন সংস্থা, রাজ্য পর্যটন দপ্তর, আন্তর্জাতিক ডেস্টিনেশন, ট্রাভেল কোম্পানি এবং আতিথেয়তা শিল্পের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করবেন।
TTF Kolkata 2026-এর উদ্বোধনী মঞ্চ থেকে যে বার্তা স্পষ্ট হয়েছে, তা হলো—পর্যটনের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে আন্তঃরাজ্য সহযোগিতা, আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব এবং অভিজ্ঞতা বিনিময়ের ওপর। আর সেই নতুন যাত্রায় পশ্চিমবঙ্গ নিজেকে দেশের অন্যতম শীর্ষ পর্যটন গন্তব্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।






Published on: জুলা ১১, ২০২৬ at ০১:২৯



