
Published on: অক্টো ১৯, ২০২৬ at ১২:৫১
ড.সম্রাট তপাদার | সংবাদ প্রভাকর টাইমস
এসপিটি বিশেষ প্রতিবেদন: শারদীয়ার আলোয় যখন আমরা মৃন্ময়ী দুর্গাকে বরণ করে নিই, যখন দেবীর কাছে শক্তি, সাহস ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করার প্রেরণা চাই, তখন ইতিহাসের পাতায় থাকা এক বিস্মৃত নারীকে কি আমরা মনে করি? তাঁর নাম নীরা আর্য। আজাদ হিন্দ ফৌজের রানি ঝাঁসি রেজিমেন্টের সঙ্গে যুক্ত এই স্বাধীনতা সংগ্রামীর জীবন জুড়ে রয়েছে দেশপ্রেম, সাহস, নির্যাতন এবং অবহেলার এক বেদনাময় কাহিনি। তাঁকে ঘিরে প্রচলিত নানা বিবরণের মধ্যে কিছু ঘটনা সরকারি সূত্রে উল্লেখিত, আবার কিছু কাহিনির ঐতিহাসিক সত্যতা নিয়ে আরও গবেষণার প্রয়োজন। তবুও দেশের স্বাধীনতার জন্য সর্বস্ব ত্যাগের যে আদর্শ তাঁর জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে, তা আজও আমাদের ভাবায়।
১৯০২ সালের ৫ মার্চ উত্তরপ্রদেশের বাগপত জেলার খেকড়া গ্রামে নীরা আর্যর জন্ম বলে বিভিন্ন জীবনীমূলক বিবরণে উল্লেখ রয়েছে। তাঁর বাবা শেঠ ছাজুরাম এবং মা লক্ষ্মী দেবী। ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনার প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল বলে জানা যায়। পরবর্তী সময়ে কলকাতায় পড়াশোনা করতে এসে তাঁর মনে দেশপ্রেমের ভাবনা আরও গভীর হয় বলে প্রচলিত জীবনীতে উল্লেখ রয়েছে। ব্রিটিশ শাসনের অধীনে দেশের মানুষের দুর্দশা তাঁকে স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখতে উদ্বুদ্ধ করেছিল।
পরিবারের সিদ্ধান্তে তাঁর বিয়ে হয় শ্রীকান্ত জয়রঞ্জন দাসের সঙ্গে। বিভিন্ন বিবরণ অনুযায়ী, তাঁর স্বামী ব্রিটিশ পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। কিন্তু নীরা আর্যর মনে তখন অন্য স্বপ্ন—দেশকে পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করা। একদিকে ব্রিটিশ সরকারের প্রতি আনুগত্য, অন্যদিকে দেশের স্বাধীনতার জন্য আত্মনিয়োগ—এই দুই বিপরীত আদর্শ তাঁদের দাম্পত্য সম্পর্কে গভীর সংঘাত তৈরি করেছিল বলে প্রচলিত কাহিনিতে উঠে এসেছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় আজাদ হিন্দ ফৌজের কার্যকলাপ নতুন গতি পায়। ১৯৪৩ সালে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর নেতৃত্বে গড়ে ওঠে রানি ঝাঁসি রেজিমেন্ট। ক্যাপ্টেন লক্ষ্মী সহগলের নেতৃত্বে এই নারী বাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন বহু ভারতীয় নারী। নীরা আর্যও এই বাহিনীর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। স্বাধীনতার লড়াইয়ে নারীরাও যে অস্ত্র হাতে দেশের জন্য এগিয়ে আসতে পারেন, রানি ঝাঁসি রেজিমেন্ট ছিল তার এক ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত।
নীরা আর্যকে ঘিরে প্রচলিত জীবনীমূলক বিবরণে তাঁর গুপ্তচর হিসেবে কাজ করার কথাও উঠে এসেছে। ভারত সরকারের আজাদি কা অমৃত মহোৎসবের ওয়েবসাইটেও তাঁকে আজাদ হিন্দ ফৌজের প্রথম মহিলা গুপ্তচর হিসেবে পরিচিত করা হয়েছে। ‘নাগিনী’ নামেও তিনি পরিচিত ছিলেন বলে বিভিন্ন লেখায় দাবি করা হয়। তবে নেতাজি নিজে তাঁকে এই নাম দিয়েছিলেন কি না, সে বিষয়ে নির্ভরযোগ্য সমকালীন প্রমাণ আরও যাচাই করা প্রয়োজন।
তাঁর জীবনকে ঘিরে সবচেয়ে আলোচিত ও নাটকীয় ঘটনাগুলির একটি হল স্বামীর সঙ্গে সংঘাত। প্রচলিত বিবরণ অনুযায়ী, নীরা আর্যর স্বামী নেতাজিকে হত্যার উদ্দেশ্যে তাঁকে অনুসরণ করেছিলেন। একদিন নেতাজির সঙ্গে দেখা করার সময় তিনি গুলি চালান। গুলি নেতাজির গায়ে না লেগে তাঁর গাড়ির চালককে আঘাত করে। এরপর নীরা আর্য নিজের স্বামীকে হত্যা করেন বলে সরকারি জীবনীমূলক বিবরণে উল্লেখ রয়েছে। ঘটনাটির সমস্ত খুঁটিনাটি নিয়ে আরও ঐতিহাসিক অনুসন্ধান প্রয়োজন হলেও এই কাহিনি নীরা আর্যর জীবনকে ঘিরে প্রচলিত আলোচনার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু।
একজন নারীর জীবনে স্বামী ও সংসারের সম্পর্কের মূল্য কতখানি, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু দেশের স্বাধীনতার প্রশ্নে ব্যক্তিগত সম্পর্কের ঊর্ধ্বে ওঠার যে কঠিন সিদ্ধান্তের কথা নীরা আর্যর জীবনীতে বলা হয়, তা ইতিহাসের এক গভীর ও বেদনাময় অধ্যায়। দেশপ্রেমের সেই সিদ্ধান্তের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে রক্ত, যন্ত্রণা এবং ব্যক্তিগত জীবনের চরম মূল্য।
আজাদ হিন্দ ফৌজের পতনের পর নীরা আর্যর জীবনে নেমে আসে আরও কঠিন সময়। সরকারি বিবরণ অনুযায়ী, তাঁকে আন্দামানের কারাগারে পাঠানো হয়েছিল। নেতাজির অবস্থান ও স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্য নেতাদের সম্পর্কে তথ্য জানার জন্য তাঁর ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয়েছিল বলে বিভিন্ন বিবরণে দাবি করা হয়। তিনি সেই চাপের কাছে নতি স্বীকার করেননি—এমন কথাও তাঁর জীবনকাহিনিতে উঠে এসেছে।
কারাগারে তাঁর ওপর ভয়াবহ শারীরিক নির্যাতন চালানো হয়েছিল বলে পরবর্তী জীবনীমূলক লেখায় উল্লেখ রয়েছে। এমনকি তাঁর স্তন কেটে ফেলার চেষ্টার কথাও কিছু বিবরণে পাওয়া যায়। তবে এই নির্দিষ্ট ঘটনার সব দিক স্বাধীন ঐতিহাসিক প্রমাণ দিয়ে প্রতিষ্ঠিত নয়। তাই তাঁর ওপর নির্যাতনের কথা তুলে ধরার সময় আবেগের পাশাপাশি তথ্যের নির্ভুলতার প্রতিও আমাদের দায়িত্বশীল থাকা প্রয়োজন।
স্বাধীনতার পর নীরা আর্য যথাযথ সম্মান ও স্বীকৃতি পেয়েছিলেন কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। বিভিন্ন জীবনীমূলক বিবরণে তাঁর শেষ জীবনের দারিদ্র্য ও নিঃসঙ্গতার কথা বলা হয়েছে। ফুল বিক্রি করে এবং কাগজের ঠোঙা তৈরি করে দিন কাটানোর কথাও প্রচলিত রয়েছে। তাঁর আত্মজীবনী ‘মেরা জীবন, মেরা সংঘর্ষ’-এর উল্লেখ পাওয়া যায়। এই বই তাঁর জীবন ও সংগ্রাম সম্পর্কে আরও জানার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হতে পারে।
১৯৯৮ সালের ২৬ জুলাই হায়দরাবাদের ওসমানিয়া হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়েছিল বলে বিভিন্ন জীবনীমূলক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে। যে নারী দেশের স্বাধীনতার জন্য নিজের জীবনে এত বড় মূল্য দিয়েছিলেন, তাঁর শেষ জীবন সম্পর্কে প্রচলিত বিবরণ আমাদের মনে করিয়ে দেয়—স্বাধীনতার ইতিহাসে বহু মানুষের অবদান আজও যথাযথ আলোচনার অপেক্ষায় রয়েছে।
দুর্গাপুজো কেবল উৎসব নয়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে শক্তির জাগরণও। যখন আমরা উচ্চারণ করি, ‘যা দেবী সর্বভূতেষু শক্তিরূপেণ সংস্থিতা’, তখন সেই শক্তিকে শুধু মাটির প্রতিমার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলে না। দেশের স্বাধীনতার জন্য যাঁরা নিজেদের জীবন, সংসার ও ব্যক্তিগত সুখ বিসর্জন দিয়েছেন, তাঁদের জীবনেও সেই সাহসের প্রতিফলন দেখা যায়।
নীরা আর্যর জীবনকে ঘিরে প্রচলিত সব কাহিনি সমানভাবে প্রমাণিত না হলেও, আজাদ হিন্দ ফৌজের সঙ্গে তাঁর যোগ এবং স্বাধীনতা সংগ্রামে তাঁর ভূমিকা তাঁকে স্মরণ করার যথেষ্ট কারণ দেয়। ইতিহাসের বিস্মৃত অধ্যায়গুলিকে নতুন করে জানা, তথ্য যাচাই করা এবং পরবর্তী প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা আমাদের দায়িত্ব।
এই দুর্গাপুজোয় দেবী দুর্গার কাছে প্রার্থনা হোক—অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস যেন আমাদের মধ্যে জাগ্রত থাকে। আর স্বাধীনতার জন্য আত্মত্যাগ করা নীরা আর্যর মতো সংগ্রামী নারীদের কথা যেন ইতিহাসের অন্ধকারে হারিয়ে না যায়।
বীরাঙ্গনা নীরা আর্যকে শ্রদ্ধা। স্বাধীনতার সংগ্রামে আত্মনিয়োগ করা সকল বিস্মৃত যোদ্ধাকে প্রণাম।
এই দুর্গা পুজোয়, একজন জীবন্ত দুর্গাকে প্রণাম। ক্যাপ্টেন নীরা আর্য অমর রহে।
তথ্যসূত্র
1. ভারত সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রক — আজাদি কা অমৃত মহোৎসব: ‘নীরা আর্য’ শীর্ষক সরকারি পরিচিতি। জন্ম, আজাদ হিন্দ ফৌজে যোগদান, স্বামীর সঙ্গে সংঘাত, কারাবাস ও মৃত্যুর তথ্যের প্রধান সরকারি সূত্র।
2. নীরা আর্য — ‘মেরা জীবন, মেরা সংঘর্ষ’: তাঁর নামে প্রকাশিত আত্মজীবনী। জীবনের অভিজ্ঞতা ও সংগ্রাম সম্পর্কে জানার জন্য প্রাসঙ্গিক প্রাথমিক সূত্র।
3. গবেষণাপত্র — ‘Neera Arya: A Forgotten Revolutionary of the Indian Freedom Struggle’: নীরা আর্যর জীবন ও স্বাধীনতা সংগ্রামে তাঁর ভূমিকা নিয়ে প্রকাশিত গবেষণামূলক আলোচনা।
4. গবেষণা প্রবন্ধ — Integrated Journal for Research in Arts and Humanities: নীরা আর্যর জীবন, কারাবাস, নির্যাতন ও আত্মজীবনী নিয়ে আলোচনা।
Published on: অক্টো ১৯, ২০২৬ at ১২:৫১




