
Published on: সেপ্টে ১২, ২০২৬ at ২৩:৫৪
সংবাদ প্রভাকর টাইমস | বিশেষ প্রতিবেদন
এসপিটি নিওউজ, নয়াদিল্লি, ১২ সেপ্টেম্বর: সাত বছর পর ভারতে পা রাখলেন চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। আর তাঁর নয়াদিল্লি সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলির একটি হয়ে থাকল প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক। ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে শনিবার নয়াদিল্লিতে মুখোমুখি বসেন দুই নেতা। ২০২০ সালের গালওয়ান সংঘর্ষের পর ভারত–চিন সম্পর্কে যে গভীর অবিশ্বাস তৈরি হয়েছিল, তার মধ্যেই এই বৈঠককে দুই পরমাণু শক্তিধর প্রতিবেশীর সম্পর্ক স্বাভাবিক করার নতুন প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
শি জিনপিংয়ের শেষ ভারত সফর হয়েছিল ২০১৯ সালে। তারপর লাদাখে সীমান্ত সংঘর্ষ, দীর্ঘ সামরিক অচলাবস্থা এবং কূটনৈতিক টানাপোড়েনে দিল্লি–বেজিং সম্পর্ক তলানিতে পৌঁছেছিল। ২০২৪ সালের সীমান্ত-সমঝোতার পর ধীরে ধীরে যে বরফ গলতে শুরু করেছিল, নয়াদিল্লিতে মোদি–শি বৈঠক সেই প্রক্রিয়াকে আরও এক ধাপ এগিয়ে দিল।
সাত বছর পর শি, কেন এত গুরুত্বপূর্ণ এই সফর?
২০১৯ সালের পর শি জিনপিংয়ের প্রথম ভারত সফর শুধু একটি দ্বিপাক্ষিক সফর নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ভারত–চিন সীমান্ত, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, যোগাযোগ, সরবরাহ-শৃঙ্খল এবং বৃহত্তর আন্তর্জাতিক রাজনীতির একাধিক প্রশ্ন।
২০২০ সালের জুনে পূর্ব লাদাখের গালওয়ান উপত্যকায় সংঘর্ষে ২০ জন ভারতীয় সেনা এবং চার জন চিনা সেনা নিহত হওয়ার পর দুই দেশের সম্পর্ক মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সীমান্তে বিপুল সেনা মোতায়েনের পাশাপাশি ভারত চিনা বিনিয়োগ ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে একাধিক বিধিনিষেধ আরোপ করে এবং চিনা মোবাইল অ্যাপ নিষিদ্ধ করে।
পরিস্থিতির পরিবর্তন শুরু হয় ২০২৪ সালের অক্টোবরে সীমান্তে টহল ব্যবস্থা নিয়ে দুই দেশের সমঝোতার পর। এর ফলে পূর্ব লাদাখের দীর্ঘ সামরিক অচলাবস্থা কিছুটা প্রশমিত হয় এবং রাজনৈতিক যোগাযোগ ফের সক্রিয় হয়। পরবর্তী সময়ে বিমান যোগাযোগ, ভিসা পরিষেবা, তীর্থযাত্রা এবং অন্যান্য মানুষের যোগাযোগও ধীরে ধীরে স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বৈঠকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা—সীমান্তে শান্তি
মোদি–শি বৈঠকের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল সীমান্ত প্রশ্ন। প্রধানমন্ত্রী মোদি স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে সীমান্তে শান্তি ও স্থিতিশীলতা ভারত–চিন দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উন্নতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দুই নেতা একমত হয়েছেন যে মতপার্থক্যকে বিরোধে পরিণত হতে দেওয়া উচিত নয় এবং সীমান্ত সমস্যার শান্তিপূর্ণ, ন্যায্য ও গ্রহণযোগ্য সমাধানের জন্য আলোচনা চালিয়ে যেতে হবে।
এটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ সীমান্ত সমস্যা এখনও পুরোপুরি মেটেনি। প্রায় ৩,৮০০ কিলোমিটার দীর্ঘ প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা বরাবর দুই দেশই উল্লেখযোগ্য সামরিক উপস্থিতি বজায় রেখেছে। ফলে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পথে সীমান্তে শান্তি বজায় রাখাই সবচেয়ে বড় শর্তগুলির একটি।
‘মতপার্থক্য যেন বিরোধে না গড়ায়’
বৈঠকের অন্যতম তাৎপর্যপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা হল—দুই দেশ তাদের মতপার্থক্য স্বীকার করলেও সেই মতপার্থক্যকে নতুন সংঘাতের দিকে নিয়ে যেতে চায় না।
চিনের পক্ষ থেকেও দীর্ঘমেয়াদি ও কৌশলগত দৃষ্টিকোণ থেকে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক পরিচালনার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে। শি জিনপিং দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতার ক্ষেত্র বাড়ানোর পাশাপাশি পারস্পরিক সাফল্যে সহায়তাকারী অংশীদার হিসেবে কাজ করার বার্তা দিয়েছেন।
অর্থাৎ, এখনই ভারত–চিন সম্পর্কের পূর্ণ স্বাভাবিকতার ঘোষণা নয়; বরং সংঘাত নিয়ন্ত্রণ, যোগাযোগ বজায় রাখা এবং ধীরে ধীরে আস্থা পুনর্গঠনের পথ—এই তিনটি বিষয়েই জোর দেওয়া হচ্ছে।
বাণিজ্য ঘাটতি—মোদি সরকারের বড় উদ্বেগ
সীমান্তের পাশাপাশি অর্থনৈতিক সম্পর্কও বৈঠকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। দুই দেশের বাণিজ্য ঐতিহাসিকভাবে বড় হলেও ভারতের বাণিজ্য ঘাটতি বিপুল। ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য প্রায় ১৫৫.৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে বলে Reuters জানিয়েছে। এর মধ্যে চিন থেকে ভারতের আমদানি প্রায় ১৩২ বিলিয়ন ডলার। ফলে ভারতের বাণিজ্য ঘাটতি ১০০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি।
ভারতের উদ্বেগ শুধু বাণিজ্যের পরিমাণ নিয়ে নয়, বরং বাণিজ্যের ভারসাম্য নিয়েও। ভারতীয় সংস্থাগুলির জন্য চিনের বাজারে আরও বেশি প্রবেশাধিকার, সরবরাহ-শৃঙ্খলের স্থিতিশীলতা এবং বাজারে সমান সুযোগ—এই বিষয়গুলি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বৈঠকে দুই দেশ বাণিজ্য ঘাটতি, বাজারে প্রবেশাধিকার এবং ব্যবসায়িক সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা করেছে।
অর্থনীতি বনাম কৌশলগত নিরাপত্তা—ভারতের দ্বৈত বাস্তবতা
ভারত–চিন সম্পর্কের সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য এখানেই।
একদিকে ভারত চিনের উপর কৌশলগত নির্ভরতা কমাতে চাইছে। অন্যদিকে শিল্পযন্ত্র, ইলেকট্রনিক্স, রাসায়নিক, যন্ত্রাংশ এবং বিভিন্ন উৎপাদন ক্ষেত্রে চিনা সরবরাহ-শৃঙ্খলের গুরুত্ব এখনও যথেষ্ট। তাই দিল্লির লক্ষ্য শুধু বাণিজ্য বাড়ানো নয়; বরং বাণিজ্যকে আরও ভারসাম্যপূর্ণ এবং স্থিতিশীল করা। এই বাস্তবতার মধ্যেই মোদি–শি বৈঠকে অর্থনৈতিক সহযোগিতার প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
আবার কি শুরু হচ্ছে ভারত–চিন সম্পর্কের নতুন অধ্যায়?
এখনই এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনো সম্ভব নয় যে ভারত–চিন সম্পর্ক পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়ে গিয়েছে। সীমান্ত বিরোধ এখনও রয়েছে। অরুণাচল প্রদেশ নিয়ে চিনের দাবি ভারত মেনে নেয়নি। দুই দেশের মধ্যে সামরিক অবিশ্বাসও পুরোপুরি দূর হয়নি। একই সঙ্গে চিন–পাকিস্তান ঘনিষ্ঠতা এবং ভারত–আমেরিকা কৌশলগত সম্পর্কও দিল্লি–বেজিং সমীকরণকে জটিল করে রেখেছে।
তবে ২০২৪ সালের সীমান্ত-সমঝোতার পর ধারাবাহিক রাজনৈতিক যোগাযোগ, সামরিক স্তরে আলোচনা এবং মানুষের যাতায়াত পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ দেখাচ্ছে যে দুই দেশই আপাতত সংঘাতের বদলে নিয়ন্ত্রিত সহযোগিতার পথ বেছে নিয়েছে।
ব্রিকসের মঞ্চে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের আলাদা গুরুত্ব
মোদি–শি বৈঠকটি হয়েছে ব্রিকসের মঞ্চে। ফলে এর প্রভাব শুধু ভারত–চিন সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।চিন ব্রিকসকে একটি বৃহত্তর বহুপাক্ষিক ও বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে দেখে। ভারতও ব্রিকসকে উন্নয়নশীল ও উদীয়মান দেশগুলির সহযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হিসেবে ব্যবহার করতে চায়। তবে ভারতের অবস্থান হল, ব্রিকস কোনও নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে জোট নয়।
এই জায়গাতেই ভারত ও চিনের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ মিল রয়েছে—দুই দেশই বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থার পক্ষে। কিন্তু সেই বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থার চরিত্র কেমন হবে, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলিতে কার কতটা প্রভাব থাকবে এবং পশ্চিমা দেশগুলির সঙ্গে সম্পর্ক কীভাবে পরিচালিত হবে—এসব প্রশ্নে দুই দেশের দৃষ্টিভঙ্গি সবসময় এক নয়।
আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্কও বড় সমীকরণ
মোদি–শি বৈঠকের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পটভূমি হল ভারত ও চিনের সঙ্গে আমেরিকার সম্পর্ক। ভারত গত কয়েক বছরে আমেরিকার সঙ্গে প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি ও কৌশলগত সহযোগিতা বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে চিনের সঙ্গে আমেরিকার বাণিজ্য ও কৌশলগত প্রতিযোগিতাও আন্তর্জাতিক রাজনীতির অন্যতম বড় বিষয়।
এই পরিস্থিতিতে ভারত ও চিন—দুই দেশই নিজেদের জাতীয় স্বার্থে একে অপরের সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগ বজায় রাখতে আগ্রহী। Reuters-এর বিশ্লেষণেও উঠে এসেছে, ওয়াশিংটনের সঙ্গে জটিল সম্পর্কের মধ্যেও দিল্লি ও বেজিং একটি কার্যকর দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক বজায় রাখার প্রয়োজন অনুভব করছে।
শি জিনপিংয়ের সফর থেকে কী বার্তা গেল?
নয়াদিল্লিতে শি জিনপিংয়ের উপস্থিতি এবং মোদির সঙ্গে তাঁর বৈঠক কয়েকটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে।
প্রথমত, ২০২০ সালের সংঘর্ষের পর সম্পর্ক যে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েনি, দুই দেশই তা দেখাতে চাইছে।
দ্বিতীয়ত, সীমান্তে শান্তি ও স্থিতিশীলতা ছাড়া সম্পর্কের দীর্ঘমেয়াদি উন্নতি সম্ভব নয়—এই বাস্তবতা দুই পক্ষই স্বীকার করছে।
তৃতীয়ত, অর্থনৈতিক সম্পর্ককে নতুন করে সক্রিয় করার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে বাণিজ্য ঘাটতি কমানো এবং বাজারে প্রবেশাধিকারের প্রশ্ন ভারতের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
চতুর্থত, ব্রিকসের মতো বহুপাক্ষিক মঞ্চে ভারত ও চিন প্রতিদ্বন্দ্বী হলেও সম্পূর্ণ মুখোমুখি অবস্থানে যেতে চাইছে না।
পঞ্চমত, এই বৈঠক কোনও তাৎক্ষণিক ‘সম্পূর্ণ সম্পর্ক স্বাভাবিক’ হওয়ার ঘোষণা নয়। বরং এটি কৌশলগত যোগাযোগ পুনরুদ্ধার এবং আস্থা তৈরির একটি ধীর প্রক্রিয়ার অংশ।
ভারতের জন্য লাভ কোথায়?
ভারতের দৃষ্টিতে সবচেয়ে বড় লাভ হল—সীমান্তে উত্তেজনা কমিয়ে অর্থনীতি ও জাতীয় উন্নয়নের দিকে আরও বেশি মনোযোগ দেওয়ার সুযোগ তৈরি হওয়ার চিনের সঙ্গে সীমান্তে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক মোতায়েন ভারতের জন্য বিপুল সম্পদ ও পরিকাঠামোগত চাপ তৈরি করে। একই সঙ্গে চিন ভারতের অন্যতম বৃহৎ বাণিজ্যিক অংশীদার।
তাই দিল্লির কাছে লক্ষ্যটি এখন ‘চিনের সঙ্গে বন্ধুত্ব’ নয়, বরং প্রতিযোগিতা ও সহযোগিতাকে একই সঙ্গে পরিচালনা করা। মোদি–শি বৈঠকের পর সেই কৌশলই আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
শেষ কথা
সাত বছর পর ভারতের মাটিতে শি জিনপিংয়ের পা রাখা নিঃসন্দেহে ভারত–চিন সম্পর্কের একটি প্রতীকী ও কৌশলগত মুহূর্ত। কিন্তু এই সফরের আসল গুরুত্ব কোনও ছবি, করমর্দন বা সৌজন্য বিনিময়ে নয়—বরং পরবর্তী পদক্ষেপে।
সীমান্তে স্থায়ী শান্তি কি ফিরবে?
বাণিজ্য ঘাটতি কি কমবে?
ভারতীয় সংস্থাগুলি কি চিনের বাজারে আরও সুযোগ পাবে?
দুই দেশের মধ্যে আস্থা কি সত্যিই ফিরবে?
এই প্রশ্নগুলির উত্তরই ঠিক করবে, নয়াদিল্লিতে মোদি–শি বৈঠক শুধু একটি কূটনৈতিক সাক্ষাৎ ছিল, নাকি ভারত–চিন সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ের সূচনা।
এই মুহূর্তে সবচেয়ে বাস্তবসম্মত বার্তা একটাই—দুই দেশই সংঘাতের বদলে সংলাপকে বেছে নিয়েছে, কিন্তু আস্থা পুনর্গঠনের পথ এখনও দীর্ঘ।
Published on: সেপ্টে ১২, ২০২৬ at ২৩:৫৪




