
Published on: সেপ্টে ১২, ২০২৬ at ২৩:১৭
সংবাদ প্রভাকর টাইমস | বিশেষ প্রতিবেদন
এসপিটি নিউজ, নয়াদিল্লি, ১২ সেপ্টেম্বর: নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত অষ্টাদশ ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের ঘোষণাপত্রে পহেলগাঁও সন্ত্রাসী হামলার তীব্র নিন্দা এবং সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে ‘শূন্য সহনশীলতা’র নীতি পুনর্ব্যক্ত হওয়াকে ভারতের জন্য বড় কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। ২০২৫ সালের ২২ এপ্রিল জম্মু ও কাশ্মীরের পহেলগাঁওয়ে ভয়াবহ হামলায় ২৬ জন নিহত হয়েছিলেন। এক বছরেরও বেশি সময় পরও ব্রিকসের মতো গুরুত্বপূর্ণ বহুপাক্ষিক মঞ্চে সেই হামলার উল্লেখ ভারতের সন্ত্রাসবিরোধী অবস্থানকে নতুন করে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দিল।
বিশেষ তাৎপর্যের বিষয়, ঘোষণাপত্রে ব্রিকসের সদস্য চিন-সহ সব সদস্য দেশ পহেলগাঁও হামলার নিন্দায় একমত হয়েছে। পাকিস্তানের সঙ্গে চিনের ঘনিষ্ঠ কৌশলগত সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে এই ঐকমত্যকে নয়াদিল্লির জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
পহেলগাঁও হামলার তীব্র নিন্দা
নয়াদিল্লি ঘোষণাপত্রে ২০২৫ সালের ২২ এপ্রিলের পহেলগাঁও হামলার তীব্র নিন্দা জানানো হয়েছে। হামলায় ২৬ জন নিহত হন। একই সঙ্গে সন্ত্রাসবাদের সমস্ত রূপ ও প্রকাশের বিরুদ্ধে ব্রিকসের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে।
ঘোষণাপত্রের বার্তা শুধু একটি নির্দিষ্ট হামলার নিন্দায় সীমাবদ্ধ নয়। সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, সন্ত্রাসবাদে অর্থ জোগান বন্ধ করা, সন্ত্রাসীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল নির্মূল করা এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে যুক্ত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনার উপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
‘শূন্য সহনশীলতা’—কেন তাৎপর্যপূর্ণ
ব্রিকস ঘোষণাপত্রে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে ‘শূন্য সহনশীলতা’ নীতির কথা স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় দ্বৈত মানদণ্ডের বিরোধিতা করা হয়েছে এবং রাষ্ট্রসংঘের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী ও সন্ত্রাসী সংগঠনগুলির বিরুদ্ধে সমন্বিত পদক্ষেপের আহ্বান জানানো হয়েছে।
ভারতের দীর্ঘদিনের অবস্থান হল—সন্ত্রাসবাদকে কোনও রাজনৈতিক, ধর্মীয় বা ভৌগোলিক যুক্তিতে বৈধতা দেওয়া যায় না। ব্রিকসের ঘোষণায় সেই অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ভাষা ব্যবহার হওয়া নয়াদিল্লির জন্য গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অর্জন।
সীমান্তপারের সন্ত্রাস, নিরাপদ আশ্রয় ও অর্থায়ন
ঘোষণাপত্রে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ক্ষেত্রে সীমান্তপারের সন্ত্রাসী চলাচল, সন্ত্রাসে অর্থায়ন এবং সন্ত্রাসীদের নিরাপদ আশ্রয়ের বিষয়গুলির উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
যদিও ঘোষণাপত্রে কোনও দেশের নাম করে অভিযোগ তোলা হয়নি, এই ভাষা ভারতের দীর্ঘদিনের উদ্বেগের সঙ্গে সরাসরি সাযুজ্যপূর্ণ। নয়াদিল্লি বহু বছর ধরেই আন্তর্জাতিক মঞ্চে সীমান্তপারের সন্ত্রাস এবং সন্ত্রাসী পরিকাঠামোর বিরুদ্ধে সমন্বিত আন্তর্জাতিক পদক্ষেপের দাবি জানিয়ে এসেছে।
ফলে পাকিস্তানের নাম সরাসরি না থাকলেও ঘোষণাপত্রের এই অবস্থান ইসলামাবাদের উপর কূটনৈতিক চাপ বাড়ানোর সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
পাকিস্তানের নাম নেই—তবু কেন ভারতের জয়?
এই ঘোষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলির একটি হল—পাকিস্তানকে সরাসরি অভিযুক্ত করা হয়নি। একইভাবে ভারতের পরবর্তী সামরিক পদক্ষেপ ‘অপারেশন সিঁদুর’-কেও ঘোষণাপত্রে সরাসরি সমর্থন করা হয়নি।
তবে ভারতের কূটনৈতিক সাফল্য এখানেই যে, পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা দেশগুলিও পহেলগাঁও হামলার নিন্দা এবং সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে একমত হয়েছে।
বিশেষ করে চিনের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ। পহেলগাঁও হামলার পর বেজিং হামলাটির নিন্দা করেছিল এবং সমস্ত ধরনের সন্ত্রাসবাদের বিরোধিতা করেছিল। পরবর্তী সময়ে ভারত-পাকিস্তান সামরিক উত্তেজনার সময় চিন দুই পক্ষকেই সংযমের আহ্বান জানিয়েছিল।
অর্থাৎ, পহেলগাঁও হামলাকে সন্ত্রাসী হামলা হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দেওয়ার ক্ষেত্রে ভারতের অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়েছে।
ব্রিকসের বার্তা: সন্ত্রাসবাদের কোনও ধর্ম নেই
ঘোষণাপত্রে সন্ত্রাসবাদকে কোনও ধর্ম, জাতীয়তা, সভ্যতা বা জাতিগত পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত করার বিরোধিতা করা হয়েছে। ব্রিকসের বক্তব্য অনুযায়ী, সন্ত্রাসবাদকে তার সমস্ত রূপ ও প্রকাশে মোকাবিলা করতে হবে।
এই অবস্থান ভারতের কাছে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ নয়াদিল্লি বরাবরই বলে এসেছে, সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে কোনও ‘ভাল সন্ত্রাসবাদ’ বা ‘খারাপ সন্ত্রাসবাদ’-এর বিভাজন করা যায় না।
দ্বৈত মানদণ্ডের বিরুদ্ধে কঠোর বার্তা
ব্রিকসের ঘোষণায় সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় দ্বৈত মানদণ্ড প্রত্যাখ্যানের কথাও বলা হয়েছে। অর্থাৎ কোনও সন্ত্রাসী সংগঠন বা গোষ্ঠী কোনও দেশের রাজনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত হলে তাকে আলাদা চোখে দেখা যাবে না—এমন একটি নীতিগত বার্তাই উঠে এসেছে ঘোষণাপত্রে।
ভারতের দৃষ্টিতে এই অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ নয়াদিল্লির অভিযোগ দীর্ঘদিনের—সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক লড়াই তখনই কার্যকর হবে, যখন সব দেশের ক্ষেত্রে একই মানদণ্ড প্রয়োগ করা হবে।
চিন ও রাশিয়ার অবস্থান ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ
ব্রিকসের বর্তমান কাঠামোয় চিন ও রাশিয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দুই শক্তি। এই দুই দেশসহ অন্যান্য সদস্যের সম্মতিতে পহেলগাঁও হামলার নিন্দা এবং সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ ভারতের জন্য কূটনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ।
বিশেষ করে চিন-পাকিস্তান ঘনিষ্ঠতার কারণে বেজিংয়ের সম্মতি ভারতের কাছে আলাদা গুরুত্ব বহন করে। তবে এটিকে ভারত-পাকিস্তান দ্বন্দ্বে চিনের অবস্থান সম্পূর্ণ পরিবর্তন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং পহেলগাঁও হামলার সন্ত্রাসী চরিত্র নিয়ে আন্তর্জাতিক ঐকমত্যকে আরও শক্তিশালী করার ক্ষেত্রেই এই সিদ্ধান্তের গুরুত্ব বেশি।
ভারতের কূটনৈতিক কৌশলের সাফল্য
ভারত দীর্ঘদিন ধরে সন্ত্রাসবাদকে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে তুলে ধরছে। পহেলগাঁও হামলার পর সেই অবস্থান আরও জোরালো হয়।
নয়াদিল্লিতে ব্রিকস সম্মেলনের ঘোষণাপত্রে পহেলগাঁও হামলার পুনরুল্লেখ দেখাচ্ছে যে বিষয়টি সদস্য দেশগুলির যৌথ ঘোষণায় জায়গা করে নেওয়ার মতো আন্তর্জাতিক গুরুত্ব পেয়েছে। এটি ভারতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অর্জন।
তবে কি পাকিস্তান একঘরে?
ব্রিকস ঘোষণার পর ভারতীয় কূটনৈতিক মহলে পাকিস্তানের উপর চাপ বাড়ার আলোচনা স্বাভাবিক। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি আরও জটিল।
ব্রিকস ঘোষণায় পাকিস্তানের নাম নেই। ফলে এটিকে সরাসরি পাকিস্তান-বিরোধী প্রস্তাব বলা যাবে না। একইভাবে ব্রিকস কোনও সদস্য রাষ্ট্রকে নির্দিষ্ট করে পহেলগাঁও হামলার জন্য দায়ীও করেনি।
তবে আন্তর্জাতিক একটি গুরুত্বপূর্ণ বহুপাক্ষিক মঞ্চে পহেলগাঁও হামলার পুনরায় নিন্দা, সীমান্তপারের সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অবস্থান, সন্ত্রাসীদের নিরাপদ আশ্রয় ও অর্থায়নের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ এবং ‘শূন্য সহনশীলতা’র নীতি—সব মিলিয়ে ভারতের বক্তব্য যে আরও গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই।
শুধু সন্ত্রাসবাদ নয়, বদলাচ্ছে ব্রিকসের ভূমিকা
নয়াদিল্লি ঘোষণাপত্রের গুরুত্ব শুধু পহেলগাঁও প্রসঙ্গে সীমাবদ্ধ নয়। একই ঘোষণায় পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত, ইউক্রেন যুদ্ধ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, একতরফা নিষেধাজ্ঞা, বিশ্বশাসন ব্যবস্থার সংস্কার এবং উন্নয়নশীল বিশ্বের ভূমিকা নিয়েও সদস্য দেশগুলি যৌথ অবস্থান নিয়েছে।
অর্থাৎ ব্রিকস এখন শুধু অর্থনৈতিক সহযোগিতার মঞ্চ নয়; আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা, সন্ত্রাসবাদ এবং বিশ্ব কূটনীতির গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নেও সংগঠনটি ক্রমশ নিজেদের অবস্থান তুলে ধরছে।
নয়াদিল্লির বার্তা স্পষ্ট
পহেলগাঁও হামলার নিন্দা এবং সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে ‘শূন্য সহনশীলতা’র ঘোষণা ভারতের জন্য নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সাফল্য। পাকিস্তানের নাম না থাকলেও সীমান্তপারের সন্ত্রাস, নিরাপদ আশ্রয় এবং সন্ত্রাসে অর্থায়নের বিরুদ্ধে ব্রিকসের অবস্থান ভারতের দীর্ঘদিনের দাবির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল—পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ মিত্র চিনও এই যৌথ অবস্থানে অংশ নিয়েছে।
তবে এটিকে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সরাসরি ব্রিকসের রায় হিসেবে দেখার পরিবর্তে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে ভারতের অবস্থানের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক মুহূর্ত হিসেবে দেখা বেশি বাস্তবসম্মত।
নয়াদিল্লি থেকে তাই ভারতের বার্তা স্পষ্ট—সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে কোনও দ্বৈত মানদণ্ড নয়, প্রয়োজন অভিন্ন আন্তর্জাতিক অবস্থান। আর ব্রিকসের নতুন ঘোষণাপত্রে সেই দাবিরই একটি শক্তিশালী প্রতিধ্বনি শোনা গেল। (Picture: AI Generate)
Published on: সেপ্টে ১২, ২০২৬ at ২৩:১৭




