ব্রিকস সম্মেলনে বিদেশি প্রতিনিধিদের পাতে ভারতের স্বাদ

Main দেশ বিদেশ ভ্রমণ রাজ্য
শেয়ার করুন

কাশ্মীরের আখরোট থেকে বাংলার কুচো নিমকি, মিলেট থেকে পদ্মঅনুপ্রাণিত মিষ্টান্নদিল্লির অভিজাত হোটেলগুলিতে ভারতীয় খাদ্যসংস্কৃতির বিশেষ আয়োজন। 

Published on: সেপ্টে ১১, ২০২৬ at ২১:২৬

সংবাদ প্রভাকর টাইমস | বিশেষ প্রতিবেদন

এসপিটি নিউজ, নয়াদিল্লি, ১১ সেপ্টেম্বর: আন্তর্জাতিক কূটনীতির মঞ্চে বৈঠক, নীতি-নির্ধারণ ও রাষ্ট্রীয় আলোচনার পাশাপাশি অনেক সময় একটি দেশের পরিচয় পৌঁছে যায় আরও সহজ একটি মাধ্যমে—খাবারের পাতে। ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনকে সামনে রেখে নয়াদিল্লির অভিজাত হোটেলগুলিতে তাই বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধান, প্রতিনিধি ও সাংবাদিকদের জন্য যে বিশেষ খাদ্য আয়োজন করা হয়েছে, তার মধ্যে দিয়ে ভারত তুলে ধরতে চাইছে দেশের বৈচিত্র্যময় খাদ্যঐতিহ্য, আঞ্চলিক স্বাদ, স্থানীয় কৃষিপণ্য এবং আধুনিক স্বাস্থ্যসচেতনতার এক অনন্য সমন্বয়।

দিল্লির ‘তাজ মহল’, ‘দ্য ললিত’ এবং ‘দ্য লীলা প্যালেস’-এর বিশেষ মেনুতে যেমন রয়েছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ঐতিহ্যবাহী খাবার, তেমনই গুরুত্ব পেয়েছে মিলেট বা মোটা শস্য, স্থানীয় উপাদান, স্বাস্থ্যকর খাদ্য এবং আধুনিক রন্ধনশৈলী।

ছয় অঞ্চলের ছয় স্বাদেতাজ মহল

নয়াদিল্লির ‘তাজ মহল’ হোটেল বিদেশি প্রতিনিধিদের জন্য তৈরি করেছে ‘ট্র্যাডিশন টু টেবিল’ নামের বিশেষ খাদ্য আয়োজন। এর মূল ভাবনা হল ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী খাবারকে আন্তর্জাতিক অতিথিদের সামনে তুলে ধরা।

এই আয়োজনে জায়গা পেয়েছে কাশ্মীরের মশলাদার আখরোট, পুরনো দিল্লির ময়দা কাজু, রাজস্থানের মিনি কচুরি, বাংলার কুচো নিমকি, মহারাষ্ট্রের ভাকারওয়াড়ি এবং তামিলনাড়ুর মুরুক্কু। অর্থাৎ একটি মেনুতেই উত্তর থেকে দক্ষিণ এবং পূর্ব থেকে পশ্চিম ভারতের খাদ্য বৈচিত্র্যকে তুলে ধরা হয়েছে।

তাজ মহলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই খাবারগুলির পিছনে শুধু আঞ্চলিক পরিচয় নয়, ব্যক্তিগত স্মৃতিও রয়েছে। হোটেলের রন্ধনশিল্পীরা তাঁদের শৈশব এবং মায়েদের কাছ থেকে পাওয়া রান্নার স্মৃতি ও অনুপ্রেরণাকে এই আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। ফলে খাবারগুলি হয়ে উঠেছে ভারতের আতিথেয়তার পাশাপাশি পারিবারিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেরও প্রতীক।

মিলেটের মাধ্যমে স্বাস্থ্য ভারতীয় কৃষির বার্তা

‘দ্য ললিত’-এর বিশেষ আয়োজনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হল মিলেট বা মোটা শস্যের ওপর বিশেষ গুরুত্ব। হোটেলটির নির্বাহী সহ-রাঁধুনি অমিত বিশ্বাস জানিয়েছেন, ব্রিকস সম্মেলনে মিলেটের প্রচারকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বাজরা, জোয়ারের মতো শস্যকে ভারতীয় খাদ্যপরম্পরার সঙ্গে আধুনিক খাদ্যাভ্যাসের উপযোগী করে পরিবেশনের চেষ্টা করা হয়েছে।

প্রাতঃরাশের মেনুও তৈরি করা হয়েছে আন্তর্জাতিক অতিথিদের কথা মাথায় রেখে। মশলার পরিমাণ নিয়ন্ত্রিত রাখা হয়েছে এবং এমন খাবার বেছে নেওয়া হয়েছে যাতে বিভিন্ন দেশের অতিথিরা স্বাচ্ছন্দ্যে তা উপভোগ করতে পারেন।

মূল খাবারের ক্ষেত্রেও ভারতীয় মশলা, ঐতিহ্যবাহী শাকসবজি এবং খামারে উৎপাদিত তাজা সবজি ব্যবহারের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় পণ্য ও কৃষিজাত সামগ্রীকে মেনুর অংশ করে বিদেশি অতিথিদের সামনে ভারতের স্থানীয় খাদ্যসম্পদের বৈচিত্র্য তুলে ধরাই এই উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য।

দ্য ললিতের মেনুতে গালৌটি কাবাব, তন্দুরি রুটি এবং বাজরা-ভিত্তিক খাবারের পাশাপাশি ভারতীয় ও আন্তর্জাতিক রন্ধনশৈলীর সংমিশ্রণে তৈরি কয়েকটি অভিনব পদও রয়েছে। এর মধ্যে মিসো পেস্ট দিয়ে তৈরি বেগুন, ধীরে রান্না করা চিনা বাঁধাকপি এবং অ্যাম্বার সস-সহ জাপানি ধাঁচের মিষ্টি রাজমা বিশেষ আকর্ষণ।

পদ্মের আকারে মিষ্টান্ন, মিলেটের বিস্কুট স্বাস্থ্যকর খাবার

‘দ্য লীলা প্যালেস নিউ দিল্লি’ আবার ভারতীয় প্রতীক ও আধুনিক সুস্থতা-ভাবনাকে একত্র করেছে তাদের বিশেষ আয়োজনে।

হোটেলটি ভারতের জাতীয় ফুল পদ্মকে কেন্দ্র করে একটি বিশেষ ভোজ্য পদ্ম তৈরি করেছে। গোলাপ, জাফরান ও এলাচের স্বাদে তৈরি এই শিল্পসম্মত মিষ্টান্নের সঙ্গে ব্যবহার করা হয়েছে দেশীয় ভারতীয় ফল। ফলে এটি শুধু একটি মিষ্টান্ন নয়, বরং ভারতীয় সংস্কৃতি ও রন্ধনশিল্পের প্রতীকী উপস্থাপনাও হয়ে উঠেছে।

হোটেলটির ‘ওজাস্য’ সুস্থতা কর্মসূচির আওতায় মিলেটের বিস্কুট, হাতে তৈরি গ্র্যানোলা বার এবং স্বাস্থ্যকর পানীয় পরিবেশনের ব্যবস্থাও রয়েছে। আপনার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রতিনিধিদের জন্য কিনোয়া উপমা, মিলেটের লাড্ডু, নোনতা মিলেট ট্রেইল মিক্স, গ্র্যানোলা বার, কেশর-পেস্তা ‘কলস’ এবং সন্ন্যাসী ফল দিয়ে তৈরি চিনি-বিহীন ডুমুর ও কাজুবাদামের রোলের মতো পদও রাখা হয়েছে।

বিশেষ কক্ষ-অভ্যন্তরীণ আপ্যায়নের ক্ষেত্রেও ভারতীয় স্বাদের ছাপ থাকছে। এলাচ, জাফরান ও গোলাপের সুবাসে তৈরি পদ্ম-অনুপ্রাণিত মিষ্টান্ন সেই আয়োজনের অন্যতম আকর্ষণ।

মেনু তৈরিতে মাসের পর মাস প্রস্তুতি

এ ধরনের আন্তর্জাতিক সম্মেলনে খাবার তৈরি করা নিছক রন্ধনশৈলীর বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে অতিথিদের খাদ্যাভ্যাস, পছন্দ-অপছন্দ, অ্যালার্জি এবং সাংস্কৃতিক সংবেদনশীলতা।

‘দ্য লীলা প্যালেস’-এর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সম্মেলনের কয়েক মাস আগে থেকেই বিশেষ মেনু তৈরির প্রস্তুতি শুরু হয়েছিল। চূড়ান্ত মেনু নির্ধারণের আগে একাধিকবার খাবারের স্বাদ যাচাই এবং পরীক্ষামূলক পরিবেশন করা হয়েছে। বিভিন্ন রেস্তোরাঁয় আলাদা ধরনের খাবারের ব্যবস্থার পাশাপাশি প্রতিনিধিদের ব্যক্তিগত খাদ্যাভ্যাস এবং অ্যালার্জির বিষয়গুলিও বিবেচনায় রাখা হচ্ছে।

অর্থাৎ একজন বিদেশি অতিথির কাছে ভারতীয় খাবার পরিবেশনের অর্থ শুধু ঝাল-মশলাদার খাবার পরিবেশন নয়; বরং তাঁর খাদ্যসংস্কৃতিকে সম্মান জানিয়ে ভারতীয় স্বাদের সঙ্গে একটি নিরাপদ ও আরামদায়ক খাদ্য-অভিজ্ঞতা তৈরি করা।

প্রতিনিধিদের জন্যগুডি ব্যাগেওভারতের বৈচিত্র্য

খাবারের পাশাপাশি ব্রিকস সম্মেলনের প্রতিনিধি ও সাংবাদিকদের হাতে তুলে দেওয়ার জন্য বিশেষ উপহারের ঝুড়ির ব্যবস্থাও করা হয়েছে। এর মধ্যেও ফুটে উঠেছে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের পণ্য ও সংস্কৃতি।

এই উপহারের ঝুড়িতে রয়েছে বিহারের সত্তু ও মাখানা, ওড়িশার বিশেষ অ্যারাবিকা কফি, গুজরাটের ঐতিহ্যবাহী স্টোল এবং মগ ও চার্জিং পোর্ট-সহ টোট ব্যাগ।

ফলে অতিথিদের কাছে ভারতের পরিচয় শুধু সম্মেলনস্থলের আলোচনায় সীমাবদ্ধ থাকছে না; খাবার, পানীয়, পোশাক ও স্থানীয় পণ্যের মাধ্যমেও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সাংস্কৃতিক পরিচয় তাঁদের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে।

খাবারের টেবিলেই ভারতেরএক দেশ, বহু স্বাদ

ব্রিকস সম্মেলনের এই বিশেষ খাদ্য আয়োজনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হল—ভারতকে একটি একক খাদ্যপরিচয়ের মধ্যে আটকে না রেখে তার বহুত্বকে তুলে ধরা।

কাশ্মীরের আখরোট, দিল্লির ময়দা কাজু, রাজস্থানের কচুরি, বাংলার কুচো নিমকি, মহারাষ্ট্রের ভাকারওয়াড়ি, তামিলনাড়ুর মুরুক্কু, উত্তর ভারতের কাবাব, দক্ষিণ ভারতের খাদ্যধারা এবং ভারতের বহু অঞ্চলে চাষ হওয়া মিলেট—সবকিছুকে একই আন্তর্জাতিক অতিথি তালিকার সামনে তুলে ধরা হচ্ছে।

একদিকে রয়েছে শতাব্দীপ্রাচীন আঞ্চলিক রান্না, অন্যদিকে রয়েছে আধুনিক খাদ্যবিজ্ঞান ও সুস্থতার ভাবনা। কোথাও ঐতিহ্য, কোথাও ফিউশন, কোথাও স্বাস্থ্যকর খাদ্য—সব মিলিয়ে এই মেনু কার্যত ভারতের একটি ‘খাদ্যমানচিত্র’।

ব্রিকসের মতো আন্তর্জাতিক মঞ্চে এই আয়োজনের তাৎপর্য তাই নিছক আতিথেয়তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। খাবারের মাধ্যমে ভারত তার কৃষি, স্থানীয় পণ্য, আঞ্চলিক সংস্কৃতি, রন্ধন ঐতিহ্য এবং আধুনিক খাদ্যচিন্তাকে বিশ্বের সামনে তুলে ধরছে।

কূটনীতির ভাষা যেখানে বৈঠক ও ঘোষণাপত্রে প্রকাশ পায়, সেখানে ব্রিকস সম্মেলনের এই খাদ্য আয়োজন যেন তার আরও নরম ও সুস্বাদু এক সংস্করণ—একটি দেশের পরিচয়, তার মাটি, কৃষি, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে খাবারের পাতে তুলে ধরে বিশ্ব অতিথিদের স্বাগত জানানো। (Picture: AI Generate)

সূত্র: ‘আজ তক’, ‘এনডিটিভি ফুড’ এবং হোটেল কর্তৃপক্ষের প্রকাশিত তথ্য।

প্রতিবেদনটি লিখেছেন : অনিরুদ্ধ পাল

Published on: সেপ্টে ১১, ২০২৬ at ২১:২৬


শেয়ার করুন