ক্রমশ উজ্জ্বল হচ্ছেন বঙ্গবন্ধু

বাংলাদেশ বিদেশ
শেয়ার করুন

বাহালুল মজনুন চুন্নু

Published on: আগ ১৪, ২০১৮ @ ১৬:৫১

এসপিটি, ঢাকা, ১৪ আগস্টঃ ওরা কি মানুষ? পারল কীভাবে ওরা? ওদের বুক কি একটুও কাঁপল না? একটুও কি বিবেক দংশাল না?—এমনই হাজারো প্রশ্ন আজ বিয়াল্লিশটি বছর ধরে মনের মধ্যে বারে বারে উঁকি দিয়ে যায়, কুড়ে কুড়ে খায়। ওদেরকে নির্দয়, নিঠুর, পাষণ্ড কত কিছুতেই তো আখ্যা দিই, তবু মন ভরে না। নাহ, ওরা মানুষ নয়। তবে হায়েনা? হায়েনাদেরই অপমান হয় তাতে। ওরা নরকের কীট। না, তারচেয়েও অতি জঘন্য কিছু। হবেই না কেন, ওরা যে ওদের পিতাকেই হত্যা করেছে। ওরা সেই পিতাকেই আঠারটি বুলেট ছুঁড়ে হত্যা করেছে, যে পিতার কারণে ওরা পরাধীনতার বিষবাষ্প থেকে মুক্তি পেয়ে স্বাধীন দেশে শান্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিল। ওরা সেই পিতাকেই হত্যা করেছিল, যে পিতা নিজের জীবনকে তুচ্ছজ্ঞান করে ওদের মুক্তির জন্য ফাঁসির মঞ্চেও যেতে দ্বিধা করেননি একটুখানির জন্যও। ওরা সেই পিতাকেই সপরিবারে হত্যা করেছিল, যে পিতা ওদেরকে প্রজাপতির রঙিন ডানায় আঁকা নবকিরণের স্বপ্ন দেখিয়েছিল, মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর মন্ত্র শিখিয়েছিল! মীরজাফরের থেকেও ভয়ানক সেই বিশ্বাসঘাতকের দল এতটাই পিশাচতুল্য যে, শিশুর কান্নাও ওদের মনকে একটুও ভেজাতে পারেনি। ওদেরকে তাই জঘন্য, অতিব জঘন্য কোনো কিছুর সঙ্গে তুলনা করে শেষ করা যায় না, ওরা সেই তুলনার চেয়েও বেশি জঘন্য।

১৫ আগস্ট বাঙালি জাতির ইতিহাসে সবচেয়ে কলঙ্কময়, অশ্রুভেজা একটি দিন। ওই দিনের কথা ছাপান্ন হাজার বর্গমাইল জনপদের প্রতিটি ধূলিকণা কখনো ভুলতে পারবে না। পারা সম্ভবও নয়। রক্তের কালিতে লেখা সেই রাতের শোকগাথা বীণার করুণ সুর হয়ে বাঙালির হৃদয়ে বেজে চলে অনবরত। আমার হৃদয়ে অহর্নিশ সেই সুর বেজে চলে। বাংলাদেশ ছাত্রলীগের একজন কর্মী হওয়ায় সেই মহামানবের, সেই মহান বীরের সান্নিধ্যে আসার সুযোগ হয়েছিল আমার। সেই অকুতোভয় দেশপ্রেমিক যোদ্ধাকে, তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞাকে খুব কাছ থেকে দেখার চেষ্টা করেছি, বোঝার ও শেখার চেষ্টা করেছি। তাঁর সান্নিধ্য যতবার পেয়েছি, ততবারই নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করেছি, নিজের মাঝে নতুন এক শক্তিকে জেগে উঠতে দেখেছি। যখন শুনলাম আমার সেই শক্তির উ্ৎসধারা আঠারটি বুলেটে বিদ্ধ, তখন বুক ফেটে কান্না দুমড়ে উঠেছিল।

কী নিদারুণ কষ্ট! পিতা হারানোর বেদনা যে কত কঠিন, তা সেই ভয়ংকর কালোরাতের পরের সকালেই বুঝেছিলাম। কতটুকু নীচ প্রজাতির হলে, কত পাষাণে বাঁধানো বুক হলে এত নির্দয়ভাবে গুলি করে শিশু, গর্ভবর্তী নারীসহ জাতির পিতার পরিবারসহ মোট তিনটি পরিবারকে নিশ্চিহ্ন করা যায়, তা ভাবলেই গায়ে কাঁটা দেয়। শিউরে উঠি, চোখ জ্বালা করে ওঠে। সে রাতে স্ত্রী বেগম শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, পুত্র শেখ কামাল, শেখ জামাল ও দশ বছরের শিশুপুত্র শেখ রাসেল, দুই পুত্রবধূ সুলতানা কামাল ও রোজি জামাল এবং ভাই শেখ নাসের ও দুইজন কর্মকর্তাসহ নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছিলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। প্রায় একই সময়ে ঘাতকরা বঙ্গবন্ধুর ভাগ্নে যুবলীগ নেতা শেখ ফজলুল হক মণির বাসায় হামলা চালিয়ে শেখ ফজলুল হক মণি, তাঁর অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আরজু মণি, বঙ্গবন্ধুর ভগ্নিপতি আবদুর রব সেরনিয়াবাতের বাসায় হামলা করে সেরনিয়াবাত ও তার চৌদ্দবছরের কন্যা বেবী, দশ বছরের পুত্র আরিফ সেরনিয়াবাত, চার বছর বয়সী নাতি বাবু, ভাতিজা সজীব সেরনিয়াবাত, ভাগিনা  নান্টু, তিনজন অতিথি ও চারজন ভৃত্যকে হত্যা করে। সবমিলিয়ে সেই কালোরাতে পঁচিশজনকে বিশ্বাসঘাতকরা হত্যা করে এদেশের মানচিত্রকে, এদেশের মাটিকে কলঙ্কিত করে। এদেশের বাতাসকে দূষিত বিষবাষ্পে ছেয়ে ফেলে।

১৫ আগস্টের কলঙ্কিত ইতিহাস আরও কলঙ্কিত হয়, যখন জাতির পিতার খুনিদের বাঁচানোর জন্য ১৯৭৫ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর স্ব-ঘোষিত রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক আহমেদ ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করেন। অধ্যাদেশটিতে দুটি ভাগ আছে। প্রথম অংশে বলা হয়েছে, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোরে বলবত্ আইনের পরিপন্থী যা কিছুই ঘটুক না কেন, এ ব্যাপারে সুপ্রিম কোর্টসহ কোনো আদালতে মামলা, অভিযোগ দায়ের বা কোনো আইনি প্রক্রিয়ায় যাওয়া যাবে না। আর দ্বিতীয় অংশে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতি উল্লিখিত ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে যাদের প্রত্যয়ন করবেন তাদের দায়মুক্তি দেওয়া হলো। অর্থাৎ তাদের বিরুদ্ধে কোনো আদালতে মামলা, অভিযোগ দায়ের বা কোনো আইনি প্রক্রিয়ায় যাওয়া যাবে না। এরপর ক্ষমতায় এসে জিয়া সেই অধ্যাদেশকে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে আইনি বৈধতা দেন। এভাবেই মোস্তাক, জিয়া, এরশাদ ও খালেদা বঙ্গবন্ধুর হন্তারকদের রক্ষা করার ষোলকলা পূর্ণ করেন।

শুধু কি তাই? তারা ওই খুনিচক্রকে বিভিন্ন দেশের দূতাবাসে গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত করেন। দীর্ঘ একুশ বছরের সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারপ্রক্রিয়া শুরু করার জন্য প্রথমেই সেই অধ্যাদেশ বাতিল করেছিল। এরপর বহু ঝড়ঝঞ্ঝা মোকাবিলা করে অবশেষে ২০১০ সালের ২৭ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনি বরখাস্তকৃত লে. কর্নেল সৈয়দ ফারুক রহমান, লে. কর্নেল (অব.) সুলতান শাহরিয়ার রশিদ খান, মেজর (অব.) বজলুল হুদা, লে. কর্নেল (অব.) এ কে এম মহিউদ্দিন আহমেদ (ল্যান্সার) এবং লে. কর্নেল (অব.) মুহিউদ্দিন আহমেদকে (আর্টিলারি) ফাঁসির দড়িতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছিল। আর সেই ঘটনার মধ্যে দিয়ে জাতির ললাটে আঁকা কলঙ্কচিহ্ন মুছে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যায়। কিন্তু বিদেশে পালিয়ে থাকা অন্য খুনিদের এখনো দেশে ফিরিয়ে এনে ফাঁসি কার্যকর করতে পারেনি সরকার। তাই এখনো ললাটে কলঙ্কের দাগ, রক্তের দাগ। তাই এখনো দেশের মানুষের তপ্ত হৃদয়ে বইছে ক্ষোভের বহ্নিশিখা। এদেরকে ফিরিয়ে এনে মৃত্যুদণ্ড দিলেই কেবল সেই দাগ মুছবে, নিভবে ক্ষোভের বহ্নিশিখা।

১৫ আগস্টের কালো রাতে ঘাতকদের সেই আঠারটি বুলেটে বিদ্ধ জাতির পিতাই কেবল স্তব্ধ হয়ে যাননি, স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল এদেশের অগ্রযাত্রা। গভীর গিরিখাতের অতল অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়েছিল দেশের মানুষ। বিষবাষ্পে এদেশের মানুষের নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হতে থাকে। আবারও যেন তারা পরাধীনতার শিকলে বাঁধা পড়ে। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা তিনবারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে সেই অন্ধকার থেকে আলোতে নিয়ে এসেছেন। আজ বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশ। আজ এদেশের মানুষকে না খেয়ে থাকতে হয় না। যুদ্ধাপরাধীদের একে একে মৃত্যুদণ্ড দিয়ে দেশ আজ অনেকটাই কলঙ্কমুক্ত হয়ে উঠছে। তবে ইদানীং স্বাধীনতার পরাজিত শক্তিরা জঙ্গিবাদের ঘটানোর চেষ্টা করছে। মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে তারা। কিন্তু জাতির জনকের অসাম্প্রদায়িকতা, ধর্ম নিরপেক্ষতা ও বাঙালি জাতীয়তাবাদের আদর্শে উজ্জীবিত বাঙালি তা হতে দেবে না। বঙ্গবন্ধুর আর্দশকে বুকে লালন করে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে তারা ধিক্কৃত জঙ্গিবাদ ও মৌলবাদী রাজনীতির শিকড় উৎপাটন করবে। বঙ্গবন্ধু এভাবেই তার আর্দশ ও চেতনার মধ্যে দিয়েই চিরঞ্জীব হয়ে আছেন।

লেখক : সিনেট ও সিন্ডিকেট সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং প্রাক্তন সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ

Published on: আগ ১৪, ২০১৮ @ ১৬:৫১

 


শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

35 + = 39