জলমগ্ন পথ পেরিয়ে নাগেশ্বর মহাদেবের দরবারে ভক্তের ঢল—‘টান’ যেন তিনিই দিয়েছেন

Main দেশ ধর্ম রাজ্য
শেয়ার করুন

অনিরুদ্ধ পাল
সংবাদ প্রভাকর টাইমস

এসপিটি নিউজ, রামনগর, পূর্ব মেদিনীপুর, ১৮ আগস্ট: শ্রাবণ মাসের শেষ সোমবার। চারদিকে বর্ষার জল। কোথাও রাস্তা, কোথাও জলধারা—প্রকৃতির এমন প্রতিকূলতাকেও যেন হার মানাল ভক্তির টান। দীর্ঘ পথ, কর্দমাক্ত ও জলমগ্ন রাস্তা পেরিয়ে পূর্ব মেদিনীপুরের রামনগর থানার বাখারপুর গ্রামের শ্রীশ্রী অখণ্ড ক্রিয়াযোগ সাধন মন্দির আশ্রমে এসে হাজির হলেন অজস্র ভক্ত। উদ্দেশ্য একটাই—বাবা নাগেশ্বর মহাদেবের মাথায় পবিত্র জল অর্পণ।

রামনগর শহর থেকে বাখারপুর বেশ কিছুটা দূরে। যোগাযোগ ব্যবস্থাও খুব উন্নত নয়। তার উপর কয়েকদিনের প্রবল বর্ষণে বিস্তীর্ণ এলাকা জলমগ্ন। বহু জায়গায় রাস্তার চেহারা বদলে গিয়ে মনে হয়েছে যেন ছোট নদী। সেই জল পেরিয়েই কাঁধে জল নিয়ে ভক্তরা এগিয়ে গিয়েছেন আশ্রমের দিকে। কারও হাতে পবিত্র জল, কারও কণ্ঠে ‘হর হর মহাদেব’, আবার কারও মুখে শুধু বাবা নাগেশ্বরের নাম।

প্রতিকূলতা ছিল, কিন্তু ভক্তির পথে তা বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি।

আশ্রমে পৌঁছতেই ভক্তদের ফুল দিয়ে স্বাগত জানান আশ্রমের প্রতিষ্ঠাতা শ্রীশ্রী ১০০৮ মহন্ত আচার্য দেবানন্দ শাস্ত্রী, যিনি সকলের কাছে ‘গুরুজি’ নামেই পরিচিত। আধ্যাত্মিক সাধনার পাশাপাশি মানবসেবাকেও যিনি নিজের জীবনের অন্যতম ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেছেন।

নর্মদার তলদেশ থেকে বাখারপুরে নাগেশ্বর মহাদেব

গুরুজির বক্তব্য অনুযায়ী, আশ্রমের এই নাগেশ্বর মহাদেবের বিগ্রহ নর্মদা নদীর তলদেশ থেকে আনা হয়েছিল। তাঁর কথায়, স্বপ্নাদেশে মহাদেব নিজেই এই বিগ্রহ উদ্ধারের নির্দেশ দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে তাঁর এক শিষ্যের মাধ্যমে অত্যন্ত যত্ন ও ভক্তির সঙ্গে সেই বিগ্রহ উদ্ধার করে রামনগরের এই আশ্রমে প্রতিষ্ঠা করা হয়।

তারপর থেকেই নিয়মিত পূজা, আরাধনা ও বিভিন্ন ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে নাগেশ্বর মহাদেবের উপাসনা হয়ে আসছে।

প্রতি বছরের মতো এবারও শ্রাবণের শেষ সোমবারেও দূরদূরান্ত থেকে ভক্তরা জল নিয়ে এসে মহাদেবের মাথায় অর্পণ করেন। এবার বর্ষার দাপট সেই যাত্রাকে আরও কঠিন করে তুলেছিল। কিন্তু ভক্তদের কাছে সেই কষ্ট যেন কষ্টই নয়।

গুরুজির কথায়, অসুবিধা হয়েছে ঠিকই, কিন্তু ভক্তরা সেই অসুবিধাকে গুরুত্ব দেননি। তাঁদের কাছে বাবা নাগেশ্বর মহাদেবের মাথায় জল ঢালাটাই ছিল প্রধান। আসলে সবই বাবার ইচ্ছা। তিনিই ভক্তদের নিয়ে এসেছেন। বলা যায়, তাঁর টানেই ভক্তরা এখানে আসেন।

বাহ্যিক শিব থেকে অন্তরের শিব

এই আশ্রমের সাধনার মূল সুরের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে যোগীরাজ শ্যামাচরণ লাহিড়ির ক্রিয়াযোগের দর্শন। সেই পথ অনুসরণ করেই গুরুদেবের নির্দেশে দীর্ঘদিন ধরে আধ্যাত্মিক সাধনার পাশাপাশি সমাজসেবায় নিয়োজিত আচার্য দেবানন্দ শাস্ত্রী।

তাঁর জীবনদর্শনের অন্যতম মূলমন্ত্র—সেবাই পরম ধর্ম।

শ্যামাচরণ লাহিড়ি মহাশয়ের শিবভাবনাতেও ছিল এক গভীর অন্তর্দর্শনের শিক্ষা। তাঁর সাধনাদর্শনে মহাদেব কেবল বাহ্যিক কোনও দেবসত্তা নন; বরং মানুষের অন্তরে বিরাজমান গভীর চৈতন্যের প্রতীক।

শিব মানে চেতনা। আর ক্রিয়াযোগের সাধনার মাধ্যমে সেই অন্তর্নিহিত চৈতন্যকে উপলব্ধি করার পথই যেন খুলে যায়। বাহ্যিক পূজা, আচার বা বিগ্রহের আরাধনার পাশাপাশি সাধকের নিজের অন্তরের দিকে ফিরে তাকানো—এই আত্মঅন্বেষণই ক্রিয়াযোগের সাধনায় বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।

অর্থাৎ, শিবকে খুঁজতে শুধু বাইরে নয়, নিজের ভিতরেও তাকাতে হয়। মন যখন শান্ত হয়, সাধনা যখন গভীর হয়, তখনই অনুভব করা যায় সেই নিঃশব্দ চৈতন্যকে—যেখানে জীব ও শিবের মধ্যে কোনও দূরত্ব থাকে না।

জলমগ্ন পথেও থামেনি ভক্তি

শ্রাবণের শেষ সোমবারে সেই দর্শনেরই যেন এক অন্যরকম বহিঃপ্রকাশ দেখা গেল বাখারপুরে। কাঁধে পবিত্র জল নিয়ে ভক্তরা একের পর এক এসে দাঁড়ালেন নাগেশ্বর মহাদেবের সামনে। কেউ দীর্ঘ পথ পায়ে হেঁটে, কেউ জল-কাদা পেরিয়ে, কেউ আবার বানভাসি রাস্তার উপর দিয়ে আশ্রমে পৌঁছলেন।

মহাদেবের মস্তকে জল অর্পণের মুহূর্তে যেন সমস্ত পথের ক্লান্তি মিলিয়ে গেল। আশ্রমজুড়ে ধ্বনিত হল ‘হর হর মহাদেব’।

ফুল, ধূপ, মন্ত্রোচ্চারণ, ভক্তি আর ক্রিয়াযোগের আধ্যাত্মিক আবহে বাখারপুরের অখণ্ড ক্রিয়াযোগ সাধন মন্দির সেবাশ্রম হয়ে উঠল এক অনন্য সাধনক্ষেত্র।

বর্ষার জল রাস্তা ভাসিয়ে দিতে পারে, কিন্তু ভক্তির পথকে কি ভাসিয়ে দেওয়া যায়?

বাখারপুরের এই শ্রাবণ-সোমবার যেন সেই প্রশ্নেরই উত্তর দিয়ে গেল—যেখানে বিশ্বাস আছে, সেখানে পথের দূরত্ব আর বাধা বড় হয়ে দাঁড়ায় না। আর ভক্তের বিশ্বাসে, সেই পথ দেখান স্বয়ং বাবা নাগেশ্বর মহাদেবই।


শেয়ার করুন