৬১৫ কোটি টাকায় বাংলার পর্যটনে বড় রদবদল

Main দেশ ভ্রমণ রাজ্য
শেয়ার করুন

১৯টি পর্যটন পরিক্রমা, মিরিকের সৌন্দর্যায়ন থেকে টাকিকে বিশ্বমানের পর্যটনকেন্দ্রচাপর্যটনেও নতুন পরিকল্পনা

অনিরুদ্ধ পাল
সংবাদ প্রভাকর টাইমস

এসপিটি নিউজ, কলকাতা, ১৯ আগস্ট: পশ্চিমবঙ্গের পর্যটন মানচিত্রকে নতুন করে সাজানোর লক্ষ্যে প্রায় ৬১৫ কোটি টাকার একগুচ্ছ প্রকল্পের পরিকল্পনা করেছে রাজ্য পর্যটন দফতর। এর মধ্যে কেন্দ্রীয় স্বদেশ দর্শন প্রকল্পের আওতায় প্রায় ১২৯ কোটি টাকার প্রস্তাব জমা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি প্রায় ৪৮৬ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৯টি পর্যটন পরিক্রমা গড়ে তোলার কাজ হাতে নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন রাজ্যের পর্যটনমন্ত্রী শঙ্কর ঘোষ।

রাজ্যের নতুন পর্যটন পরিকল্পনায় একদিকে যেমন পাহাড়, নদী, ধর্মীয় ও ঐতিহ্যবাহী পর্যটনকেন্দ্রকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, তেমনই উত্তরবঙ্গের চা-বাগানকে ঘিরে নতুন ধরনের পর্যটন অর্থনীতি গড়ে তোলার পরিকল্পনাও সামনে এসেছে।

মিরিকের জন্য ১০২ কোটি টাকার প্রস্তাব

কেন্দ্রীয় স্বদেশ দর্শন প্রকল্পের আওতায় ইতিমধ্যেই বিস্তারিত প্রকল্প প্রতিবেদন জমা দিয়েছে রাজ্য। এর মধ্যে মিরিক হ্রদের সৌন্দর্যায়ন ও সংশ্লিষ্ট পর্যটন পরিকাঠামোর উন্নয়নের জন্য প্রায় ১০২ কোটি টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে।

এর পাশাপাশি দার্জিলিঙের ঐতিহ্য এবং পাহাড়ি অঞ্চলের পর্যটন পরিকাঠামো উন্নয়নের জন্যও প্রকল্প রাখা হয়েছে।

অর্থাৎ উত্তরবঙ্গের পর্যটনে শুধু নতুন পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তোলাই নয়, বিদ্যমান আকর্ষণগুলিকে আরও পরিকল্পিত ভাবে সাজানোর দিকেও নজর দেওয়া হচ্ছে।

১৯টি পর্যটন পরিক্রমায় কী রয়েছে?

রাজ্য পর্যটনমন্ত্রী জানিয়েছেন, প্রায় ৪৮৬ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৯টি পর্যটন পরিক্রমার প্রকল্প নেওয়া হয়েছে।

প্রকাশ্যে আসা পরিকল্পনাগুলির মধ্যে রয়েছে—

  • কলকাতায় রজ্জুপথ প্রকল্প;
  • নবদ্বীপ–ঝাঁপা পর্যটন পরিক্রমা;
  • উত্তর ২৪ পরগনার টাকিকে বিশ্বমানের পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা;
  • নদী পর্যটনের জন্য আধুনিক নৌযান ও লঞ্চ সংগ্রহ।

তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, ১৯টি পরিক্রমার সম্পূর্ণ তালিকা এবং প্রতিটি প্রকল্পের পৃথক ব্যয়ের হিসাব এখনও প্রকাশ্যে আনা হয়নি। ফলে এই মুহূর্তে কোন জেলায় কোন পরিক্রমার আওতায় কী কী কাজ হবে এবং প্রতিটির জন্য ঠিক কত টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে, তার পূর্ণ চিত্র পাওয়া যাচ্ছে না।

নদীকে পর্যটনের নতুন সম্পদ হিসেবে দেখার উদ্যোগ

পশ্চিমবঙ্গের নদীনির্ভর পর্যটনকে আরও শক্তিশালী করতে আধুনিক নৌযান ও লঞ্চ কেনার পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে।

হুগলি, ইছামতী, গঙ্গা এবং সুন্দরবন-সহ বিভিন্ন নদীভিত্তিক অঞ্চলে নৌভ্রমণকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে পারলে পর্যটনের সঙ্গে স্থানীয় অর্থনীতিরও প্রসার ঘটতে পারে।

নদীভ্রমণের সঙ্গে স্থানীয় খাবার, হস্তশিল্প, গ্রামীণ জীবন এবং নদীতীরবর্তী পর্যটনকেন্দ্রকে যুক্ত করা গেলে একটি বড় পর্যটন-অর্থনৈতিক পরিকাঠামো তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

টাকিকে বিশ্বমানের পর্যটনকেন্দ্র করার পরিকল্পনা

উত্তর ২৪ পরগনার সীমান্ত শহর টাকিও নতুন পরিকল্পনায় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।

ইছামতী নদী, নৌভ্রমণ, সীমান্তের পরিবেশ এবং স্থানীয় ঐতিহ্যকে কেন্দ্র করে টাকিকে একটি পূর্ণাঙ্গ পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।

তবে টাকির ক্ষেত্রে ঠিক কী ধরনের পরিকাঠামো তৈরি হবে এবং তার জন্য কত টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে, সে বিষয়ে পৃথক বিস্তারিত এখনও প্রকাশ্যে আসেনি।

নবদ্বীপ–ঝাঁপা পর্যটন পরিক্রমার পরিকল্পনাও ১৯নবদ্বীপ–ঝাঁপা: ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পর্যটনের নতুন পরিক্রমা

টি প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে।

নবদ্বীপের বৈষ্ণব ঐতিহ্য, মন্দির, নদী, সংস্কৃতি এবং আশপাশের ঐতিহাসিক স্থানের সঙ্গে অন্যান্য পর্যটনকেন্দ্রকে যুক্ত করে একটি সমন্বিত পর্যটনপথ গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে।

তবে এই পরিক্রমার সঠিক বিস্তার এবং প্রকল্পভিত্তিক কাজের পূর্ণ তালিকা এখনও প্রকাশিত হয়নি।

এবার চাবাগানও পর্যটনের বড় সম্পদ

রাজ্যের নতুন পর্যটন ভাবনায় উত্তরবঙ্গের চা-বাগানকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

পর্যটনমন্ত্রী জানিয়েছেন, পাহাড়ি অঞ্চলে একটি চা-পর্যটন পরিক্রমা গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। চা-বাগানের পুরনো বাংলোগুলিকে সংস্কার করে ঐতিহ্যবাহী উচ্চমানের আবাসনে পরিণত করার পরিকল্পনাও রয়েছে।

এর ফলে পর্যটকরা শুধু পাহাড় দেখতে নয়, চা-বাগানের জীবন, চা উৎপাদন এবং ঔপনিবেশিক আমলের চা-বাগান সংস্কৃতির সঙ্গে সরাসরি পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাবেন।

এই পরিকল্পনার সঙ্গে স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান এবং আয় বাড়ানোর বিষয়টিও যুক্ত করা হয়েছে। চা-বাগানের কর্মীদের আতিথেয়তা এবং আবাসন পরিষেবার প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে স্থানীয় মানুষ সরাসরি পর্যটন অর্থনীতির অংশ হতে পারেন।

চা উৎসব থেকে কমলালেবু উৎসব

উত্তরবঙ্গের পর্যটনকে আরও বৈচিত্র্যময় করতে শিলিগুড়ি ও দার্জিলিঙে চা উৎসব আয়োজনের পরিকল্পনাও রয়েছে।

চা পাতা তোলা থেকে শুরু করে কাপের চা তৈরি হওয়া পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াকে তুলে ধরতে একটি বিশেষ ধাতব ভাস্কর্য তৈরির পরিকল্পনার কথাও জানা গিয়েছে।

পাশাপাশি পাহাড়ের সিটং এলাকায় কমলালেবু উৎসব আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে।

অর্থাৎ চা এবং কমলালেবুর মতো স্থানীয় কৃষিজ সম্পদকে শুধু পণ্য হিসেবে নয়, পর্যটনের অভিজ্ঞতা হিসেবেও তুলে ধরার চেষ্টা হচ্ছে।

১০৮টি ধর্মীয় পর্যটন পরিক্রমারও পরিকল্পনা

১৯টি বৃহত্তর পর্যটন পরিক্রমার পাশাপাশি রাজ্য সরকার ১০৮টি ধর্মীয় পর্যটন পরিক্রমা গড়ে তোলার কাজও করছে।

জেলা প্রশাসনের কাছ থেকে এর জন্য প্রস্তাব নেওয়া হচ্ছে। পর্যটন দফতরের কাছে প্রথম পর্যায়ে ১৭টি এবং দ্বিতীয় পর্যায়ে ৫৫টি প্রস্তাব এসেছে। বিধায়কদের কাছ থেকেও ৩৯টি প্রস্তাব জমা পড়েছে বলে পর্যটনমন্ত্রী জানিয়েছেন।

এর ফলে আগামী দিনে পশ্চিমবঙ্গের ধর্মীয় পর্যটনকে একক মন্দিরকেন্দ্রিক না রেখে একাধিক ধর্মীয় ও ঐতিহ্যবাহী স্থানকে একটি পর্যটনপথের মধ্যে যুক্ত করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

কালীঘাট থেকে তারাপীঠ, তারকেশ্বর থেকে জোড়াসাঁকো

কেন্দ্রের তীর্থ ও আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় বিস্তারিত প্রকল্প প্রতিবেদন তৈরির জন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানও চিহ্নিত করা হয়েছে।

এর মধ্যে রয়েছে—

কালীঘাট মন্দির, তারাপীঠ মন্দির, তারকেশ্বর মন্দির এবং জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি।

বেলুড় মঠের উন্নয়নের জন্য ইতিমধ্যেই কেন্দ্রীয় প্রকল্প রয়েছে।

ফলে রাজ্যের পর্যটন পরিকল্পনায় একই সঙ্গে ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক, ঐতিহ্য, পাহাড়, নদী, চা-বাগান এবং নগর পর্যটন—এই একাধিক ক্ষেত্রকে যুক্ত করার চেষ্টা স্পষ্ট হচ্ছে।

তবে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখনও ১৯টি পরিক্রমাকে ঘিরেই

প্রায় ৪৮৬ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৯টি পর্যটন পরিক্রমার কথা ঘোষণা হলেও এই মুহূর্তে প্রকাশ্যে আসা তথ্য অনুযায়ী সবকটি পরিক্রমার নাম, জেলা-ভিত্তিক বিস্তার, পৃথক ব্যয় এবং প্রকল্পভিত্তিক পরিকাঠামোর পূর্ণ তালিকা এখনও প্রকাশিত হয়নি।

ফলে আগামী দিনে রাজ্য সরকারের কাছ থেকে এই ১৯টি প্রকল্পের বিস্তারিত প্রকল্প প্রতিবেদন প্রকাশের দাবি উঠতে পারে।

কারণ ৪৮৬ কোটি টাকা যখন ১৯টি পরিক্রমার জন্য নির্ধারিত হচ্ছে, তখন স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন উঠছে—

কোন জেলায় কত টাকা?

কোন পর্যটনকেন্দ্র কীভাবে বদলাবে?

কোন রাস্তা, জলপথ বা পর্যটন পরিকাঠামো তৈরি হবে?

কতগুলি নতুন থাকার ব্যবস্থা তৈরি হবে?

স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান কতটা বাড়বে?

এই প্রশ্নগুলির উত্তর মিললেই বাংলার নতুন পর্যটন পরিকল্পনার প্রকৃত চেহারা আরও স্পষ্ট হবে।

বদলাচ্ছে বাংলার পর্যটনের ভাবনা?

সাম্প্রতিক ঘোষণাগুলি একত্রে দেখলে একটি বিষয় স্পষ্ট—পশ্চিমবঙ্গের পর্যটনকে শুধু কয়েকটি জনপ্রিয় গন্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে পরিক্রমাভিত্তিক পর্যটন ব্যবস্থা গড়ে তোলার দিকে জোর দেওয়া হচ্ছে।

পাহাড়ে চা-বাগান, মিরিকে হ্রদ, কলকাতায় রজ্জুপথ, টাকিতে নদী ও সীমান্ত পর্যটন, নবদ্বীপে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পর্যটন—প্রতিটি অঞ্চলের নিজস্ব বৈশিষ্ট্যকে পর্যটনের মূল আকর্ষণে পরিণত করার চেষ্টা চলছে।

প্রায় ৬১৫ কোটি টাকার এই পরিকল্পনা বাস্তবে কতটা রূপ পায়, আর ১৯টি পরিক্রমার পূর্ণ নকশা কবে প্রকাশ্যে আসে—এখন নজর সেদিকেই।

সংবাদ প্রভাকর টাইমস এই ১৯টি পর্যটন পরিক্রমার জেলা-ভিত্তিক পূর্ণ বিবরণ, প্রকল্পভিত্তিক ব্যয় এবং পরিকাঠামোর তথ্য সামনে আসার সঙ্গে সঙ্গে তা পাঠকদের সামনে তুলে ধরবে।


শেয়ার করুন