
যুবশক্তি, সংস্কার ও পরিকাঠামোয় জোর—২০২৬-২৭ অর্থবর্ষে আত্মবিশ্বাসী রূপরেখা কেন্দ্রের

Published on: ফেব্রু ১, ২০২৬ at ২২:৪৩
এসপিটি নিউজ, নয়াদিল্লি, ১ ফেব্রুয়ারি : মাঘ পূর্ণিমা ও গুরু রবিদাসের জন্মজয়ন্তীর পবিত্র তিথিতে সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের সাধারণ বাজেট পেশ করলেন কেন্দ্রীয় অর্থ ও কর্পোরেট বিষয়ক মন্ত্রী নির্মলা সীতারমণ। কর্তব্য ভবনে পেশ হওয়া এই বাজেটকে তিনি আখ্যা দেন ‘তিন কর্তব্যে অনুপ্রাণিত বিকশিত ভারতের নীলনকশা’ হিসেবে—যার মূল লক্ষ্য উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, সাধারণ মানুষের ক্ষমতায়ন এবং সবকা সাথ, সবকা বিকাশ ভাবনার বাস্তব রূপায়ণ।
অর্থমন্ত্রী বলেন, অনিশ্চিত বৈশ্বিক পরিস্থিতির মধ্যেও ভারত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে এগোচ্ছে। একদিকে যেমন বাণিজ্য সম্প্রসারণ, রপ্তানি বৃদ্ধি ও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ আকর্ষণের উপর জোর দেওয়া হচ্ছে, তেমনই অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে দেশের অগ্রযাত্রার শরিক করে তোলাই এই বাজেটের মূল দর্শন।
প্রথম কর্তব্য: উৎপাদনশীলতা ও প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বৃদ্ধি
সুস্থিত অর্থনৈতিক বিকাশ ত্বরান্বিত করতে প্রথম কর্তব্যের আওতায় ছয়টি নির্দিষ্ট ক্ষেত্রকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে—
কৌশলগত শিল্প ও ঐতিহ্যবাহী ক্ষেত্র
৭টি কৌশলগত ও প্রথম সারির ক্ষেত্রে উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি রেশম, পশম, পাট ও মানবসৃষ্ট ফাইবার-সহ প্রাকৃতিক ফাইবারে স্বনির্ভরতা অর্জনে জাতীয় ফাইবার প্রকল্প ঘোষণা করা হয়েছে। ঐতিহ্যবাহী শিল্প ক্লাস্টারগুলির আধুনিকীকরণ, মেশিনারি উন্নয়ন ও পরীক্ষাকেন্দ্র স্থাপনের প্রস্তাব রয়েছে। খাদি, তাঁত ও হস্তশিল্পের প্রসারে মহাত্মা গান্ধী গ্রাম স্বরাজ উদ্যোগ-এর মাধ্যমে ব্র্যান্ডিং, দক্ষতা উন্নয়ন ও বিশ্ববাজার সংযোগে জোর দেওয়া হয়েছে।
বায়োফার্মা ও এসএমই-তে বড় বরাদ্দ
ভারতকে বিশ্বমানের বায়োফার্মা হাব হিসেবে গড়ে তুলতে বায়োফার্মা SHAKTI প্রকল্পে আগামী পাঁচ বছরে ১০,০০০ কোটি টাকা বরাদ্দ। নতুন তিনটি NIPER ও সাতটি বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন, ১০০০-র বেশি ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল সেন্টার গড়ার ঘোষণা করা হয়েছে।
এমএসএমই ক্ষেত্রের বিকাশে ১০,০০০ কোটি টাকার এসএমই বিকাশ তহবিল গঠনের প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
পরিকাঠামো ও পরিবহণ
সরকারি মূলধনী ব্যয় ২০২৬-২৭ সালে বাড়িয়ে ১২.২ লক্ষ কোটি টাকা করার প্রস্তাব।
ডানকুনি থেকে সুরাট পর্যন্ত নতুন পণ্য করিডর, পাঁচ বছরে ২০টি জাতীয় জলপথ এবং শহরভিত্তিক অর্থনৈতিক অঞ্চলে অঞ্চলপিছু ৫,০০০ কোটি টাকার বিনিয়োগের ঘোষণা করা হয়েছে। পরিবেশবান্ধব যাত্রী পরিবহণে ৭টি উচ্চগতির রেল করিডর—মুম্বাই-পুণে থেকে বারাণসী-শিলিগুড়ি পর্যন্ত—গড়ে তোলার প্রস্তাব বাজেটের অন্যতম আকর্ষণ।
দ্বিতীয় কর্তব্য: সাধারণ মানুষের সক্ষমতা ও আশা পূরণ
গত এক দশকে প্রায় ২৫ কোটি মানুষকে দারিদ্র্যসীমা থেকে মুক্ত করার সাফল্যের কথা উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী জানান, এবার জোর দেওয়া হচ্ছে মানবসম্পদ উন্নয়নে।
ভারতকে মেডিক্যাল ট্যুরিজম হাব হিসেবে গড়তে ৫টি আঞ্চলিক মেডিক্যাল হাব
পশু চিকিৎসা পরিকাঠামোয় ২০,০০০ কোটির বেশি ঋণভিত্তিক ভর্তুকি
AVGC ক্ষেত্রে ১৫,০০০ স্কুল ও ৫০০ কলেজে কনটেন্ট ক্রিয়েটর ল্যাব
হোটেল ম্যানেজমেন্ট শিক্ষায় উৎকর্ষ ও ১০,০০০ ট্যুর গাইডের দক্ষতা উন্নয়ন
খেলো ইন্ডিয়া মিশন চালুর ঘোষণা
তৃতীয় কর্তব্য: সবকা সাথ, সবকা বিকাশ
কৃষকদের আয় বৃদ্ধি, দিব্যাঙ্গজনদের ক্ষমতায়ন, মানসিক স্বাস্থ্য ও পূর্বোদয় রাজ্য এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলের উন্নয়ন—এই চার স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়ে তৃতীয় কর্তব্য।
ভারত-বিস্তার প্রকল্পে কৃষি ক্ষেত্রে বহুভাষিক এআই সরঞ্জাম
রাঁচি ও তেজপুরের মানসিক স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান উন্নয়ন এবং নিমহান্স-২ স্থাপন
পূর্ব উপকূলীয় শিল্প করিডর, ৫টি পর্যটন গন্তব্য ও ৪,০০০ ই-বাস
উত্তর-পূর্বে বুদ্ধ পর্যটন সার্কিট গঠনের প্রস্তাব
আর্থিক সংহতি ও রাজস্ব শৃঙ্খলা
২০২৬-২৭ অর্থবর্ষে রাজকোষ ঘাটতি জিডিপি-র ৪.৩ শতাংশে নামানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। ঋণ-জিডিপি অনুপাত কমে ৫৫.৬ শতাংশে দাঁড়ানোর আশা প্রকাশ করেছে কেন্দ্র।
কর সংস্কারে সরলীকরণ ও স্বস্তি
নতুন আয়কর আইন (কার্যকর এপ্রিল ২০২৬), টিসিএস হার হ্রাস, জরিমানা ও মামলা-মোকদ্দমার যৌক্তিকীকরণ, সমবায় ও তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রে করছাড়—সব মিলিয়ে কর প্রশাসনকে আরও নাগরিক-বান্ধব করার রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে। পরোক্ষ কর ক্ষেত্রে শুল্ক কাঠামো সরলীকরণ, দেশীয় উৎপাদন ও রপ্তানিতে সহায়তা এবং জীবনযাপন সহজ করার উদ্যোগ বাজেটের গুরুত্বপূর্ণ দিক।
২০২৬-২৭ সালের কেন্দ্রীয় বাজেট একদিকে যেমন পরিকাঠামো ও উৎপাদনমুখী প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করতে চায়, তেমনই সামাজিক অন্তর্ভুক্তি, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও আর্থিক শৃঙ্খলার মাধ্যমে বিকশিত ভারতের পথে এক সুসংহত, আত্মবিশ্বাসী পদক্ষেপ হিসেবেই উঠে এল এই বাজেট।
Published on: ফেব্রু ১, ২০২৬ at ২২:৪৩



