দেব আনন্দ থেকে অমিতাভ: এক কণ্ঠে বদলে গেছে পাঁচ প্রজন্মের নায়কের পরিচয়

Main দেশ বিনোদন ভ্রমণ রাজ্য
শেয়ার করুন

সাধারণত একজন নেপথ্য গায়ক একজন বা দুজন নায়কের কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠেন। কিন্তু কিশোর কুমার ছিলেন ব্যতিক্রম। তিনি শুধু একজন নায়কের কণ্ঠ ছিলেন নাতিনি ছিলেন একাধিক যুগের, একাধিক ব্যক্তিত্বের, একাধিক প্রজন্মের আবেগের ভাষা। ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এমন নজির দ্বিতীয়টি খুঁজে পাওয়া কঠিন।

কলমে: অনিরুদ্ধ পাল
সংবাদ প্রভাকর টাইমস

এসপিটি প্রতিবেদন: কোনও নায়ক যখন পর্দায় প্রেমে পড়েন, দর্শক তাঁর চোখের ভাষা দেখেন। কিন্তু সেই প্রেমকে হৃদয়ের গভীরে পৌঁছে দেয় যে কণ্ঠ, তার শক্তি অনেক সময় চোখে পড়ে না।

কিশোর কুমার সেই অদৃশ্য শক্তি ছিলেন।

তিনি এমন এক শিল্পী, যিনি পর্দায় না থেকেও পর্দার সবচেয়ে বড় নায়কদের ব্যক্তিত্বের অংশ হয়ে উঠেছিলেন।

দেব আনন্দের রোম্যান্টিক হাসি, রাজেশ খান্নার মায়াভরা চোখ, অমিতাভ বচ্চনের দৃঢ় ব্যক্তিত্ব, ঋষি কাপুরের তারুণ্য কিংবা সঞ্জয় দত্তের আবেগ—সবকিছুর মধ্যেই কোথাও না কোথাও লুকিয়ে ছিল কিশোর কুমারের কণ্ঠ।

দেব আনন্দ: প্রথম পূর্ণাঙ্গ রসায়ন

যদি প্রশ্ন করা হয়, রাজেশ খান্নার আগে কোন নায়কের সঙ্গে কিশোর কুমারের কণ্ঠ সবচেয়ে স্বাভাবিকভাবে মিশে গিয়েছিল?

নিঃসন্দেহে উত্তর হবে— দেব আনন্দ।

দেব আনন্দের মধ্যে ছিল এক অদ্ভুত প্রাণচাঞ্চল্য। তাঁর হাঁটা, কথা বলা, হাসি—সবকিছুতেই ছিল ছন্দ। আর সেই ছন্দের সঙ্গেই আশ্চর্যভাবে মিলে যেত কিশোরের গায়কি।

মুনিমজি’, ‘পেয়িং গেস্ট’, ‘ফান্টুশ’, ‘নও দো গিয়ারাহ’, ‘গাইড’, ‘জুয়েল থিফ’—একটির পর একটি ছবিতে এই জুটি দর্শকদের মন জয় করে।

“জীবন কে সফর মে রাহি”, “গাতা রহে মেরা দিল”, “ইয়ে দিল না হোতা বেচারা”, “ফুলোঁ কে রং সে”—এসব গান শুনলে মনে হয়, দেব আনন্দ যেন নিজেই গান গাইছেন।

এই বিশ্বাসযোগ্যতাই ছিল কিশোর কুমারের সবচেয়ে বড় সাফল্য।

রাজেশ খান্না: যখন কণ্ঠ হয়ে উঠল সুপারস্টারের পরিচয়

তারপর এলেন রাজেশ খান্না। ভারতের প্রথম সুপারস্টার। কিন্তু সুপারস্টারের জনপ্রিয়তাকে আরও এক ধাপ ওপরে তুলেছিল যে কণ্ঠ, তার নাম কিশোর কুমার। এক সময় এমন অবস্থাও তৈরি হয়েছিল যে, রাজেশ খান্নাকে নিয়ে নতুন ছবি মানেই দর্শক অপেক্ষা করতেন—

কিশোর কুমারের নতুন গান কবে শোনা যাবে?

‘আরাধনা’, ‘কাটি পতঙ্গ’, ‘আমার প্রেম’, ‘সফর’, ‘দাগ’, ‘আপ কি কসম’, ‘মেরে জীবন সাথী’—প্রতিটি ছবিই যেন দুই শিল্পীর যৌথ সৃষ্টির দলিল।

আজও যখন “ও মেরে দিল কে চেইন” বা “কুছ তো লোগ কহেঙ্গে” বাজে, তখন রাজেশ খান্নার মুখ আর কিশোরের কণ্ঠকে আলাদা করা যায় না।

অমিতাভ বচ্চন: এক নতুন যুগের সূচনা

সত্তরের দশকের মাঝামাঝি সময়ে বলিউডে এক নতুন নায়কের আবির্ভাব।

অমিতাভ বচ্চন।

‘অ্যাংরি ইয়ং ম্যান’-এর যুগ শুরু হয়েছে। এবার দরকার ছিল এমন এক কণ্ঠ, যা একদিকে শক্তিশালী, অন্যদিকে আবেগপূর্ণ। কিশোর কুমার আবারও নিজেকে বদলে ফেললেন। অমিতাভের জন্য তিনি গাইলেন একেবারে অন্যভাবে।

‘অভিমান’, ‘ডন’, ‘কালিয়া’, ‘নমক হালাল’, ‘শরাবি’—প্রতিটি ছবিতে তাঁর কণ্ঠ যেন অমিতাভের ব্যক্তিত্বকে আরও গভীর করে তুলেছে।

“মেরে অঙ্গনে মে”-এর দুষ্টুমি যেমন তিনি গাইতে পারেন, তেমনই “পাগ ঘুঙরু বাঁধ”-এর উচ্ছ্বাস কিংবা “ইন্তেহা হো গয়ি”-র রোম্যান্সও সমান দক্ষতায় তুলে ধরতে পারেন।

এটাই ছিল তাঁর অসাধারণ ক্ষমতা।

ঋষি কাপুর: তারুণ্যের নতুন ভাষা

আশির দশকে ভারতীয় সিনেমা আবার বদলাতে শুরু করল। পর্দায় এলেন তরুণ নায়ক ঋষি কাপুর। অনেকে ভেবেছিলেন, হয়তো এবার নতুন গায়কের প্রয়োজন হবে। কিন্তু আবারও কিশোর কুমার প্রমাণ করলেন— বয়স নয়, শিল্পই শেষ কথা।

‘খেল খেল মে’, ‘হাম কিসিসে কম নেহি’, ‘করজ’ (যেখানে অন্যান্য শিল্পীদেরও গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল), ‘ইয়াদোঁ কি বারাত’-পরবর্তী যুবপ্রজন্মের রোম্যান্টিক ধারার বহু ছবিতে তাঁর কণ্ঠ তরুণদের নতুন আবেগ হয়ে ওঠে।

তাঁর কণ্ঠে কোনও ক্লান্তি ছিল না। বরং মনে হতো, তিনি যেন প্রতিটি নতুন প্রজন্মের সঙ্গে নিজেকেও নতুন করে জন্ম দিচ্ছেন।

সঞ্জয় দত্ত: প্রজন্ম বদলাল, কণ্ঠ নয়

আশির দশকের মাঝামাঝি যখন সঞ্জয় দত্তের মতো নতুন মুখ আসছে, তখনও কিশোর কুমারের কণ্ঠ সমান প্রাসঙ্গিক। এটি খুব সাধারণ ঘটনা নয়। একজন শিল্পী যদি তিন দশক ধরে জনপ্রিয় থাকেন, সেটাই বিরল।

আর কিশোর?

তিনি প্রায় চার দশক ধরে একের পর এক প্রজন্মের নায়কের কণ্ঠ হয়ে থেকেছেন। ভারতীয় চলচ্চিত্র সঙ্গীতে এমন নজির কার্যত অনন্য।

কেন সবাই তাঁকেই চাইতেন?

এই প্রশ্নের উত্তর শুধু তাঁর কণ্ঠে নয়। উত্তর লুকিয়ে ছিল তাঁর অভিনয়বোধে। তিনি রেকর্ডিংয়ের আগে শুধু গান শুনতেন না।

তিনি জানতেন— নায়ক কে?

চরিত্রের বয়স কত?

সে প্রেমে পড়েছে, না ভেঙে পড়েছে?

সে মদ্যপ, না স্বপ্নবাজ?

সে শহুরে, না গ্রামের ছেলে?

এই বিশ্লেষণের পরই তিনি মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়াতেন। তাই একই শিল্পী কখনও দেব আনন্দের মতো হালকা, কখনও রাজেশ খান্নার মতো আবেগপ্রবণ, কখনও অমিতাভের মতো দৃঢ়, আবার কখনও ঋষি কাপুরের মতো চঞ্চল হয়ে উঠতে পারতেন।

কণ্ঠের মধ্যে ছিল অভিনেতা

সম্ভবত এটাই ছিল কিশোর কুমারের সবচেয়ে বড় গোপন রহস্য। তিনি প্রথমে ছিলেন একজন অভিনেতা। তারপর গায়ক। ফলে তিনি শুধু সুর গাইতেন না। তিনি চরিত্রকে অভিনয় করতেন। এই কারণেই তাঁর গান শুনলে মনে হয়, পর্দার নায়ক নিজেই যেন নিজের মনের কথা বলছেন।

ভারতীয় চলচ্চিত্রে এই অভিনয়নির্ভর গায়কির ধারা তিনি এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন।

যে কণ্ঠ সময়ের সঙ্গে নিজেকেও বদলেছে

অনেক শিল্পী একটি নির্দিষ্ট সময়ের প্রতীক হয়ে থাকেন। কিশোর কুমার ছিলেন সময়েরও ঊর্ধ্বে।

পঞ্চাশের দশকের সরল সুর, ষাটের দশকের রোম্যান্স, সত্তরের দশকের আবেগ, আশির দশকের আধুনিকতা—প্রতিটি যুগে তিনি নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করেছেন। তাই তাঁর গান কখনও পুরোনো মনে হয় না। বরং প্রতিটি প্রজন্ম মনে করে—

“এই কণ্ঠ তো আমাদেরই।”

একজন শিল্পী, যিনি নায়কদেরও অমর করে তুলেছিলেন

আজ যদি দেব আনন্দ, রাজেশ খান্না, অমিতাভ বচ্চন কিংবা ঋষি কাপুরের সেরা মুহূর্তগুলোর কথা মনে করা হয়, তবে তার সঙ্গে কোনও না কোনওভাবে জড়িয়ে থাকবে কিশোর কুমারের একটি গান।

এই কণ্ঠ শুধু নায়কদের জন্য গান গায়নি। এই কণ্ঠ তাঁদের পর্দার জীবনকে আরও বিশ্বাসযোগ্য, আরও আবেগময়, আরও স্মরণীয় করে তুলেছিল।

হয়তো এ কারণেই বলা যায়—

ভারতীয় চলচ্চিত্রে অনেক মহান অভিনেতা এসেছেন। অনেক মহান গায়কও এসেছেন। কিন্তু এমন একজন শিল্পী খুব কমই এসেছেন, যিনি নিজের কণ্ঠ দিয়ে পাঁচ প্রজন্মের নায়কের পরিচয়ই বদলে দিয়েছেন।

সেই শিল্পীর নাম— কিশোর কুমার।

পরবর্তী খণ্ড

বাংলার কিশোর: হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের স্নেহ, উত্তম কুমারের কণ্ঠ আর বাংলা গানের এক অনন্য অধ্যায়

এই পর্বে উঠে আসবে—

  • কেন কিশোর কুমার নিজেকে আজীবন একজন খাঁটি বাঙালি বলে মনে করতেন,
  • হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে তাঁর গভীর সম্পর্ক,
  • বাংলা চলচ্চিত্রে তাঁর অভিনয় ও গান,
  • উত্তম কুমারের জন্য গাওয়া কালজয়ী গান,
  • রবীন্দ্রসঙ্গীত ও আধুনিক বাংলা গানে তাঁর অবদান,
  • এবং কেন বাংলা সঙ্গীতজগতে কিশোর কুমারের অবদান অনেক সময় তাঁর হিন্দি গানের আড়ালে চাপা পড়ে যায়।

শেয়ার করুন