ঘুরে এলাম মেঘ পিওনের দেশে

Main দেশ ভ্রমণ রাজ্য
শেয়ার করুন

Published on: ফেব্রু ৮, ২০২৬ at ২০:৩৬
লেখক – সোহম ভট্টাচার্য

কয়েক দিন আগে আমি ঘুরে এলাম কাশ্যেন নামে একটি ছোট পাহাড়ি গ্রামে, যেটি কালিম্পং জেলার পেডং ডেভেলপমেন্ট ব্লকের অন্তর্গত। নির্দিষ্ট কিছু দেখার উদ্দেশ্য নিয়ে এবারের আমার সফর ছিল না। শুধু মনে ইচ্ছে ছিল – শহরের চেনা শব্দ, হৈ-হুল্লোড় আর প্রতিদিনের ব্যস্ততা থেকে একটু দূরে গিয়ে নিজের মতো করে কিছুটা সময় কাটানোর। কালিম্পং জেলার এই ছোট পাহাড়ি গ্রামটা আমাকে ঠিক সেটাই দিয়েছিল।

এই গ্রামের ইতিহাসও বেশ পুরনো। এটি ছিল ঐতিহাসিক সিল্ক রুট-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্শ্বপথ বা transit point সিল্ক রুট।  শুধু রেশম নয়, বরং নুন, পশম, মশোলা, ভেষজ, চা ও অন্যান্য পণ্য আদান-প্রদানের জন্য ব্যবহৃত হত।

তিব্বত থেকে নুন ও পশম নিয়ে ব্যবসায়ীরা এই পথ ধরে ভারতে আসতেন, আর ভারত থেকে যেত চাল, মশলা ও অন্যান্য দ্রব্য। পেডং, আরিতার, জুলুক, রংলী- এই সমস্ত জায়গার সঙ্গে কাশ্যেন যুক্ত ছিল একটি স্বাভাবিক বিশ্রামস্থল হিসাবে।

ব্রিটিশ আমলে এই সিল্ক রুট-এর গুরুত্ব আরও বাড়ে। কারণ, এটি ছিল তিব্বত সীমান্তের খুব কাছে, ফলে বাণিজ্যের পাশাপাশি এর সামরিক গুরুত্বও ছিল। সেই কারণে পাহাড়ি রাস্তাগুলো উন্নত করা হয় ডাক ও পণ্যবাহী পথ তৈরির জন্য। সেই সময় থেকেই কাশ্যেন ও আশপাশের গ্রামগুলো একটি পরিচিত নাম হয়ে ওঠে।

আমি ছিলাম কাশ্যেন গ্রামের একটি সুন্দর হোমস্টেতে, নাম “ট্রাভেলাইটস হিল স্টে”। এই হোমস্টে’র খবর পেয়েছিলাম আমারই সহকর্মী অরুণবাবুর থেকে। হোমস্টে’র সামনে রয়েছে কমলালেবুর বাগান। হাত বাড়ালেই গাছ থেকে পেড়ে নেওয়া যায় অনায়াসে। সকালের নরম রোদে বাগানের ভিতর হাঁটতে বেশ ভালোই লাগে।

এখানে সকাল শুরু হয় পাখির ডাকে। জানলা খুললেই চোখে পড়ে ঢেউ খেলানো পাহাড়ের সারি, সবুজ ঢাকা উপত্যকা আর ভেসে যাওয়া মেঘ। দূরে প্যাকিয়ং এয়ারপোর্টের দিকে উড়ে যাওয়া বিমানের সাদা রেখাটুকু চোখে পড়ে- কিছুক্ষণ আকাশে ভেসে থেকে আবার মিলিয়ে যায়।

হোমস্টের একেবারে কাছেই পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে এসেছে একটি ছোট ঝর্ণা। সারাদিন ধরে তার অবিরাম জলের ধারা শব্দটা এমনভাবে চারপাশে মিশে থাকে যে আলাদা করে শুনতে হয় না। – নিজে থেকেই কানে এসে পৌঁছয়। কয়েকদিন কাটার পর টের পেলাম , এই অবিরাম স্রোতটাই আমার দিনের গতি ঠিক করে দিচ্ছে। এখানে সময় ঘড়িতে মাপা হয় না- ঝর্নার দ্বন্দ্বেই সকাল গড়িয়ে দুপুর, আর দুপুর থেকে ধীরে ধীরে সন্ধে নামে।

ভোর হলেই এলার্মের শব্দে ঘুম ভেঙে যেত। চা খেয়ে ঝটপট রেডি হয়ে বেরোতেই দেখা হয়ে যেত গেটের সামনে বসে থাকা আমার নতুন বন্ধু টারজানের সাথে । লেজ নাড়াতে নাড়াতে সে কিছুটা পথ আমার সাথে যেত। তারপর তাকে বিদায় জানিয়ে আমি ঘন জঙ্গলের ভিতর দিয়ে পথ চলা শুরু করতাম। চলতে চলতে চোখে পড়ত পাহাড়ি ফুল, ফলের বাগান আর চারপাশে ছড়িয়ে থাকা ছোট ছোট ঝর্ণা। কোথাও কোথাও একটু উপরে উঠতে হয়- সেই ছোট ট্রেকগুলোর শেষে হঠাৎ করেই চোখে পড়ে ঝকঝকে কাঞ্চনজঙ্ঘা। কোনও পরিকল্পনা ছাড়াই এমন দৃশ্য সামনে চলে আসাটাই কাশ্যেনের সবচেয়ে বড় চমক।

এখান থেকে খুব সহজেই গাড়ি নিয়ে ঘুরে আসা যায় আশপাশের পাহাড়ি গ্রামগুলো। লাভা , লোলেগাঁও আর রিশপ-সবকটাই কাছাকাছি। এখান থেকে প্রায় দেড় ঘণ্টার মধ্যেই পৌঁছে যাওয়া যায় লাভা মনাস্ট্রিতে। পথ জুড়ে শান্ত পরিবেশে কিছুটা সময় কাটালে মনটা আপনা-আপনিই শান্ত হয়ে আসে।

যদি হাতে আর একটা দিন সময় থাকে , তাহলে কাশ্যেন লোকাল সাইট সিয়িং অবশ্যই করা উচিত। কাশ্যেনের চারপাশে ছড়িয়ে থাকা জায়গাগুলো খুব কাছাকাছি হলেও প্রতিটা জায়গার অনুভূতি আলাদা।

কাশ্যেন ভিউ পয়েন্ট থেকে পাহাড়ের ঢেউ খেলানো সারি একসঙ্গে দেখা যায়। আলো আঁধারি খেলায় পাহাড়গুলো তখন মায়াবী হয়ে ওঠে। দূর থেকে দেখা যায় জুলুক, আরিতার। আকাশ পরিষ্কার থাকলে এখান থেকে পান্ডিমও দেখা যায়। এটি ‘কাঞ্চঞ্জঙ্ঘা ম্যাসিফ’-এরই অংশ। স্থানীয় লেপচা ও ভুটিয়া সম্প্রদায়ের বিশ্বাস অনুযায়ী, ‘প্যান-ডিম’ শব্দের অর্থ হল ‘দেবতাদের পাহাড়’ বা ‘রক্ষাকর্তা পর্বত’।

পান্ডিমকে তারা ‘গার্জিয়ান মাউন্টেন’ হিসাবে মানে। মনে করা হয়, এই পাহাড় সবাইকে বিপদ থেকে রক্ষা করে এবং প্রকৃতির ভারসাম্য বজায় রাখে।

সিকিমে বৌদ্ধ ধর্মের (বিশেষ করে ব্জ্রযান ) প্রভাবের কারণে পাহাড়গুলিকে দেবতার আসন হিসাবে দেখা হয়। পান্ডিম পাহাড়কে ঘিরে বহু প্রার্থণা, লোককথা ও আচার প্রচলিত আছে।

কাশ্যেন ওয়াটার ফলস পৌঁছনোর পথে অল্প হাঁটা আছে। চারপাশের সবুজ আর জল পড়ার শব্দ  মিলিয়ে জায়গাটার পরিবেশ খুব শান্ত। বর্ষার সময় এই জায়গা সবচেয়ে সুন্দর থাকে।

রামিতে ভিউ পয়েন্ট-এ পৌঁছতে হলে হালকা ট্রেক করতে হয়। এই ভিউ পয়েন্ট থেকে প্রায় ১৪টি বাঁক নিয়ে বয়ে চলা তিস্তা নদী দেখা যায়। স্থানীয় লেপচা ভাষায় “রামিতে” শব্দের অর্থ ধরা হয় “সুন্দর দৃশ্য” বা “দূর পর্যন্ত দেখা যায় এমন জায়গা” । সূর্যাস্তের সময় এখানে নদীর উপর আলো-ছায়ার খেলা বিশেষভাবে সসুন্দর লাগে।

জলসা বাংলো কাশ্যেনের ইতিহাসের অংশ। পুরনো কাঠামো আর চারপাশের জঙ্গল মিলিয়ে জায়গাটার একটা আলাদা আবহ আছে। এটি ছিল ঐটিহাসিক ব্রিটিশ আমলের বাংলো। নাম থেকেই বোঝা যায় , এটি মূলত ছিল ব্রিটিশ অফিসারদের বিশ্রাম ও বিনোদনের স্থান- যেখানে পার্টি, আড্ডা আরা সামাজিক জমায়েত হত, যাকে তখন “জলসা” বলা হত।

এই বাংলোটি পাহাড়ের উঁচু জায়গায় তৈরি করা হয়েছিল, যাতে চারপাশের উপত্যকা ও পাহাড়ি পথ স্পষ্ট দেখা যায়। ফলে এর ব্যবহার শুধু বিনোদনের জন্য নয়, পথ পর্যবেক্ষণ ও প্রশাসনিক নজরদারির কাজেও হত।

হিমানি ভিউ পয়েন্ট-এ দাঁড়ালে মনে হয়, মেঘগুলো খুব কাছ দিয়ে ভেসে যাচ্ছে। পরিষ্কার দিনে এখান থেকে কাঞ্চঞ্জঙ্ঘা, সঙ্গে পান্ডিম ও আশপাশের বরফঢাকা চূড়া দেখা যায়। ভোরের আলোয় বা বিকেলের নরম রোদে এই জায়গার সৌন্দর্য সবচেয়ে বেশি ধরা দেয়।

রামদূরা ভিউ পয়েন্ট থেকে একদিকে তিস্তা নদী, অন্যদিকে কাঞ্চজঙ্ঘা –দুটোই একসঙ্গে দেখা যায়। ফটোগ্রাফির জন্য জায়গাটা দারুন।

মুনসঙ ভিউ পয়েন্ট হালকা ট্রেক করে উপরের চূড়ায় উঠলে চারদিকের পাহাড় এ্কসঙ্গে চোখে পড়ে। এখান থেকে একদিকে তিস্তা উপত্যকা আর অন্যদিকে সিকিম ও পূর্ব হিমালয়ের বিস্তৃত পাহাড়ি দৃশ্য দেখা যায়।

সবশেষে মিলন টপ হিল ভিউ পয়েন্ট। শেষ অংশটা একটু হাঁটতে হয়, কিন্তু উপরে উঠে দাঁড়ালেই মনে হয় পরিশ্রম সার্থক। পাহাড় আর আকাশ এখানে যেন একে অন্যের সঙ্গে মিশে গেছে। এখান থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা ঝকঝকে দেখায়।

দিন গড়িয়ে সন্ধে নামতেই হোমস্টেতে ফিরে আসা। গরম গরম ঘরোয়া খাবার, হাতে চা বা কফির কাপ, আর ধীরে ধীরে নামতে থাকা পাহাড়ি সন্ধ্যা- এই মুহূর্তগুলোই কাশ্যেন এ থাকার অভিজ্ঞতাকে সত্যি মনে রাখার মতো করে তোলে।

দু’একদিন ল্যাপটপ খুলে কাজও করেছি, কিন্তু মনটা বারবার জানলার বাইরে পাহাড় আর নীরবতার দিকেই আটকে ছিল।

কাশ্যেন থেকে ফিরে এসে আমার মনে হয়েছে—এটা এমন একটা জায়গা, যেখানে শুধু যাওয়াটাই আসল নয়। শহরে কর্ম ব্যস্ততার মধ্যে একটু ব্রেক পাওয়াটাই সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।

কোথায় থাকবেন

Travelites Hill Stay
কাশ্যেন গ্রাম, পেডং ডেভেলপমেন্ট ব্লক,
জেলা-কালিম্পং
পিন-734311
Contact: 8902481053

কিভাবে আসবেন

NJP থেকে গাড়িতে প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা,  গাড়ি চাইলে সরাসরি Travelites Hill Stay-তে ফোন করলে ব্যবস্থা পেয়ে যাবেন

Pickup/Drop সুবিধা

NJP থেকে হোমস্টে পর্যন্ত পিক-আপ ও ড্রপের ব্যবস্থা আছে। ছোট গাড়ির চার্জ সাড়ে তিন হাজার এবং বড় গাড়ির চার্জ Rs. 4200 । গাড়ির জন্য আগেই হোমস্টেতে ফোন করে বুক করা যাবে।

হোমস্টের খরচ

থাকা ও খাওয়া মিলিয়ে খরচ জন প্রতি Rs. 1200 প্রতিদিন। এই প্যাকেজের মধ্যে ব্রেকফাস্ট, লাঞ্চ, ইভনিং স্ন্যাক্স এবং ডিনার অন্তর্ভুক্ত।

Room & Amenities

প্রতিটি রুমে চা বা কফি বানানোর জন্য কেটলি আছে। এছাড়া টয়লেট কিট, ওয়াই-ফাই এবং গিজারের-এর সুবিধাও পাওয়া যাবে।

 

Published on: ফেব্রু ৮, ২০২৬ at ২০:৩৬


শেয়ার করুন