
গীতাঞ্জলি স্টেডিয়ামে মানবিকতার এক অনন্য উৎসব—‘আশায়েন ২০২৬’
Published on: ফেব্রু ১, ২০২৬ at ১৬:৫২
Reporter: Aniruddha Pal

এসপিটি নিউজ, কলকাতা, ১ ফেব্রুয়ারি: রবিবার কলকাতা যেন শুধুই একটি শহর ছিল না—সে দিন কলকাতা হয়ে উঠেছিল আশা, সাহস ও অন্তর্ভুক্তির এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। গীতাঞ্জলি স্টেডিয়াম প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হল ‘আশায়েন – রোশনি উম্মিদোঁ কি’-র দ্বাদশ বর্ষের বার্ষিক প্যারালিম্পিক ক্রীড়া উৎসব। শহরের প্রায় ৪০টি স্কুল ও বিশেষ প্রতিষ্ঠান থেকে আসা প্রায় ৮০০ জন বিশেষভাবে সক্ষম শিশু সারাদিন ধরে অংশ নিল এই অন্তর্ভুক্তিমূলক ক্রীড়া কার্নিভালে—যেখানে প্রতিযোগিতার চেয়েও বড় হয়ে উঠেছিল অংশগ্রহণ, আত্মবিশ্বাস আর নিজের সীমাকে অতিক্রম করার আনন্দ।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের দৃশ্য ছিল সত্যিই মন ছুঁয়ে যাওয়ার মতো। সঙ্গীতের তালে তালে নাচতে থাকা শিশুদের চোখেমুখে যে উচ্ছ্বাস, তারপর হাতে ধরা রঙিন বেলুনগুলো যখন একসঙ্গে আকাশে উড়ে গেল—তখন পুরো স্টেডিয়াম জুড়ে ছড়িয়ে পড়ল এক অনাবিল আনন্দ। সেই মুহূর্ত যেন মনে করিয়ে দিল ‘তারে জমিন পর’-এর সেই দৃশ্যগুলিকে, যেখানে শিশুমনের অবাধ আনন্দ ও আত্মপ্রকাশ সব বাধা ভেঙে বেরিয়ে আসে। গীতাঞ্জলি স্টেডিয়াম তখন যেন সেই অনুভূতিরই এক জীবন্ত ফ্ল্যাশব্যাক।
উদ্যোগের নেপথ্যে মানবিক হাতছানি
লায়ন্স ক্লাব অব কলকাতা (ডিস্ট্রিক্ট ৩২২বি১)-এর উদ্যোগে এবং রাউন্ড টেবিল ইন্ডিয়া (RT 113) ও লেডিস সার্কেল ইন্ডিয়া (LC 132)-এর সহযোগিতায় আয়োজিত এই অনুষ্ঠানটি শুধু একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়—বরং বিশেষভাবে সক্ষম শিশুদের মর্যাদা, সমান সুযোগ ও সামাজিক অন্তর্ভুক্তির প্রতি শহরের দৃঢ় অঙ্গীকারের প্রকাশ।
৫০ মিটার ও ১০০ মিটার দৌড়, বল নিক্ষেপ, শট পুট-সহ একাধিক ইভেন্টে অংশ নেয় শিশুরা। প্রতিটি খেলায় নিরাপত্তা, ন্যায্যতা ও পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করতে তৎপর ছিল সোদপুর রেফারি অ্যাসোসিয়েশন (এসআরএ)-এর প্রশিক্ষিত আধিকারিকরা।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন দেবেন্দ্র প্রকাশ সিং, আইপিএস, অতিরিক্ত কমিশনার অব পুলিশ, কলকাতা পুলিশ এবং রূপেশ কুমার, আইপিএস, যুগ্ম কমিশনার অব পুলিশ (ট্রাফিক), কলকাতা পুলিশ। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সিএ পবন কুমার পতোদিয়া, ভাইস প্রেসিডেন্ট, স্পেশাল অলিম্পিক্স ভারত। তিনি অংশগ্রহণকারী শিশু, স্বেচ্ছাসেবক ও আয়োজকদের সঙ্গে মতবিনিময় করে তাঁদের মনোবল বাড়ান।
এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন মনোজ আগরওয়াল (সেক্রেটারি), শৈলেন্দ্র তিওয়ারি (ট্রেজারার), লায়ন্স ক্লাব অব কলকাতা; হর্ষ করনানি (চেয়ারম্যান, RT 113) ও অনুরাগ মিত্তাল (এরিয়া চেয়ারম্যান, RT ইন্ডিয়া, এরিয়া ৪)। তাঁদের প্রত্যেকের কথায় ফুটে ওঠে এই উদ্যোগের সামাজিক গুরুত্ব ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা।
ক্রীড়া প্রতিযোগিতার পাশাপাশি ছিল একটি আলাদা ফান কার্নিভাল জোন—যেখানে ম্যাজিশিয়ান, জাগলার, চরিত্রাভিনেতা ও ইন্টার অ্যাক্টিভ পারফরমারদের উপস্থিতিতে শিশুরা মেতে ওঠে আনন্দে। সারাক্ষণ স্বেচ্ছাসেবকদের সক্রিয় উপস্থিতি ভেন্যু জুড়ে নিরাপত্তা ও সহায়তা নিশ্চিত করে।
প্রতিটি অংশগ্রহণকারী শিশুর জন্য ছিল প্রাতরাশ ও মধ্যাহ্নভোজ, ইভেন্ট টি-শার্ট, জ্যাকেট, ক্যাপ এবং বিশেষভাবে সাজানো উপহার সামগ্রী—যা স্পষ্ট বার্তা দেয়, এখানে জয়-পরাজয়ের চেয়ে বড় হল অংশগ্রহণের সম্মান।
আশায়েন—একটি দর্শন
অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে লায়ন কৃষ্ণন গোপাল কেজরিওয়াল, সভাপতি, লায়ন্স ক্লাব অব কলকাতা বলেন, “আশায়েন কেবল খেলাধুলার মঞ্চ নয়। এটি প্রতিটি শিশুর সাহস, আত্মবিশ্বাস ও অদম্য মানসিকতাকে সম্মান জানানোর একটি প্ল্যাটফর্ম।”
আশায়েন ২০২৬-এর চেয়ারম্যান লায়ন প্রশান্ত জৈসওয়াল জানান, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, স্বেচ্ছাসেবক ও কমিউনিটি পার্টনারদের সম্মিলিত প্রচেষ্টাতেই এই অন্তর্ভুক্তিমূলক মঞ্চ সম্ভব হয়েছে। দীর্ঘ কয়েক দশকের ঐতিহ্য নিয়ে লায়ন্স ক্লাব অব কলকাতা স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে চলেছে। দ্বাদশ বর্ষে পদার্পণ করা আশায়েন আজ শুধু একটি অনুষ্ঠান নয়—এটি এক আন্দোলন, যা মনে করিয়ে দেয়, সক্ষমতা মাপা যায় না শারীরিক সীমাবদ্ধতায়, বরং মাপা যায় মনের শক্তিতে।
রবিবার গীতাঞ্জলি স্টেডিয়ামে সেই শক্তিরই উজ্জ্বল প্রকাশ দেখল কলকাতা—যেখানে প্রতিটি হাসি ছিল এক একটি বিজয়, আর প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল এক একটি নতুন সম্ভাবনার পথে এগিয়ে যাওয়া।





Published on: ফেব্রু ১, ২০২৬ at ১৬:৫২



