বন্ধন দৃঢ় হল: লোকনাথের জন্মভূমি চাকলায় বারদির মহামিলন

Main দেশ ধর্ম ভ্রমণ রাজ্য
শেয়ার করুন

Published on: ডিসে ১৫, ২০২৫ at ১৭:৪৪
Reporter: Aniruddha Pal

এসপিটি নিউজ, চাকলা (উত্তর ২৪ পরগনা ), ১৪ ডিসেম্বর : ত্রিকালদর্শী বাবা লোকনাথের জন্মস্থান, পুণ্যভূমি চাকলাধাম গত রবিবার (ছুটির দিনে) পরিণত হলো এক মহোৎসবে। চাকলা লোকনাথ সেবাশ্রম সংঘের আয়োজনে এই দিন অনুষ্ঠিত হল ‘বিশ্ব লোকনাথ ভক্ত মহামিলন উৎসব’। রাজ্য, দেশ ও বিদেশ থেকে বহু লোকনাথ ভক্তের সমাগমে এই মিলনমেলা এক ঐতিহাসিক আকার নেয়।

বারদি থেকে অতিথিদের আগমন ও সম্মাননা

এই উৎসবের প্রধান আকর্ষণ ছিল বাংলাদেশের বারদিধাম (বাবা লোকনাথের সমাধিস্থল) থেকে আমন্ত্রিত হয়ে আসা দুই প্রধান অতিথি—ড. তাপস পাল এবং নিখিল মজুমদার। তাঁদের আগমন উৎসবের ঔজ্জ্বল্য বহুগুণ বাড়িয়ে তোলে। চাকলা লোকনাথ সেবাশ্রম সংঘের পক্ষ থেকে এই দুই সম্মানীয় অতিথিকে বিশেষভাবে সম্মানিত করা হয়। চাকলাধামের নামাঙ্কিত উত্তরীয় পরিয়ে তাদের হাতে বিশেষ স্মারক তুলে দেওয়া হয়। এরপর বারদির দুই প্রতিনধিকে সম্মাননা পত্র দেওয়া হয়। একই সঙ্গে চাকলাধামের পক্ষ থেকে বারদিধামের উদ্দেশ্যে বাবা লোকনাথের অসাধারণ মূর্তি উপহার স্বরূপ প্রদান করা হয়।

পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা ভক্তদের পাশাপাশি বারদির অতিথিদের উষ্ণ অভ্যর্থণা জানান বাবার মহানাম প্রচারক ও চাকলা লোকনাথ সেবাশ্রম সঙ্ঘের সভাপতি নবকুমার দাস, সম্পাদক সুব্রত হাজরা ও কোষাধ্যক্ষ স্বপন সেন-সহ অন্যান্য সদস্যরা।

বিশ্ব শান্তির বার্তা ও মানবকল্যাণে প্রার্থনা

অনুষ্ঠানের শুরুতেই চাকলাধামের বাবা লোকনাথের মূল মন্দিরে পুজো দেন ড. তাপস পাল ও নিখিল মজুমদার। পরে সংবাদ মাধ্যমের কাছে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করে ড. তাপস পাল বলেন, “লোকনাথ বাবা শুধু ভারত-বাংলাদেশ নয়, সারা বিশ্বজুড়ে উনি সনাতন ধর্মকে যারা বিশ্বাস করেন তাদের হৃদয়ে অবস্থান করছেন। প্রতিটি লোকের ঘরে ঘরে লোকনাথের ছবি আছে, হৃদয়ে ধারণ করে বলেই আছে।” তিনি আরও যোগ করেন, “বাবার একজন ভক্ত হিসেবে আজ এখানে বাবার পুণ্যধাম চাকলায় এই পুণ্যভূমি স্পর্শ করতে পেরে নিজেকে ধন্য মনে করছি।” এদিন তিনি বাবা লোকনাথের কাছে বিশ্ব শান্তির জন্য প্রার্থনা করেন।

ড. তাপস পাল ভক্তদের মাঝে দাঁড়িয়ে মহামিলন মঞ্চে বলেন, “অদ্বিতীয় কেউ নেই। ওনাকে বিশ্বাস করতে হবে, ধারণ করতে হবে… হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান—লোকনাথ বাবা কিন্তু সকলের।” তিনি বলেন, লোকনাথ বাবা শুধু ব্রহ্মচারী নন, উনি সত্যের সাধক ছিলেন এবং মানবকল্যাণে কাজ করে গিয়েছেন।

আগামিদিনে বারদিতেও একইরকনভাবে লোকনাথ ভক্তদের নিয়ে ভক্ত সম্মেলন আয়োজন করা যায় কিনা তা নিয়ে নিজের অভিমত প্রকাশ করে তাপসবাবু বলেন-“সেই ইচ্ছা আছে। আপনারা সবাই যদি যান তাহলে সবাইকে সাথে নিয়ে সেটা করা সম্ভব। আপনারা আসুন। যেমন আমি চলে এসছি। সব কিছু মিলেই আমরা একত্রে কাজ করতে পারব। নিজেদের মধ্যে আন্তরিকতা, সহযোগিতা সব কিছুই থাকবে।“

বারদির কোষাধ্যক্ষ নিখিল মজুমদার বলেন, “আমি চাকলায় বাবার জন্মস্থানে আসতে পেরে খুবই গর্ববোধ করছি। আমাদের দুই দেশের মধ্যে মৈত্রীর সম্পর্ক থাকবে। ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে প্রত্যেকটা মানুষ যেন বাবার আদর্শ নিয়ে চলে। তাহলে আমরা আনন্দের, সুখে, শান্তিতে থাকব।” তিনি বাংলাদেশের বারদিধামে সকলকে আসার আমন্ত্রণও জানান।

উৎসবের সূচনা ও বর্ণাঢ্য আয়োজন

অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক শুভ সূচনা করা হয় পতাকা উত্তোলন ও প্রদীপ জ্বালিয়ে। বাবার মহানাম প্রচারক ও চাকলাধামের সভাপতি নবকুমার দাস, সম্পাদক সুব্রত হাজরা এবং কোষাধ্যক্ষ স্বপন সেন-সহ সকল সদস্যরা এক সাথে পতাকা উত্তোলন করেন। চাকলাধামের মূল মন্দিরের পিছনে নতুন তৈরি হওয়া বিশালাকার কমিউনিটি সেন্টারে এই মহামিলন উৎসব আয়োজিত হয়। অনুষ্ঠান মঞ্চের পাশেই বাবা লোকনাথের একটি বিশালাকার তৈলচিত্র রাখা হয়েছিল, যেখানে প্রদীপ জ্বালিয়ে অনুষ্ঠানের সূচনা করা হয়। এরপর আগত ভক্তরা বাবার ছবিতে ফুল দিয়ে প্রণাম ও শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

বাবার মহানাম প্রচারক ও চাকলা লোকনাথ সেবাশ্রম সঙ্ঘের সভাপতি নবকুমার দাস বলেন, “বাবা লোকনাথ বলেছিলেন যে আমি যেদিন দেহ রাখব তারপর একদিন আসবে যখন প্রতিটি ঘরে আমার ছবি থাকবে। তাই আজ লোকনাথ বাবার ছবি প্রতিটি ঘরে ঘরে পৌঁছে গিয়েছে।” তিনি জানান, এদিনের ভক্ত সম্মেলনে পশ্চিমবঙ্গের নানা প্রান্ত থেকে একশোরও বেশি মন্দির যোগ দিয়েছে। তিনি আরও বলেন, “বাবা লোকনাথের বাল্যবন্ধু বেণীমাধব ও গুরু ভগবান গাঙ্গুলির সঙ্গে এই চাকলাধাম থেকেই কালীঘাটে গিয়েছিলেন,  সব জায়গা ঘুরে তিনি অবশেষে বর্তমান বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার বারদিতে যান। এটা আমাদের কাছে সত্যি এক গর্বের যে এই চাকলাধাম বাবার জন্মস্থান।”

সম্মাননা ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা

এদিন রাজ্যের বিভিন্ন জায়গার লোকনাথ মন্দির ও আশ্রম থেকে আসা প্রতিনিধিদের উত্তরীয় ও স্মারক দিয়ে সম্মানিত করা হয়। এছাড়াও সাংবাদিক, সাহিত্যিক ও উপস্থাপিকা-সহ সকলকে সম্মানিত করা হয়। এদিনের অনুষ্ঠানে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা কচুয়াধাম থেকে আমন্ত্রিত এক প্রতিনিধির উপস্থিতি, যা সকলের নজর কেড়েছে। এদিন চাকলার পক্ষ থেকে কচুয়াধামের তপন সেনকেও সম্বর্ধিত করা হয়।  তাকে সম্বর্ধিত করেন বাবার মহানাম প্রচারক ও চাকলাধামের সভাপতি নবকুমার দাস স্বয়ং।

ভক্তদের জন্য ভোগ প্রসাদ খাওয়ানোর ব্যবস্থা ছিল চোখে পড়ার মতো। গোটা অনুষ্ঠানটি যেভাবে নিয়ম-শৃঙ্খলা মেনে ও সুষ্ঠূভাবে পরিচালিত হয়েছে, তা দেখে বাংলাদেশ থেকে আসা দুই প্রধান অতিথি অভিভূত হয়েছেন।

সব মিলিয়ে চাকলাধামের এই ভক্ত মহামিলন উৎসব লোকনাথ ভক্তদের কাছে মানবকল্যাণে এগিয়ে আসার প্রেরণা জুগিয়েছে এবং ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রীর বন্ধনকে আরও সুদৃঢ় করেছে।

Published on: ডিসে ১৫, ২০২৫ at ১৭:৪৪


শেয়ার করুন