
ঔপনিবেশিক শাসন, জনগণনা, আইন ও শিক্ষাব্যবস্থা কীভাবে একটি বৃহত্তর ধর্মীয় পরিচয়ের ধারণাকে সুসংহত করল?
Published on: অক্টো ২৭, ২০২৬ at ১৬:০৭
✍️ লিখছেন অনিরুদ্ধ পাল। সংবাদ প্রভাকর টাইমস
এসপিটি বিশেষ প্রতিবেদন: “ব্রিটিশরা হিন্দু ধর্ম বানিয়েছিল”—কথাটি শুনতে সরল মনে হলেও ইতিহাসের বিচারে এটি অতিসরলীকরণ। কারণ, ব্রিটিশ শাসন ভারতে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার বহু শতাব্দী আগে থেকেই এই ভূখণ্ডে বৈদিক ঐতিহ্য, উপনিষদীয় দর্শন, শৈব, বৈষ্ণব ও শাক্ত উপাসনা, বিভিন্ন ভক্তিধারা, ধর্মীয় দর্শন এবং অসংখ্য আঞ্চলিক আচার-অনুষ্ঠানের অস্তিত্ব ছিল। এই ঐতিহ্যগুলির অনেকগুলির ইতিহাস বহু প্রাচীন।
তাহলে ব্রিটিশ শাসনের ভূমিকা কোথায়?
মূল প্রশ্নটি এই নয় যে ব্রিটিশরা ভারতীয় ধর্মীয় ঐতিহ্য সৃষ্টি করেছিল কি না। বরং প্রশ্ন হলো, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন কীভাবে বহু প্রাচীন ও বৈচিত্র্যময় ধর্মীয় পরম্পরাকে একটি বৃহত্তর, শ্রেণিবদ্ধ এবং প্রশাসনিকভাবে চিহ্নিত ধর্মীয় পরিচয়ের মধ্যে উপস্থাপন করতে সাহায্য করেছিল?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে ধর্মীয় বিশ্বাসের ইতিহাসের পাশাপাশি প্রশাসন, আইন, জনগণনা, শিক্ষা, মুদ্রণ এবং ঊনবিংশ শতকের ভারতীয় সমাজে আত্মপরিচয়ের পরিবর্তনগুলিকেও বুঝতে হবে।
ব্রিটিশদের আগেও কি হিন্দু ধর্মীয় ঐতিহ্য ছিল?
অবশ্যই ছিল। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য মনে রাখা প্রয়োজন। কোনও ধর্মীয় ঐতিহ্যের প্রাচীন অস্তিত্ব এবং সেই ঐতিহ্যের সমস্ত অনুসারীর একটি একক, সর্বজনস্বীকৃত নামে নিজেদের পরিচিত করার বিষয়টি এক নয়।
ব্রিটিশ শাসনের বহু আগে থেকেই ভারতীয় উপমহাদেশে বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায় ও পরম্পরার অস্তিত্ব ছিল। বৈদিক আচার, উপনিষদীয় চিন্তা, শৈব ও বৈষ্ণব দর্শন, শাক্ত সাধনা, পুরাণভিত্তিক উপাসনা এবং ভক্তি আন্দোলনের নানা ধারা নিজেদের মতো করে বিকশিত হয়েছিল। তাদের মধ্যে পারস্পরিক আদানপ্রদান যেমন ঘটেছে, তেমনই মতবাদ, উপাসনা ও সামাজিক রীতির পার্থক্যও ছিল।
প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় লেখায় ‘হিন্দু’ শব্দটির ব্যবহার পাওয়া যায়। তবে সব যুগে, সব অঞ্চলে এবং সব লেখকের কাছে শব্দটির অর্থ একই ছিল না। কখনও এটি ভৌগোলিক পরিচয়, কখনও জনগোষ্ঠী বা সামাজিক পরিচয়, আবার কোনও কোনও মধ্যযুগীয় লেখায় ধর্মীয় পরিচয় বোঝাতে ব্যবহৃত হয়েছে।
অতএব, ব্রিটিশদের আগের ভারতবর্ষে হিন্দু ধর্মীয় ঐতিহ্য ছিল না—এমন দাবি ঐতিহাসিক তথ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। আবার আধুনিক অর্থে ‘হিন্দুইজম’ নামে একটি সুসংহত ও সর্বজনস্বীকৃত ধর্মীয় শ্রেণি প্রাচীনকাল থেকেই অপরিবর্তিত অবস্থায় ছিল—এমন দাবিও সতর্কতার সঙ্গে যাচাই করা প্রয়োজন।
ইতিহাসবিদ ব্রায়ান কে. পেনিংটন তাঁর ‘হিন্দুইজম কি উদ্ভাবিত হয়েছিল? ব্রিটিশ, ভারতীয় এবং ঔপনিবেশিক যুগে ধর্মের নির্মাণ’ গ্রন্থে দেখিয়েছেন, আধুনিক হিন্দুধর্মের ধারণা বোঝার জন্য ব্রিটিশদের দৃষ্টিভঙ্গির পাশাপাশি ভারতীয় সমাজের নিজস্ব ধর্মীয় ইতিহাস, ব্যাখ্যা ও প্রতিক্রিয়াকেও গুরুত্ব দিতে হবে।
এই পার্থক্য থেকেই আমাদের অনুসন্ধান শুরু।
ঔপনিবেশিক প্রশাসন: বৈচিত্র্যকে শ্রেণিবদ্ধ করার প্রয়োজন
ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এবং পরে ব্রিটিশ সরকার যখন ভারতীয় উপমহাদেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল শাসন করতে শুরু করে, তখন তাদের সামনে একটি বিশাল ও জটিল সমাজকে প্রশাসনিকভাবে পরিচালনার প্রশ্ন দেখা দেয়।
এই সমাজে বিভিন্ন ভাষা, জাতিগোষ্ঠী, ধর্মীয় সম্প্রদায়, আঞ্চলিক রীতি, সামাজিক বিধান এবং স্থানীয় প্রথার অস্তিত্ব ছিল। প্রশাসনিক সুবিধার জন্য এই বৈচিত্র্যকে বিভিন্ন শ্রেণিতে ভাগ করা, মানুষের পরিচয় নথিভুক্ত করা এবং প্রচলিত নিয়মকানুনকে লিখিত আকারে বোঝা ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
ইউরোপীয় জ্ঞানচর্চায় ধর্মকে পৃথক ও চিহ্নিত ব্যবস্থা হিসেবে ব্যাখ্যা করার প্রবণতাও এই প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করে। ভারতীয় ধর্মীয় পরম্পরাকে বুঝতে গিয়ে কিছু ব্রিটিশ লেখক ও প্রশাসক ধর্মগ্রন্থ, আচার, দেবদেবী, পুরোহিত এবং সামাজিক বিধানের মধ্যে এমন একটি সাধারণ কাঠামো খুঁজতে শুরু করেন, যার সাহায্যে বিভিন্ন সম্প্রদায়কে একটি বৃহত্তর শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত করা যায়।
কিন্তু বাস্তবের ভারতীয় সমাজ ছিল এই ধরনের সরল শ্রেণিবিন্যাসের চেয়ে অনেক বেশি বৈচিত্র্যময়। একই অঞ্চলে বসবাসকারী মানুষের ধর্মীয় আচারে পার্থক্য থাকতে পারত। একই বৃহত্তর ধর্মীয় পরম্পরার মধ্যে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের ধর্মগ্রন্থ, উপাস্য, দর্শন ও আচারেও উল্লেখযোগ্য ভিন্নতা ছিল।
প্রশাসনিক শ্রেণিবিন্যাসের ফলে এই পার্থক্যগুলি সব সময় সমান গুরুত্ব পায়নি। কখনও কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্যকে সামনে আনা হয়েছে, কখনও আবার স্থানীয় ও সম্প্রদায়ভিত্তিক স্বাতন্ত্র্যকে বৃহত্তর পরিচয়ের অধীনে রাখা হয়েছে।
এভাবেই ঔপনিবেশিক প্রশাসন ভারতীয় ধর্মীয় বৈচিত্র্যকে নির্দিষ্ট শ্রেণিতে চিহ্নিত করার প্রক্রিয়াকে শক্তিশালী করে। তবে এই প্রক্রিয়া একতরফা ছিল না। ভারতীয় পণ্ডিত, ধর্মীয় নেতা, সংস্কারক এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরাও নিজেদের ঐতিহ্যকে ব্যাখ্যা করতে, নিজেদের অবস্থান প্রতিষ্ঠা করতে এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের সঙ্গে দরকষাকষি করতে সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছিলেন।
জনগণনা: পরিচয় যখন সরকারি নথিতে বাঁধা পড়ল
ঔপনিবেশিক শাসনামলে জনগণনা বা জনসংখ্যা গণনা ধর্মীয় পরিচয়কে শ্রেণিবদ্ধ করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। মানুষের সংখ্যা, ভাষা, জাতি, পেশা ও ধর্ম সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে প্রশাসনকে বিভিন্ন পরিচয়ের জন্য নির্দিষ্ট শ্রেণি ব্যবহার করতে হয়েছিল।
এই প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল, বাস্তব জীবনে মানুষের পরিচয় যতটা জটিল ও বহুমাত্রিক, সরকারি নথিতে তা অনেক সময় ততটা জটিলভাবে প্রকাশ পেত না। একজন মানুষ একই সঙ্গে স্থানীয় সম্প্রদায়ের সদস্য, নির্দিষ্ট দেবতার উপাসক, কোনও আঞ্চলিক ঐতিহ্যের অনুসারী এবং বৃহত্তর ধর্মীয় পরম্পরার অংশ হতে পারতেন। কিন্তু গণনার জন্য তাঁকে একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় শ্রেণিতে নথিভুক্ত করা হলে তাঁর পরিচয়ের অন্য দিকগুলি আড়ালে থেকে যেতে পারত।
ঊনবিংশ শতকের শেষভাগে এবং বিংশ শতকের গোড়ায় জনগণনার বিভিন্ন পর্যায়ে ধর্মীয় শ্রেণিবিন্যাস আরও নিয়মিত ও প্রাতিষ্ঠানিক হয়ে ওঠে। এর ফলে ‘হিন্দু’ পরিচয়টি সরকারি পরিসংখ্যানে একটি বিস্তৃত শ্রেণি হিসেবে দৃশ্যমানতা পায়।
তবে জনগণনাই এককভাবে এই পরিচয় সৃষ্টি করেছিল, এমন দাবি করা ঠিক হবে না। ‘হিন্দু’ শব্দের দীর্ঘ ইতিহাস, আঞ্চলিক ও ধর্মীয় পরিচয়, সমাজসংস্কার আন্দোলন, ধর্মীয় সংগঠন এবং ভারতীয়দের নিজস্ব আত্মপরিচয়ের পরিবর্তন—সব কিছুর সঙ্গে জনগণনার সম্পর্ক ছিল। সরকারি শ্রেণিবিন্যাস একদিকে সমাজের পরিচয়কে নথিভুক্ত করেছে, অন্যদিকে পরিচয় সম্পর্কে মানুষের ধারণা ও বিতর্ককেও প্রভাবিত করেছে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক নীতি মনে রাখা দরকার: কোনও পরিচয়কে সরকারি নথিতে একটি নির্দিষ্ট শ্রেণি হিসেবে ব্যবহার করা মানেই সেই পরিচয়টি তার আগে ছিল না—এমন নয়। আবার সরকারি নথিতে একটি শ্রেণি প্রতিষ্ঠিত হলেই সমাজের প্রত্যেক মানুষ সেই পরিচয়কে একইভাবে গ্রহণ করেছিলেন—এমনও নয়।
আইন: ধর্মীয় বৈচিত্র্যের জন্য একক বিধানের সন্ধান
ব্রিটিশ শাসনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র ছিল আইন। বিবাহ, উত্তরাধিকার, সম্পত্তি এবং পারিবারিক সম্পর্কের মতো বিষয়ে ঔপনিবেশিক প্রশাসন বিভিন্ন সম্প্রদায়ের প্রচলিত নিয়ম বোঝার চেষ্টা করেছিল। এই প্রক্রিয়ায় ধর্মীয় গ্রন্থ, পণ্ডিতদের ব্যাখ্যা এবং স্থানীয় প্রথাকে আইনি সিদ্ধান্তের ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
১৭৭২ সালে ওয়ারেন হেস্টিংসের বিচারসংক্রান্ত পরিকল্পনায় হিন্দুদের ক্ষেত্রে তাঁদের নিজস্ব আইন এবং মুসলমানদের ক্ষেত্রে ইসলামি আইনের ভিত্তিতে নির্দিষ্ট পারিবারিক বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার নীতি গ্রহণ করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে এই ব্যবস্থার বিভিন্ন পরিবর্তন ঘটে।
হিন্দু আইন নির্ধারণের ক্ষেত্রে ধর্মশাস্ত্র, স্মৃতিগ্রন্থ এবং পণ্ডিতদের ব্যাখ্যা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কিন্তু ভারতীয় সমাজে প্রচলিত নিয়ম সব সময় এক ছিল না। অঞ্চল, সম্প্রদায়, জাতি, পারিবারিক রীতি ও স্থানীয় প্রথা অনুযায়ী বহু পার্থক্য ছিল। লিখিত গ্রন্থে উল্লিখিত বিধান এবং বাস্তব জীবনে প্রচলিত আচারের মধ্যেও ব্যবধান থাকতে পারত।
আইন প্রয়োগের সুবিধার জন্য যখন বিভিন্ন প্রথাকে একটি বৃহত্তর ‘হিন্দু আইন’-এর অধীনে ব্যাখ্যা করা হলো, তখন বহু জটিল ও বৈচিত্র্যময় রীতিকে একটি সাধারণ কাঠামোয় বোঝার প্রবণতা শক্তিশালী হয়।
এর অর্থ এই নয় যে ব্রিটিশদের আগের ভারতে ধর্মীয় বিধান বা সামাজিক নিয়ম ছিল না। বরং ঔপনিবেশিক আইনব্যবস্থা কিছু নির্দিষ্ট গ্রন্থ ও ব্যাখ্যাকে নতুন প্রশাসনিক কর্তৃত্ব দেয় এবং বহুবিধ প্রথার মধ্যে কোনটি আইনগতভাবে গ্রহণযোগ্য, তা নির্ধারণের ক্ষমতা রাষ্ট্রের হাতে কেন্দ্রীভূত করে।
এই প্রক্রিয়ায় ধর্মীয় পরিচয় শুধু ব্যক্তিগত বিশ্বাস বা উপাসনার বিষয় থাকেনি; তা আইনি শ্রেণিবিন্যাসের সঙ্গেও যুক্ত হয়ে ওঠে।
শিক্ষা ও মুদ্রণ: নতুন ধারণার বিস্তার
ঊনবিংশ শতকে ছাপাখানার বিস্তার, সংবাদপত্র ও সাময়িকপত্রের প্রকাশ, অনুবাদ এবং আধুনিক শিক্ষার প্রসার ভারতীয় ধর্মীয় চিন্তার জগতে নতুন পরিবর্তন নিয়ে আসে।
প্রাচীন ধর্মগ্রন্থের মুদ্রিত সংস্করণ প্রকাশিত হতে থাকে। সংস্কৃত ও অন্যান্য ভারতীয় ভাষার গ্রন্থ অনুবাদ হয়ে বৃহত্তর পাঠকসমাজের কাছে পৌঁছতে শুরু করে। ধর্মীয় আচার, দর্শন, সামাজিক প্রথা ও সংস্কার নিয়ে বিতর্ক সংবাদপত্র, পুস্তিকা এবং সভা-সমিতির মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
এর ফলে ভারতীয় ধর্মীয় ঐতিহ্য নিয়ে আলোচনা কেবল মন্দির, আশ্রম, মঠ, পণ্ডিতসমাজ কিংবা স্থানীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। নতুন শিক্ষিত পাঠকসমাজের কাছে প্রশ্ন উঠতে থাকে—কোন গ্রন্থকে কতটা কর্তৃত্ব দেওয়া হবে? কোন আচার প্রাচীন? কোনটি পরবর্তী কালের সংযোজন? ধর্মীয় ঐতিহ্যের মধ্যে কী কী সাধারণ বৈশিষ্ট্য রয়েছে? সমাজে প্রচলিত কোন প্রথা বজায় রাখা উচিত, আর কোনটির সংস্কার প্রয়োজন?
ব্রাহ্মসমাজ, আর্যসমাজ এবং অন্যান্য ধর্মীয় ও সমাজসংস্কার আন্দোলন এই বৃহত্তর আলোচনার অংশ ছিল। তাদের উদ্দেশ্য ও মতবাদ এক ছিল না। কেউ উপনিষদীয় একেশ্বরবাদকে গুরুত্ব দিয়েছেন, কেউ বেদের কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছেন, আবার কেউ প্রচলিত আচার ও সামাজিক বৈষম্যের সমালোচনা করেছেন।
তবু এই আন্দোলনগুলির মধ্যে একটি সাধারণ ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্য লক্ষ করা যায়: ভারতীয় ধর্মীয় ঐতিহ্য কী, তার মূল ভিত্তি কোথায় এবং আধুনিক সমাজে তার পরিচয় কীভাবে ব্যাখ্যা করা হবে—এসব প্রশ্ন ক্রমশ প্রকাশ্য বিতর্কের বিষয় হয়ে ওঠে।
মুদ্রণ ও শিক্ষার বিস্তার এই বিতর্ককে আরও দূর পর্যন্ত পৌঁছে দেয়। ফলে বৃহত্তর ধর্মীয় পরিচয়ের ধারণা শুধু প্রশাসনিক শ্রেণিবিন্যাসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; তা ভারতীয় সমাজের আত্মসমালোচনা, সংস্কার ও আত্মপরিচয় নির্মাণের আলোচনারও অংশ হয়ে ওঠে।
ইউরোপীয় ধর্মতত্ত্ব ও ভারতীয় প্রতিক্রিয়া
ব্রিটিশ লেখক, খ্রিস্টান ধর্মপ্রচারক এবং প্রাচ্যবিদদের একটি অংশ ভারতীয় ধর্মীয় পরম্পরাকে এমন একটি সুসংহত ধর্মব্যবস্থা হিসেবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছিলেন, যার নির্দিষ্ট বিশ্বাস, গ্রন্থ ও আচার রয়েছে। তাঁদের কেউ কেউ মূর্তিপূজা, সতীদাহ কিংবা বিভিন্ন আচারকে সামনে রেখে ভারতীয় ধর্মীয় জীবন সম্পর্কে সামগ্রিক সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিলেন।
এই দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে পক্ষপাত ও ভুল ব্যাখ্যার উদাহরণ ছিল। বহু ক্ষেত্রে কোনও বিশেষ অঞ্চলের প্রথা বা নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের আচরণকে সমগ্র ভারতীয় ধর্মীয় জীবনের বৈশিষ্ট্য হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। আবার ভারতীয় ঐতিহ্যের দার্শনিক গভীরতা ও অভ্যন্তরীণ বৈচিত্র্যও সব সময় যথাযথভাবে বোঝা হয়নি।
কিন্তু ভারতীয়রা এই প্রক্রিয়ায় নিষ্ক্রিয় দর্শক ছিলেন না। তাঁরা ব্রিটিশ লেখকদের বক্তব্যের জবাব দিয়েছেন, নিজেদের ধর্মীয় ঐতিহ্যের ব্যাখ্যা পেশ করেছেন, সংস্কারের পক্ষে ও বিপক্ষে যুক্তি দিয়েছেন এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের স্বাতন্ত্র্য ও ঐক্য নিয়ে বিতর্কে অংশ নিয়েছেন।
ইতিহাসবিদ ব্রায়ান কে. পেনিংটনের গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, আধুনিক হিন্দুধর্মের ধারণাকে কেবল ব্রিটিশদের আরোপিত নির্মাণ হিসেবে দেখলে ভারতীয় চিন্তাবিদদের সক্রিয় ভূমিকা উপেক্ষিত হয়। তাঁর মতে, ঔপনিবেশিক যুগে ব্রিটিশ ও ভারতীয়দের মধ্যে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগ, বিরোধ এবং পারস্পরিক প্রতিক্রিয়ার মধ্য দিয়েই আধুনিক ধারণাটির বিকাশ ঘটে।
এই কারণে ‘ব্রিটিশরা হিন্দু ধর্ম তৈরি করেছিল’—এমন বক্তব্য ইতিহাসের জটিলতাকে যথাযথভাবে প্রকাশ করে না। বরং বলা যায়, ব্রিটিশ শাসন ও ইউরোপীয় ধর্মতত্ত্ব ভারতীয় ধর্মীয় ঐতিহ্যকে একটি বৃহত্তর শ্রেণি হিসেবে সংজ্ঞায়িত করার প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করেছিল। সেই প্রক্রিয়ায় ভারতীয় সমাজের বিভিন্ন অংশও নিজেদের মতো করে অংশ নিয়েছিল।
জাতীয়তাবাদ ও বৃহত্তর ধর্মীয় আত্মপরিচয়
ঊনবিংশ শতকের শেষভাগে এবং বিংশ শতকের গোড়ায় ভারতীয় জাতীয়তাবাদী চিন্তার বিকাশের সঙ্গে ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে আলোচনা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ব্রিটিশ শাসনের অধীনে ভারতীয় সমাজের বিভিন্ন অংশ নিজেদের অতীত, সংস্কৃতি, ধর্মীয় ঐতিহ্য ও সামাজিক অবস্থানকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করতে শুরু করে।
কিছু চিন্তাবিদ ভারতীয় ধর্মীয় ঐতিহ্যের মধ্যে একটি বৃহত্তর ঐক্য খুঁজে দেখানোর চেষ্টা করেন। তাঁরা বিভিন্ন দার্শনিক ধারা, ধর্মগ্রন্থ ও উপাসনাপদ্ধতির মধ্যে মিলকে গুরুত্ব দেন। অন্যদিকে, বিভিন্ন সম্প্রদায়ের নিজস্ব পরিচয়, মতবাদ ও স্বাতন্ত্র্যও বজায় ছিল।
এই সময়ে ধর্মীয় সংগঠন, সভা-সমিতি, সংবাদপত্র এবং প্রকাশিত গ্রন্থ বৃহত্তর ধর্মীয় পরিচয়কে প্রকাশ ও প্রচারের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে ওঠে। ফলে ‘হিন্দু’ পরিচয়টি শুধু বাইরে থেকে ব্যবহৃত একটি শ্রেণি হিসেবে থাকেনি; ভারতীয় সমাজের বিভিন্ন অংশও নিজেদের অবস্থান অনুযায়ী এই পরিচয়কে গ্রহণ, ব্যাখ্যা কিংবা নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করতে শুরু করে।
তবে এই পরিবর্তনকে সর্বভারতীয় সমাজের সর্বত্র একই রকম ঘটনা হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। অঞ্চল, ভাষা, সম্প্রদায়, সামাজিক অবস্থান ও রাজনৈতিক মতাদর্শ অনুযায়ী এই পরিচয়ের অর্থ ভিন্ন হতে পারত। বৃহত্তর পরিচয়ের ধারণা শক্তিশালী হওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন ধর্মীয় পরম্পরার স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যও বজায় ছিল।
অতএব, আধুনিক হিন্দু পরিচয়ের ইতিহাসে ঔপনিবেশিক শাসন গুরুত্বপূর্ণ হলেও ভারতীয় সমাজের নিজস্ব চিন্তা, সংগঠন ও রাজনৈতিক পরিবর্তনও সমানভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
তাহলে কি ব্রিটিশরাই ‘হিন্দুইজম’ তৈরি করেছিল?
এতক্ষণকার আলোচনা থেকে তিনটি বিষয় স্পষ্ট হয়।
প্রথমত, ব্রিটিশ শাসনের বহু আগে থেকেই ভারতীয় উপমহাদেশে বৈচিত্র্যময় ধর্মীয় ঐতিহ্য, দর্শন, উপাসনা ও সামাজিক রীতির অস্তিত্ব ছিল। এই ঐতিহ্যগুলিকে ব্রিটিশরা সৃষ্টি করেনি।
দ্বিতীয়ত, ঔপনিবেশিক শাসনের সময় প্রশাসনিক শ্রেণিবিন্যাস, জনগণনা, আইন, শিক্ষা, মুদ্রণ এবং ইউরোপীয় ধর্মতাত্ত্বিক আলোচনার মাধ্যমে এই বৈচিত্র্যময় পরম্পরাগুলিকে একটি বৃহত্তর ধর্মীয় পরিচয়ের অধীনে উপস্থাপনের প্রবণতা শক্তিশালী হয়।
তৃতীয়ত, এই প্রক্রিয়া শুধু ব্রিটিশদের একতরফা উদ্যোগ ছিল না। ভারতীয় পণ্ডিত, ধর্মীয় নেতা, সমাজসংস্কারক, লেখক ও সংগঠনও নিজেদের ঐতিহ্যের ব্যাখ্যা দিতে এবং বৃহত্তর পরিচয়ের অর্থ নির্ধারণ করতে সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছিল।
এই তিনটি বিষয়কে একসঙ্গে বিবেচনা করলেই ইতিহাসের জটিলতা বোঝা সম্ভব।
‘হিন্দুইজম’ নামে আধুনিক ধর্মীয় শ্রেণির বিকাশকে তাই একদিকে সম্পূর্ণ প্রাচীন ও অপরিবর্তিত ব্যবস্থা হিসেবে দেখা যায় না; অন্যদিকে, একে কেবল ব্রিটিশদের তৈরি কৃত্রিম পরিচয় বলেও ব্যাখ্যা করা যায় না।
ইতিহাসবিদদের আলোচনায় এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে: ধর্মীয় ঐতিহ্যের ইতিহাস এবং সেই ঐতিহ্যকে একটি বৃহত্তর শ্রেণির মধ্যে সংজ্ঞায়িত করার ইতিহাস পরস্পর সম্পর্কিত হলেও অভিন্ন নয়।
ব্রিটিশ শাসন এই দ্বিতীয় প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত ও শক্তিশালী করেছিল। কিন্তু সেই প্রক্রিয়ার মধ্যে বহু প্রাচীন ভারতীয় ঐতিহ্য, ভারতীয় সমাজের নিজস্ব উদ্যোগ এবং আধুনিক যুগের রাজনৈতিক ও বৌদ্ধিক পরিবর্তন—সব কিছুরই ভূমিকা ছিল।
ইতিহাসের প্রতি দায়বদ্ধতা কোথায়?
ধর্মীয় পরিচয়ের ইতিহাস আলোচনা করতে গিয়ে দুটি বিপরীত ভুল এড়িয়ে চলা প্রয়োজন।
একদিকে, আধুনিক যুগে কোনও শব্দের প্রচলন ঘটেছে বলেই সেই শব্দের অধীনে আলোচিত সমস্ত ধর্মীয় ঐতিহ্যও আধুনিক যুগে সৃষ্টি হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনো ভুল।
অন্যদিকে, কোনও ধর্মীয় ঐতিহ্যের শিকড় প্রাচীন বলেই তার বর্তমান পরিচয়, নাম ও শ্রেণিবিন্যাস সব যুগে একই ছিল—এমন দাবিও ঐতিহাসিক অনুসন্ধান ছাড়া গ্রহণ করা যায় না।
‘হিন্দু’, ‘হিন্দুইজম’ এবং ‘সনাতন ধর্ম’—এই তিনটি শব্দের ইতিহাস অনুসন্ধানের ক্ষেত্রেও একই সতর্কতা প্রয়োজন। শব্দগুলির ব্যবহার, অর্থ ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা বিভিন্ন সময়ে কীভাবে পরিবর্তিত হয়েছে, তা নির্দিষ্ট সূত্রের সাহায্যে যাচাই করতে হবে।
এই অনুসন্ধানের উদ্দেশ্য কোনও বিশ্বাসকে ছোট করা নয়, আবার কোনও ঐতিহাসিক দাবিকে প্রমাণ ছাড়াই সত্য বলে মেনে নেওয়াও নয়। বরং বিশ্বাসের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই ইতিহাসের তথ্য, ভাষার পরিবর্তন এবং সামাজিক প্রেক্ষাপটকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া।
‘হিন্দুইজম’ কি ব্রিটিশরা তৈরি করেছিল?—এর সবচেয়ে সতর্ক উত্তর হলো, ব্রিটিশরা ভারতীয় ধর্মীয় ঐতিহ্য সৃষ্টি করেনি; কিন্তু ঔপনিবেশিক শাসন আধুনিক হিন্দুধর্মের ধারণাকে একটি সুসংহত ধর্মীয় শ্রেণি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। সেই ইতিহাসে ভারতীয়দের নিজস্ব উদ্যোগ ও প্রতিক্রিয়াও ছিল অপরিহার্য।
এই পার্থক্যটি বুঝতে পারলেই আমরা পরবর্তী প্রশ্নটির দিকে এগোতে পারি—‘সনাতন ধর্ম’ কথাটি প্রাচীন হলেও কখন থেকে তা বৃহত্তর হিন্দুধর্মের সমার্থক পরিচয় হিসেবে ব্যবহৃত হতে শুরু করল?
এই পর্বের সূত্র
১। ব্রায়ান কে. পেনিংটন, ‘হিন্দুইজম কি উদ্ভাবিত হয়েছিল? ব্রিটিশ, ভারতীয় এবং ঔপনিবেশিক যুগে ধর্মের নির্মাণ’, অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় প্রকাশনা, ২০০৫।
২। ব্রায়ান কে. পেনিংটন, উল্লিখিত গ্রন্থের প্রথম অধ্যায়—ঔপনিবেশিক যুগে হিন্দুধর্মের ধারণার বিকাশ ও ভারতীয়দের সক্রিয় ভূমিকা।
৩। ব্রায়ান কে. পেনিংটন, উল্লিখিত গ্রন্থের তৃতীয় অধ্যায়—খ্রিস্টান ধর্মপ্রচারকদের লেখায় ভারতীয় ধর্মীয় আচার ও বিশ্বাসের উপস্থাপন।
৪। ঔপনিবেশিক যুগে ভারতীয় ধর্মীয় পরিচয়, প্রশাসনিক শ্রেণিবিন্যাস এবং ধর্মীয় ঐতিহ্যের আধুনিক ব্যাখ্যা নিয়ে গবেষণা।
পরবর্তী পর্ব
পর্ব ১৮ — ‘সনাতন ধর্ম’ কখন হিন্দুধর্মের সমার্থক হল?
এটি সম্ভবত পুরো ধারাবাহিকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্ব।
‘সনাতন’ শব্দটি প্রাচীন সংস্কৃত সাহিত্যে ব্যবহৃত হয়েছে। কিন্তু সেই শব্দবন্ধকে আজকের অর্থে হিন্দুধর্মের সাধারণ নাম হিসেবে ব্যবহার করার ইতিহাস কি সমান প্রাচীন?
ঐতিহাসিক পিটার হীশের গবেষণা অনুযায়ী, প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় সংস্কৃত সাহিত্যে ‘সনাতন ধর্ম’ কথাটির ব্যবহার থাকলেও তা ভারতীয়দের সমস্ত ধর্মীয় বিশ্বাস ও আচারের সাধারণ নাম হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল—এমন প্রমাণ পাওয়া যায় না। তাঁর অনুসন্ধানে, হিন্দুধর্মের সমার্থক বৃহত্তর পরিচয় হিসেবে এই শব্দবন্ধের ব্যবহার মূলত ঔপনিবেশিক যুগের শেষভাগে স্পষ্ট হয়ে ওঠে; ১৮৭০ সালের আগের মুদ্রিত উপাদানে এই আধুনিক অর্থের প্রমাণ অত্যন্ত সীমিত। তবে তাঁর গবেষণায় ব্যবহৃত নথি ও অনুসন্ধানপদ্ধতির সীমাবদ্ধতাও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।
তাহলে ‘সনাতন ধর্ম’ কথাটির প্রাচীন ব্যবহার এবং আধুনিক ধর্মীয় পরিচয় হিসেবে তার প্রতিষ্ঠার মধ্যে সম্পর্ক কী? কখন, কীভাবে এবং কোন ঐতিহাসিক পরিস্থিতিতে এই অর্থের পরিবর্তন ঘটল?
পরবর্তী পর্বে থাকবে সেই অনুসন্ধান।
— লিখছেন অনিরুদ্ধ পাল
“বিশ্বাসের প্রতি শ্রদ্ধা, ইতিহাসের প্রতি দায়বদ্ধতা।”
Published on: অক্টো ২৭, ২০২৬ at ১৬:০৭




