ঘোষগ্রামের লক্ষ্মীমাতা: লোককথা, সাধনা ও বিশ্বাসের এক প্রাচীন পীঠ

Main দেশ ধর্ম ভ্রমণ রাজ্য
শেয়ার করুন

তারাপীঠের অদূরে ঘোষগ্রামের লক্ষ্মীমন্দিরে কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো ঘিরে ভক্তদের ঢল, জড়িয়ে রয়েছে সাধক কামদেব ব্রহ্মচারীর অলৌকিক সাধনকাহিনি ও প্রাচীন জনশ্রুতি।

Published on: অক্টো ২৫, ২০২৬ at ২১:০২

✍️ লিখছেন অনিরুদ্ধ পাল। সংবাদ প্রভাকর টাইমস

এসপিটি নিউজ, ঘোষগ্রাম (তারাপীঠ),২৫ অক্টোবর: রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬। কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো। বাংলার ঘরে ঘরে ধন, সমৃদ্ধি ও সৌভাগ্যের দেবী মা লক্ষ্মীর আরাধনায় মেতেছেন অসংখ্য মানুষ। সন্ধ্যা নামতেই বিভিন্ন মন্দির ও পুজোমণ্ডপে শুরু হয়েছে ভক্তদের আনাগোনা। তবে বীরভূমের তারাপীঠের অদূরে অবস্থিত ঘোষগ্রামে কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর মাহাত্ম্য যেন একটু অন্য রকম। এখানকার লক্ষ্মীমাতার মন্দিরকে ঘিরে রয়েছে প্রাচীন ইতিহাস, সাধনসাধিকার কাহিনি, অলৌকিক ঘটনার জনশ্রুতি এবং স্থানীয় মানুষের গভীর বিশ্বাস। সেই বিশ্বাসের টানেই প্রতি বছর কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর সন্ধ্যায় বহু মানুষ ভিড় করেন এই প্রাচীন মন্দিরে। এ বছরও তার ব্যতিক্রম হয়নি।

তারাপীঠ থেকে পাকা রাস্তা ধরে এগিয়ে ঘোষগ্রামে প্রবেশের মুখেই রাস্তার পাশে চোখে পড়ে সুদৃশ্য লক্ষ্মীমাতার মন্দির। বাইরে থেকে সাধারণ মন্দিরের মতো মনে হলেও এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বহু শতাব্দীর ইতিহাস ও বিশ্বাসের পরম্পরা। এখানকার বিশেষত্ব হল, মন্দিরে পূজিতা হন দারুময়ী লক্ষ্মীমাতা। অর্থাৎ কাঠের তৈরি মূর্তিতে দেবীর আরাধনা করা হয়। তবে এই মূর্তি প্রতিষ্ঠার কাহিনি শুধু একটি ধর্মীয় আচার পালনের ইতিহাস নয়, বরং এর সঙ্গে মিশে রয়েছে এক সাধকের সাধনা, দেবীর স্বপ্নাদেশ এবং একাধিক লোকশ্রুতি।

‘তীর্থভূমি তারাপীঠ’ গ্রন্থে লেখক প্রবোধ কুমার বন্দ্যোপাধ্যায় ঘোষগ্রামের ইতিহাস এবং লক্ষ্মীমাতার পুজো প্রচলনের কাহিনি বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেছেন। তাঁর বিবরণ অনুযায়ী, এই পুজোর সূচনা করেছিলেন সাধক কামদেব ব্রহ্মচারী। তিনি ছিলেন শাক্ত ও বৈষ্ণব—উভয় সাধনপথের অনুসারী। তন্ত্রসাধনার পাশাপাশি বৈষ্ণব ভাবধারাতেও তাঁর গভীর অনুরাগ ছিল। ঘোষগ্রামের নিবিড় আম্রকুঞ্জে সাধনা করেই তিনি লক্ষ্মীমাতার আরাধনায় সিদ্ধিলাভ করেছিলেন বলে জনশ্রুতি রয়েছে।

কিন্তু এই পুজোর ইতিহাস বুঝতে গেলে ফিরে তাকাতে হয় ঘোষগ্রামের প্রাচীন অতীতের দিকে।

প্রবোধ কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের গ্রন্থে উল্লিখিত তথ্য অনুযায়ী, বাংলার শূর বংশীয় রাজাদের ইতিহাসের সঙ্গে এই অঞ্চলের প্রাচীন জনবসতির একটি যোগসূত্রের কথা জানা যায়। জনশ্রুতি ও ঐতিহাসিক বিবরণে রাজা আদিশূরের নামের সঙ্গে এই ইতিহাসের সম্পর্কের উল্লেখ রয়েছে। কথিত আছে, ভূশূরের মঙ্গল কামনায় যজ্ঞের আয়োজন করতে গিয়ে বাংলায় উপযুক্ত ব্রাহ্মণের অভাবের কারণে তিনি বর্তমান উত্তরপ্রদেশের কনৌজ থেকে পাঁচজন ব্রাহ্মণ ও পাঁচজন কায়স্থকে বাংলায় নিয়ে আসেন। সেই পাঁচ কায়স্থের মধ্যে ছিলেন সোম ঘোষ।

গ্রন্থের বিবরণ অনুসারে, সোম ঘোষকে বিপুল সংখ্যক গ্রামের সামন্তশাসনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। জয়যান থেকে একচক্রা পর্যন্ত ২৭০০টি গ্রামের সঙ্গে তাঁর নাম জড়িয়ে রয়েছে বলে উল্লেখ পাওয়া যায়। এই ঐতিহ্যের সূত্র ধরেই ঘোষগ্রামকে অত্যন্ত প্রাচীন জনপদ বলে মনে করা হয়। গ্রামটির বয়স দেড় হাজার বছরেরও বেশি হতে পারে বলে স্থানীয় ইতিহাসচর্চায় দাবি করা হয়, যদিও এই সময়কাল সম্পর্কে স্বতন্ত্র ঐতিহাসিক প্রমাণ যাচাই করা প্রয়োজন।

জনশ্রুতি অনুযায়ী, ঘোষগ্রামের আদি নাম ছিল ভবেশ্বরপুর। পরবর্তীকালে সোম ঘোষের নামের সূত্রে এবং লক্ষ্মীভক্ত দয়াল ঘোষের সঙ্গে গ্রামের নিবিড় সম্পর্কের কারণে জনপদটি ঘোষগ্রাম নামে পরিচিতি লাভ করে। এই গ্রামের ইতিহাসের সঙ্গে তাই একদিকে যেমন প্রাচীন শাসনব্যবস্থার স্মৃতি জড়িয়ে রয়েছে, অন্যদিকে তেমনই রয়েছে ধর্মীয় বিশ্বাস ও ভক্তির দীর্ঘ পরম্পরা।

এই পরম্পরার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র সাধক কামদেব ব্রহ্মচারী।

প্রবোধ কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিবরণ অনুযায়ী, কামদেব ব্রহ্মচারীর আবির্ভাব হয়েছিল বড়তুড়িগ্রামে। তিনি শাক্ত ও বৈষ্ণব—দুই ধারাতেই সাধনা করেছিলেন। বড়তুড়িগ্রামে কালীমায়ের আরাধনা এবং চণ্ডীপুর-তারাপীঠে তারামায়ের সাধনার সঙ্গে তাঁর নাম জড়িয়ে রয়েছে। তারাপীঠ অঞ্চলে তাঁর স্মৃতির সঙ্গে কামদেবপুর নামটিও যুক্ত। এই কামদেবপুর মৌজার মধ্যেই অবস্থিত তারাপীঠ মহাশ্মশান।

তবে ঘোষগ্রামে তাঁর সাধনার সঙ্গে যে কাহিনি সবচেয়ে বেশি জড়িয়ে রয়েছে, তা হল জলাশয়ে ভেসে থাকা একটি প্রস্ফুটিত পদ্ম এবং সেই পদ্মকে ঘিরে দেবী লক্ষ্মীর আবির্ভাবের জনশ্রুতি।

কথিত আছে, একসময় ঘোষগ্রামের আম্রকুঞ্জের পাশে একটি নিমগাছের তলায় বসে সাধনায় মগ্ন ছিলেন কামদেব ব্রহ্মচারী। সেই সময় গ্রামের লক্ষ্মীভক্ত দয়াল ঘোষ নিজের জমিতে চাষের কাজ করছিলেন। তাঁর পুত্র বায়না ধরে, গ্রামের পাশের জলাশয়ে ভেসে থাকা একটি প্রস্ফুটিত পদ্মফুল তুলে দিতে হবে। ছেলের আবদার রাখতে দয়াল ঘোষ যখন পদ্মটি তুলতে যান, তখন দেখা যায়, তিনি কাছে এগিয়ে গেলেই পদ্মটি যেন সরে যাচ্ছে। বারবার চেষ্টা করেও তিনি পদ্মটি তুলতে পারেননি।

শেষ পর্যন্ত তিনি সাধক কামদেব ব্রহ্মচারীর কাছে গিয়ে গোটা ঘটনা খুলে বলেন। সাধক তাঁকে পরদিন পদ্মটি তোলার কথা জানান।

লোকশ্রুতি অনুসারে, সেই রাতেই দেবী লক্ষ্মী কামদেব ব্রহ্মচারীকে স্বপ্নাদেশ দেন। এরপর সাধক জলাশয় থেকে পদ্মটি তুলে এনে আম্রকুঞ্জে একটি ঘটের ওপর স্থাপন করেন এবং দেবীর পুজো শুরু করেন। এভাবেই ঘোষগ্রামে লক্ষ্মীমাতার আরাধনার সূচনা হয়েছিল বলে স্থানীয় মানুষের বিশ্বাস।

প্রথম দিকে ঘট ও পটের মাধ্যমে দেবীর পুজো করা হত। কিন্তু সেই পুজোই একসময় বিশেষ রূপ লাভ করে। জনশ্রুতি অনুযায়ী, দেবী লক্ষ্মী পরে সাধক কামদেব ব্রহ্মচারীকে স্বপ্নাদেশ দিয়ে জানান, তাঁর একটি দারুময়ী মূর্তি নির্মাণ করে কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর দিন প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

মূর্তি নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় কাঠ কোথা থেকে সংগ্রহ করতে হবে, স্বপ্নাদেশে দেবী সেই নির্দেশও দিয়েছিলেন বলে কথিত রয়েছে।

সেই নির্দেশ অনুযায়ী, জলাশয়ের কাছে বাস্তুভিটার সংলগ্ন এমন একটি নিমগাছের কাঠ প্রয়োজন ছিল, যার একটি শাখায় পদ্মচিহ্ন থাকবে। গাছের গায়ে কোনও কোটর থাকবে না, সেখানে পাখি কিংবা সাপের বাসাও থাকবে না। দেবীর নির্দেশে সেই কাঠ সংগ্রহ করতে হবে মুর নদীর তীর থেকে।

লোককাহিনিতে আরও বলা হয়, মুর্শিদাবাদের মণিগ্রামে এক রাজার নির্মিত কনক লক্ষ্মীমন্দিরের সঙ্গে যুক্ত একটি কাঠের অংশ বন্যার জলে ভেসে এসে মুর নদীর তীরে অবস্থান করবে। সেই কাঠ সংগ্রহ করে কামদেব ব্রহ্মচারীকে তাঁর সাধনাস্থলে দেবীর মূর্তি নির্মাণ করতে হবে।

সাধক দেবীর স্বপ্নাদেশ অনুসারে সেই কাঠ সংগ্রহ করেন বলে জনশ্রুতি রয়েছে। তার ওপর গঙ্গামাটি দিয়ে চতুর্ভুজা মহালক্ষ্মীর মূর্তি নির্মাণ করে ঘোষগ্রামের আম্রকুঞ্জে নিজের পর্ণকুটিরে কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর রাতে প্রতিষ্ঠা করেন।

এই পুজোর আর একটি বিশেষ দিক রয়েছে। কামদেব ব্রহ্মচারী ছিলেন তন্ত্র ও বৈষ্ণব—উভয় সাধনপথের অনুসারী। তাই দেবীর নির্দেশ অনুযায়ী তিনি লক্ষ্মীমাতাকে শুধু ধনসম্পদের দেবী হিসেবে নয়, দশমহাবিদ্যার অন্যতম দেবী কমলারূপে মহালক্ষ্মী জ্ঞানেও আরাধনা শুরু করেন বলে জনশ্রুতি রয়েছে। ফলে ঘোষগ্রামের লক্ষ্মীমাতার পুজোয় শাক্ত ও বৈষ্ণব ভাবধারার এক বিশেষ সমন্বয় লক্ষ করা যায়।

এই বিশ্বাসের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে সাধকের সিদ্ধিলাভের কাহিনিও। কথিত আছে, কামদেব ব্রহ্মচারী জপ ও সাধনার মধ্য দিয়ে আত্মচৈতন্যের উপলব্ধি লাভ করেন এবং দেবীর আশীর্বাদে সিদ্ধসাধক হিসেবে প্রতিষ্ঠা পান। আজও তাঁর সেই সাধনভূমির স্মৃতি ঘোষগ্রামের লক্ষ্মীমাতার পুজোর সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে রয়েছে।

শুধু দেবীর মূর্তি প্রতিষ্ঠাই নয়, পরবর্তীকালে মন্দির নির্মাণ এবং দেবীর সম্পত্তি দানের কাহিনিও এই পীঠের মাহাত্ম্যকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে।

প্রবোধ কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের গ্রন্থে বর্ণিত লোকশ্রুতি অনুসারে, একদিন সাধক কামদেব ব্রহ্মচারীর পর্ণকুটিরের পাশ দিয়ে ঘোড়ায় চড়ে যাচ্ছিলেন ঢেকার রাজা রামজীবনের উত্তরাধিকারী বলে কথিত মহেশ রায়। তিনি দেখতে পান, সাধক নিমগাছের তলায় বসে পদ্মকে লক্ষ্মীজ্ঞানে পুজো করছেন। লক্ষ্মীমাতার প্রতি তাঁর নিজেরও গভীর ভক্তি ছিল। সাধকের সাধনায় সন্তুষ্ট হয়ে তিনি দেবীর মন্দির নির্মাণ এবং পুজোর যাবতীয় দায়িত্ব গ্রহণের ইচ্ছা প্রকাশ করেন।

সেই সময় সাধক তাঁর কাছে দেবীর নামে জমি দানের আবেদন জানান। কথিত আছে, কামদেব ব্রহ্মচারী জানান, তিনি শাঁখে তিনবার ফুঁ দিয়ে যতটা জমি প্রদক্ষিণ করতে পারবেন, ততটা জমি দেবীর নামে দান করতে হবে।

জমিদার সেই প্রস্তাবে সম্মতি দেন। লোককাহিনি অনুযায়ী, সাধক প্রথমবার ফুঁ দিয়ে ১০০ বিঘা, দ্বিতীয়বার আরও ১০০ বিঘা এবং তৃতীয়বার ৭২ বিঘা জমি প্রদক্ষিণ করেন। অর্থাৎ মোট ২৭২ বিঘা জমি দেবীর নামে দানের কথা প্রচলিত রয়েছে। এরপর জমিদার সাধককে আর এগোতে নিষেধ করেন বলে জনশ্রুতি।

এই দানের কাহিনি ঘোষগ্রামের লক্ষ্মীমাতার মন্দিরকে ঘিরে প্রচলিত অন্যতম আকর্ষণীয় লোককথা। যদিও বর্তমানে সেই জমির অধিকাংশই আর মন্দিরের অধীনে নেই বলে স্থানীয়ভাবে জানা যায়। মন্দিরের অবস্থানটুকু বর্তমান সেবাইতদের নামে নথিভুক্ত রয়েছে বলে উল্লেখ পাওয়া যায়।

ঘোষগ্রামের লক্ষ্মীমাতার মূর্তির মধ্যেও রয়েছে কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য, যা ভক্তদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। দেবীর ডানদিকে কন্যাসন্তান এবং বাঁদিকে পুত্র কুবেরের উপস্থিতি এই মূর্তির অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক। দেবীর হাতে দেখা যায় চালের গাই, যা নিয়ে স্থানীয় জনশ্রুতিতে একটি কাহিনি প্রচলিত রয়েছে।

কথিত আছে, সত্যযুগে ধান নয়, সরাসরি চালই উৎপন্ন হত। একবার এক রাজা ক্ষুধার তাড়নায় সেই চাল ছিঁড়ে খেতে শুরু করেন। বিষয়টি দেখে দেবী লক্ষ্মী চিন্তিত হয়ে পড়েন। তিনি ভাবেন, রাজাই যদি এভাবে চাল সংগ্রহ করে খেতে থাকেন, তাহলে সাধারণ মানুষও একই কাজ করবেন। ফলে খাদ্যের অপচয় বাড়বে। সেই কারণেই দেবী চালের চারদিকে খোসার আবরণ সৃষ্টি করে ধানের জন্ম দেন বলে লোকবিশ্বাস।

এই কাহিনির মধ্য দিয়ে কৃষি, খাদ্য এবং মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে লক্ষ্মীদেবীর সম্পর্ককে ব্যাখ্যা করা হয়। বাংলার কৃষিনির্ভর সমাজে ধান ও চাল যে সমৃদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক, ঘোষগ্রামের লক্ষ্মীমাতার পুজোর এই উপকথা তারই এক ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক প্রকাশ।

কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর দিন এই মন্দিরে ভক্তসমাগমের পাশাপাশি ভোগপ্রসাদেরও বিশেষ আয়োজন থাকে। স্থানীয় বিশ্বাস ও প্রচলিত রীতি অনুসারে, প্রতি বছর কয়েক হাজার মানুষ মায়ের ভোগপ্রসাদ গ্রহণ করেন। শুধু কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোতেই নয়, বছরের অন্যান্য সময়েও এই মন্দিরে ভক্তদের আনাগোনা লেগে থাকে।

বিশেষ করে পৌষ, চৈত্র ও ভাদ্র মাসের প্রতি বৃহস্পতিবার বহু মানুষ লক্ষ্মীমাতার পুজো দিতে আসেন। নিয়মিত পুজোর অংশ হিসেবে প্রতিদিন পাঁচ সের দুধ, পাঁচ পোয়া আতপ চাল এবং পাঁচ ছটাক চিনি দিয়ে মায়ের পরমান্ন ভোগ প্রস্তুত করা হয় বলে প্রচলিত রয়েছে। এই ভোগ নিবেদনের রীতিও মন্দিরের দীর্ঘদিনের পুজোপরম্পরার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বাঙালির চিরাচরিত বিশ্বাস—এই বিশেষ রাতে দেবী লক্ষ্মী জাগ্রত মানুষের গৃহে আগমন করেন এবং তাঁদের আশীর্বাদ করেন। সেই বিশ্বাসকে কেন্দ্র করেই বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে লক্ষ্মীপুজো পালিত হয়। কিন্তু ঘোষগ্রামের লক্ষ্মীমাতার মন্দিরের আকর্ষণ শুধু পুজোর দিনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এখানে ধর্মীয় আচার, সাধকের জীবন, স্থানীয় ইতিহাস এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা জনশ্রুতি একসঙ্গে মিশে রয়েছে।

তারাপীঠের মতো বিখ্যাত তীর্থক্ষেত্রের অদূরে অবস্থিত হয়েও ঘোষগ্রামের লক্ষ্মীমাতার মন্দির নিজস্ব ঐতিহ্য ও বিশ্বাসের স্বতন্ত্র পরিচয় বহন করে চলেছে। সাধক কামদেব ব্রহ্মচারীর সাধনভূমি, দারুময়ী মহালক্ষ্মীর মূর্তি, ২৭২ বিঘা জমি দানের লোককাহিনি এবং চালের গাইকে ঘিরে প্রচলিত উপকথা—সব মিলিয়ে এই মন্দির বাংলার লোকধর্ম ও আঞ্চলিক সংস্কৃতির এক উল্লেখযোগ্য নিদর্শন।

আজও কোজাগরীর সন্ধ্যায় যখন ভক্তদের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে ঘোষগ্রামের এই প্রাচীন মন্দির, তখন মনে হয়, সময় বদলেছে, বদলেছে মানুষের জীবনযাত্রা, কিন্তু বদলায়নি বিশ্বাসের টান। সেই বিশ্বাসেই ভক্তরা ছুটে আসেন মা লক্ষ্মীর কাছে—সংসারের মঙ্গল, অন্নের প্রাচুর্য, সুখ-সমৃদ্ধি এবং পরিবারের কল্যাণ কামনায়।

ঘোষগ্রামের লক্ষ্মীমাতার মন্দির তাই কেবল একটি উপাসনাস্থল নয়; এটি ইতিহাস, সাধনা, লোককথা ও মানুষের বিশ্বাসের এক জীবন্ত ঐতিহ্য। কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর আবহে সেই ঐতিহ্যই নতুন করে ধরা দেয় ভক্তদের কাছে।

Published on: অক্টো ২৫, ২০২৬ at ২১:০২


শেয়ার করুন