
“কিছু মানুষের মৃত্যু হয়। আবার কিছু মানুষের প্রস্থান হয়। কিশোর কুমারের চলে যাওয়া ছিল দ্বিতীয়টি। ১৯৮৭ সালের ১৩ অক্টোবর ভারত শুধু একজন শিল্পীকে হারায়নি; হারিয়েছিল এমন একটি কণ্ঠকে, যে কণ্ঠ কয়েক প্রজন্মের হাসি, প্রেম, কান্না আর স্বপ্নকে এক সুতোয় বেঁধে রেখেছিল।“
Published on: আগ ২২, ২০২৬ at ১১:২৩
✍️কলমে: অনিরুদ্ধ পাল
সংবাদ প্রভাকর টাইমস
এসপিটি প্রতিবেদন : জীবনের শেষ কয়েক বছরে কিশোর কুমার যেন বদলে যেতে শুরু করেছিলেন। স্টুডিওতে তিনি এখনও একইরকম প্রাণবন্ত। রেকর্ডিংয়ে এখনও সবাইকে হাসিয়ে দিচ্ছেন। কিন্তু কাছের মানুষরা লক্ষ্য করেছিলেন— এই হাসির আড়ালে যেন কোথাও এক গভীর ক্লান্তি জমে উঠছে। যেন তিনি ধীরে ধীরে আলো ঝলমলে বোম্বে থেকে নিজেকে সরিয়ে নিতে চাইছেন।
একটাই স্বপ্ন—ফিরে যাব খণ্ডওয়ায়
কিশোর কুমারের জীবনের শেষ বড় স্বপ্ন ছিল খুব সাধারণ। তিনি আবার ফিরে যেতে চেয়েছিলেন তাঁর জন্মভূমি খণ্ডওয়ায়।
বন্ধুদের বলতেন, “অনেক হয়েছে। এবার আমি বাড়ি ফিরব।”
তিনি আর বড় বড় স্টুডিও, ক্যামেরা, শুটিং ফ্লোর কিংবা রেকর্ডিংয়ের ব্যস্ততার মধ্যে থাকতে চাইছিলেন না। চেয়েছিলেন শান্ত একটা জীবন। সকালে উঠে গাছের সঙ্গে কথা বলবেন।
বাগানে হাঁটবেন। পুরনো হারমোনিয়াম খুলে নিজের জন্য গান গাইবেন। হয়তো এটাই ছিল তাঁর সবচেয়ে বড় অপূর্ণ ইচ্ছে। যে মানুষ সারাজীবন কোটি মানুষের জন্য গান গেয়েছেন, শেষ জীবনে তিনি শুধু নিজের জন্য বাঁচতে চেয়েছিলেন।
এক জীবনের ক্লান্তি
প্রায় চার দশক ধরে তিনি একটানা কাজ করেছেন।
অভিনেতা।
গায়ক।
সুরকার।
গীতিকার।
প্রযোজক।
পরিচালক।
স্টেজ শো।
রেকর্ডিং।
দেশ-বিদেশের সফর।
এই দীর্ঘ পথচলা শরীরকে ক্লান্ত করেছিল।
কিন্তু তাঁর কণ্ঠে সেই ক্লান্তির ছাপ খুব কমই ধরা পড়ত।
মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়ালেই তিনি যেন আবার নতুন মানুষ হয়ে উঠতেন।
শেষ সময়েও গান ছিল তাঁর সঙ্গী
আশির দশকের শেষভাগেও কিশোর কুমারের ব্যস্ততা কমেনি। বাপ্পী লাহিড়ী, রাজেশ রোশন, লক্ষ্মীকান্ত–পেয়ারেলাল, কল্যাণজি–আনন্দজীর মতো সুরকারদের সঙ্গে তিনি নিয়মিত কাজ করছিলেন।
নতুন নায়কদের জন্যও সমান নিষ্ঠায় গান গাইছিলেন। অসংখ্য জনপ্রিয় গান তখনও তাঁর কণ্ঠে রেকর্ড হচ্ছে। এ যেন সময়কে চ্যালেঞ্জ জানানো এক শিল্পী।
একটি দিনের গল্প
১৩ অক্টোবর, ১৯৮৭।
সেদিনও দিনটা অন্য দিনের মতোই শুরু হয়েছিল। কেউ ভাবতেও পারেননি, কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ভারতীয় সঙ্গীতের ইতিহাস বদলে যাবে। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথাবার্তা।
ভবিষ্যতের পরিকল্পনা। খণ্ডওয়ায় ফিরে যাওয়ার স্বপ্ন। সবই ছিল।
তারপর হঠাৎ…
হৃদরোগে আক্রান্ত হলেন তিনি। চিকিৎসার চেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু সময় আর সুযোগ দেয়নি। মাত্র ৫৮ বছর বয়সে থেমে গেল সেই কণ্ঠ। যে কণ্ঠকে মানুষ ভেবেছিল, কখনও বুড়ো হবে না।
যে খবর বিশ্বাস করতে পারেনি ভারত
খবরটি ছড়িয়ে পড়তেই স্তব্ধ হয়ে যায় গোটা দেশ। রেডিও স্টেশনগুলো হঠাৎ তাঁর গান বাজাতে শুরু করে। স্টুডিওগুলোর রেকর্ডিং বাতিল হয়ে যায়। চলচ্চিত্র জগত যেন মুহূর্তের মধ্যে নিস্তব্ধ হয়ে পড়ে। অনেকেই প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারেননি। কারণ মাত্র কয়েকদিন আগেও তো তিনি গান গেয়েছেন।
হেসেছেন।
পরিকল্পনা করেছেন। তাহলে হঠাৎ এমন কীভাবে?
যে মানুষটির জন্য কেঁদেছিল বলিউড
তাঁর প্রয়াণে শোক জানিয়েছিলেন সেই সময়ের প্রায় প্রত্যেক শিল্পী। যাঁদের জন্য তিনি গান গেয়েছেন, সেই নায়কেরা যেন নিজেদের কণ্ঠ হারিয়েছিলেন। সুরকাররা হারিয়েছিলেন তাঁদের সবচেয়ে বিশ্বস্ত শিল্পীকে। সহশিল্পীরা হারিয়েছিলেন একজন বন্ধুকে। আর কোটি কোটি শ্রোতা হারিয়েছিলেন তাঁদের জীবনের অগণিত স্মৃতির সঙ্গীকে।
অনেকেই বলেছিলেন, “আজ শুধু একজন গায়ক মারা যাননি। ভারতীয় সিনেমার একটি যুগ শেষ হয়ে গেল।”
অসমাপ্ত থেকে গেল কত পরিকল্পনা
জীবনের শেষদিকে তিনি আরও বাংলা গান গাইতে চেয়েছিলেন। আরও রবীন্দ্রসঙ্গীত রেকর্ড করার কথাও ভেবেছিলেন। খণ্ডওয়ায় একটি শান্ত জীবন কাটানোর স্বপ্নও ছিল। নিজের মতো করে গান বানানোর ইচ্ছেও ছিল। কিন্তু সেই সব পরিকল্পনা আর বাস্তব হয়ে ওঠেনি।
সময় তাঁর জন্য অন্য সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছিল।
শেষ বিদায়, কিন্তু শেষ নয়
মৃত্যু একজন মানুষের জীবন থামিয়ে দেয়। কিন্তু শিল্পীর জীবন থামাতে পারে না। ১৩ অক্টোবরের পরও কিশোর কুমার থেমে যাননি। বরং তিনি নতুনভাবে জন্ম নিয়েছেন। প্রতিদিন কোনও না কোনও রেডিওতে। কোনও গাড়ির প্লেলিস্টে। কোনও প্রেমিকের হেডফোনে। কোনও স্টেজের আলোয়। কোনও শিশুর প্রথম শেখা গানে
যে কণ্ঠকে সময় হারাতে পারেনি
কিশোর কুমারের মৃত্যুর পর প্রজন্ম বদলেছে। অডিও ক্যাসেট এসেছে। তারপর সিডি। তারপর এমপিথ্রি। আজ ডিজিটাল স্ট্রিমিং।
প্রযুক্তি বদলেছে। কিন্তু একটি জিনিস বদলায়নি। মানুষ এখনও সকালে “পল পল দিল কে পাশ” শুনে দিন শুরু করে। ভালোবাসার মানুষকে মনে পড়লে “ও মেরে দিল কে চেইন” বাজায়। জীবনের দর্শন খুঁজতে “জিন্দেগি কা সফর” শুনে। বিষণ্ণ সন্ধ্যায় “চিঙ্গারি কোই ভড়কে”-র কাছে ফিরে যায়।
এই ফিরে আসাটাই একজন শিল্পীর প্রকৃত অমরত্ব।
শেষ দৃশ্যের পরেও যাঁর গান বাজতেই থাকে
সিনেমা শেষ হলে পর্দা নেমে যায়। আলো জ্বলে ওঠে। দর্শক বাড়ি ফিরে যায়। কিন্তু কিছু শিল্পী আছেন, যাঁদের গল্প শেষ দৃশ্যের পরেও চলতে থাকে। কিশোর কুমার সেই বিরল শিল্পীদের একজন। তিনি যেন নিজের জীবন দিয়েই প্রমাণ করে গেছেন—
মানুষের আয়ু সীমিত। কিন্তু শিল্পের কোনও মৃত্যু নেই।
একটি কণ্ঠ, যা এখনও বেঁচে আছে
আজ তাঁর জন্মদিনে কিংবা প্রয়াণ দিবসে আমরা শুধু একজন গায়ককে স্মরণ করি না। আমরা স্মরণ করি এমন একজন মানুষকে, যিনি জীবনের প্রতিটি অনুভূতির জন্য একটি করে গান রেখে গেছেন।
ভালোবাসার জন্য একটি গান।
বিরহের জন্য একটি গান।
বন্ধুত্বের জন্য একটি গান।
হাসির জন্য একটি গান।
জীবনের জন্য একটি গান।
আর বিদায়ের জন্যও একটি গান।
তাই হয়তো কিশোর কুমারকে বিদায় জানানো যায় না। কারণ তিনি কোথাও যাননি।
যেখানে গান আছে…
যেখানে স্মৃতি আছে…
যেখানে ভালোবাসা আছে…
সেখানেই তিনি আজও বেঁচে আছেন।
পরবর্তী খণ্ড–১০ (সমাপনী পর্ব)
“কেন কিশোর কুমার আজও অমর: এক কণ্ঠ, এক জীবন, এক অনন্ত উত্তরাধিকার“
এই শেষ পর্বে থাকবে—
- কেন ২১শ শতাব্দীতেও কিশোর কুমার সমান প্রাসঙ্গিক,
- তাঁর ৮টি ফিল্মফেয়ার, শত শত অমর গান ও বহুমাত্রিক শিল্পীসত্তার মূল্যায়ন,
- নতুন প্রজন্ম কেন এখনও তাঁকে আবিষ্কার করছে,
- এবং একটি আবেগঘন উপসংহার—”কিশোর কুমার কোনও নাম নন, তিনি ভারতীয় সঙ্গীতের এক চিরন্তন অনুভূতি।”
- Published on: আগ ২২, ২০২৬ at ১১:২৩




