তারাপীঠের আগুনের পর প্রশ্ন: বাংলার তীর্থ পর্যটনকেন্দ্রে কতটা নিরাপদ পর্যটকের রাতযাপন?

Main দেশ ধর্ম ভ্রমণ রাজ্য
শেয়ার করুন

হোটেলের অগ্নিনিরাপত্তা, জরুরি বহির্গমন, বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা, পর্যটকনিবন্ধন প্রশাসনিক নজরদারিতারাপীঠের মর্মান্তিক আগুন কি এবার গোটা তীর্থ পর্যটন ব্যবস্থার নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলল?

Published on: আগ ১৭, ২০২৬ at ১০:৫২

বিশেষ অনুসন্ধান | অনিরুদ্ধ পাল | সংবাদ প্রভাকর টাইমস

এসপিটি প্রতিবেদন: তারাপীঠে সোমবার ভোরের আগুন শুধু কয়েকটি পরিবারের কাছে প্রিয়জন হারানোর মর্মান্তিক ঘটনা নয়। এটি পশ্চিমবঙ্গের তীর্থ পর্যটনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রগুলিতে পর্যটকদের রাতযাপনের নিরাপত্তা নিয়ে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন সামনে এনে দিয়েছে—তীর্থযাত্রীরা যে হোটেল, লজ বা অতিথিশালায় রাত কাটাচ্ছেন, সেগুলি সত্যিই কতটা নিরাপদ?

১৭ আগস্ট ভোরে বীরভূমের তারাপীঠ মন্দিরের কাছে একটি চারতলা বেসরকারি হোটেলে ভয়াবহ আগুনে অন্তত সাতজনের মৃত্যু হয়েছে বলে পুলিশ ও একাধিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। আহত হয়েছেন আরও বেশ কয়েকজন। অধিকাংশ আবাসিক তখন ঘুমিয়ে ছিলেন। আগুনের সূত্রপাত নিচের তলায় এবং পরে ধোঁয়া ও আগুন দ্রুত ওপরের তলাগুলিতে ছড়িয়ে পড়ে বলে প্রাথমিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। আহতদের রামপুরহাট সরকারি মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।

তবে ঘটনার প্রথম কয়েক ঘণ্টায় মৃতের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য প্রকাশিত হয়েছে—কোথাও চার, কোথাও পাঁচ, কোথাও ছয় এবং পরবর্তী প্রতিবেদনে সাতজনের মৃত্যুর কথা বলা হয়েছে। ফলে উদ্ধার ও শনাক্তকরণ প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত সংখ্যাটি প্রশাসনের চূড়ান্ত বিবৃতি দিয়েই নিশ্চিত করা উচিত।

এখানেই শুরু হচ্ছে আসল প্রশ্ন।

আগুন কীভাবে লাগল, তার চেয়েও বড় প্রশ্ন—আগুন লাগার পর বেরোনোর পথ কোথায় ছিল?

প্রাথমিকভাবে বৈদ্যুতিক গোলযোগ বা শর্ট সার্কিটের সম্ভাবনার কথা সামনে এসেছে। হোটেল মালিকের বক্তব্য অনুযায়ী, নিচের তলায় শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের একটি বৈদ্যুতিক সুইচ থেকে আগুনের সূত্রপাত হতে পারে। হোটেলের অভ্যন্তরীণ সাজসজ্জায় দাহ্য উপকরণ থাকার কথাও স্থানীয় প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে আগুন লাগার প্রকৃত কারণ এখনও তদন্তাধীন; এখনই সেটিকে চূড়ান্ত কারণ হিসেবে ঘোষণা করা ঠিক হবে না।

কিন্তু একটি হোটেলের নিরাপত্তা বিচার করতে শুধু আগুনের উৎস দেখা যথেষ্ট নয়।

আগুন লাগার পর অতিথিরা কত দ্রুত নিরাপদ জায়গায় পৌঁছতে পারলেন?

জরুরি নির্গমন পথ ছিল কি?

সিঁড়ি ব্যবহারযোগ্য ছিল কি?

জরুরি আলোর ব্যবস্থা ছিল কি?

ধোঁয়া শনাক্ত করার যন্ত্র কাজ করছিল কি?

অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা কার্যকর ছিল কি?

হোটেলের কর্মীরা আগুন লাগলে অতিথিদের কীভাবে বের করে আনতে হয়, তার প্রশিক্ষণ পেয়েছিলেন কি?

এই প্রশ্নগুলির উত্তরই এখন তদন্তের কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত।

কারণ ঘুমন্ত মানুষের জন্য আগুনের সবচেয়ে বড় বিপদ অনেক সময় আগুন নয়—ধোঁয়া, আতঙ্ক এবং বেরোনোর পথ খুঁজে না পাওয়া।

তারাপীঠের ঘটনায় বহু আবাসিক ঘুমন্ত অবস্থায় ছিলেন বলে একাধিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। আগুন নিচের তলায় শুরু হলে ওপরের তলায় থাকা মানুষদের কাছে নিরাপদে বেরিয়ে আসার জন্য কতটা সময় ছিল, সেটিই এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

পশ্চিমবঙ্গের নিয়মে অগ্নিনিরাপত্তা কোনও ঐচ্ছিক বিষয় নয়

এই জায়গায় একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে আসে।

পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অগ্নি ও জরুরি পরিষেবা দফতরের ব্যবস্থায় বাণিজ্যিক ভবনের জন্য অগ্নিনিরাপত্তা সংক্রান্ত অনুমোদন ও শংসাপত্রের ব্যবস্থা রয়েছে। রাজ্যের সরকারি একক-জানালা ব্যবস্থাতেও অগ্নিনিরাপত্তা শংসাপত্র এবং অগ্নি-লাইসেন্সকে প্রয়োজনীয় অনুমোদনের তালিকায় রাখা হয়েছে।

এমনকি রাজ্যের অনলাইন পরিষেবা ব্যবস্থায় তারকা-বিহীন স্বতন্ত্র হোটেলের অগ্নিনিরাপত্তা সংক্রান্ত স্বঘোষণার ব্যবস্থাও রয়েছে।

অর্থাৎ প্রশ্নটি শুধু—

“হোটেলে আগুন নেভানোর যন্ত্র ছিল কি?”

এতটুকু নয়।

প্রশ্ন হওয়া উচিত—

“যে অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকার কথা, তা কি অনুমোদিত ছিল, নিয়মিত পরীক্ষা করা হয়েছিল এবং দুর্ঘটনার সময় বাস্তবে কার্যকর ছিল?”

এই তিনটি বিষয় এক নয়।

কাগজে শংসাপত্র থাকলেই কি নিরাপত্তা নিশ্চিত?

এখানেই শুরু হয় প্রশাসনিক নজরদারির সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা।

কোনও হোটেল অগ্নিনিরাপত্তার শংসাপত্র পেয়েছে—এটি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তার পরের প্রশ্ন হল, সেই ব্যবস্থা নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়েছে কি না।

অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র থাকলেই হবে না। সেটি ব্যবহারযোগ্য কি না, নির্দিষ্ট সময়ে পরীক্ষা হয়েছে কি না, জল সরবরাহ ব্যবস্থা সচল কি না, অগ্নিনির্বাপণ পাম্প কাজ করছে কি না, জরুরি সিঁড়ি খোলা আছে কি না—এসবও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

পশ্চিমবঙ্গের অগ্নি ও জরুরি পরিষেবা দফতরের সরকারি ব্যবস্থায় অগ্নিনিরাপত্তার সুপারিশ, অগ্নিনিরাপত্তা শংসাপত্র এবং তার নবীকরণের পৃথক পরিষেবা রয়েছে।

তাই তারাপীঠের ঘটনার পর তদন্তের একটি স্বাভাবিক প্রশ্ন হওয়া উচিত—

এই হোটেলের অগ্নিনিরাপত্তা সংক্রান্ত অনুমোদন কী ছিল, তার মেয়াদ কতদিন, শেষ পরিদর্শন কবে হয়েছিল এবং পরিদর্শনের সময় কী কী ত্রুটি ধরা পড়েছিল?

এগুলি তদন্তের তথ্য হিসেবে প্রকাশ্যে এলে শুধু একটি ঘটনার দায় নির্ধারণ হবে না; ভবিষ্যতের জন্যও একটি দৃষ্টান্ত তৈরি হবে।

দ্বিতীয় প্রশ্ন: জরুরি বহির্গমন ব্যবস্থা

একটি বহু-তলা হোটেলে আগুন লাগলে অতিথিদের বেরিয়ে আসার জন্য বিকল্প পথ থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

মূল প্রবেশপথ যদি আগুন বা ধোঁয়ায় বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে অন্য পথ কোথায়?

জরুরি সিঁড়ি কি ছিল?

সেটি কি সবসময় খোলা থাকে?

কোনও করিডর কি মালপত্র দিয়ে আটকে রাখা হয়েছিল?

জরুরি দরজায় তালা বা বাধা ছিল কি?

অতিথিরা নিজেদের ঘর থেকে নিরাপদ বহির্গমন পথ দেখতে পেতেন কি?

এই প্রশ্নগুলির উত্তর একটি অগ্নিকাণ্ডের তদন্তে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কারণ আগুনের সময় মানুষ সাধারণত সেই পথেই বেরোতে চান যেদিক দিয়ে তাঁরা ঢুকেছেন। কিন্তু সেই পথই যদি ধোঁয়া বা আগুনে বন্ধ হয়ে যায়, তখন বিকল্প পথ সম্পর্কে আগে থেকে জানা না থাকলে বিপদ কয়েক গুণ বেড়ে যায়।

তৃতীয় প্রশ্ন: বৈদ্যুতিক নিরাপত্তা

তারাপীঠের ঘটনায় বৈদ্যুতিক গোলযোগের সম্ভাবনা সামনে এসেছে। তাই হোটেলগুলির বৈদ্যুতিক নিরাপত্তা এখন আলাদা করে পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

পুরনো তার কি বদলানো হয়েছে?

অতিরিক্ত বৈদ্যুতিক সংযোগ নেওয়া হয়েছে কি?

শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র, বৈদ্যুতিক গিজার, রান্নাঘরের যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য উচ্চ-ক্ষমতার সরঞ্জামের জন্য পৃথক নিরাপদ সংযোগ রয়েছে কি?

বিদ্যুৎ সংযোগে অতিরিক্ত চাপ পড়ছে কি?

বৈদ্যুতিক প্যানেল নিয়মিত পরীক্ষা করা হয় কি?

এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—কোনও ত্রুটি ধরা পড়লে সেটি সঙ্গে সঙ্গে মেরামত করা হয় কি?

শুধু শর্ট সার্কিটকে সম্ভাব্য কারণ হিসেবে চিহ্নিত করলেই তদন্ত শেষ হতে পারে না। শর্ট সার্কিট কেন হল, সেটিও জানতে হবে।

চতুর্থ প্রশ্ন: হোটেলে কে কোথায় আছেন, প্রশাসন কি জানে?

পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের নাগরিক পরামর্শে হোটেল ও অতিথিশালা পরিচালকদের অতিথির পরিচয়পত্র ও যোগাযোগের নম্বর নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। সন্দেহজনক কার্যকলাপ নজরে এলে পুলিশকে জানানোর পাশাপাশি সিসিটিভি রাখার কথাও উল্লেখ রয়েছে।

এই ব্যবস্থা শুধু আইনশৃঙ্খলার জন্য নয়; বড় দুর্ঘটনার সময়ও অতিথি-নিবন্ধন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ধরা যাক, কোনও হোটেলে ৫০ জন অতিথি রয়েছেন।

আগুন লাগার পরে প্রশাসনের হাতে কি সঙ্গে সঙ্গে জানা সম্ভব হবে—কতজন ছিলেন?

কতজন বেরিয়ে এসেছেন?

কতজন নিখোঁজ?

কোন ঘরে কে ছিলেন?

পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের নম্বর কী?

এই তথ্য সঠিকভাবে সংরক্ষিত থাকলে উদ্ধারকাজ এবং নিখোঁজ ব্যক্তিদের শনাক্তকরণ অনেক দ্রুত হতে পারে।

তারাপীঠের মতো তীর্থকেন্দ্রে উৎসব, পূর্ণিমা, অমাবস্যা বা বিশেষ পুজোর সময়ে যখন আবাসিক সংখ্যা হঠাৎ বেড়ে যায়, তখন এই ব্যবস্থা আরও গুরুত্বপূর্ণ।

পঞ্চম প্রশ্ন: তীর্থকেন্দ্রে পর্যটনের চাপ কি নিরাপত্তা ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ?

তারাপীঠে সাধারণ দিনেও পুণ্যার্থীর ভিড় থাকে। বিশেষ তিথিতে সেই ভিড় আরও বেড়ে যায়।

১৭ আগস্টের ঘটনাটিও এমন একটি দিনে ঘটেছে, যখন শ্রাবণ মাসের শেষ সোমবার উপলক্ষে প্রচুর পুণ্যার্থী তারাপীঠে এসেছিলেন বলে স্থানীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। হোটেলটিও আবাসিকে পরিপূর্ণ ছিল বলে প্রাথমিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

এখানে একটি বৃহত্তর প্রশ্ন তৈরি হয়।

পর্যটনকেন্দ্রের ধারণক্ষমতা কি প্রশাসন জানে?

কতগুলি হোটেল?

কতগুলি লজ?

মোট কতগুলি শয্যা?

ব্যস্ত দিনে আনুমানিক কতজন পর্যটক ও পুণ্যার্থী রাত কাটান?

এর তুলনায় কতগুলি দমকলকেন্দ্র, কতগুলি অগ্নিনির্বাপণ যান, কতগুলি প্রশিক্ষিত কর্মী এবং কতগুলি চিকিৎসা পরিষেবা প্রস্তুত থাকে?

পর্যটনের সংখ্যা বাড়ানোর পরিকল্পনার সঙ্গে যদি নিরাপত্তার পরিকাঠামো না বাড়ে, তাহলে পর্যটন বৃদ্ধি নিজেই ঝুঁকির কারণ হয়ে উঠতে পারে।

শুধু তারাপীঠ নয়—একই প্রশ্ন বাংলার অন্য তীর্থকেন্দ্রগুলির ক্ষেত্রেও

তারাপীঠকে আলাদা করে দেখা যাবে না।

পশ্চিমবঙ্গের তীর্থ পর্যটনের মানচিত্র অনেক বড়।

নবদ্বীপ–মায়াপুর, গঙ্গাসাগর, তারকেশ্বর, কালীঘাট, কামারপুকুর, জয়রামবাটি, ফুরফুরা শরিফ, পাথরচাপুড়ি—প্রতিটি জায়গায় বিভিন্ন ধরনের হোটেল, লজ, অতিথিশালা, আশ্রম ও ধর্মশালা রয়েছে।

এগুলির সবগুলির নিরাপত্তা ব্যবস্থা একই রকম নয়।

কোথাও আধুনিক হোটেল, কোথাও পুরনো বাড়ি রূপান্তরিত করে আবাসন, কোথাও ছোট লজ, কোথাও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান পরিচালিত অতিথিশালা।

তাই একটি তীর্থ পর্যটন নিরাপত্তা নিরীক্ষা জরুরি হয়ে উঠছে।

প্রতিটি বড় তীর্থকেন্দ্রে অন্তত একবার সমন্বিতভাবে পরীক্ষা করা যেতে পারে—

অগ্নিনিরাপত্তা + বৈদ্যুতিক নিরাপত্তা + জরুরি বহির্গমন + অতিথি-নিবন্ধন + সিসিটিভি + কর্মীদের প্রশিক্ষণ + দমকলের পৌঁছনোর সময় + নিকটবর্তী হাসপাতালের সঙ্গে যোগাযোগ।

প্রশাসনের কাছে পাঁচটি সরাসরি প্রশ্ন

তারাপীঠের ঘটনার তদন্ত চলাকালীন প্রশাসনের কাছে পাঁচটি প্রশ্ন বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

এক. সংশ্লিষ্ট হোটেলের বৈধ অগ্নিনিরাপত্তা শংসাপত্র ছিল কি?

দুই. শেষ অগ্নিনিরাপত্তা পরিদর্শন কবে হয়েছিল এবং কী রিপোর্ট দেওয়া হয়েছিল?

তিন. হোটেলে নির্ধারিত জরুরি বহির্গমন ব্যবস্থা, অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম ও সতর্কীকরণ ব্যবস্থা বাস্তবে কার্যকর ছিল কি?

চার. অতিথিদের পরিচয় ও কক্ষভিত্তিক নিবন্ধন সঠিকভাবে রাখা হয়েছিল কি?

পাঁচ. ব্যস্ত তীর্থ মৌসুমে স্থানীয় প্রশাসন ও দমকল কি হোটেলগুলির বিশেষ নিরাপত্তা পরিদর্শন করে?

এই প্রশ্নগুলির উত্তর শুধু তারাপীঠের ঘটনার জন্য নয়—গোটা রাজ্যের পর্যটন নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজন।

হোটেল মালিকদের দায়, প্রশাসনের দায়—কিন্তু পর্যটকেরও কি কিছু জানা উচিত নয়?

অবশ্যই। পর্যটক কোনও হোটেলে উঠলে কয়েকটি বিষয় নিজের চোখেও দেখে নিতে পারেন। ঘরে ঢোকার পর জরুরি বহির্গমন পথ কোথায়, তা জানা। সিঁড়ির অবস্থান দেখা। জরুরি দরজা খোলা আছে কি না দেখা। অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র কোথায় রয়েছে, তা খেয়াল করা। করিডরে কোনও দাহ্য বা বাধাদায়ক জিনিস রাখা হয়েছে কি না দেখা। পরিবারের সঙ্গে জরুরি যোগাযোগের নম্বর ভাগ করে রাখা। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক বা অসুস্থ ব্যক্তিদের সঙ্গে থাকলে আগুন লাগলে কীভাবে বেরোবেন, তা আগে থেকেই ঠিক করে রাখা।

এগুলি আতঙ্ক ছড়ানোর জন্য নয়। বরং নিরাপদ পর্যটন সংস্কৃতির অংশ হওয়া উচিত।

পর্যটন বাড়াতে চাইলে নিরাপত্তাকেও পর্যটন নীতির অংশ করতে হবে

পশ্চিমবঙ্গ এখন নতুন পর্যটন রোডম্যাপ তৈরির পথে। রাজ্য সরকার পর্যটন শিল্পের সঙ্গে আলোচনা করে পরিকাঠামো, যোগাযোগ, বিনিয়োগ, নতুন গন্তব্য এবং পর্যটন পরিষেবা নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করছে।

এই পরিকল্পনায় একটি বিষয় আলাদা করে যুক্ত করা দরকার—

“নিরাপদ পর্যটন”।

কোনও পর্যটক যদি কোনও গন্তব্যে গিয়ে নিরাপদে থাকতে না পারেন, তাহলে সেই গন্তব্যের ব্র্যান্ডিং, প্রচার, সৌন্দর্যায়ন বা নতুন পর্যটন প্রকল্প কোনওটাই দীর্ঘমেয়াদে যথেষ্ট নয়। পর্যটনের প্রকৃত মান শুধু পর্যটকের সংখ্যা দিয়ে মাপা যায় না।

নিরাপদে আসা + নিরাপদে থাকা + নিরাপদে ঘোরা + নিরাপদে ফিরে যাওয়া—এই চারটি পর্যায় মিলেই একটি সফল পর্যটন ব্যবস্থা তৈরি হয়।

এখন প্রয়োজন ‘তীর্থ পর্যটন নিরাপত্তা নিরীক্ষা’

তারাপীঠের মর্মান্তিক ঘটনা থেকে যদি কোনও ইতিবাচক শিক্ষা নেওয়া যায়, তাহলে সেটি হওয়া উচিত একটি রাজ্যব্যাপী তীর্থ পর্যটন নিরাপত্তা নিরীক্ষা। প্রথম পর্যায়ে রাজ্যের প্রধান তীর্থকেন্দ্রগুলির সব হোটেল, লজ, অতিথিশালা ও ধর্মশালাকে চিহ্নিত করা যেতে পারে। তারপর ঝুঁকির ভিত্তিতে শ্রেণিবিন্যাস।

বহুতল ভবন আলাদা। পুরনো ভবন আলাদা। অতিরিক্ত পর্যটক ধারণকারী আবাসন আলাদা। সংকীর্ণ রাস্তার মধ্যে থাকা হোটেল আলাদা। এর পরে অগ্নিনিরাপত্তা, বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা, জরুরি বহির্গমন, অতিথি-নিবন্ধন এবং উদ্ধার-পরিকল্পনা পরীক্ষা করা যেতে পারে।

যে আবাসন নিরাপত্তার মান পূরণ করবে না, তাকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সংশোধনের সুযোগ দিতে হবে। আর গুরুতর ত্রুটি থাকলে নিয়ম মেনে ব্যবস্থা নিতে হবে।

কারণ প্রশ্নটি শুধু একটি হোটেলের নয়

তারাপীঠের আগুনের প্রকৃত কারণ কী ছিল, কোন নির্দিষ্ট নিরাপত্তা ব্যবস্থা ব্যর্থ হয়েছিল, কার গাফিলতি ছিল—এসব তদন্তেই পরিষ্কার হবে। এখনই কোনও ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দায় চাপানো দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা হবে না।

কিন্তু একই সঙ্গে এটাও সত্য যে, একটি দুর্ঘটনা গোটা ব্যবস্থার দুর্বল জায়গাগুলি পরীক্ষা করার সুযোগ তৈরি করে। তারাপীঠে যদি বৈদ্যুতিক ত্রুটি হয়ে থাকে, তবে অন্য হোটেলগুলির বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা পরীক্ষা করা দরকার। যদি অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থায় ঘাটতি থাকে, তবে অন্য আবাসনগুলিও পরীক্ষা করা দরকার। যদি জরুরি বহির্গমন ব্যবস্থা যথেষ্ট না থাকে, তবে একই ধরনের ভবনগুলির নিরাপত্তা নিরীক্ষা দরকার। আর যদি অতিথি-নিবন্ধনে সমস্যা থাকে, তবে তীর্থ পর্যটনকেন্দ্রগুলির আবাসন ব্যবস্থায় তাৎক্ষণিক নজরদারি প্রয়োজন। কারণ একটি দুর্ঘটনা শুধু একটি জায়গাকে সতর্ক করে না; সেটি গোটা ব্যবস্থাকে সতর্ক করার সুযোগ দেয়।

শেষ প্রশ্ন

পশ্চিমবঙ্গ যদি আগামী দিনে দার্জিলিংকে বিশ্বমানের পর্যটনকেন্দ্র করতে চায়, সুন্দরবনকে আন্তর্জাতিক পর্যটন মানচিত্রে আরও শক্তিশালী করতে চায়, পুরুলিয়া থেকে ডুয়ার্স পর্যন্ত নতুন গন্তব্য তৈরি করতে চায় এবং তারাপীঠ, নবদ্বীপ, গঙ্গাসাগরের মতো তীর্থকেন্দ্রে পর্যটক বাড়াতে চায়, তাহলে এখনই একটি প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে—

“আমরা কি শুধু আরও বেশি পর্যটক চাই, নাকি আরও বেশি নিরাপদ পর্যটক চাই?”

তারাপীঠের আগুনের পরে এই প্রশ্ন আর এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

পর্যটনের সাফল্য পর্যটকের ভিড়ে নয়—পর্যটক কতটা নিরাপদে সেই অভিজ্ঞতা নিয়ে বাড়ি ফিরলেন, তার মধ্যেই একটি গন্তব্যের প্রকৃত মান নির্ধারিত হয়।

Published on: আগ ১৭, ২০২৬ at ১০:৫২


শেয়ার করুন