রাশিয়ার উচ্চগতির ট্রেনের প্রস্তাব ভারতের সামনে, ঘণ্টায় ৩৬০ কিলোমিটার গতির রুশ প্রযুক্তি নিয়ে জল্পনা

Main দেশ বিদেশ ভ্রমণ রাজ্য রেল
শেয়ার করুন

আট কামরার ট্রেন, ৬৪২ যাত্রী, দেশীয় যন্ত্রাংশ ব্যবহারের লক্ষ্যব্রিকস সম্মেলনের আবহে ভারতরাশিয়া রেল সহযোগিতায় নতুন সম্ভাবনা

Published on: সেপ্টে ১৩, ২০২৬ at ১৬:২১ 

সংবাদ প্রভাকর টাইমস | বিশেষ প্রতিবেদন

এসপিটি নিউজ, নয়াদিওল্লি, ১৩ সেপ্টেম্বর: ভারতের উচ্চগতির রেল ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে যখন দেশজুড়ে প্রস্তুতি চলছে, ঠিক তখনই রাশিয়ার একটি নতুন উচ্চগতির ট্রেনকে ঘিরে তৈরি হয়েছে বিশেষ আগ্রহ। রুশ রেলপ্রযুক্তি সংস্থার সঙ্গে যুক্ত একটি প্রস্তাবিত উচ্চগতির ট্রেনের সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় ৩৬০ কিলোমিটার পর্যন্ত হতে পারে বলে রেল-শিল্প সংক্রান্ত সাম্প্রতিক তথ্য সামনে এসেছে। ট্রেনটিতে থাকতে পারে আটটি কামরা এবং প্রায় ৬৪২ জন যাত্রী বহনের ব্যবস্থা। পাশাপাশি ভারতীয় উপাদান ও যন্ত্রাংশ ব্যবহারের মাধ্যমে স্থানীয় উৎপাদনের মাত্রা প্রায় ৮০ শতাংশে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যও আলোচনায় রয়েছে।

তবে এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল—এই ট্রেনটিকে সরাসরি রাশিয়ার বর্তমানে চলাচলকারী ‘ইভোলগা ৪.০’-এর সঙ্গে এক করে দেখা ঠিক হবে না। রাশিয়ার ‘ইভোলগা’ পরিবারের বর্তমান বৈদ্যুতিক ট্রেনগুলি মূলত শহর ও উপনগরীয় যাত্রী পরিষেবার জন্য তৈরি। ‘ইভোলগা ৩.০’ ও ‘ইভোলগা ৪.০’-এর নকশাগত সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় ১৬০ কিলোমিটার। ‘ইভোলগা ৪.০’-এ এগারোটি কামরাও রয়েছে এবং রুশ সংস্থার দাবি অনুযায়ী এর প্রায় ৯৭ শতাংশ যন্ত্রাংশ রাশিয়াতেই তৈরি হয়।

অর্থাৎ, ভারতকে ঘিরে যে ৩৬০ কিলোমিটার গতির ‘ইভোলগা এফজি’-র কথা ছড়িয়েছে, সেটিকে বর্তমান ইভোলগা নগর রেলের সরাসরি সমতুল্য হিসেবে দেখা উচিত নয়। বরং এটি উচ্চগতির রেল ব্যবস্থার জন্য প্রস্তাবিত একটি পৃথক উন্নত সংস্করণ বা প্রকল্প হিসেবে বিবেচনা করা বেশি যুক্তিযুক্ত।

ব্রিকস সম্মেলনে পুতিনমোদির বৈঠক এবং রেল সহযোগিতা

২০২৬ সালের ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনকে কেন্দ্র করে নয়াদিল্লিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও রাশিয়ার রাষ্ট্রপতি ভ্লাদিমির পুতিনের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক বৈঠক হয়। দুই নেতা ভারত–রাশিয়ার বিশেষ ও কৌশলগত অংশীদারিত্ব আরও শক্তিশালী করার বিষয়ে আলোচনা করেন।

আলোচনায় অর্থনীতি, প্রতিরক্ষা, জ্বালানি, মহাকাশ, শিল্প ও প্রযুক্তি সহযোগিতা বিশেষ গুরুত্ব পায়। দুই দেশের বাণিজ্য ২০৩০ সালের মধ্যে ১০ হাজার কোটি মার্কিন ডলারে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়েও আলোচনা হয়েছে।

বৈঠকের পর মোদি ও পুতিন একসঙ্গে রুশ শিল্প ও প্রযুক্তি প্রদর্শনী ‘ইনোপ্রম’-এ যান। সেখানে রাশিয়ার বিভিন্ন শিল্পপ্রযুক্তি, উৎপাদন ব্যবস্থা ও পরিবহণ প্রযুক্তি প্রদর্শিত হয়। এই ঘটনাই ভারত–রাশিয়ার প্রযুক্তিগত সহযোগিতার সম্ভাবনা নিয়ে নতুন করে আগ্রহ তৈরি করেছে।

তবে এখনও পর্যন্ত প্রকাশ্যে আসা সরকারি বিবরণে পুতিন ব্যক্তিগতভাবে মোদিকে ‘ইভোলগা’ উচ্চগতির ট্রেন বিক্রির আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দিয়েছেন—এমন নির্দিষ্ট বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তাই বিষয়টিকে এখনই চূড়ান্ত চুক্তি বা সরকারি সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

ঘণ্টায় ৩৬০ কিলোমিটারকতটা দ্রুত?

প্রস্তাবিত রুশ উচ্চগতির ট্রেনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হল এর সম্ভাব্য গতি।

ঘণ্টায় ৩৬০ কিলোমিটার গতিতে চলতে সক্ষম হলে এটি ভারতের বর্তমান দ্রুতগতির আন্তঃনগর রেল পরিষেবার তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন শ্রেণির প্রযুক্তি হবে।

রাশিয়া নিজস্ব উচ্চগতির রেল ব্যবস্থার জন্য এমন ট্রেন তৈরির কাজ করছে যার নকশাগত গতি ঘণ্টায় ৪০০ কিলোমিটার এবং বাণিজ্যিক পরিষেবায় সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় ৩৬০ কিলোমিটার রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। মস্কো থেকে সেন্ট পিটার্সবার্গের উচ্চগতির রেলপথের জন্য আট কামরার ট্রেন নির্মাণের পরিকল্পনাও ইতিমধ্যে সামনে এসেছে।

এই কারণে ৩৬০ কিলোমিটার গতির রুশ প্রযুক্তি ভারতের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে।

আট কামরায় ৬৪২ যাত্রী

সাম্প্রতিক শিল্প-সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয় বাজারের জন্য আলোচিত ট্রেনটির আটটি কামরা থাকবে এবং প্রায় ৬৪২ জন যাত্রী বহনের সক্ষমতা থাকবে। ট্রেনটির পরিকল্পিত আয়ুষ্কাল প্রায় ৩০ বছর বলেও সংশ্লিষ্ট শিল্পমহলের আলোচনায় উল্লেখ করা হয়েছে।

এর অর্থ হল, এটি কেবল দ্রুতগতির একটি ট্রেন নয়—দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যিক পরিষেবা দেওয়ার উপযোগী একটি সম্পূর্ণ উচ্চগতির রেল ব্যবস্থা হিসেবে তৈরি করার লক্ষ্য রয়েছে।

৮০ শতাংশ দেশীয় উৎপাদনের সম্ভাবনা

ভারতের ক্ষেত্রে রুশ প্রস্তাবের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলির একটি হতে পারে স্থানীয় উৎপাদন।

প্রকাশিত শিল্প-তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৮০ শতাংশ যন্ত্রাংশ ও উপাদান স্থানীয়ভাবে উৎপাদনের লক্ষ্য রাখা হয়েছে।

ভারতের ‘দেশে তৈরি’ নীতির সঙ্গে এই মডেলটি সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে। বিদেশি প্রযুক্তি এনে সম্পূর্ণ তৈরি ট্রেন আমদানির বদলে প্রযুক্তি, নকশা ও উৎপাদন জ্ঞান ভারতে এনে দেশীয় সংস্থাগুলিকে উৎপাদন ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা হলে দীর্ঘমেয়াদে রেল শিল্পে নতুন দক্ষতা তৈরি হতে পারে।

এখানেই ভারত–রাশিয়া সহযোগিতার সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা।

মুম্বইআহমেদাবাদ করিডরে কি এই ট্রেন?

এই প্রশ্নটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

ভারতে বর্তমানে নির্মীয়মাণ মুম্বই–আহমেদাবাদ উচ্চগতির রেলপথের নকশাগত গতি ঘণ্টায় ৩২০ কিলোমিটার। কিন্তু এই করিডরের জন্য কোন ট্রেন চূড়ান্তভাবে ব্যবহৃত হবে, সেটিই এখনও নির্দিষ্টভাবে এই রুশ প্রস্তাবের সঙ্গে যুক্ত করা যায় না।

ভারতীয় রেল ইতিমধ্যে দেশীয় উচ্চগতির ট্রেন তৈরির কাজও এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। আট কামরার দেশীয় উচ্চগতির ট্রেনের নকশা ও নির্মাণ নিয়েও কাজ চলছে।

ফলে রুশ প্রস্তাব বাস্তবে গ্রহণ করা হলে সেটি শুধু মুম্বই–আহমেদাবাদ প্রকল্পের জন্যই হবে, এমন কোনও সরকারি সিদ্ধান্ত এখন নেই।

ভারতের জন্য রুশ ট্রেন কেন গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে?

ভারতের উচ্চগতির রেল ব্যবস্থা আগামী দশকে আরও বিস্তৃত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে শুধু একটি নির্দিষ্ট করিডর নয়, ভবিষ্যতের একাধিক উচ্চগতির রেলপথের জন্য ট্রেন নির্মাণের প্রযুক্তি ও উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তোলা গুরুত্বপূর্ণ।

রাশিয়ার প্রস্তাব গ্রহণ করা হলে সম্ভাব্য সহযোগিতার ক্ষেত্র হতে পারে—

প্রথমত, উচ্চগতির ট্রেনের নকশা ও প্রযুক্তি।

দ্বিতীয়ত, ভারতে ট্রেন নির্মাণের জন্য দেশীয় উৎপাদন ব্যবস্থা।

তৃতীয়ত, উচ্চগতির রেলযানের রক্ষণাবেক্ষণ ও যন্ত্রাংশ উৎপাদন।

চতুর্থত, রেল প্রযুক্তিতে দুই দেশের গবেষণা ও উন্নয়ন সহযোগিতা।

পঞ্চমত, ভবিষ্যতে তৃতীয় দেশের বাজারে যৌথভাবে উচ্চগতির ট্রেন রপ্তানির সম্ভাবনা।

ভারতের উচ্চগতির রেলের সঙ্গে প্রতিযোগিতা বাড়বে?

এই প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে ভারতের উচ্চগতির রেল ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা আরও বাড়তে পারে।

জাপানের প্রযুক্তি ইতিমধ্যেই মুম্বই–আহমেদাবাদ উচ্চগতির রেল প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত। পাশাপাশি ভারত নিজস্ব উচ্চগতির ট্রেন তৈরির দিকে এগোচ্ছে। রাশিয়া নতুন করে প্রবেশের চেষ্টা করলে ভারতকে একাধিক প্রযুক্তিগত বিকল্পের মধ্যে থেকে ভবিষ্যতের প্রয়োজন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দিতে পারে।

তবে উচ্চগতির রেলে শুধু ট্রেনের গতি গুরুত্বপূর্ণ নয়। নিরাপত্তা, রেলপথের মান, সংকেত ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ সরবরাহ, রক্ষণাবেক্ষণ, যাত্রীসুবিধা, আবহাওয়া ও ভূপ্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিচালন ব্যয়—সবকিছুকেই বিবেচনায় নিতে হয়।

ইভোলগানামটি নিয়েই কেন বিভ্রান্তি?

এখানেই সবচেয়ে বেশি সতর্কতা প্রয়োজন।

রাশিয়ার ‘ইভোলগা’ নামে পরিচিত ট্রেন পরিবার বর্তমানে মস্কোর উপনগরীয় রেল ব্যবস্থায় ব্যবহৃত হচ্ছে। ‘ইভোলগা ৪.০’ এগারো কামরার একটি বৈদ্যুতিক ট্রেন এবং এর নকশাগত গতি ঘণ্টায় ১৬০ কিলোমিটার।

অন্যদিকে সামাজিক মাধ্যমে যে নতুন তথ্য ছড়িয়েছে, সেখানে ‘ইভোলগা এফজি’ নামে আট কামরার, ঘণ্টায় ৩৬০ কিলোমিটার গতির এবং ৬৪২ যাত্রী ধারণক্ষমতার একটি উচ্চগতির মডেলের কথা বলা হচ্ছে।

তাই সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে দুটিকে একই ট্রেন হিসেবে উল্লেখ করলে তথ্যগত বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে।

পুতিনমোদির কথোপকথনের তাৎপর্য কোথায়?

পুতিন ও মোদির সাম্প্রতিক আলোচনার সবচেয়ে বড় বার্তা হল—দুই দেশ তাদের সম্পর্ককে শুধু প্রতিরক্ষা ও জ্বালানির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চাইছে না।

শিল্প, প্রযুক্তি, পরিবহণ, মহাকাশ, বাণিজ্য এবং উৎপাদনের মতো ক্ষেত্রেও সহযোগিতা বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। পুতিন ব্রিকসকে আরও বাস্তবমুখী অর্থনৈতিক সহযোগিতার প্ল্যাটফর্মে পরিণত করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। মোদিও ভারতের উৎপাদন ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর জোর দিয়েছেন।

এই বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে রুশ উচ্চগতির ট্রেনের প্রস্তাবকে দেখলে বিষয়টি নিছক একটি ট্রেন বিক্রির প্রস্তাব নয়; বরং এটি ভারতীয় রেল প্রযুক্তি ও উৎপাদন ব্যবস্থায় রাশিয়ার প্রবেশের সম্ভাব্য একটি নতুন দরজা হতে পারে।

এখন কী অপেক্ষা?

এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল ভারতের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত বা রুশ সংস্থার বিস্তারিত প্রস্তাব প্রকাশ।

যদি সত্যিই ৩৬০ কিলোমিটার গতির আট কামরার ট্রেন, ৬৪২ যাত্রী ধারণক্ষমতা এবং প্রায় ৮০ শতাংশ স্থানীয় উৎপাদনের পরিকল্পনা বাস্তবে ভারতীয় বাজারের জন্য উপস্থাপিত হয়ে থাকে, তাহলে পরবর্তী ধাপে প্রযুক্তিগত পরীক্ষা, ভারতীয় রেলপথের সঙ্গে সামঞ্জস্য যাচাই, নিরাপত্তা অনুমোদন, উৎপাদন কাঠামো, মূল্য, রক্ষণাবেক্ষণ এবং স্থানীয় উৎপাদনের শর্তই হবে মূল বিষয়।

ভারত ইতিমধ্যেই উচ্চগতির রেলের যুগে প্রবেশের প্রস্তুতি নিচ্ছে। তার সঙ্গে যদি রুশ প্রযুক্তির এই নতুন প্রস্তাব যুক্ত হয়, তাহলে আগামী দিনে ভারতের উচ্চগতির রেল বাজারে জাপান, দেশীয় প্রযুক্তি এবং রাশিয়ার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে।

তবে আপাতত এটিকে ‘ভারতের জন্য রাশিয়ার প্রস্তাবিত উচ্চগতির ট্রেন’ হিসেবে দেখা নিরাপদ; ‘পুতিন ব্রিকস সম্মেলনে মোদিকে ইভোলগা ট্রেনের আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দিয়েছেন’—এমন দাবি নিশ্চিত সরকারি সূত্রে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

Published on: সেপ্টে ১৩, ২০২৬ at ১৬:২১


শেয়ার করুন